বিজ্ঞান স্যারের সাথে ঈশিতা: কোষের জগতে এক রোমাঞ্চকর অভিযান

ঈশিতা: স্যার, নমস্কার। আমি আজ একটা অদ্ভুত জিনিস দেখেছি। আমার জন্মদিনে পাওয়া নতুন মাইক্রোস্কোপটা দিয়ে পেঁয়াজের খোসা দেখছিলাম। পাতলা পর্দার ভেতরে ছোট ছোট অনেকগুলো ঘরের মতো জিনিস! দেখতে অনেকটা মৌমাছির চাকের মতো। এগুলো কী স্যার?

বিজ্ঞান স্যার: বাহ্ ঈশিতা, খুব সুন্দর একটা পর্যবেক্ষণ! তুমি যা দেখেছ, সেটাই হলো জীবজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক একক। ওগুলোকে বলে ‘কোষ’ (Cell)। তুমি আসলে রবার্ট হুক নামে এক বিজ্ঞানীর করা ১৬৬৫ সালের সেই বিখ্যাত আবিষ্কারটি নিজের চোখেই আবার করে ফেললে।

ঈশিতা: কোষ! বইতে নামটা পড়েছি। কিন্তু এটাকেই যে জীবনের মূল একক বলে, সেটা ঠিক বুঝতে পারিনি। এর মানে কী, স্যার? ঠিক যেমন ইট দিয়ে বাড়ি তৈরি হয়, সেরকম?

বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক ধরেছ! তোমার উপমাটা অসাধারণ। একটা বাড়ি যেমন অসংখ্য ইট পাশাপাশি এবং একটার উপর একটা সাজিয়ে তৈরি হয়, ঠিক তেমনই সমস্ত উদ্ভিদ এবং প্রাণীদেহ, অর্থাৎ সকল জীবদেহ, অসংখ্য কোষ দিয়ে তৈরি। এই কোষই হলো জীবনের গঠনগত এবং কার্যগত একক। অর্থাৎ, আমাদের শরীরের সমস্ত কাজ, যেমন শ্বাস নেওয়া, খাবার হজম করা, শক্তি তৈরি করা – সবকিছুর মূলেই রয়েছে এই কোষ।

কোষের আবিষ্কার এবং কোষ তত্ত্ব

ঈশিতা: আপনি রবার্ট হুকের কথা বললেন। তিনিই কি প্রথম কোষ আবিষ্কার করেন?

বিজ্ঞান স্যার: হ্যাঁ। ১৬৬৫ সালে রবার্ট হুক তাঁর নিজের তৈরি করা একটি সরল মাইক্রোস্কোপের নিচে কর্কের (গাছের ছালের অংশ) একটি পাতলা টুকরো পরীক্ষা করছিলেন। তিনি সেখানে মৌমাছির চাকের মতো ছোট ছোট কুঠুরি দেখতে পান। ল্যাটিন ভাষায় ‘cellula’ শব্দের অর্থ হলো ‘ছোট ঘর’। সেখান থেকেই তিনি এর নাম দেন ‘সেল’ বা কোষ। তবে তিনি যেগুলো দেখেছিলেন, সেগুলো ছিল মৃত কোষের কোষপ্রাচীর।

ঈশিতা: তাহলে জীবন্ত কোষ প্রথম কে দেখেন?

বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন। এর কিছুদিন পর, লিউয়েনহুক নামের আরেকজন বিজ্ঞানী আরও উন্নত মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পুকুরের জলে প্রথম মুক্ত এবং জীবন্ত কোষ পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর কোষ নিয়ে গবেষণা অনেক এগিয়ে যায়। দুজন জার্মান বিজ্ঞানী, স্লেইডেন (Schleiden) এবং সোয়ান (Schwann), কোষ তত্ত্ব (Cell Theory) প্রস্তাব করেন।

ঈশিতা: কোষ তত্ত্ব! সেটা আবার কী, স্যার?

বিজ্ঞান স্যার: কোষ তত্ত্বের মূল কথাগুলো হলো:

  • সমস্ত জীব (উদ্ভিদ এবং প্রাণী) কোষ দ্বারা গঠিত।
  • কোষ হলো জীবনের মূল গঠনগত এবং কার্যগত একক।
পরে বিজ্ঞানী ভার্চাউ (Virchow) এই তত্ত্বকে আরও উন্নত করে বলেন যে, সমস্ত কোষের সৃষ্টি হয় পূর্ববর্তী কোনো কোষ থেকেই। অর্থাৎ, কোষ নিজে থেকে তৈরি হতে পারে না, কোষ বিভাজনের মাধ্যমেই নতুন কোষ জন্মায়।

এককোষী ও বহুকোষী জীব

ঈশিতা: তার মানে কি পৃথিবীতে সব জীবের দেহেই অনেক অনেক কোষ আছে?

বিজ্ঞান স্যার: না, সব ক্ষেত্রে তা নয়। এই কোষের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে জীবদের দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। যাদের দেহ কেবল একটিমাত্র কোষ দিয়ে তৈরি, তাদের বলা হয় ‘এককোষী জীব’ (Unicellular Organism)। যেমন – অ্যামিবা (Amoeba), ক্ল্যামাইডোমোনাস (Chlamydomonas), প্যারামিসিয়াম (Paramecium) এবং ব্যাকটেরিয়া। এই একটি কোষই তাদের জীবনের সমস্ত কাজ, যেমন – খাদ্যগ্রহণ, শ্বসন, রেচন, জনন ইত্যাদি সম্পন্ন করে।

ঈশিতা: আর আমাদের মতো প্রাণীরা?

বিজ্ঞান স্যার: আমরা হলাম ‘বহুকোষী জীব’ (Multicellular Organism)। আমাদের দেহে লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি কোষ একসঙ্গে কাজ করে। এই কোষগুলো বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে আলাদা আলাদা কাজ করে। যেমন, আমাদের পেশি কোষগুলো সংকোচন-প্রসারণ করে আমাদের চলাফেরায় সাহায্য করে, স্নায়ু কোষগুলো বার্তা আদান-প্রদান করে, আবার রক্তের লোহিত রক্তকণিকা অক্সিজেন পরিবহন করে। এই বিভিন্ন ধরনের কোষ একত্রিত হয়ে কলা (Tissue), কলা থেকে অঙ্গ (Organ), এবং অঙ্গ থেকে তন্ত্র (System) তৈরি করে, যা দিয়ে আমাদের পুরো শরীরটা চলে।

কোষের গঠন: কী দিয়ে তৈরি এই ছোট ছোট ঘর?

ঈশিতা: স্যার, এই কোষগুলো কি শুধুই ফাঁকা ঘর? নাকি এর ভেতরেও কিছু আছে?

বিজ্ঞান স্যার: চমৎকার প্রশ্ন! কোষগুলো মোটেও ফাঁকা নয়। প্রতিটি কোষের ভেতরে একটা আস্ত জগৎ রয়েছে। এদের মধ্যে নানা রকম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ বা ‘কোষ অঙ্গাণু’ (Cell Organelles) থাকে, যারা নির্দিষ্ট কাজ করে। চলো, আমরা একটা সাধারণ কোষের প্রধান অংশগুলো সম্পর্কে জানি।

সাধারণত, একটি কোষের তিনটি প্রধান অংশ থাকে:

  1. কোষপর্দা বা প্লাজমা পর্দা (Plasma Membrane)
  2. নিউক্লিয়াস (Nucleus)
  3. সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm)

১. কোষপর্দা বা প্লাজমা পর্দা: কোষের প্রহরী

বিজ্ঞান স্যার: প্রতিটি কোষের বাইরে একটি পাতলা, নমনীয় এবং জীবন্ত আবরণ থাকে, যা কোষের ভেতরের সমস্ত কিছুকে বাইরের পরিবেশ থেকে আলাদা করে রাখে। একেই বলে কোষপর্দা বা প্লাজমা পর্দা।

ঈশিতা: এর কাজ কী, স্যার? এটা কি শুধু একটা দেওয়ালের মতো?

বিজ্ঞান স্যার: এটা একটা সাধারণ দেওয়াল নয়, বরং একটা বুদ্ধিমান প্রহরীর মতো কাজ করে। একে ‘প্রভেদক ভেদ্য পর্দা’ (Selectively Permeable Membrane) বলা হয়। কারণ এটি সব পদার্থকে কোষের ভেতরে ঢুকতে বা বাইরে বের হতে দেয় না। কেবল নির্দিষ্ট কিছু প্রয়োজনীয় পদার্থ, যেমন – অক্সিজেন, জল, পুষ্টিদ্রব্য ইত্যাদিই এর মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতে পারে। আবার কোষের ভেতরের ক্ষতিকারক বর্জ্য পদার্থগুলোকে এটি বাইরে বের করে দেয়।

ঈশিতা: কিন্তু এই যাতায়াতটা কীভাবে হয়?

বিজ্ঞান স্যার: মূলত দুটি প্রক্রিয়ায় হয় – ব্যাপন (Diffusion) এবং অভিস্রবণ (Osmosis)। যখন কোনো পদার্থ (যেমন – কার্বন ডাই অক্সাইড বা অক্সিজেন) তার বেশি ঘনত্বযুক্ত অঞ্চল থেকে কম ঘনত্বযুক্ত অঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে ব্যাপন বলে। আর অভিস্রবণ হলো এক বিশেষ ধরনের ব্যাপন, যেখানে কেবল জলের অণু একটি প্রভেদক ভেদ্য পর্দার মধ্যে দিয়ে বেশি ঘনত্বের অঞ্চল থেকে কম ঘনত্বের দিকে যায়। উদ্ভিদ কোষ মূলরোমের সাহায্যে মাটি থেকে জল শোষণ করে এই অভিস্রবণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই।

২. নিউক্লিয়াস: কোষের মস্তিষ্ক

ঈশিতা: স্যার, আমি ছবিতে দেখেছি কোষের মাঝখানে একটা গোল, ঘন বস্তু থাকে। ওটা কী?

বিজ্ঞান স্যার: ঠিক দেখেছ। ওটাই হলো কোষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ – নিউক্লিয়াস। একে কোষের ‘মস্তিষ্ক’ বা ‘কন্ট্রোল রুম’ বলা হয়। কারণ এটি কোষের সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোষ বিভাজনে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

ঈশিতা: এর ভেতরে কী থাকে?

বিজ্ঞান স্যার: নিউক্লিয়াসের বাইরে একটি দ্বিস্তরীয় আবরণ থাকে, যাকে নিউক্লীয় পর্দা বলে। এর ভেতরে থাকে ক্রোমাটিন বস্তু (Chromatin material), যা কোষ বিভাজনের সময় সুস্পষ্ট ক্রোমোজোমে (Chromosome) পরিণত হয়। এই ক্রোমোজোমের মধ্যেই থাকে বংশগতির ধারক ও বাহক – ডিএনএ (DNA)। ডিএনএ-এর নির্দিষ্ট কার্যকরী অংশকে বলা হয় জিন (Gene), যা আমাদের সমস্ত বৈশিষ্ট্য (যেমন – চোখের রঙ, চুলের প্রকৃতি) নিয়ন্ত্রণ করে।

৩. সাইটোপ্লাজম: জীবনের কর্মক্ষেত্র

বিজ্ঞান স্যার: নিউক্লিয়াস এবং কোষপর্দার মধ্যবর্তী জেলির মতো থকথকে যে পদার্থটি থাকে, তাকে সাইটোপ্লাজম বলে। এই সাইটোপ্লাজমের মধ্যেই কোষের সমস্ত অঙ্গাণুগুলো ভেসে থাকে।

কোষ অঙ্গাণু: ছোট ছোট কারখানা

ঈশিতা: কোষ অঙ্গাণুগুলো কী কী, স্যার? আর তাদের কাজই বা কী?

বিজ্ঞান স্যার: চলো, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কোষ অঙ্গাণুর সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

  • এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম (Endoplasmic Reticulum - ER): এটি নিউক্লিয়াসের পর্দা থেকে উৎপন্ন হয়ে সাইটোপ্লাজমে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা একটি অঙ্গাণু। এটি দুই প্রকার – অমসৃণ (Rough ER) এবং মসৃণ (Smooth ER)। অমসৃণ ER-এর গায়ে রাইবোজোম দানা লেগে থাকে, যা প্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করে। আর মসৃণ ER ফ্যাট বা লিপিড তৈরিতে সাহায্য করে। এটি কোষের মধ্যে বিভিন্ন পদার্থ পরিবহনের জন্যও একটি পথের কাজ করে। একে কোষের ‘পরিবহন তন্ত্র’ বলা যেতে পারে।
  • গলজি বস্তু (Golgi Apparatus): বিজ্ঞানী ক্যামিলো গলজি এটি আবিষ্কার করেন। এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামে তৈরি হওয়া পদার্থগুলো এখানে এসে জমা হয়, প্রক্রিয়াজাত হয় এবং প্যাকেজিং হয়ে কোষের বিভিন্ন জায়গায় বা কোষের বাইরে প্রেরিত হয়। তাই একে কোষের ‘প্যাকেজিং সেন্টার’ বা ‘পোস্ট অফিস’ বলা হয়।
  • লাইসোজোম (Lysosome): এগুলো ছোট ছোট থলির মতো অঙ্গাণু, যার ভেতরে শক্তিশালী পাচক রস বা এনজাইম থাকে। এরা কোষের মধ্যে প্রবেশ করা জীবাণু বা পুরনো, অকেজো অঙ্গাণুগুলোকে হজম করে কোষকে পরিষ্কার রাখে। তাই এদের কোষের ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ বলা হয়। কোনো কারণে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, লাইসোজোম ফেটে যায় এবং তার ভেতরের এনজাইম পুরো কোষটাকেই হজম করে ফেলে। এই কারণে একে ‘আত্মঘাতী থলি’ (Suicide Bag) বলা হয়।
  • মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondria): এটি কোষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গাণু। আমরা যে খাবার খাই, তা থেকে শক্তি উৎপন্ন করার কাজটা এখানেই হয়। শ্বসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখানে এটিপি (ATP - Adenosine Triphosphate) অণু তৈরি হয়, যা কোষের সমস্ত কাজে শক্তি যোগায়। তাই মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের ‘শক্তিঘর’ (Powerhouse of the cell) বলা হয়।
  • প্লাস্টিড (Plastid): এই অঙ্গাণুটি কেবল উদ্ভিদ কোষে পাওয়া যায়। এটি তিন প্রকারের হয় – ক্লোরোপ্লাস্ট, ক্রোমোপ্লাস্ট এবং লিউকোপ্লাস্ট। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্লোরোপ্লাস্ট, যার মধ্যে সবুজ রঙের ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক থাকে। এই ক্লোরোফিলের সাহায্যেই উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় নিজের খাদ্য তৈরি করে। তাই ক্লোরোপ্লাস্টকে ‘কোষের রান্নাঘর’ বলা হয়।
  • ভ্যাকুওল বা কোষগহ্বর (Vacuoles): এগুলো হলো কোষের ‘স্টোরেজ ট্যাঙ্ক’। এরা কোষের মধ্যে জল, খাদ্য এবং বর্জ্য পদার্থ সঞ্চয় করে রাখে। উদ্ভিদ কোষে একটি অনেক বড় কোষগহ্বর থাকে, যা কোষের প্রায় ৫০-৯০% জায়গা জুড়ে থাকে। কিন্তু প্রাণী কোষে কোষগহ্বর খুব ছোট বা অনুপস্থিত থাকে।

উদ্ভিদ কোষ বনাম প্রাণী কোষ: কিছু অমিল

ঈশিতা: স্যার, আপনি বললেন প্লাস্টিড আর বড় কোষগহ্বর শুধু উদ্ভিদ কোষেই থাকে। তাহলে উদ্ভিদ কোষ আর প্রাণী কোষের মধ্যে আরও কি কোনো পার্থক্য আছে?

বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো পয়েন্ট ধরেছ। হ্যাঁ, কিছু মূল পার্থক্য রয়েছে।

  1. কোষপ্রাচীর (Cell Wall): উদ্ভিদ কোষের কোষপর্দার বাইরে সেলুলোজ দিয়ে তৈরি একটি অতিরিক্ত, জড় এবং দৃঢ় আবরণ থাকে, যাকে কোষপ্রাচীর বলে। এটি উদ্ভিদ কোষকে নির্দিষ্ট আকৃতি দেয় এবং বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে। প্রাণী কোষে এই কোষপ্রাচীর থাকে না।
  2. প্লাস্টিড: যা আগেই বললাম, উদ্ভিদ কোষে প্লাস্টিড (বিশেষত ক্লোরোপ্লাস্ট) থাকে, যা তাদের খাদ্য তৈরিতে সাহায্য করে। প্রাণী কোষে প্লাস্টিড থাকে না।
  3. কোষগহ্বর (Vacuole): উদ্ভিদ কোষে একটি বড়, কেন্দ্রীয় কোষগহ্বর থাকে। প্রাণী কোষে কোষগহ্বর খুব ছোট বা অনুপস্থিত।

প্রোক্যারিওটিক ও ইউক্যারিওটিক কোষ

বিজ্ঞান স্যার: গঠনের ওপর ভিত্তি করে কোষকে আরও দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। প্রোক্যারিওটিক (Prokaryotic) বা আদি কোষ এবং ইউক্যারিওটিক (Eukaryotic) বা আদর্শ কোষ।

ঈশিতা: এদের মধ্যে কী পার্থক্য?

বিজ্ঞান স্যার: প্রধান পার্থক্য হলো নিউক্লিয়াসের গঠনে। প্রোক্যারিওটিক কোষে কোনো সুসংগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না। অর্থাৎ, নিউক্লীয় পর্দা থাকে না এবং ক্রোমাটিন বস্তু সাইটোপ্লাজমে ছড়ানো থাকে। এই অঞ্চলটিকে নিউক্লিঅয়েড বলা হয়। এছাড়াও, এদের কোনো পর্দা-ঘেরা কোষ অঙ্গাণু (যেমন - মাইটোকন্ড্রিয়া, গলজি বস্তু) থাকে না। ব্যাকটেরিয়া হলো এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।
অন্যদিকে, ইউক্যারিওটিক কোষে একটি সুসংগঠিত, পর্দা-ঘেরা নিউক্লিয়াস এবং অন্যান্য সমস্ত পর্দা-ঘেরা কোষ অঙ্গাণু উপস্থিত থাকে। সমস্ত উন্নত উদ্ভিদ ও প্রাণী হলো ইউক্যারিওটিক কোষের উদাহরণ।

প্রশ্নোত্তর পর্ব: ঈশিতার জিজ্ঞাস্য

ঈশিতা: স্যার, পুরো বিষয়টা খুব মজার। আমার মনে আরও কয়েকটা প্রশ্ন এসেছে। জিজ্ঞেস করতে পারি?

বিজ্ঞান স্যার: অবশ্যই, ঈশিতা। প্রশ্ন করলেই তো ধারণা আরও স্পষ্ট হবে।

ঈশিতা: প্রশ্ন ১: মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের ‘শক্তিঘর’ বলা হয় কেন?

বিজ্ঞান স্যার: খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমরা যে খাবার খাই, তা থেকে সরাসরি শক্তি পাই না। সেই খাবার কোষের ভেতরে জারিত হয় এবং শক্তি নির্গত করে। এই প্রক্রিয়াটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা ক্রেবস চক্র নামে পরিচিত, সেটি মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরেই ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক শক্তি এটিপি (ATP) নামক এক প্রকার শক্তি-অণুর মধ্যে জমা হয়। যখনই কোষের কোনো কাজের জন্য শক্তির প্রয়োজন হয়, তখন এই এটিপি অণু ভেঙে শক্তি সরবরাহ করে। এই কারণেই মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের শক্তিঘর বা পাওয়ার হাউস বলা হয়।

ঈশিতা: প্রশ্ন ২: লাইসোজোমকে ‘আত্মঘাতী থলি’ বলা হয় কেন?

বিজ্ঞান স্যার: লাইসোজোমের ভেতরে খুব শক্তিশালী পাচক এনজাইম থাকে যা বিভিন্ন জৈববস্তু ভেঙে ফেলতে পারে। যখন কোনো কোষ খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বা রোগাক্রান্ত হয় এবং তার মেরামত সম্ভব হয় না, তখন কোষটি নিজেই নিজেকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সময়, লাইসোজোমের পর্দা ফেটে যায় এবং ভেতরের এনজাইমগুলো বেরিয়ে এসে পুরো কোষের অঙ্গাণুগুলোকেই হজম করে ফেলে। কোষের এই আত্ম-ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে বলেই একে আত্মঘাতী থলি বলা হয়।

ঈশিতা: প্রশ্ন ৩: অভিস্রবণ এবং ব্যাপনের মধ্যে আসল পার্থক্যটা কী?

বিজ্ঞান স্যার: দুটো প্রক্রিয়াই পদার্থের অণুর চলাচল সম্পর্কিত, কিন্তু এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ব্যাপন হলো যেকোনো পদার্থের (কঠিন, তরল বা গ্যাসীয়) অণুর তার উচ্চ ঘনত্ব থেকে নিম্ন ঘনত্বের দিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া। এর জন্য কোনো পর্দার প্রয়োজন হয় না। যেমন – ঘরে ধূপ জ্বালালে তার গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়া।
অন্যদিকে, অভিস্রবণ হলো কেবল তরল দ্রাবকের (সাধারণত জল) অণুর একটি প্রভেদক ভেদ্য পর্দার মধ্যে দিয়ে নিম্ন ঘনত্বের দ্রবণ থেকে উচ্চ ঘনত্বের দ্রবণের দিকে যাওয়া। অর্থাৎ, এখানে একটি পর্দার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক এবং কেবল দ্রাবকের অণুই চলাচল করে।

ঈশিতা: প্রশ্ন ৪: ডিএনএ (DNA) এবং জিনের (Gene) কাজটা ঠিক কী?

বিজ্ঞান স্যার: ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড হলো একটি বিশাল অণু যা আমাদের সমস্ত জেনেটিক তথ্য বা বংশগতির নির্দেশ বহন করে। এটা অনেকটা একটা巨大 रेसिपी বইয়ের মতো, যেখানে একটি জীবকে তৈরি করার এবং পরিচালনা করার সমস্ত নির্দেশ লেখা থাকে। আর জিন হলো সেই বইয়ের এক-একটি নির্দিষ্ট রেসিপি। ডিএনএ-এর একটি নির্দিষ্ট কার্যকরী অংশ যা একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরি করার সংকেত বহন করে, তাকেই জিন বলে। এই প্রোটিনগুলোই আমাদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, যেমন চুলের রঙ, উচ্চতা ইত্যাদি প্রকাশ করে। এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে বৈশিষ্ট্যগুলো এই জিনের মাধ্যমেই বাহিত হয়।

আজ আমরা কী শিখলাম?

বিজ্ঞান স্যার: তাহলে ঈশিতা, আজকের আলোচনা থেকে আমরা কোষ সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। চলো, একবার সংক্ষেপে দেখে নিই মূল বিষয়গুলো।

  • কোষ হলো সমস্ত জীবের গঠনগত এবং কার্যগত মূল একক।
  • রবার্ট হুক প্রথম কোষ আবিষ্কার করেন এবং স্লেইডেন ও সোয়ান কোষ তত্ত্ব প্রবর্তন করেন।
  • কোষ প্রধানত দুই প্রকার – প্রোক্যারিওটিক (আদি) এবং ইউক্যারিওটিক (আদর্শ)।
  • একটি আদর্শ ইউক্যারিওটিক কোষের প্রধান অংশগুলি হলো কোষপর্দা, সাইটোপ্লাজম এবং নিউক্লিয়াস।
  • সাইটোপ্লাজমে বিভিন্ন কোষ অঙ্গাণু থাকে, যেমন – মাইটোকন্ড্রিয়া (শক্তিঘর), লাইসোজোম (আত্মঘাতী থলি), গলজি বস্তু (প্যাকেজিং কেন্দ্র), এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম ইত্যাদি।
  • উদ্ভিদ কোষ এবং প্রাণী কোষের মধ্যে কিছু মূল পার্থক্য রয়েছে, যেমন – কোষপ্রাচীর, প্লাস্টিড এবং কোষগহ্বরের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি।
  • নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকা ক্রোমোজোমে ডিএনএ এবং জিন থাকে, যা বংশগতির বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে।

ঈশিতা: ধন্যবাদ স্যার! আজ আমি বুঝতে পারলাম যে আমাদের এই বিশাল শরীরটা আসলে কোটি কোটি ছোট ছোট কারখানার সমষ্টি। প্রত্যেকটা কোষের ভেতরে যে এত কিছু চলে, তা সত্যিই আশ্চর্যজনক। আমি এখন থেকে সবকিছুকে অন্যভাবে দেখতে শিখব।

বিজ্ঞান স্যার: এটাই তো বিজ্ঞানের আসল মজা, ঈশিতা! আমাদের চারপাশের জগৎটাকে নতুন চোখে দেখতে শেখা। খুব ভালো করে পড়বে, পরের দিন আমরা কলা বা টিস্যু নিয়ে আলোচনা করব।