ঘটনার প্রেক্ষাপট
সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ৫৩ অব্দ। স্থান: প্রাচীন তুরস্কের হারান শহরের নিকটবর্তী কারহে-র তপ্ত মরুপ্রান্তর। একদিকে রোমান প্রজাতন্ত্রের বিশাল সেনাবাহিনী, যার নেতৃত্বে আছেন মার্কাস লিসিনিয়াস ক্রাসাস – রোমের অন্যতম ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি। অন্যদিকে পার্থিয়ান সাম্রাজ্যের দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী বাহিনী। ক্রাসাসের চোখে তখন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন, কিন্তু তিনি জানতেন না যে এই মরুভূমি তার এবং তার চল্লিশ হাজার সৈন্যের সমাধিস্থল হতে চলেছে।
যুদ্ধটি ছিল এক কথায় অসম। পার্থিয়ানদের নিখুঁত তীরন্দাজি এবং ভয়ঙ্কর ক্যাটাফ্র্যাক্ট (ভারী অশ্বারোহী) বাহিনীর সামনে রোমান legionaries বা পদাতিক সৈন্যরা খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। রোমানদের প্রায় ২০,০০০ সৈন্য নিহত হয় এবং ক্রাসাস নিজেও নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন। কিন্তু প্রায় ১০,০০০ সৈন্যকে জীবিত বন্দী করা হয়। এখানেই ইতিহাসের একটি সাধারণ অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং এক অবিশ্বাস্য ও অমীমাংসিত রহস্যের গল্পের শুরু। এই ১০,০০০ রোমান সৈন্যের ভাগ্যে কী ঘটেছিল? ইতিহাসবিদ প্লুটার্কের মতে, তাদের পার্থিয়ান সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে, σημερινή Turkmenistan-এর মার্ভ অঞ্চলে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। এরপর ইতিহাসের পাতা থেকে তারা যেন পুরোপুরি উধাও হয়ে যায়।
রহস্যের জাল
প্রায় দুই হাজার বছর পর, ১৯৪০-এর দশকে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ইতিহাসের অধ্যাপক হোমার এইচ. ডাবস এক দুঃসাহসিক তত্ত্ব নিয়ে সামনে এলেন যা ইতিহাসবিদদের মধ্যে ঝড় তুলে দেয়। তিনি দাবি করেন, কারহে-র যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া সেই রোমান সৈন্যরা উধাও হয়ে যায়নি, বরং তারা আরও পূর্বে যাত্রা করে পৌঁছে গিয়েছিল এক অবিশ্বাস্য গন্তব্যে – চীন!
ডাবসের তত্ত্ব অনুযায়ী, পার্থিয়ানদের হয়ে সীমান্তরক্ষীর কাজ করার পর, এই রোমান সৈন্যরা ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে যাযাবর জিওংনু (বা হুন) উপজাতির নেতা ঝিঝি চানিউ-এর সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৩৬ অব্দে, চীনের হান রাজবংশ ঝিঝি চানিউ-এর বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে লিপ্ত হয়, যা আজকের কাজাখস্তান-এর কাছাকাছি কোনো স্থানে সংঘটিত হয়েছিল। হান রাজবংশের ইতিহাস 'হান শু'-তে এই যুদ্ধের এক অদ্ভুত বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ আছে, ঝিঝি-র সৈন্যরা এক বিশেষ ধরনের "মাছের আঁশের মতো" সৈন্য বিন্যাস (fish-scale formation) ব্যবহার করেছিল। ডাবস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, এই বিন্যাসটি ছিল রোমানদের বিখ্যাত 'টেস্টুডো ফরমেশন' (Testudo formation), যেখানে সৈন্যরা ঢাল দিয়ে নিজেদের এবং সঙ্গীদের ঢেকে কচ্ছপের খোলসের মতো এক দুর্ভেদ্য ব্যূহ তৈরি করত। চীনারা এর আগে এমন কৌশল কখনো দেখেনি।
যুদ্ধে হান বাহিনী জয়লাভ করে এবং প্রায় দেড় হাজার ভাড়াটে সৈন্যকে বন্দী করে। ডাবসের মতে, এই বন্দীরাই ছিল সেই হারিয়ে যাওয়া রোমান সৈন্যদল। তাদের বীরত্ব এবং অদ্ভুত যুদ্ধকৌশলে মুগ্ধ হয়ে হান সম্রাট তাদের হত্যা না করে চীনের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে, আজকের গানসু প্রদেশের একটি স্থানে বসতি স্থাপনের সুযোগ দেন। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, চীনারা এই নতুন কাউন্টির নাম দিয়েছিল 'লিচিয়েন' (Lìqiān বা 犁靬)। প্রাচীন চীনা ভাষায় 'লিচিয়েন' শব্দটি রোম বা রোমান সাম্রাজ্য বোঝাতে ব্যবহৃত হত, যা সম্ভবত 'আলেকজান্দ্রিয়া' শব্দের চীনা রূপান্তর ছিল। তাহলে কি সত্যিই একদল রোমান সৈন্য চীনের মাটিতে নিজেদের নতুন বাড়ি খুঁজে পেয়েছিল?
সত্যের উন্মোচন
অধ্যাপক ডাবসের এই তত্ত্বটি যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই বিতর্কিত। কয়েক দশক ধরে ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই রহস্যের সমাধানে নেমেছেন। তাদের অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু গানসু প্রদেশের ইওংচ্যাং কাউন্টির একটি ছোট গ্রাম – ঝেলাইঝাই (Zhelaizhai), যা প্রাচীন লিচিয়েন শহরের সম্ভাব্য অবস্থান বলে মনে করা হয়। এই গ্রামের কিছু বাসিন্দার চেহারায় ককেশীয় ছাপ, যেমন – স্বর্ণাভ চুল, নীল বা সবুজ চোখ এবং দীর্ঘ নাসিকা, এই তত্ত্বকে আরও উস্কে দিয়েছে। গ্রামবাসীরাও নিজেদের রোমান সৈন্যদের বংশধর বলে দাবি করে গর্ববোধ করেন।
এই দাবিকে ঘিরে পর্যটন শিল্পও গড়ে উঠেছে। স্থানীয় সরকার সেখানে রোমান ধাঁচের স্থাপত্য এবং মূর্তি নির্মাণ করেছে। কিন্তু નક્કર প্রমাণের অভাব এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। আজ পর্যন্ত ঝেলাইঝাই বা তার আশেপাশে কোনো রোমান অস্ত্র, মুদ্রা বা ল্যাটিন ভাষায় লেখা কোনো শিলালিপি খুঁজে পাওয়া যায়নি যা সরাসরি রোমান উপস্থিতির প্রমাণ দিতে পারে।
আধুনিক ডিএনএ পরীক্ষাও এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারেনি। ২০০৫ সালের একটি জেনেটিক পরীক্ষায় কিছু গ্রামবাসীর ডিএনএ-তে ৫৬% ককেশীয় উৎস পাওয়া গিয়েছিল, যা উত্তেজনার সৃষ্টি করে। কিন্তু পরবর্তী, আরও विस्तृत গবেষণা এই লিঙ্কটিকে সমর্থন করেনি। ২০০৭ সালের একটি গবেষণায় বলা হয় যে, তাদের জিনগত গঠন রোমানদের তুলনায় চীনের হান জনগোষ্ঠীর একটি উপগোষ্ঠীর সাথেই বেশি মেলে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই ককেশীয় বৈশিষ্ট্য সিল্ক রোড ধরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মিশ্রণের ফল হতে পারে, কোনো একক রোমান সৈন্যদলের নয়।
আজও, অধিকাংশ ইতিহাসবিদ হোমার ডাবসের তত্ত্বকে একটি আকর্ষণীয় অনুমান হিসেবেই দেখেন, প্রমাণিত সত্য হিসেবে নয়। কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকায়, ড্রাগনের দেশে রোমান সৈন্যদলের গল্পটি ইতিহাসের এক অমীমাংসিত এবং রোমাঞ্চকর রহস্য হয়েই রয়ে গেছে। কারহে-র মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া সেই দশ হাজার সৈন্যের নিয়তি কি সত্যিই পার্থিয়ার পূর্ব সীমান্তে শেষ হয়ে গিয়েছিল, নাকি তাদের অবিশ্বাস্য যাত্রা শেষ হয়েছিল চীনের প্রাচীরের ছায়ায়? উত্তরটা হয়তো সময়ের অতলেই হারিয়ে গেছে, কিন্তু রেখে গেছে এক শিহরণ জাগানো প্রশ্ন, যা আজও ইতিহাসপ্রেমীদের কল্পনাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)