ঈশিতা: স্যার, আমি আজকাল একটা জিনিস নিয়ে খুব ভাবছি। আমরা যখন খাবার বাইরে ফেলে রাখি, তখন কিছুদিন পরই সেটা নষ্ট হয়ে যায়। এর কারণটা কী?
বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন করেছো, ঈশিতা! তোমার এই প্রশ্নটার উত্তর জানতে হলে আমাদের বিজ্ঞানের এক অসাধারণ জগৎ সম্পর্কে জানতে হবে, যা তোমাদের অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ের মূল বিষয়। আমরা আজ অনুজীব (Microorganisms) নিয়ে কথা বলবো – আমাদের বন্ধু এবং শত্রু উভয় রূপেই তারা পরিচিত।
অনুজীব কী?
বিজ্ঞান স্যার: আচ্ছা, তুমি কি কখনো খালি চোখে কোনো ছোট পোকা দেখেছো যা মাটির ওপর হেঁটে যাচ্ছে?
ঈশিতা: হ্যাঁ স্যার, দেখেছি। পিঁপড়ে বা খুব ছোট ছোট পোকামাকড়।
বিজ্ঞান স্যার: ঠিক তাই। কিন্তু আমাদের চারপাশে এমন অনেক জীব আছে যাদের আমরা খালি চোখে দেখতেই পাই না। তাদের দেখার জন্য আমাদের অণুবীক্ষণ যন্ত্র (Microscope) ব্যবহার করতে হয়। এই অতি ক্ষুদ্র জীবগুলোকেই আমরা বলি অনুজীব বা মাইক্রোঅর্গানিজম। 'মাইক্রো' মানেই হলো 'খুব ছোট' এবং 'অর্গানিজম' মানে 'জীব'।
ঈশিতা: ওহ, তার মানে এরা এতটাই ছোট যে আমরা ওদের দেখতে পাই না? কিন্তু এরা কি সব একই রকম?
অনুজীবের প্রকারভেদ: এদের কত রূপ!
বিজ্ঞান স্যার: না, ঈশিতা। এরা মোটেই একরকম নয়। বৈচিত্র্যে ভরা এদের জগৎ। বিজ্ঞানীরা এদের প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন:
- ব্যাকটেরিয়া (Bacteria)
- ছত্রাক (Fungi)
- প্রোটোজোয়া (Protozoa)
- শৈবাল (Algae)
- এবং ভাইরাস (Viruses)
এবার চলো, আমরা এদের সম্পর্কে একটু বিস্তারিত জেনে নিই।
১. ব্যাকটেরিয়া (Bacteria)
বিজ্ঞান স্যার: ব্যাকটেরিয়া হলো এককোষী জীব, অর্থাৎ এদের শরীর মাত্র একটি কোষ দিয়ে তৈরি। এরা বিভিন্ন আকারের হতে পারে, যেমন দণ্ডের মতো (bacilli), গোল আকারের (cocci) বা পেঁচানো (spirilla)। এদের প্রায় সব জায়গায় পাওয়া যায়। আমাদের দই তৈরি হতে সাহায্য করে যে অনুজীব, সেও এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া!
ঈশিতা: দই! তার মানে ভালো ব্যাকটেরিয়াও আছে?
২. ছত্রাক (Fungi)
বিজ্ঞান স্যার: একদম! এবার বলি ছত্রাকদের কথা। এরা সাধারণত বহুকোষী হয়, তবে ইস্ট (Yeast) নামক একটি ছত্রাক এককোষী। মাশরুম, পাউরুটির উপর যে সবুজ ছাতা পড়ে, এগুলো সব ছত্রাকের উদাহরণ। এরা সাধারণত স্যাঁতসেঁতে ও উষ্ণ পরিবেশে ভালো জন্মায়।
৩. প্রোটোজোয়া (Protozoa)
বিজ্ঞান স্যার: প্রোটোজোয়াও এককোষী জীব। এদের মধ্যে কিছু প্রোটোজোয়া স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করে, যেমন অ্যামিবা বা প্যারামেসিয়াম। আবার কিছু প্রোটোজোয়া পরজীবী হিসেবে অন্য জীবের শরীরে বাস করে এবং রোগ সৃষ্টি করে, যেমন ম্যালেরিয়ার জন্য দায়ী প্লাজমোডিয়াম।
৪. শৈবাল (Algae)
বিজ্ঞান স্যার: শৈবাল হলো উদ্ভিদ জগতের কাছাকাছি থাকা এক ধরনের অনুজীব। এরা সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় নিজেদের খাদ্য তৈরি করতে পারে। সাধারণত জলে বা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় এদের দেখা যায়। স্পাইরোগাইরা (Spirogyra) বা ক্ল্যামাইডোমোনাস (Chlamydomonas) এর উদাহরণ।
৫. ভাইরাস (Viruses)
বিজ্ঞান স্যার: সবশেষে আসি ভাইরাসদের কথায়। এরা আকারে এত ছোট যে অন্য অনুজীবদের থেকেও এদের দেখতে বিশেষ ধরনের অণুবীক্ষণ যন্ত্র (ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ) লাগে। এদের নিয়ে একটা মজার ব্যাপার আছে – এরা জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী এক ধরনের সত্তা। যখন এরা কোনো জীবন্ত কোষের বাইরে থাকে, তখন এদের জড়ের মতো মনে হয়। কিন্তু যেই এরা কোনো জীবন্ত কোষে প্রবেশ করে, অমনি সেই কোষের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে, তখন এদের সজীব মনে হয়। সর্দি-কাশি, ফ্লু, হাম, পোলিও এমনকি সাম্প্রতিককালের কোভিড-১৯ এর মতো রোগের জন্য ভাইরাসরাই দায়ী।
ঈশিতা: বাহ! এটা তো খুব ইন্টারেস্টিং! তাহলে স্যার, এই অনুজীবগুলো ঠিক কোথায় থাকে?
অনুজীব কোথায় থাকে?
বিজ্ঞান স্যার: ঈশিতা, সত্যি বলতে কী, পৃথিবীর এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে অনুজীব নেই! এরা প্রায় সব পরিবেশেই নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। বরফের মতো ঠাণ্ডা আবহাওয়া থেকে শুরু করে মরুভূমির রুক্ষ মাটি, এমনকি উষ্ণ প্রস্রবণের ফুটন্ত জল – সব জায়গাতেই এদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এরা বায়ুতে ভেসে বেড়ায়, জলে সাঁতার কাটে, মাটিতে বাস করে, এমনকি আমাদের শরীরের ভেতরে এবং অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের ভেতরেও থাকে। আসলে, এরা এত বেশি যে আমরা হয়তো ভাবতেও পারি না!
মিত্র অনুজীব: আমাদের উপকারে আসে যারা
বিজ্ঞান স্যার: অনুজীবদের কথা শুনলে প্রথমেই হয়তো আমাদের রোগ বা অসুখের কথা মনে পড়ে। কিন্তু এটা ওদের একটা দিক মাত্র। ওদের বেশিরভাগই কিন্তু আমাদের জন্য অত্যন্ত উপকারী, এমনকি আমাদের বেঁচে থাকার জন্যও এরা জরুরি। চলো, আমরা এদের 'মিত্র' রূপটা দেখি।
১. দই, পাউরুটি ও কেক তৈরি
বিজ্ঞান স্যার: তোমার প্রথম প্রশ্নটা মনে আছে? খাবারের নষ্ট হওয়া নিয়ে? ঠিক তেমনই, দুধ থেকে দই তৈরি হওয়াটাও কিন্তু অনুজীবদেরই কাজ। ল্যাক্টোব্যাসিলাস (Lactobacillus) নামের ব্যাকটেরিয়া দুধের ল্যাক্টোজ চিনিকে ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত করে, যার ফলে দুধ জমে দই হয়ে যায়। আর পাউরুটি, কেক তৈরির সময় আমরা ইস্ট ব্যবহার করি। এই ইস্ট দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) গ্যাস তৈরি করে, যার ফলে আটা বা ময়দা ফুলে ওঠে এবং পাউরুটি বা কেক নরম ও স্পঞ্জি হয়।
ঈশিতা: তার মানে পাউরুটির ফুলে ওঠার কারণও অনুজীব! এটা তো জানতাম না!
২. অ্যালকোহল, ওয়াইন ও অ্যাসিটিক অ্যাসিড উৎপাদন
বিজ্ঞান স্যার: হ্যাঁ, ঈশিতা। শুধু তাই নয়, ইস্ট ব্যবহার করে গম, বার্লি, চাল বা ফলের রস থেকে অ্যালকোহল ও ওয়াইনও তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে গাঁজন (Fermentation) বলে। লুই পাস্তুর (Louis Pasteur) ১৮৫৭ সালে গাঁজন প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। এছাড়া, অ্যাসিটোব্যাক্টর (Acetobacter) নামের ব্যাকটেরিয়া অ্যাসিটিক অ্যাসিড (ভিনিগার) তৈরি করতে সাহায্য করে।
৩. ঔষধপত্র তৈরিতে
বিজ্ঞান স্যার: অনুজীবদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারগুলোর মধ্যে একটি হলো ঔষধপত্র তৈরিতে।
- অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotics): যখন আমরা অসুস্থ হই, তখন অনেক সময় ডাক্তাররা অ্যান্টিবায়োটিক দেন। এই অ্যান্টিবায়োটিকগুলো হলো এমন ঔষধ যা রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীবদের বৃদ্ধি বন্ধ করে দেয় অথবা তাদের মেরে ফেলে। পেনিসিলিন হলো প্রথম আবিষ্কৃত অ্যান্টিবায়োটিক, যা পেনিসিলিয়াম নোটেটাম (Penicillium notatum) নামক ছত্রাক থেকে পাওয়া গিয়েছিল। অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯২৯ সালে এটি আবিষ্কার করেন। স্ট্রেপ্টোমাইসিন, টেট্রাসাইক্লিন, এরিথ্রোমাইসিন – এগুলো সবই বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক থেকে তৈরি হয়। তবে মনে রাখতে হবে, সাধারণ সর্দি-কাশির মতো ভাইরাসের আক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। কারণ অ্যান্টিবায়োটিক শুধু ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে কাজ করে।
- ভ্যাকসিন বা টিকা (Vaccines): টিকা হলো আরেকটা চমৎকার আবিষ্কার যা অনুজীবদের ব্যবহার করে তৈরি হয়। টিকা আমাদের শরীরকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত করে। টিকার মধ্যে মৃত বা দুর্বল করা রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীব থাকে। যখন এই দুর্বল অনুজীব আমাদের শরীরে প্রবেশ করানো হয়, তখন আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune system) এই অনুজীবদের চিনতে পারে এবং তাদের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি (Antibodies) তৈরি করে। ফলে ভবিষ্যতে যখন আসল রোগের জীবাণু আক্রমণ করে, তখন শরীর দ্রুত তার মোকাবিলা করতে পারে এবং আমরা রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকি। পোলিও, হাম, যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস – এসব রোগের টিকা রয়েছে।
ঈশিতা: তার মানে টিকাতেও অনুজীব থাকে! এটা তো দারুন ব্যাপার!
৪. পরিবেশ পরিষ্করণ
বিজ্ঞান স্যার: প্রকৃতিতেও অনুজীবদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এরা আমাদের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ, গোবর, আবর্জনা – এই সবকিছুকে এরা পচিয়ে সরল উপাদানে পরিণত করে। এই প্রক্রিয়াকে বিয়োজন (Decomposition) বলে। এর ফলে মাটির উর্বরতা বাড়ে এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত থাকে। অনেকটা প্রকৃতির নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো!
৫. কৃষি কাজে
বিজ্ঞান স্যার: কৃষিক্ষেত্রেও অনুজীবদের অবদান অনস্বীকার্য।
- নাইট্রোজেন সংবন্ধন (Nitrogen Fixation): উদ্ভিদকে ভালোভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নাইট্রোজেন একটি অত্যন্ত জরুরি উপাদান। বায়ুমণ্ডলে প্রচুর নাইট্রোজেন থাকলেও উদ্ভিদ সরাসরি তা গ্রহণ করতে পারে না। রাইজোবিয়াম (Rhizobium) নামক ব্যাকটেরিয়া কিছু শিম্বগোত্রীয় উদ্ভিদের (যেমন মটরশুঁটি, ছোলা) মূলে বাস করে এবং বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেনকে উদ্ভিদের ব্যবহারযোগ্য উপাদানে রূপান্তরিত করে। একেই নাইট্রোজেন সংবন্ধন বলে। এর ফলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এবং কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো যায়।
- মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি: কিছু ব্যাকটেরিয়া ও নীল-সবুজ শৈবাল (যেমন অ্যানাবেনা, নস্টক) বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেনকে মাটিতে আবদ্ধ করে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। এদের জৈব সার (Biological fertilizers) হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
শত্রু অনুজীব: রোগের কারণ ও ক্ষতিকারক দিক
বিজ্ঞান স্যার: এতক্ষণ আমরা অনুজীবদের ভালো দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করলাম। কিন্তু এদের কিছু খারাপ দিকও আছে। কিছু অনুজীব আমাদের, অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করে। এদের আমরা বলি রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীব বা প্যাথোজেন (Pathogens)।
১. মানুষে রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীব
বিজ্ঞান স্যার: এই অনুজীবগুলো বিভিন্নভাবে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীবের প্রভাবে মানুষের মধ্যে সৃষ্ট কিছু সাধারণ রোগ হলো:
- ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ: যক্ষ্মা (Tuberculosis), টাইফয়েড (Typhoid), কলেরা (Cholera), ডিপথেরিয়া (Diphtheria), টিটেনাস (Tetanus)।
- ভাইরাস ঘটিত রোগ: সাধারণ সর্দি (Common Cold), ফ্লু (Flu), হাম (Measles), পোলিও (Polio), চিকেনপক্স (Chickenpox), হেপাটাইটিস (Hepatitis), এইডস (AIDS), কোভিড-১৯ (COVID-19)।
- প্রোটোজোয়া ঘটিত রোগ: ম্যালেরিয়া (Malaria), অ্যামিবিক ডিসেন্ট্রি (Amoebic Dysentery), কালাজ্বর (Kala-azar)।
- ছত্রাক ঘটিত রোগ: দাদ, চুলকানি (Ringworm)।
ঈশিতা: স্যার, এত রোগ! কিন্তু এই রোগগুলো একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায় কীভাবে?
২. রোগ ছড়ানোর বিভিন্ন পদ্ধতি
বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন, ঈশিতা! রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীবগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তি, বা প্রাণী থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে।
- বায়ুবাহিত (Air-borne): যখন একজন অসুস্থ ব্যক্তি হাঁচি বা কাশি দেয়, তখন রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ছোট ছোট জলকণার সাথে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সুস্থ ব্যক্তি সেই বাতাস নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করলে সেও সংক্রমিত হতে পারে। যেমন: সর্দি, ফ্লু, যক্ষ্মা।
- জলবাহিত (Water-borne): দূষিত পানীয় জল পান করার মাধ্যমে কলেরা, টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়ায়।
- খাদ্যবাহিত (Food-borne): দূষিত বা বাসি খাবার খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়া বা অন্যান্য পেটের রোগ হতে পারে।
- প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ (Direct Contact): কিছু রোগ সরাসরি স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়, যেমন দাদ, চুলকানি, এমনকি কিছু যৌন সংক্রামিত রোগ।
- কীটপতঙ্গ দ্বারা (Through Insects/Vectors): মশা, মাছি ইত্যাদির মাধ্যমেও রোগ ছড়ায়। যেমন, ম্যালেরিয়া ছড়ায় স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে, আর ডেঙ্গু ছড়ায় স্ত্রী এডিস মশার মাধ্যমে। মাছি নোংরা জায়গা থেকে রোগ জীবাণু বহন করে এনে আমাদের খাবারের উপর বসে, যা খেলে আমরা অসুস্থ হতে পারি।
৩. প্রাণী ও উদ্ভিদে রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীব
বিজ্ঞান স্যার: শুধু মানুষ নয়, অনুজীবরা প্রাণী ও উদ্ভিদেরও ক্ষতি করে। যেমন:
- প্রাণীতে: অ্যানথ্রাক্স (Anthrax) একটি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ যা মানুষ ও গবাদি পশু উভয়কেই আক্রান্ত করে।
- উদ্ভিদে: গম, ধান, আলু, আখ, কমলালেবু, আপেল ইত্যাদিতে রোগ সৃষ্টিকারী অনুজীবরা ফসল নষ্ট করে। যেমন, গমের মরিচা (Rust of wheat) ছত্রাক দ্বারা, কমলালেবুর ক্যাঙ্কার (Citrus canker) ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এবং আলুর ব্লাইট রোগ ছত্রাক দ্বারা হয়।
৪. খাদ্যদ্রব্যের পচন
বিজ্ঞান স্যার: তোমার প্রথম প্রশ্ন, খাবার নষ্ট হওয়া নিয়ে। তোমার অনুমান ঠিকই ছিল। ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া খাবারের উপর জন্মে সেগুলোকে নষ্ট করে দেয়। খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও রঙ পরিবর্তন হয়ে যায় এবং অনেক সময় বিষাক্ত পদার্থ (toxins) তৈরি করে, যা খেলে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি। এই কারণেই আমাদের খাবার সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
রোগ প্রতিরোধ ও খাদ্য সংরক্ষণ: অনুজীবদের ঠেকানোর উপায়
বিজ্ঞান স্যার: তাহলে দেখা যাচ্ছে, অনুজীবরা যেমন আমাদের বন্ধু, তেমনই এরা শত্রুর মতো রোগ ছড়াতে ও খাবার নষ্ট করতে পারে। তাই এদের ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে বাঁচতে আমাদের কিছু পদ্ধতি জানতে হবে।
১. রোগ প্রতিরোধের উপায়
- ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা: নিয়মিত হাত ধোয়া, গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক পরা জরুরি।
- পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা: চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, জল জমতে না দেওয়া, আবর্জনা সঠিক স্থানে ফেলা।
- বিশুদ্ধ পানীয় জল: ফুটানো বা বিশুদ্ধকরণ করা জল পান করা।
- সুষম খাদ্য: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সুষম খাদ্য গ্রহণ করা।
- টিকা গ্রহণ: সময়মতো সব টিকা গ্রহণ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো।
- কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ: মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করা, মশারি ব্যবহার করা।
২. খাদ্য সংরক্ষণের উপায়
বিজ্ঞান স্যার: খাদ্যদ্রব্যে অনুজীবের বৃদ্ধি রোধ করে সেগুলোকে দীর্ঘ সময় ভালো রাখার পদ্ধতিকেই খাদ্য সংরক্ষণ (Food Preservation) বলে। এরও অনেক পদ্ধতি আছে।
- রাসায়নিক পদ্ধতি: লবণ, চিনি, তেল, ভিনিগার ইত্যাদি ব্যবহার করে খাদ্য সংরক্ষণ করা হয়। এছাড়াও, সোডিয়াম বেনজোয়েট এবং সোডিয়াম মেটাবাইসালফাইট এর মতো রাসায়নিক সংরক্ষণকারী ব্যবহার করা হয় জ্যাম, জেলি, আচার, স্কোয়াশ ইত্যাদিতে অনুজীবের বৃদ্ধি রোধ করার জন্য।
- লবণ ও চিনি দিয়ে সংরক্ষণ: মাংস, মাছ, আম, তেঁতুল ইত্যাদিতে লবণ মিশিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। লবণ জলের পরিমাণ কমিয়ে অনুজীবের বৃদ্ধি রোধ করে। জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ ইত্যাদিতে চিনি ব্যবহার করা হয়। চিনিও জলের পরিমাণ কমিয়ে অনুজীবের বৃদ্ধি ব্যাহত করে।
- তেল ও ভিনিগার দিয়ে সংরক্ষণ: আচার, সবজি, মাছ, মাংস ইত্যাদি তেল ও ভিনিগারে ডুবিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। তেল ও ভিনিগার অনুজীবদের জন্ম নিতে বাধা দেয়।
- তাপ ও ঠাণ্ডা প্রয়োগ:
- ফুটানো: জল ফুটিয়ে বা খাবার গরম করে অনেক অনুজীবকে মেরে ফেলা যায়।
- শীতলীকরণ: রেফ্রিজারেটরে বা হিমঘরে খাবার রেখে অনুজীবদের বৃদ্ধি ধীর করা যায়।
- পাস্তুরাইজেশন: লুই পাস্তুর এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। দুধে অনুজীবদের বৃদ্ধি বন্ধ করার জন্য দুধকে প্রথমে ৭০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের জন্য গরম করা হয়, তারপর দ্রুত ঠাণ্ডা করে সংরক্ষণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় দুধের পুষ্টিগুণ বজায় থাকে।
- শুকিয়ে সংরক্ষণ: খাদ্যদ্রব্য থেকে জল শুকিয়ে ফেলে অনুজীবের বৃদ্ধি রোধ করা হয়। যেমন, ডাল, শস্য, শুকনো মাছ, সবজি ইত্যাদি।
- বায়ুরোধী প্যাকেজিং: বায়ুরোধী পাত্রে বা প্যাকেটে খাবার রাখলে অনুজীবদের প্রবেশ ও বৃদ্ধি রোধ করা যায়।
ঈশিতার প্রশ্ন, বিজ্ঞান স্যারের উত্তর (Q&A)
ঈশিতা: স্যার, এই অধ্যায়টা খুব মজার ছিল! আমার কিছু প্রশ্ন আছে, যদি অনুমতি দেন?
বিজ্ঞান স্যার: অবশ্যই, ঈশিতা। প্রশ্ন করাই তো শেখার সবচেয়ে ভালো উপায়। বলো তোমার কী প্রশ্ন আছে।
ঈশিতা: স্যার, প্রথমত, ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাসের মধ্যে মূল পার্থক্যটা কী?
বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন। ব্যাকটেরিয়া এককোষী জীব, এরা নিজেদের কোষের মধ্যে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে ও বংশবৃদ্ধি করতে পারে। আর ভাইরাসরা জীবন্ত কোষের বাইরে জড়ের মতো থাকে এবং শুধুমাত্র কোনো জীবন্ত কোষের ভিতরে প্রবেশ করে তবেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। তাদের নিজস্ব কোনো কোষীয় গঠন নেই। ব্যাকটেরিয়া আকারে ভাইরাসের চেয়ে অনেক বড় হয়।
ঈশিতা: আচ্ছা। দ্বিতীয় প্রশ্ন, অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে কাজ করে এবং কেন সর্দি-কাশির মতো ভাইরাসের ক্ষেত্রে ডাক্তাররা অ্যান্টিবায়োটিক দিতে চান না?
বিজ্ঞান স্যার: অ্যান্টিবায়োটিকগুলো সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীর গঠন বা প্রোটিন সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত করে তাদের মেরে ফেলে বা তাদের বংশবৃদ্ধি রোধ করে। সর্দি-কাশি ভাইরাসের কারণে হয়, আর ভাইরাসের কোনো কোষ প্রাচীর বা সেই ধরনের গঠন নেই যা অ্যান্টিবায়োটিক লক্ষ্য করতে পারে। তাই অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের উপর কাজ করে না, বরং অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াও মারা যায় এবং ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
ঈশিতা: এটা খুব পরিষ্কার হলো। শেষ প্রশ্ন, পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতিটা আরেকবার যদি একটু সংক্ষেপে বলেন?
বিজ্ঞান স্যার: পাস্তুরাইজেশন হলো এমন একটা প্রক্রিয়া যেখানে দুধকে অল্প সময়ের জন্য (যেমন, ৭০°C তাপমাত্রায় ১৫-৩০ সেকেন্ড) উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করা হয় এবং তারপর দ্রুত ঠাণ্ডা করা হয়। এর ফলে দুধের ক্ষতিকারক অনুজীবগুলো মরে যায়, কিন্তু দুধের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয় না। এরপর এই দুধ বায়ুরোধী প্যাকেটে ভরে বাজারে আনা হয়, যাতে তা দীর্ঘ সময় ধরে ভালো থাকে।
আজ আমরা কী শিখলাম?
বিজ্ঞান স্যার: বাহ, ঈশিতা! তোমার প্রশ্নগুলো অসাধারণ ছিল। আমার মনে হয়, তুমি আজ অনুজীবদের নিয়ে অনেক কিছু শিখেছ। চলো, আজ যা শিখলাম, তার একটা দ্রুত সারসংক্ষেপ করে নিই।
- বিজ্ঞান স্যার: আজ আমরা জানলাম যে অনুজীবরা খালি চোখে দেখা যায় না এমন ক্ষুদ্র জীব, যাদের ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, প্রোটোজোয়া, শৈবাল এবং ভাইরাস – এই পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।
- ঈশিতা: হ্যাঁ স্যার! আর এরা পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় থাকতে পারে।
- বিজ্ঞান স্যার: একদম! আমরা দেখেছি কীভাবে এরা আমাদের বন্ধু হয়ে দই, পাউরুটি তৈরি, অ্যালকোহল উৎপাদন, ঔষধ (অ্যান্টিবায়োটিক ও ভ্যাকসিন) তৈরি, পরিবেশ পরিষ্কার ও নাইট্রোজেন সংবন্ধনে সাহায্য করে।
- ঈশিতা: আর এরা আমাদের শত্রুও বটে! কারণ এরা মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদের রোগ ঘটায় এবং খাবার নষ্ট করে দেয়।
- বিজ্ঞান স্যার: ঠিক ধরেছো। রোগ ছড়ানোর কারণ ও প্রতিরোধের উপায়গুলোও আমরা দেখেছি, যেমন পরিচ্ছন্নতা, টিকা এবং মশা নিয়ন্ত্রণ।
- ঈশিতা: আর কীভাবে লবণ, চিনি, তেল, ভিনিগার, তাপ বা ঠাণ্ডা প্রয়োগ করে এবং পাস্তুরাইজেশনের মাধ্যমে খাবার ভালো রাখা যায়, সেটাও শিখলাম!
- বিজ্ঞান স্যার: চমৎকার! তোমার আগ্রহ দেখে আমি মুগ্ধ। মনে রাখবে, এই ক্ষুদ্র অনুজীবদের জগৎ যেমন জটিল, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। ওদের সম্পর্কে যত জানবে, তত আমাদের চারপাশের জগৎটাকেও ভালোভাবে বুঝতে পারবে।
ঈশিতা: অনেক ধন্যবাদ স্যার! অনুজীবদের নিয়ে আমার সব ভুল ধারণা আজ ভেঙে গেল এবং অনেক নতুন তথ্য জানতে পারলাম। এটা সত্যিই খুব শিক্ষামূলক ছিল!