ভালোবাসার দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত! এখানে কখন, কীভাবে, কোন বাঁকে যে কী লুকিয়ে থাকে, তা বলা মুশকিল। মানুষ হিসেবে আমরা ভাবি, প্রেম-ভালোবাসার যত নাটকীয়তা, যত চড়াই-উতরাই, সব বোধহয় আমাদের জীবনেই ঘটে। কিন্তু সত্যিটা হলো, প্রকৃতির রাজ্যে এমন অনেক প্রেমের গল্প লুকিয়ে আছে, যা শুনলে আমাদের নিজেদের জীবনের গল্পও ফিকে মনে হতে পারে। আজ তেমনই এক আটপেয়ে প্রেমিকের গল্প শোনাব, যে তার প্রেমিকাকে ঠকাতে গিয়েও আসলে জিতিয়ে দেয় ভালোবাসাকে।
উপহার যখন ভালোবাসার চাবিকাঠি
আমাদের গল্পের নায়ক হলো এক বিশেষ প্রজাতির মাকড়সা, যার নাম নার্সারি ওয়েব স্পাইডার (Nursery Web Spider)। এরা সাধারণত ইউরোপের তৃণভূমিতে বাস করে। আর পাঁচটা মাকড়সার মতো এরা জাল বুনে শিকার ধরে না, বরং শিকারি হিসেবেই এদের বেশি নামডাক। তবে এদের যা সবচেয়ে বেশি অবাক করে, তা হলো এদের প্রেম নিবেদনের পদ্ধতি। পুরুষ নার্সারি ওয়েব স্পাইডার যখন কোনো নারী মাকড়সার প্রেমে পড়ে, তখন সে খালি হাতে মোটেই যায় না। ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে সে সঙ্গে নিয়ে যায় এক বিশেষ 'উপহার', যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন 'নাপশিয়াল গিফট' (Nuptial Gift)।
এই উপহার আর কিছুই নয়, রেশমি সুতোয় সুন্দর করে মোড়ানো একটি শিকার। পুরুষ মাকড়সাটি নিজের শিকার করা কোনো পোকামাকড়কে যত্ন করে রেশম দিয়ে মুড়িয়ে প্রেমিকার সামনে হাজির হয়। যদি নারী মাকড়সাটি সেই উপহার গ্রহণ করে, তবেই তাদের মিলন সম্ভব হয়। প্রেমিকা যখন উপহারটি খেতে ব্যস্ত থাকে, সেই সুযোগে পুরুষ মাকড়সাটি তার ভালোবাসার উদ্দেশ্য সফল করে।
জানেন কি? পুরুষ নার্সারি ওয়েব স্পাইডার প্রেমিকাকে উপহার দেওয়ার মাধ্যমে শুধু প্রেমই নিবেদন করে না, বরং নিজের জীবনও বাঁচায়! উপহার ছাড়া প্রেম নিবেদন করতে গেলে নারী মাকড়সার হাতে তার মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ছয়গুণ বেড়ে যায়।
ভালোবাসায় সামান্য প্রতারণা!
গল্পটা এখানেই শেষ হলে পারত। কিন্তু এই আটপেয়ে প্রেমিকদের দুনিয়ায় রয়েছে এক মজার মোড়। সব পুরুষ মাকড়সাই যে একেবারে সততার পরাকাষ্ঠা, তা কিন্তু নয়। কিছু চালাক পুরুষ মাকড়সা মাঝেমধ্যে তাদের প্রেমিকাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা অনেক সময় সুন্দর করে রেশমে মোড়ানো উপহার তো দেয়, কিন্তু ভেতরে শিকারের বদলে থাকে শুকনো পাতার টুকরো, তুলোর বল বা কোনো পোকামাকড়ের মূল্যহীন অবশিষ্টাংশ! ভাবুন একবার, ভালোবাসার নামে এমন প্রতারণা!
এই ফাঁকি অবশ্য নারী মাকড়সারা ঠিকই ধরে ফেলে। যখন সে বুঝতে পারে যে উপহারটি ভুয়া, তখন সে তাড়াতাড়ি মিলন শেষ করে পুরুষটিকে তাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, উপহার যত ভালো এবং বড় হয়, তাদের মিলনের সময়কালও তত দীর্ঘ হয়। আর এর ফলে পুরুষ মাকড়সাটি বেশি সংখ্যক শুক্রাণু স্থানান্তর করতে পারে, যা তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিশ্চিত করার জন্য খুব জরুরি।
কেন এই উপহার দেওয়া-নেওয়া?
বিজ্ঞানীরা এই অদ্ভুত আচরণের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন। প্রথমত, এই উপহারটি নারী মাকড়সার আগ্রাসন থেকে পুরুষটিকে রক্ষা করে। উপহার ছাড়া কাছে গেলে কপালে মৃত্যুও জুটতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি পুরুষ মাকড়সার যোগ্যতা প্রমাণ করে। যে পুরুষ যত ভালো শিকারি, সে তত ভালো উপহার আনতে পারে, যা প্রমাণ করে যে সে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একজন শক্তিশালী বাবা হতে পারবে। নারী মাকড়সা এই উপহারের মাধ্যমে তার হবু সন্তানের বাবার যোগ্যতা যাচাই করে নেয়।
মজার ব্যাপার হলো, কোনো পুরুষ মাকড়সা যদি তার আনা উপহার নিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়, তাহলে সে কিন্তু হাল ছাড়ে না। সে সেই উপহারের উপর আরও রেশম জড়িয়ে তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করে এবং আবার প্রেমিকার সামনে হাজির হয়। এই রেশমের আস্তরণে কিছু রাসায়নিক পদার্থও থাকে, যা নারীকে আকৃষ্ট করতে সাহায্য করে।
শেষ পর্যন্ত, এই ছোট্ট মাকড়সার প্রেমের গল্প আমাদের কী শেখায়? ভালোবাসার সম্পর্কে উপহারের চেয়েও বড় হলো সততা আর যোগ্যতা। নার্সারি ওয়েব স্পাইডারের এই अनोখা প্রেমকাহিনী প্রকৃতির এক অসাধারণ সৃষ্টি, যা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে ভালোবাসার প্রকাশ সব জায়গায়, সব প্রাণের মধ্যেই অনন্য।