প্রেমের প্রস্তাব বা প্রপোজাল म्हटলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা চেনা ছবি। কোনো এক মায়াবী সন্ধ্যায়, ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে, কিংবা কোনো পাহাড়ের চূড়ায় হাঁটু মুড়ে বসে আছে এক পুরুষ, তার হাতে ধরা ছোট্ট একটা বাক্স, আর তাতে জ্বলজ্বল করছে একটা আংটি। এরপর প্রেমিকার দিকে তাকিয়ে সেই চিরন্তন প্রশ্ন, “তুমি কি আমায় বিয়ে করবে?” কিন্তু ভাবুন তো, যদি ব্যাপারটা উল্টো হতো? যদি মেয়েরা হাঁটু মুড়ে বসে বিয়ের প্রস্তাব দিতো, আর ছেলেরা লজ্জায় লাল হয়ে যেত? শুনেই হাসি পাচ্ছে, তাই না? কিন্তু ইতিহাসে এমন একটা দিনের কথা বলা আছে, যেদিন নিয়ম ভাঙার অধিকার ছিল শুধু মেয়েদেরই!

সেই অদ্ভুত দিন, যখন নিয়ম ভাঙে মেয়েরাই!

ভাবুন একবার, ভালোবাসার মানুষটাকে মনের কথা বলতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু সমাজের নিয়মে আপনি বলতে পারছেন না। কারণ, প্রস্তাব দেওয়ার অধিকার তো শুধু ছেলেদের! বছরের পর বছর মেয়েরা এই নিয়ম মেনেই চলেছে। কিন্তু এমন এক অদ্ভুত দিনের কথা ইতিহাসে প্রচলিত আছে, যেদিন মেয়েরা সব নিয়ম ভেঙে তাদের ভালোবাসার মানুষকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারতো। আর মজার ব্যাপার হলো, ছেলেরা সেই প্রস্তাব ফেলতে পারতো না, আর ফেললেও দিতে হতো মজার এক শাস্তি!

এই প্রথাটি ‘লিপ ইয়ার প্রপোজাল’ বা ‘ব্যাচেলরস ডে’ নামে পরিচিত। লোককাহিনী অনুসারে, প্রতি চার বছর পর পর, ২৯শে ফেব্রুয়ারি তারিখে মেয়েরা ছেলেদের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ পেত। [7, 13, 17]

এই অদ্ভুত সুন্দর প্রথাটির পেছনে লুকিয়ে আছে দুটো মিষ্টি গল্প। দুটোই যেন রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা।

এক আইরিশ নান ও সেন্ট প্যাট্রিকের মিষ্টি দর কষাকষি

সবচেয়ে প্রচলিত গল্পটি আয়ারল্যান্ডের। বলা হয়, পঞ্চম শতাব্দীতে সেন্ট ব্রিজিড নামের একজন নান, সেন্ট প্যাট্রিকের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন যে, পুরুষরা বিয়ের প্রস্তাব দিতে এত দেরি করে যে মেয়েদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। [1, 2, 7] তিনি বলেন, মেয়েদেরও তো ভালোবাসার কথা জানানোর অধিকার থাকা উচিত! সেন্ট প্যাট্রিক তার কথায় রাজি হলেন এবং মজা করে বললেন, মেয়েরা প্রতি সাত বছরে একদিন এই সুযোগ পাবে। কিন্তু সেন্ট ব্রিজিডও কম যান না! তিনি দরাদরি করে সেটাকে চার বছরে নিয়ে আসেন। [15] সেই থেকে ঠিক হয় যে, প্রতি চার বছর পর ২৯শে ফেব্রুয়ারি মেয়েরা তাদের পছন্দের পুরুষকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারবে। [3, 4, 5] এই দিনটিকে ‘লেডিস প্রিভিলেজ’ বা মেয়েদের বিশেষ অধিকারের দিনও বলা হতো। [1, 5, 11]

স্কটল্যান্ডের রানির অদ্ভুত আইন

আরেকটি গল্প আমাদের নিয়ে যায় ১২৮৮ সালের স্কটল্যান্ডে। বলা হয়, তৎকালীন রানি মার্গারেট একটি আইন জারি করেছিলেন যেখানে বলা হয়েছিল, লিপ ইয়ারে যেকোনো মেয়ে তার পছন্দের পুরুষকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারবে। [2, 6, 9] আর কোনো পুরুষ যদি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তবে তাকে জরিমানা দিতে হবে! [2, 9, 10] তবে ইতিহাসবিদরা এই গল্প নিয়ে বেশ সন্দিহান, কারণ ১২৮৮ সালে রানি মার্গারেটের বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর! [1, 12] তবে গল্প সত্যি হোক বা মিথ্যে, এর ভেতরের দুষ্টুমিষ্টি ব্যাপারটা কিন্তু দারুন, তাই না?

প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের শাস্তিটাও ছিল খুব মিষ্টি!

এখন ভাবছেন, জরিমানাটা কী ছিল? জেল বা ফাঁসি নয়, বরং এমন কিছু যা শুনলে আপনার মুখে হাসি ফুটতে বাধ্য। যদি কোনো পুরুষ বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হতো, তবে তাকে শাস্তি হিসেবে ওই মেয়েটিকে একজোড়া দস্তানা বা গ্লাভস কিনে দিতে হতো। [1, 4] এর কারণটাও ভারী মিষ্টি। মেয়েটির হাতে তো আর আংটি পরানো হলো না, তাই এনগেজমেন্ট রিংয়ের অভাব ঢাকার জন্যই এই গ্লাভস! [4, 5, 18] কোনো কোনো জায়গায় আবার সিল্কের পোশাক বা একটি চুমুও জরিমানা হিসেবে প্রচলিত ছিল। [2, 6, 14] ফিনল্যান্ডে নিয়ম ছিল, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে মেয়েটিকে একটি স্কার্ট বানানোর মতো যথেষ্ট কাপড় কিনে দিতে হবে। [1, 10, 19]

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই প্রথাগুলো হয়তো নিছকই মজার গল্প। এখন আর ভালোবাসার কথা জানাতে মেয়েরা কোনো বিশেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করে না। [8] কিন্তু একবার ভাবুন তো সেই সময়ের কথা! যখন সমাজের সব নিয়ম একপাশে সরিয়ে রেখে, চার বছরে মাত্র একটা দিনের জন্য মেয়েরা তাদের ভালোবাসার অধিকার আদায় করে নিতো। এই লিপ ইয়ার প্রপোজালের গল্পটা শুধু একটা মজার তথ্য নয়, এটা ভালোবাসার সাহসিকতারও গল্প। এটা সেই সব মেয়েদের গল্প, যারা শিখিয়েছিল, ভালোবাসা কোনো নিয়ম মানে না, আর মনের কথা বলতে কোনো বিশেষ লিঙ্গের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় শুধু একটুখানি সাহসের।