প্রেম নাকি আলসেমি? এক অদ্ভুত আবিষ্কারের গল্প!
ভালোবাসার জন্য মানুষ কত কী-ই না করে! কেউ তাজমহল গড়ে, কেউ পাহাড় কাটে, আবার কেউ সিংহাসনও ছেড়ে দেয়। কিন্তু কখনও শুনেছেন কি, ভালোবাসার জন্য কেউ এমন এক খাবার আবিষ্কার করে ফেলেছে যা আজ সারা পৃথিবীর মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী? তবে একটু ভুল হলো! এই আবিষ্কারের পেছনে প্রেম ছিল না, ছিল জুয়ার প্রতি তীব্র আসক্তি আর খানিকটা রাজকীয় আলসেমি। গল্পটা আপনার আমার সকলের প্রিয় খাবার, স্যান্ডউইচের।
ভাবুন তো একবার, খুব খিদে পেয়েছে, চটজলদি কিছু একটা বানিয়ে খেতে হবে। কী বানাবেন? দুটো পাউরুটির স্লাইসের মাঝে পছন্দের কিছু পুরে দিলেই তৈরি হয়ে যায় স্যান্ডউইচ। এই সহজ কিন্তু অসাধারণ খাবারটির আবিষ্কারের গল্পটা কিন্তু এর বানানোর পদ্ধতির মতোই মজাদার এবং অপ্রত্যাশিত। এই গল্পের নায়ক কোনো বিখ্যাত শেফ বা ভোজনরসিক রাজা নন, বরং একজন পাকা জুয়াড়ি, যিনি খেলার প্রতি এতটাই মগ্ন ছিলেন যে খাওয়ার জন্য টেবিল থেকে উঠতেও রাজি ছিলেন না।
কে ছিলেন সেই ‘স্যান্ডউইচ-প্রেমিক’?
আমাদের গল্পের নায়কের নাম জন মন্টাগু, যিনি ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের চতুর্থ আর্ল অফ স্যান্ডউইচ। ভদ্রলোক কেবল একজন আর্লই ছিলেন না, ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্রিটিশ রাজনীতিবিদও। কিন্তু তার সমস্ত পরিচয়কে ছাপিয়ে গিয়েছিল তার এক অদ্ভুত শখ—জুয়া খেলা। তিনি তাস খেলতে এতটাই ভালোবাসতেন যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি কখনও কখনও ২৪ ঘণ্টা ধরেও নাকি একটানা খেলে যেতেন।
একদিন, ১৭৬২ সালের এক রাতে, খেলার নেশায় তিনি এমনই বুঁদ হয়ে ছিলেন যে খাওয়ার জন্য এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করতে চাইছিলেন না। কিন্তু পেট তো আর খেলার নেশা বোঝে না! খিদেয় যখন অবস্থা কাহিল, তখন তিনি তার ভৃত্যকে এমন একটি খাবার আনতে বললেন যা তিনি এক হাতে খেতে পারবেন, যাতে অন্য হাতে তাস ধরে রাখতে পারেন। আর হ্যাঁ, খাবারটা এমন হতে হবে যাতে হাতে তেল-ঝোল লেগে তার খেলার মূল্যবান তাসগুলো নোংরা না হয়ে যায়।
ঘটনাটা হলো, আপনার নিত্যদিনের সঙ্গী এই স্যান্ডউইচ আবিষ্কার হয়েছিল কোনো রান্নাঘরে নয়, বরং এক জুয়ার আড্ডায়, তাও আবার স্রেফ হাত ময়লা করা থেকে বাঁচতে!
ভৃত্যটিও ছিলেন বুদ্ধিমান। তিনি দুটো পাউরুটির স্লাইসের মাঝে কিছু রান্না করা মাংসের টুকরো দিয়ে প্রভুর সামনে হাজির করলেন। জন মন্টাগু তো দারুণ খুশি! এই খাবার খেতে কোনো ছুরি-কাঁটাচামচের প্রয়োজন নেই, এক হাতে ধরেই খাওয়া যাচ্ছে, আবার অন্য হাতে খেলাও চলছে। হাতের তাসও পরিষ্কার থাকছে। ব্যস, জুয়াড়ির সমস্যার চটজলদি সমাধান!
আর্লের এই অদ্ভুত কায়দায় খাবার খাওয়া দেখে তার সাথের জুয়াড়ি বন্ধুরাও বেশ অবাক হলেন। তারাও আর্লের মতো খেলার মাঝে বিরতি নিতে চাইতেন না। তাই তারাও ওয়েটারকে বলতে শুরু করলেন, "আমাকে স্যান্ডউইচের মতো একটা খাবার এনে দাও" বা "I'll have the same as Sandwich"। এভাবেই লোকমুখে ঘুরতে ঘুরতে এই খাবারটির নাম হয়ে গেল ‘স্যান্ডউইচ’।
ভাবতে অবাক লাগে, যে খাবারটি আজ স্কুল, কলেজ, অফিস বা দূরপাল্লার যাত্রায় আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী, তার জন্ম হয়েছিল স্রেফ একজন মানুষের খেলার প্রতি তীব্র ভালোবাসা আর সামান্য আলসেমির কারণে। জন মন্টাগু হয়তো জুয়ার টেবিলে সেদিন জিতেছিলেন কি না, তা ইতিহাস মনে রাখেনি, কিন্তু তার নাম অমর হয়ে আছে আমাদের প্লেটে।
সুতরাং, পরেরবার যখন আপনি স্যান্ডউইচে কামড় দেবেন, তখন শুধু এর স্বাদের কথাই ভাববেন না, এর পেছনের এই মজাদার গল্পটাও মনে করবেন। কে জানে, হয়তো আপনার কোনো ছোট আলসেমি থেকেও এমন কোনো অসাধারণ জিনিসের জন্ম হয়ে যেতে পারে, যা একদিন বদলে দেবে গোটা পৃথিবীটাকে!