বিষয়ের ভূমিকা
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট, ভারত যখন ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়, তখন উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা পেয়েছিলাম এক স্থবির, অনগ্রসর এবং খণ্ডিত অর্থনীতি। কৃষি ছিল দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, কিন্তু তার অবস্থাও ছিল শোচনীয়। উৎপাদনশীলতা ছিল অত্যন্ত কম এবং লক্ষ লক্ষ কৃষক, কারিগর ও শ্রমিক চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করত। শিল্পক্ষেত্রের অবস্থা ছিল আরও করুণ। ভারতের নিজস্ব শিল্প বলতে ছিল মূলত পাট ও তুলো কারখানা, যার অধিকাংশই ব্রিটিশদের স্বার্থে পরিচালিত হতো। দেশের পরিকাঠামো ছিল দুর্বল এবং সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে, স্বাধীন ভারতের নেতাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা।
প্রশ্ন ছিল, কোন পথে এই উন্নয়ন সম্ভব? বিশ্বের সামনে তখন মূলত দুটি অর্থনৈতিক মডেল ছিল – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদী (Capitalist) মডেল এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক (Socialist) মডেল। পুঁজিবাদী মডেলে উৎপাদনের উপকরণগুলির মালিকানা থাকে বেসরকারি হাতে এবং বাজার শক্তি (চাহিদা ও জোগান) অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক মডেলে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা থাকে রাষ্ট্রের হাতে এবং সরকারই সিদ্ধান্ত নেয় কী, কীভাবে এবং কার জন্য উৎপাদন করা হবে।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং তৎকালীন নীতি নির্ধারকরা কোনো একটি চরম পথ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে একটি মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেন। তাঁরা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চেয়েছিলেন যেখানে সমাজতন্ত্রের সমতা এবং ন্যায়বিচারের ধারণার পাশাপাশি পুঁজিবাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও গণতন্ত্রের স্থান থাকবে। এই ভাবনা থেকেই জন্ম হয় মিশ্র অর্থনীতি (Mixed Economy) ব্যবস্থার। এই মডেলে, রাষ্ট্র এবং বেসরকারি ক্ষেত্র উভয়েই অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সরকার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নির্মাণ এবং ভারী শিল্প স্থাপনের দায়িত্ব নেবে, আর কৃষি, বাণিজ্য এবং ক্ষুদ্র শিল্প মূলত বেসরকারি ক্ষেত্রের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
কিন্তু এই মিশ্র অর্থনীতিকে পরিচালনা করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল। এই উদ্দেশ্যেই ১৯৫০ সালে ভারতে পরিকল্পনা কমিশন (Planning Commission) গঠন করা হয়, যার চেয়ারপার্সন ছিলেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। এই কমিশনের প্রধান কাজ ছিল দেশের সম্পদ মূল্যায়ন করে সেগুলির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (Five-Year Plans) তৈরি করা। এই অধ্যায়ে আমরা ১৯৫০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ভারতের এই পরিকল্পিত অর্থনৈতিক যাত্রার খুঁটিনাটি, তার সাফল্য এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
স্বাধীনতার পরের চার দশক ধরে ভারতের অর্থনৈতিক নীতি মূলত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। এই পরিকল্পনাগুলির কিছু দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ছিল যা প্রায় সমস্ত পরিকল্পনাতেই গুরুত্ব পেয়েছে। আসুন, সেই লক্ষ্যগুলি এবং সেগুলি অর্জনের জন্য গৃহীত বিভিন্ন নীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনার লক্ষ্য (The Goals of Five-Year Plans)
প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নিজস্ব কিছু নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকলেও, চারটি প্রধান লক্ষ্য প্রায় সবকটি পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এই লক্ষ্যগুলি হলো:
- প্রবৃদ্ধি (Growth): এর সহজ অর্থ হলো দেশের পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে ভালো সূচক হলো মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি (Gross Domestic Product - GDP)। জিডিপি হলো একটি নির্দিষ্ট বছরে একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে উৎপাদিত সমস্ত চূড়ান্ত পণ্য ও পরিষেবার মোট বাজার মূল্য। জিডিপি বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো দেশের মানুষের আয় বাড়ছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্যই ছিল জিডিপি-কে একটি নির্দিষ্ট হারে বৃদ্ধি করা।
- আধুনিকীকরণ (Modernization): এটি শুধুমাত্র নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারকে বোঝায় না, বরং মানুষের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনকেও বোঝায়। যেমন, কৃষিক্ষেত্রে ট্রাক্টর বা হারভেস্টারের ব্যবহার যেমন আধুনিকীকরণ, তেমনই নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠনও আধুনিকীকরণের অঙ্গ। পরিকল্পনাগুলিতে শিল্প ও কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং সামাজিক পরিকাঠামো উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
- আত্মনির্ভরতা (Self-reliance): স্বাধীনতার পর ভারতীয় নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতাও অত্যন্ত জরুরি। অন্য দেশের উপর, বিশেষ করে খাদ্যশস্য এবং শিল্পজাত পণ্যের জন্য নির্ভরতা, দেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই, যে সমস্ত পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো, সেগুলি দেশেই উৎপাদন করার উপর জোর দেওয়া হয়। প্রথম সাতটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় আত্মনির্ভরতা একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল।
- সমতা (Equity): অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়ে সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে, বিশেষ করে দরিদ্র এবং অনগ্রসর শ্রেণীর কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাই হলো সমতার মূল উদ্দেশ্য। এর অর্থ হলো ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য কমানো, প্রত্যেক নাগরিককে তার মৌলিক চাহিদা (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য) পূরণের সুযোগ করে দেওয়া এবং অর্থনৈতিক শোষণের অবসান ঘটানো।
এই চারটি লক্ষ্য একে অপরের পরিপূরক হলেও, কখনও কখনও এদের মধ্যে সংঘাতও দেখা যেত। উদাহরণস্বরূপ, আধুনিকীকরণের জন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অনেক সময় মানুষের কাজের প্রয়োজন কমে যায়, যা কর্মসংস্থান এবং সমতার লক্ষ্যের পরিপন্থী হতে পারে। পরিকল্পনাবিদদের কাজ ছিল এই লক্ষ্যগুলির মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা।
কৃষি ক্ষেত্র: ভূমি সংস্কার থেকে সবুজ বিপ্লব
স্বাধীনতার সময় ভারতীয় কৃষি ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত পশ্চাৎপদ। জমিদার, জায়গিরদারদের মতো মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণে কৃষকদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। বেশিরভাগ কৃষক ছিলেন ভূমিহীন এবং অন্যের জমিতে ভাগচাষি হিসেবে কাজ করতেন। উৎপাদনশীলতা ছিল অত্যন্ত কম এবং সেচ ব্যবস্থার অভাবে কৃষকদের শুধুমাত্র বর্ষার উপর নির্ভর করতে হতো। এই সমস্যাগুলি দূর করার জন্য সরকার দুটি প্রধান পদক্ষেপ গ্রহণ করে: ভূমি সংস্কার এবং সবুজ বিপ্লব।
ভূমি সংস্কার (Land Reforms)
ভূমি সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষিব্যবস্থায় সমতা আনা এবং শোষণের অবসান ঘটানো। এর প্রধান দুটি অংশ ছিল:
- মধ্যস্বত্বভোগীদের উচ্ছেদ (Abolition of Intermediaries): সরকার আইন প্রণয়ন করে জমিদার, জায়গিরদারদের মতো মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যবস্থার অবসান ঘটায়। এর ফলে প্রায় ২০০ লক্ষ কৃষক সরাসরি সরকারের অধীনে আসে এবং জমির উপর তাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য মহৎ ছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন পুরোপুরি সফল হয়নি। অনেক বড় জমিদার আইনের ফাঁকফোকর গলে নিজেদের 'ব্যক্তিগত চাষ'-এর অধীনে প্রচুর জমি রেখে দিতে সক্ষম হয়। তা সত্ত্বেও, এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
- ভূমি সিলিং (Land Ceiling): এই নীতির অধীনে, একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবার সর্বোচ্চ কতটা জমি রাখতে পারবে তার একটি ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এই সীমার অতিরিক্ত জমি সরকার অধিগ্রহণ করে ভূমিহীন কৃষক এবং ছোট চাষিদের মধ্যে বিতরণ করার পরিকল্পনা করে। এই নীতিটিও আইনি জটিলতা এবং বড় ভূস্বামীদের প্রতিরোধের কারণে আশানুরূপ সফল হয়নি। তবে কেরালা এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো কিছু রাজ্যে এই নীতি অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে কার্যকর হয়েছিল।
সবুজ বিপ্লব (The Green Revolution)
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারত তীব্র খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে বাধ্য হয়। এই পরনির্ভরশীলতা দূর করার জন্য এবং দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা সবুজ বিপ্লব নামে পরিচিত।
- মূল উপাদান: সবুজ বিপ্লবের মূল ভিত্তি ছিল উচ্চ ফলনশীল বীজ (High Yielding Variety - HYV)-এর ব্যবহার। এই বীজগুলি, বিশেষ করে গম এবং ধানের ক্ষেত্রে, প্রচলিত বীজের তুলনায় অনেক বেশি ফসল দিতে সক্ষম ছিল। তবে এই বীজগুলির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন ছিল পর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থা, রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক।
- প্রথম পর্যায় (১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি): এই পর্যায়ে সবুজ বিপ্লবের প্রভাব মূলত পাঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুর মতো কয়েকটি রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং প্রধানত গম উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছিল।
- দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি): এই পর্যায়ে সবুজ বিপ্লবের প্রযুক্তি আরও বেশি সংখ্যক রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
সাফল্য: সবুজ বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ভারতকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। দেশ আর খাদ্যশস্য আমদানির উপর নির্ভরশীল রইল না। সরকার বিপুল পরিমাণে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে বাফার স্টক (Buffer Stock) তৈরি করতে সক্ষম হয়, যা দুর্ভিক্ষের সময় বা মূল্যবৃদ্ধির মোকাবিলায় ব্যবহৃত হতো। কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসে।
সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি:
- আঞ্চলিক ও ব্যক্তিগত বৈষম্য বৃদ্ধি: যেহেতু HYV প্রযুক্তির জন্য প্রচুর জল এবং অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল, তাই শুধুমাত্র ধনী কৃষকরাই এর সুবিধা নিতে পেরেছিল। এর ফলে ধনী ও গরিব কৃষকদের মধ্যে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পায়। একইভাবে, সেচ ব্যবস্থা ভালো থাকায় পাঞ্জাব, হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলি লাভবান হলেও, পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি পিছিয়ে পড়ে।
- পরিবেশগত প্রভাব: রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের অত্যধিক ব্যবহার মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
- বাণিজ্যিক ফসলের প্রতি ঝোঁক: কৃষকরা ডাল বা অন্যান্য খাদ্যশস্যের পরিবর্তে লাভজনক গম এবং ধান চাষের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, যা খাদ্য বৈচিত্র্যের উপর প্রভাব ফেলে।
শিল্প ও বাণিজ্য নীতি (Industry and Trade Policy)
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলিতে শিল্পায়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কারণ শিল্প ছাড়া কোনো দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের (PSUs) ভূমিকা
স্বাধীনতার সময় ভারতের বেসরকারি শিল্পপতিদের কাছে বড় শিল্প, যেমন লোহা-ইস্পাত, ভারী যন্ত্রপাতি বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ পুঁজি ছিল না। এছাড়া, বাজারের আকারও খুব বড় ছিল না যা তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। তাই, সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় বা Public Sector Undertakings (PSUs)-এর মাধ্যমে স্থাপন করা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের संतुलित আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
শিল্প নীতি প্রস্তাব, ১৯৫৬ (Industrial Policy Resolution, 1956)
এই প্রস্তাবটিকে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ভিত্তি এবং ভারতের 'অর্থনৈতিক সংবিধান' বলা হয়। এর মাধ্যমে শিল্পক্ষেত্রকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়:
- প্রথম শ্রেণী: ১৭টি শিল্প, যেগুলি একচেটিয়াভাবে রাষ্ট্রের মালিকানাধীন থাকবে। যেমন - অস্ত্র ও গোলাবারুদ, পারমাণবিক শক্তি, রেলওয়ে, বিমান চলাচল ইত্যাদি।
- দ্বিতীয় শ্রেণী: ১২টি শিল্প, যেগুলির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রধান ভূমিকা পালন করবে এবং বেসরকারি ক্ষেত্র সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন - সার, অ্যালুমিনিয়াম, মেশিন টুলস ইত্যাদি।
- তৃতীয় শ্রেণী: বাকি সমস্ত শিল্প বেসরকারি ক্ষেত্রের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়, তবে সেগুলিকেও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকতে হতো।
শিল্প লাইসেন্সিং বা 'লাইসেন্স রাজ'
IPR 1956 অনুযায়ী, বেসরকারি ক্ষেত্রকে কোনো নতুন শিল্প স্থাপন করতে, বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে বা নতুন কোনো পণ্য উৎপাদন শুরু করতে সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হতো। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল অনগ্রসর অঞ্চলে শিল্প স্থাপনকে উৎসাহিত করা এবং দেশের সম্পদের অপচয় রোধ করা। কিন্তু বাস্তবে এই 'লাইসেন্স রাজ' ব্যবস্থাটি অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে। এটি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় এবং অনেক শিল্পপতির জন্য ব্যবসায় প্রবেশ করা কঠিন করে তোলে। এর ফলে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং শিল্পক্ষেত্রে উদ্ভাবনের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে।
বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি: আমদানি প্রতিস্থাপন (Foreign Trade Policy: Import Substitution)
প্রথম সাতটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ভারতের বাণিজ্য নীতি ছিল মূলত अंतর্মুখী (inward-looking)। এই নীতির প্রধান কৌশল ছিল আমদানি প্রতিস্থাপন (Import Substitution)। এর অর্থ হলো, বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি না করে সেই পণ্যগুলি দেশেই উৎপাদন করার চেষ্টা করা।
উদ্দেশ্য: এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি। প্রথমত, নবজাতক দেশীয় শিল্পগুলিকে বিদেশী প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষা করা। দ্বিতীয়ত, মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করা, যা দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
পদ্ধতি: এই নীতি কার্যকর করার জন্য সরকার দুটি প্রধান হাতিয়ার ব্যবহার করে:
- শুল্ক (Tariffs): আমদানিকৃত পণ্যের উপর উচ্চ হারে কর আরোপ করা হতো, যার ফলে দেশের বাজারে সেগুলির দাম বেড়ে যেত এবং মানুষ দেশীয় পণ্য কিনতে উৎসাহিত হতো।
- কোটা (Quotas): কোন পণ্য কী পরিমাণে আমদানি করা যাবে, তার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সরকার নির্ধারণ করে দিত। এর ফলে আমদানির পরিমাণ সীমিত রাখা সম্ভব হতো।
ফলাফল: এই নীতির ফলে ভারতের শিল্পক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আসে। ১৯৫০-এর দশকে যে সমস্ত পণ্য, যেমন গাড়ি বা ইলেকট্রনিক্স, আমদানি করতে হতো, ১৯৯০ সালের মধ্যে তার প্রায় সবই দেশে তৈরি হতে শুরু করে। কিন্তু এর একটি নেতিবাচক দিকও ছিল। সুরক্ষার ছত্রছায়ায় থাকায় দেশীয় শিল্পগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল না বললেই চলে। ফলে, তারা পণ্যের গুণমান উন্নত করার বা দাম কমানোর কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি। এর ফল ভোগ করতে হতো ভারতীয় গ্রাহকদের, যাদের প্রায়শই নিম্নমানের পণ্যের জন্য উচ্চ মূল্য দিতে হতো।
সমালোচনা ও মূল্যায়ন
১৯৫০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই চল্লিশ বছরের পরিকল্পিত অর্থনীতির যাত্রাকে মূল্যায়ন করলে আমরা সাফল্য এবং ব্যর্থতা উভয়েরই চিত্র দেখতে পাই।
সাফল্য:
- অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন: এই সময়ে ভারতীয় অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আসে। জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে শিল্পের অবদান বৃদ্ধি পায়, যা একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির লক্ষণ।
- শিল্পক্ষেত্রের বৈচিত্র্য: ভারত একটি বৈচিত্র্যময় শিল্প ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়। ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই দেশে উৎপাদিত হতে শুরু করে।
- খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা: সবুজ বিপ্লবের ফলে ভারত খাদ্য উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে, যা একটি বিশাল সাফল্য।
- সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি: দেশের সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের হার বৃদ্ধি পায়, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
ব্যর্থতা:
- রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অদক্ষতা: অনেক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বিপুল লোকসানের সম্মুখীন হয় এবং দেশের অর্থনীতির উপর বোঝায় পরিণত হয়।
- প্রতিযোগিতার অভাব: 'লাইসেন্স রাজ' এবং আমদানি প্রতিস্থাপন নীতির কারণে দেশীয় শিল্পগুলি অদক্ষ এবং অপ্রতিযোগী হয়ে পড়ে। উদ্ভাবন এবং গুণমান উন্নয়নের কোনো তাগিদ ছিল না।
- বৈষম্য ও দারিদ্র্য: পরিকল্পনাগুলির মূল লক্ষ্য সমতা হলেও, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয়নি। দেশের এক বিশাল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত।
- বৈদেশিক মুদ্রার সংকট: ১৯৯০ সাল নাগাদ ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার প্রায় শেষ হয়ে যায়। আমদানি করার জন্য মাত্র কয়েক সপ্তাহের অর্থ অবশিষ্ট ছিল, যা দেশকে একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।
এই সংকটই ভারতকে ১৯৯১ সালে তার অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে এবং উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও বিশ্বায়নের পথে হাঁটতে বাধ্য করেছিল, যা আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করব।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যগুলি কী ছিল?
উত্তর: ভারতের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলির চারটি প্রধান দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ছিল: (ক) প্রবৃদ্ধি: দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো। (খ) আধুনিকীকরণ: নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন। (গ) আত্মনির্ভরতা: বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করা। (ঘ) সমতা: অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমানো।
প্রশ্ন ২: সবুজ বিপ্লব বলতে কী বোঝায় এবং এর দুটি প্রধান সীমাবদ্ধতা কী ছিল?
উত্তর: সবুজ বিপ্লব হলো ১৯৬০-এর দশকে ভারতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গৃহীত একটি কর্মসূচি, যার মূল ভিত্তি ছিল উচ্চ ফলনশীল বীজ (HYV), রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং সেচ ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহার। এর ফলে ভারত খাদ্যশস্য, বিশেষ করে গম ও ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। এর দুটি প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল: (ক) এটি ধনী ও দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বৈষম্য বাড়িয়ে দিয়েছিল কারণ ব্যয়বহুল প্রযুক্তি শুধুমাত্র ধনী কৃষকদের পক্ষেই ব্যবহার করা সম্ভব ছিল। (খ) রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অত্যধিক ব্যবহার পরিবেশ দূষণ ঘটায় এবং মাটির উর্বরতা নষ্ট করে।
প্রশ্ন ৩: 'আমদানি প্রতিস্থাপন' নীতি কেন গ্রহণ করা হয়েছিল?
উত্তর: 'আমদানি প্রতিস্থাপন' নীতি গ্রহণ করার প্রধান দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, ব্রিটিশ শাসন থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতের নবজাতক শিল্পগুলিকে উন্নত দেশগুলির শক্তিশালী শিল্পের প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষা করা। দ্বিতীয়ত, মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করা। আমদানির পরিমাণ কমিয়ে সেই সাশ্রয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রা দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে ব্যবহার করা হতো।
সারসংক্ষেপ
আসুন, এই অধ্যায়ের মূল বিষয়গুলি এক নজরে দেখে নিই:
- স্বাধীনতার পর ভারত একটি মিশ্র অর্থনীতি মডেল গ্রহণ করে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার পথ বেছে নেয়।
- পরিকল্পনাগুলির প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধি, আধুনিকীকরণ, আত্মনির্ভরতা এবং সমতা।
- কৃষিক্ষেত্রে, ভূমি সংস্কার আংশিকভাবে সফল হয় এবং সবুজ বিপ্লব ভারতকে খাদ্য উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীল করে তোলে।
- শিল্পক্ষেত্রে, IPR 1956-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলিকে (PSUs) প্রধান ভূমিকা দেওয়া হয় এবং বেসরকারি শিল্পকে লাইসেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
- বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমদানি প্রতিস্থাপন নীতি গ্রহণ করা হয় এবং শুল্ক ও কোটার মাধ্যমে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া হয়।
- এই চল্লিশ বছরে ভারত একটি বৈচিত্র্যময় শিল্প ভিত্তি তৈরি করতে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে সক্ষম হলেও, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অদক্ষতা, প্রতিযোগিতার অভাব এবং নীতির কঠোরতা ১৯৯০ সাল নাগাদ দেশকে এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।