ঘটনার প্রেক্ষাপট
১৮৪৫ সালের ১৯শে মে, ইংল্যান্ডের গ্রিনহিথ বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির দুটি শক্তিশালী জাহাজ—এইচএমএস ইরেবাস এবং এইচএমএস টেরর। তাদের লক্ষ্য ছিল এক অধরা স্বপ্নকে জয় করা: কিংবদন্তির নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ বা উত্তর-পশ্চিম গিরিপথ আবিষ্কার করা, যা আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করবে। এই কঠিন অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ অভিযাত্রী স্যার জন ফ্র্যাঙ্কলিন। তার সাথে ছিল ১২৮ জন সুদক্ষ নাবিক ও অফিসার। তিন বছরের রসদ, আধুনিকতম প্রযুক্তি এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অহংকার নিয়ে তারা পাড়ি দিয়েছিল অজানার উদ্দেশে।
১৮৪৫ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে, বাফিন উপসাগরে দুটি তিমি শিকারি জাহাজের ক্যাপ্টেনরা শেষবারের মতো ইরেবাস এবং টেররকে দেখতে পান। তারপর? তারপর শুধুই নৈঃশব্দ্য। দুটি জাহাজ, ১২৯টি তরতাজা প্রাণ যেন উত্তর মেরুর বরফ শীতল কুয়াশার মধ্যে চিরতরে বিলীন হয়ে গেল। সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর যায়, কিন্তু ফ্র্যাঙ্কলিন বা তার সঙ্গীদের কোনো খবর আসে না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গর্ব পরিণত হয় এক গভীর উদ্বেগে। এক অসমাপ্ত অভিযান জন্ম দেয় ইতিহাসের অন্যতম শীতল এবং শিহরণ জাগানো এক রহস্যের।
রহস্যের জাল
বছরের পর বছর কেটে গেলেও কোনো খবর না আসায় তোলপাড় শুরু হয় ইংল্যান্ডে। ফ্র্যাঙ্কলিনের স্ত্রী, লেডি জেন ফ্র্যাঙ্কলিনের চাপে ব্রিটিশ সরকার একাধিক উদ্ধারকারী দল পাঠায়। কিন্তু মেরু অঞ্চলের বৈরী প্রকৃতি যেন কোনো চিহ্নই দিতে রাজি ছিল না। অবশেষে ১৮৫০ সালে উদ্ধারকারী দল কানাডার বিচি দ্বীপে প্রথম সূত্র খুঁজে পায়। সেখানে বরফের নিচে তিনটি কবর পাওয়া যায়, যা ফ্র্যাঙ্কলিনের দলের তিনজন নাবিকের ছিল। কবরের ফলকগুলোয় লেখা তারিখ জানিয়ে দেয় যে, অভিযানের প্রথম শীতেই তারা মারা গিয়েছিল। কিন্তু বাকিদের কী হলো? জাহাজ দুটি কোথায় গেল?
এরপরের কয়েক দশকে বিভিন্ন অভিযাত্রী দল আরও কিছু ভয়ঙ্কর সূত্র আবিষ্কার করে। কিং উইলিয়াম দ্বীপে ইনুইট (এস্কিমো) শিকারিরা কিছু অদ্ভুতদর্শন সাদা মানুষের গল্প শোনায়। তাদের মতে, মানুষগুলো ছিল ক্ষুধার্ত, উন্মাদ এবং মরিয়া। তারা বরফের উপর দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছিল এবং তাদের চোখে ছিল শূন্য দৃষ্টি। ইনুইটরা এমন কিছু কাটা হাড়গোড়ের দিকে ইঙ্গিত করে, যা কোনো পশুর ছিল না। সেগুলো ছিল মানুষের! এই প্রথম নরমাংস ভক্ষণের এক ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা উঁকি দেয়। ব্রিটিশ সমাজ এই তথ্য মানতে রাজি ছিল না। তাদের চোখে অভিযাত্রীরা ছিলেন বীর, নরখাদক নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণটি পাওয়া যায় ভিক্টরি পয়েন্টে পাথরের স্তূপের নিচে রাখা একটি চিরকুট থেকে। চিরকুটটিতে দুটি ভিন্ন তারিখের লেখা ছিল। প্রথমটি ১৮৪৭ সালের, যেখানে বলা হয় জাহাজ দুটি বরফে আটকে পড়েছে কিন্তু 'সব ভালো'। দ্বিতীয় লেখাটি ছিল এক বছর পরের, ১৮৪৮ সালের। সেই লেখার ভাষা ছিল ভয়ঙ্কর এবং হতাশাজনক। সেখানে লেখা হয়, স্যার জন ফ্র্যাঙ্কলিন মারা গেছেন। জাহাজ দুটি পরিত্যক্ত হয়েছে এবং ১০৫ জন বেঁচে থাকা সদস্য দক্ষিণ দিকে হাঁটা শুরু করেছে। কিন্তু কোথায় তাদের গন্তব্য, কেনই বা তারা জাহাজ ছাড়ল, তার কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। এরপর সেই ১০৫ জনের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। তারা যেন বরফ আর বাতাসের মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছিল।
সত্যের উন্মোচন
প্রায় ১৭০ বছর ধরে এই রহস্য মানুষকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। অসংখ্য বই, গবেষণা এবং অভিযানের পর অবশেষে প্রযুক্তি উত্তর দিতে শুরু করে। ২০১৪ সালে, কানাডার ভিক্টোরিয়া স্ট্রেইটে সমুদ্রের গভীরে আবিষ্কৃত হয় এইচএমএস ইরেবাসের ধ্বংসাবশেষ। এর ঠিক দু'বছর পর, ২০১৬ সালে, কিছুটা দূরেই খুঁজে পাওয়া যায় এইচএমএস টেররকে, যা প্রায় নিখুঁত অবস্থায় সমুদ্রের গভীরে অপেক্ষা করছিল।
জাহাজ দুটি খুঁজে পাওয়ার পর নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। আধুনিক ফরেনসিক পরীক্ষায় জানা যায়, ফ্র্যাঙ্কলিনের দলের নাবিকদের হাড়ের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে সিসার উপস্থিতি ছিল। ধারণা করা হয়, তাদের জাহাজে থাকা টিনজাত খাবারগুলো সঠিকভাবে সিল করা ছিল না, যার ফলে সিসা মিশে গিয়ে বিষক্রিয়া তৈরি করে। এই সিসার বিষক্রিয়ার ফলে নাবিকদের মধ্যে অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, যা হয়তো তাদের দিয়ে ভয়ঙ্কর সব কাজ করিয়ে নিয়েছিল।
আজ আমরা জানি যে, ফ্র্যাঙ্কলিনের অভিযানটি একটি মর্মান্তিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। জাহাজগুলো বরফে আটকে যাওয়ার পর, বেঁচে থাকা সদস্যরা απελπισাগ্রস্ত হয়ে দক্ষিণ দিকে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অনাহার, শীত এবং সম্ভবত সিসার বিষক্রিয়ায় জর্জরিত হয়ে একে একে সবাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। নরমাংস ভক্ষণের যে ভয়ঙ্কর গল্প ইনুইটরা শুনিয়েছিল, বিভিন্ন হাড়ের উপর কাটার দাগ সেই নির্মম সত্যকেই প্রমাণ করে।
ইরেবাস এবং টেররের আবিষ্কার ফ্র্যাঙ্কলিন রহস্যের অনেক উত্তর দিলেও, কিছু প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে। সেই মানুষগুলোর শেষ দিনগুলো ঠিক কেমন ছিল? চরম পরিস্থিতিতে তারা একে অপরের সাথে কেমন আচরণ করেছিল? তাদের মনের মধ্যে কী চলছিল? উত্তর মেরুর বরফের নিচে আজও হয়তো চাপা পড়ে আছে ১২৯ জন মানুষের আত্মত্যাগ, কষ্ট এবং সংগ্রামের সেই হিমশীতল কাহিনী, যার পুরোটা হয়তো কোনোদিনও জানা যাবে না।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)