আচ্ছা, কাউকে ভালোবাসা প্রকাশ করতে গেলে আমরা সবার আগে কোন চিহ্নটা ব্যবহার করি? হোয়াটসঅ্যাপে হোক বা হাতে আঁকা কার্ডে, দুটো বাঁকানো লাইন মিলে তৈরি হওয়া ছোট্ট একটা ‘হার্ট’ (♥) এঁকে দিলেই যেন সব কথা বলা হয়ে যায়। তাই না? আমরা ধরেই নিয়েছি এই চিহ্নটা আমাদের বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ড বা হার্টের আদলে তৈরি। কিন্তু যদি বলি, এই ধারণাটা একেবারেই সত্যি নয়? যদি বলি, ভালোবাসার এই বিশ্বজোড়া প্রতীকের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মিষ্টি, রোমান্টিক আর একটু দুঃখের গল্প? এক হারিয়ে যাওয়া গাছের গল্প, যা কি না ভালোবেসে নিজেকেই বিলিয়ে দিয়েছিল!
অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন তো, একটা গাছের সাথে আবার ভালোবাসার কী সম্পর্ক? চলুন, আজ সেই গল্পই শোনাই। গল্পটা এমন এক সময়ের, যখন ভালোবাসার প্রকাশের জন্য কোনো ইমোজি ছিল না, ছিল শুধু বিশ্বাস আর প্রকৃতির দেওয়া উপহার।
এক বিলুপ্ত গাছের অবিশ্বাস্য কাহিনী
আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা। প্রাচীন গ্রিক এবং রোমান সভ্যতার যুগে উত্তর আফ্রিকার উপকূলে, আজকের লিবিয়ার কাছে, সাইরিন (Cyrene) নামে এক সমৃদ্ধ শহর ছিল। [10] এই শহরের প্রধান সম্পদ ছিল ‘সিলফিয়াম’ (Silphium) নামের এক অদ্ভুত গাছ। [8] এই গাছটি ছিল এক কথায় জাদুর মতো। এর সুগন্ধি মশলা হিসেবে রান্নায় ব্যবহার হতো, এর থেকে তৈরি হতো পারফিউম, আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে কার্যকরী একটি ওষুধ। [4, 8] কিন্তু এর সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যবহার ছিল অন্য জায়গায়।
সিলফিয়াম গাছটি প্রাচীনকালে गर्भनिरोधक হিসেবে দারুণ জনপ্রিয় ছিল। [2, 3] এই কারণে, এটি প্রেম এবং যৌনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল। [1, 10] মানুষ বিশ্বাস করত, এই গাছ ভালোবাসা এবং ঘনিষ্ঠতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। সেই সময়, দুটি মানুষের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ককে আরও গভীর করতে বা পরিবার পরিকল্পনার জন্য এই গাছের ওপরই ভরসা করা হতো। [7]
ভালোবাসার যে ‘হার্ট’ চিহ্নটি আমরা আজকে আঁকি বা পাঠাই, সেটি আসলে মানুষের হৃৎপিণ্ডের ছবি নয়, বরং সাইরিন শহরের সেই জাদুকরী ‘সিলফিয়াম’ গাছের হার্ট-আকৃতির বীজের আদলে তৈরি! [1, 5]
হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন! সিলফিয়ামের বীজ বা ফল দেখতে ছিল অবিকল আজকের হার্ট চিহ্নের মতো। [5, 8] সাইরিন শহরের মানুষ তাদের এই মূল্যবান সম্পদ নিয়ে এতটাই গর্বিত ছিল যে, তারা তাদের মুদ্রার ওপর এই হার্ট-আকৃতির বীজের ছবি খোদাই করে দিয়েছিল। [4, 10] ভাবুন তো, আজকের দিনে যেমন টাকায় দেশের কোনো বড় ব্যক্তিত্বের ছবি থাকে, তেমনই সেই সময়ে সাইরিনের মুদ্রায় থাকত ভালোবাসার এই প্রতীক! এই মুদ্রাগুলোই ধীরে ধীরে গোটা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে আর তার সাথে ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসার এই নতুন চিহ্ন। [4]
মানুষের হৃৎপিণ্ডের সাথে কিন্তু এই চিহ্নের চেহারার খুব একটা মিল নেই। [1] বরং সিলফিয়ামের বীজের নিখুঁত হার্ট-আকৃতির জন্যই এই চিহ্নটি ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ওঠে। কারণ গাছটি নিজেই ছিল প্রেম এবং ঘনিষ্ঠতার প্রতীক। [12]
যেভাবে হারিয়ে গেল ভালোবাসার গাছ
সিলফিয়ামের চাহিদা এতটাই বেশি ছিল যে সাইরিন শহরটি সেই সময়ে আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী শহরগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল। [4] কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই গাছটি পৃথিবীর আর কোথাও চাষ করা যেত না, শুধুমাত্র সাইরিনের আশেপাশের একটি ছোট্ট এলাকাতেই এটি জন্মাত। [2] এর চাহিদা বাড়তে থাকায় মানুষ কোনো নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত পরিমাণে এই গাছ তোলা শুরু করে। ভালোবাসার চাহিদা মেটাতে গিয়ে গাছটি যেন নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছিল।
ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। অতিরিক্ত আহরণের ফলে একসময় এই আশ্চর্য গাছটি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। [2] বলা হয়, রোমান সম্রাট নিরোর সময়ে শেষ সিলফিয়াম গাছটি কেটে ফেলা হয়েছিল। ভালোবাসার এক অদ্ভুত করুণ পরিণতি! যে গাছটি ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই ভালোবাসার চাপেই সে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল। [16]
কিন্তু গাছটি হারিয়ে গেলেও, তার দেওয়া ভালোবাসার চিহ্নটি আজও আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। সাইরিনের মুদ্রার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই হার্ট-শেপ আজকের দিনে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বজনীন প্রতীক। আমরা হয়তো সিলফিয়ামকে ভুলে গেছি, কিন্তু তার সেই মিষ্টি, হার্ট-আকৃতির বীজ আজও কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসার ভাষা হয়ে বেঁচে আছে।
তো, পরেরবার যখন কাউকে ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে ‘♥’ পাঠাবেন, তখন একবার অন্তত সেই হারিয়ে যাওয়া গাছটির কথা মনে করবেন। যে কি না নিজের অস্তিত্বকে বিলিয়ে দিয়ে আমাদের জন্য ভালোবাসার এই অমর প্রতীকটি রেখে গেছে। ভালোবাসার এর চেয়ে বড় আত্মত্যাগ আর কী হতে পারে?