প্রেমের জন্য মানুষ কত কিছুই না করে! কেউ কবিতা লেখে, কেউ গান গায়, আবার কেউ হয়তো হিমালয় ডিঙিয়ে চলে যায়। ভালোবাসার মানুষটিকে পাশে পাওয়ার জন্য বা আর কিছুক্ষণ সঙ্গে রাখার জন্য আমরা কতই না বাহানা খুঁজি। কিন্তু যদি শোনেন, কোনো প্রেমিক তার ভালোবাসার মানুষটিকে ধরে রাখার জন্য আস্ত একটা ‘থ্রিলার সিনেমার দৃশ্য’ তৈরি করে ফেলে, তাও আবার শুধু মুখের আওয়াজ দিয়ে? অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? চলুন, আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই অস্ট্রেলিয়ার জঙ্গলে থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘নকলবাজ’ প্রেমিকের সাথে।

কে এই ‘প্রেমিক’ পাখি, যে নকল করায় ওস্তাদ?

এই অসাধারণ শিল্পীর নাম ‘সুপার্ব লায়ারবার্ড’ (Superb Lyrebird)। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের বাসিন্দা এই পাখিটি কেবল দেখতেই সুন্দর নয়, তার আসল জাদু লুকিয়ে আছে তার গলায়। এই পাখিটি তার আশেপাশের প্রায় যেকোনো শব্দ নিখুঁতভাবে নকল করতে পারে। অন্য প্রায় ২০-২৫টি পাখির ডাক তো বটেই, এমনকি মানুষের তৈরি করা শব্দ, যেমন - ক্যামেরার শাটার টেপার শব্দ, গাড়ির অ্যালার্ম, বা করাতের শব্দও সে অবিকল নকল করে ফেলতে পারে। [3, 5, 9] পুরুষ লায়ারবার্ড তার এই অবিশ্বাস্য প্রতিভা ব্যবহার করে মূলত নারী পাখিদের আকর্ষণ করার জন্য। তার গানের ভাণ্ডার যত বড় হয়, প্রেমিক হিসেবে তার কদরও তত বাড়ে। [2] সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তার এই ‘সাউন্ড কালেকশন’ শুনিয়ে নারী পাখিকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করে। অনেকটা যেন একজন রকস্টার তার সেরা গিটার সোলো বাজাচ্ছেন! কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়, বরং আসল চমক তো এখনো বাকি!

প্রেমের চূড়ান্ত মুহূর্তে, যখন প্রেমিকা ছেড়ে চলে যেতে চায়, তখন এই লায়ারবার্ড হঠাৎ করেই এক ‘ভুয়ো বিপদ’ তৈরি করে! সে একদল আতঙ্কিত পাখির চিৎকার, ডানা ঝাপটানোর শব্দ এমনভাবে নকল করে, যেন আশেপাশে কোনো ভয়ঙ্কর শিকারি এসে পড়েছে!

ভাবুন একবার! ঠিক যখন মনে হচ্ছে প্রেম জমে উঠেছে, আর তখনই প্রেমিকা হয়তো কোনো কারণে উড়ে যেতে চাইছে। তখন পুরুষ লায়ারবার্ডটি তার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করে। সে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যা শুনলে মনে হবে যেন জঙ্গলে বাজ পড়েছে বা কোনো ক্ষুধার্ত শিকারি হামলা করেছে। এই শব্দের নাটকীয়তা এতটাই নিখুঁত হয় যে, শুধু তার প্রেমিকা নয়, আশেপাশের অন্য পাখিরাও বিভ্রান্ত হয়ে যায়। [4, 6] কিন্তু কেন এই ছলনা?

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, এটা আসলে পুরুষ পাখিটির এক বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল। [1] এই ‘ভুয়ো বিপদসংকেত’ তৈরি করে সে নারী পাখিটিকে বোঝাতে চায় যে, “বাইরে এখন খুব বিপদ, যেও না! আমার কাছেই থাকো, এখানে তুমি সুরক্ষিত।” [1, 5] এই আকস্মিক বিপদের ভয়ে নারী পাখিটি তখন উড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে এবং পুরুষটির কাছেই থেকে যায়। পুরুষ পাখিটি শুধু প্রেম নিবেদনের সময়েই নয়, এমনকি মিলনের সময়েও এই কৌশল প্রয়োগ করে, যাতে প্রেমিকা বেশি সময় ধরে তার সাথে থাকে। [4] এটা তার ভালোবাসার মানুষটিকে কাছে ধরে রাখার এক অদ্ভুত, অথচ কার্যকর ‘সেন্সরি ট্র্যাপ’ বা সংবেদনশীল ফাঁদ।

অনেকেই হয়তো ডেভিড অ্যাটেনবোরোর বিখ্যাত ডকুমেন্টারিতে লায়ারবার্ডকে করাত বা ক্যামেরার শব্দ নকল করতে দেখেছেন। যদিও এই তথ্যটি সত্যি, তবে এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই সব পাখিদের মধ্যে দেখা যায় যারা মানুষের কাছাকাছি থাকে, যেমন চিড়িয়াখানায়। [10] বুনো পরিবেশে তাদের প্রধান কাজ হলো প্রকৃতির অন্যান্য শব্দ, বিশেষ করে এই ‘বিপদসংকেত’ তৈরি করে নিজের প্রেমকে সফল করা।

শেষ পর্যন্ত, লায়ারবার্ডের এই প্রেমকাহিনী আমাদের কী শেখায়? ভালোবাসা হয়তো কখনো কখনো একটুখানি ছলনার আশ্রয়ও নেয়! তবে এই ছলনা কাউকে আঘাত করার জন্য নয়, বরং প্রিয়জনকে আরও কিছুক্ষণ কাছে পাওয়ার এক মিষ্টি আকুতি। তাই পরেরবার যখন জঙ্গলে কোনো পাখির কিচিরমিচিরের মধ্যে হঠাৎ ক্যামেরার ক্লিকের শব্দ বা অন্য কোনো অদ্ভুত আওয়াজ শুনবেন, তখন বুঝবেন হয়তো কোনো ‘দুষ্টু’ প্রেমিক তার ভালোবাসার জন্য এক মনগড়া নাটকের মঞ্চায়ন করছে!