ভ্যালেন্টাইনস ডে! নামটা শুনলেই চোখের সামনে কী ভেসে ওঠে? লাল গোলাপ, চকোলেটের বাক্স, নরম টেডি বিয়ার আর ভালোবাসার মিষ্টি মিষ্টি কথা, তাই না? ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ এলেই যেন বাতাসে একটা রোমান্টিক আবেশ ছড়িয়ে পড়ে। প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অপরকে ভালোবাসার কথা জানাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু যদি বলি, এমন একটা সময় ছিল যখন ভ্যালেন্টাইনস ডে মানে শুধু প্রেম নিবেদনই ছিল না, বরং ছিল চূড়ান্ত অপমান করারও একটা বিশেষ দিন? যখন প্রেমপত্রের বদলে মানুষ একে অপরকে পাঠাতো বেনামী অপমানপত্র! হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। চলুন, আজ ডুব দেওয়া যাক ভিক্টোরিয়ান যুগের সেই অদ্ভুত, মজার আর খানিকটা কাঁটাযুক্ত ভ্যালেন্টাইনস ডে-র গল্পে।

যখন ভালোবাসা ছিল ‘ভিনিগার’-এর মতো টক!

আজকের দিনে আমরা ভালোবাসার মানুষকে যে সুন্দর, দামী কার্ড পাঠাই, তার ঠিক উল্টো একটা প্রথা চালু ছিল ভিক্টোরিয়ান যুগে, অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দীতে। সেই সময়কার মানুষেরা শুধু ভালোবাসার মানুষকেই নয়, বরং অপছন্দের মানুষকেও কার্ড পাঠাতো। আর সেই কার্ডগুলোতে ভালোবাসা বা প্রশংসার ছিটেফোঁটাও থাকতো না, বরং থাকতো ঠাট্টা, বিদ্রূপ আর কড়া ভাষায় অপমান। এই অদ্ভুত কার্ডগুলোর নাম শুনলেও অবাক হবেন— এদের বলা হতো ‘ভিনিগার ভ্যালেন্টাইনস’ (Vinegar Valentines)। নামটা যেমন অদ্ভুত, এদের কাজও ছিল তেমনই।

ভিক্টোরিয়ান যুগে এমন এক ধরনের ভ্যালেন্টাইনস কার্ড ছিল যা ভালোবাসার বদলে অপমান, ব্যঙ্গ আর বিদ্রূপ প্রকাশ করার জন্য পাঠানো হতো। আর এই কার্ডগুলোর নাম ছিল— ‘ভিনিগার ভ্যালেন্টাইনস’!

ভাবছেন, কারা পাঠাতো এই কার্ড? কেনই বা পাঠাতো? আসলে এর কারণ ছিল অনেক। হয়তো কেউ তার নাছোড়বান্দা প্রেমপ্রার্থীকে মুখের উপর ‘না’ বলতে পারছে না, সে বেনামে একটা ভিনিগার ভ্যালেন্টাইন পাঠিয়ে দিত। আবার কেউ হয়তো তার কোনো পরিচিত ব্যক্তির চালচলন বা কোনো অভ্যাস একেবারেই পছন্দ করতো না, কিন্তু সামনাসামনি বলার সাহসও ছিল না। তারাও এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতো। এক কথায়, মনের মধ্যে জমে থাকা রাগ, বিরক্তি বা স্রেফ মজা করার জন্যই এই কার্ডগুলোর জন্ম হয়েছিল।

এই ভিনিগার ভ্যালেন্টাইনগুলো দেখতেও ছিল বেশ অদ্ভুত। এগুলো সাধারণত খুব সস্তা কাগজে ছাপা হতো। কার্ডের ওপর আঁকা থাকতো বিভিন্ন ধরনের ব্যঙ্গচিত্র বা ক্যারিকেচার। যেমন ধরুন, কোনো কার্ডে হয়তো একজন মোটা মানুষের ছবি এঁকে তাকে নিয়ে মজা করা হয়েছে, বা কোনো অহংকারী ব্যক্তিকে বাঁদর বা গাধার সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর সেই ছবির সাথে থাকতো ছোট্ট কিন্তু অত্যন্ত অপমানজনক ছড়া। যেমন কোনো ছড়ায় হয়তো প্রাপকের চেহারা নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে, আবার কোনোটাতে তার পেশা বা সামাজিক অবস্থানকে ছোট করা হয়েছে। এমনকি নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনকে ব্যঙ্গ করেও কার্ড তৈরি করা হতো।

সবচেয়ে মজার আর নিষ্ঠুর ব্যাপার কী ছিল জানেন? এই কার্ডগুলো বেনামে পাঠানো হতো, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাপককেই এর ডাকমাশুল দিতে হতো! একবার কল্পনা করুন, আপনি অধীর আগ্রহে পোস্টম্যানের জন্য অপেক্ষা করছেন, ভাবছেন হয়তো কোনো গোপন প্রেমপত্র আসবে। কিন্তু চিঠি খুলেই দেখলেন, কেউ আপনাকে অপমান করে একটি কার্ড পাঠিয়েছে, আর তার জন্য নিজের পকেট থেকে পয়সাও খসাতে হলো! এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে? এই কার্ডগুলো এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, একটা সময় নিউইয়র্কের এক বড় কার্ড প্রকাশক জানিয়েছিলেন যে তাদের বিক্রি হওয়া মোট ভ্যালেন্টাইনস কার্ডের প্রায় অর্ধেকই ছিল এই ভিনিগার ভ্যালেন্টাইনস।

তবে এই প্রথাটা শুধুই মজার ছিল না। কখনও কখনও পরিস্থিতি বেশ गंभीर আকার ধারণ করত। এমনও শোনা যায় যে, এই ধরনের অপমানজনক কার্ড পেয়ে অনেকে এতটাই আঘাত পেতেন যে তা নিয়ে মারামারি, এমনকি আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটত। আসলে, আজকের ডিজিটাল যুগে আমরা যাকে ‘ট্রোলিং’ বলি, ভিনিগার ভ্যালেন্টাইনস ছিল তারই এক পুরোনো সংস্করণ। মানুষ নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখে অন্যকে আঘাত করার জন্য এই মাধ্যমটি ব্যবহার করত।

তাহলে কি ভিক্টোরিয়ান যুগে ভালোবাসা ছিল না? অবশ্যই ছিল। একদিকে যেমন এই টক স্বাদের ভ্যালেন্টাইন ছিল, তেমনই অন্যদিকে ছিল মিষ্টি, সুন্দর, লেস আর ফুলে সজ্জিত দামী প্রেমপত্র। আসলে ওই যুগটা ছিল বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে যেমন ছিল কঠোর সামাজিক নিয়মকানুন, তেমনই মানুষের মনের ভেতরেও ছিল তীব্র আবেগ— তা সে ভালোবাসাই হোক বা ঘৃণা। ভিনিগার ভ্যালেন্টাইনসগুলো সেই চাপা ক্ষোভ বা বিরক্তি প্রকাশের একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

তো, পরের বার যখন ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে আপনার প্রেমিকের থেকে একটা মিষ্টি কার্ড বা গোলাপ পাবেন, তখন একবার ভিক্টোরিয়ান যুগের কথা ভেবে দেখবেন। আর মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেবেন যে, আপনাকে অন্তত ডাকমাশুল দিয়ে নিজের অপমানের চিঠি পড়তে হচ্ছে না! ভালোবাসা সত্যিই কত সহজ হয়ে গেছে, তাই না?