বিড়াল যখন শহরের মেয়র! এক অদ্ভুত ভালোবাসার সত্যি কাহিনী

ভালোবাসা আর রাজনীতি - দুটো শব্দ কি একসাথে যায়? সাধারণত তো যায় না। কোথায় রাজনীতি মানে দলাদলি, জটিল সব হিসেবনিকেশ আর কোথায় ভালোবাসা মানে নরম, আদুরে একটা অনুভূতি। কিন্তু যদি বলি, এমন একটা শহর আছে যেখানে রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদটা ভোটের মাধ্যমে নয়, বরং নিখাদ ভালোবাসা আর মজাদার এক প্রতিবাদের মাধ্যমে পূরণ হয়েছিল? আর সেই পদে বসে থাকা ব্যক্তিটি কোনো মানুষই নন, বরং লোমশ, চারপেয়ে এক আদুরে প্রাণী!

ভাবছেন, এ আবার কেমন গল্প! কিন্তু গল্প হলেও সত্যি। পৃথিবীর বুকে এমন এক শহর আছে, যারা তাদের নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছিল এক বিড়ালকে। আর সেই বিড়াল টানা ২০ বছর ধরে শহর শাসন করেছে শুধুমাত্র তার সৌন্দর্য, ঘুম আর আলসেমি দিয়ে। চলুন, আজ ঘুরে আসি আলাস্কার সেই অদ্ভুত সুন্দর শহর তালকিটনা থেকে, আর শুনে আসি মেয়র স্টাবসের অবিশ্বাস্য গল্প।

আমাদের গল্পের শুরুটা ১৯৯৭ সালে। আলাস্কার ছোট্ট, শান্তশিষ্ট শহর তালকিটনা। এখানকার বাসিন্দারা বেশ আমুদে আর নিজেদের মতো করে জীবন কাটাতে ভালোবাসেন। প্রতিবারের মতো সেবারও মেয়র নির্বাচনের আয়োজন করা হলো। কিন্তু সমস্যা হলো, মেয়র পদের জন্য যে প্রার্থীরা দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের কাউকেই এলাকাবাসীর পছন্দ হচ্ছিল না। তাদের भाषण, তাদের প্রতিশ্রুতি - সবকিছুতেই কেমন যেন একটা একঘেয়েমি। শহরের মানুষ চাইছিল নতুন কিছু, এমন কিছু যা তাদের মুখে হাসি ফোটাবে।

আলাস্কার ছোট্ট শহর তালকিটনা-র মেয়র পদে কোনো মানুষ নয়, টানা ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল এক আদা-রঙা বিড়াল, যার নাম ছিল স্টাবস! [2, 5]

ঠিক সেই সময়েই শহরের এক দোকানের ম্যানেজার, লরি স্টেক, এক বাক্স থেকে খুঁজে পান লেজবিহীন এক ছোট্ট বিড়াল ছানাকে। [5] তার নাম রাখা হলো 'স্টাবস'। শহরের মানুষের মনে হলো, এই একঘেয়ে রাজনীতিবিদদের থেকে এই মিষ্টি বিড়াল ছানাটা অনেক ভালো। ব্যস, যা ভাবা তাই কাজ! কয়েকজন রসিক বাসিন্দা মজা করে মেয়র পদে স্টাবসের নাম লিখে দেওয়ার জন্য প্রচার শুরু করলেন। [2, 5] আর কী আশ্চর্য! শহরের বেশিরভাগ মানুষ এতটাই মজা পেলেন যে তারা সত্যিই ব্যালট পেপারে স্টাবসের নাম লিখে দিয়ে এলেন। ফলাফল? বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তালকিটনা শহরের মেয়র নির্বাচিত হলো ছোট্ট স্টাবস! [2]

অবশ্য, বলে রাখা ভালো, তালকিটনা শহরটি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পৌরসভা নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক জেলা। [3] তাই এর মেয়র পদটিও ছিল মূলত সম্মানসূচক। কিন্তু তাতে কী! স্টাবস হয়ে উঠেছিল শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাসিন্দা এবং পৃথিবীর একমাত্র বিড়াল মেয়র। তার অফিস ছিল নাগলি'স জেনারেল স্টোর, যেখানে সে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাত। [2] তার কাজ? কিছুই না! শুধু পর্যটকদের আদর খাওয়া, মাঝে মাঝে নিজের পছন্দের ক্যাটনিপ মেশানো জল কাঁচের গ্লাসে করে পান করা, আর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা। [3, 4] তার কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না, ছিল না কোনো দুর্নীতির অভিযোগ। সে শুধু ভালোবাসা বিলিয়ে গেছে আর বিনিময়ে পেয়েছে অফুরন্ত আদর।

স্টাবসের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন পর্যটক শুধু তাকে দেখার জন্যই তালকিটনা শহরে আসতেন। [3] এতে শহরের পর্যটন ব্যবসাও ফুলেফেঁপে ওঠে। চিঠি, কার্ড আর উপহারে ভরে যেত তার অফিস। স্টাবস শুধু এক শহরের মেয়র ছিল না, সে হয়ে উঠেছিল ভালোবাসা আর একতার প্রতীক। তার ২০ বছরের শাসনকালে সে অনেক কঠিন পরিস্থিতিরও सामना করেছে। ২০১৩ সালে এক কুকুরের আক্রমণে সে গুরুতর আহত হয়েছিল, কিন্তু সারা বিশ্বের মানুষের প্রার্থনা আর ভালোবাসায় সে আবার সুস্থ হয়ে ওঠে। [4, 7]

২০১৭ সালে, প্রায় ২০ বছর ৩ মাস বয়সে, মেয়র স্টাবস এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। [4] তার মৃত্যুতে গোটা শহর শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সে যে ভালোবাসার উত্তরাধিকার রেখে গেছে, তা আজও তালকিটনার বাতাসে ভাসে। স্টাবসের গল্প আমাদের শেখায় যে, রাজনীতি মানে সব সময় জটিলতা নয়। কখনও কখনও একটু সরলতা, একটু নির্ভেজাল ভালোবাসা দিয়েও মানুষের মন জয় করা যায়, একটা গোটা শহরকে একসূত্রে বাঁধা যায়। মেয়র স্টাবসের মতো একজন নেতা शायद আর কোনোদিনও আসবে না, যে ট্যাক্স বাড়ায় না, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয় না, শুধু ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই একটা শহরকে বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত করে তোলে। [5] এ এক অন্যরকম প্রেমের গল্প, একটা শহরের সাথে তার চারপেয়ে শাসকের ভালোবাসার গল্প।