অর্জুন: স্যার, আমি প্রতিদিন কত নতুন জিনিস দেখি! যেমন, কখনও সোনা দেখি, কখনও লোহা দেখি, আবার কখনও জল বা বাতাস। এই সব জিনিস দেখতে, ছুঁতে বা তাদের ব্যবহার সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু কেন? মানে, সবকিছুরই তো কিছু একটা মূল গঠন আছে, তাই না? যেমন একটা বাড়ি ইঁট দিয়ে তৈরি, তেমনই এই জিনিসগুলো কী দিয়ে তৈরি, আর কেনই বা তারা এত আলাদা?
বিজ্ঞান স্যার: খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছ, অর্জুন! তোমার এই কৌতূহলই বিজ্ঞানের জন্ম দেয়। তুমি একদম সঠিক জায়গায় আঙুল রেখেছ। এই যে আমাদের চারপাশে এত বৈচিত্র্যময় পদার্থ, যেমন সোনা, লোহা, জল, বাতাস—এগুলো সবই খুব ক্ষুদ্র কিছু কণা দিয়ে তৈরি। আর এই ক্ষুদ্রতম কণাগুলোই হলো পরমাণু (Atom)। তোমাদের নবম শ্রেণির বিজ্ঞানের চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা এই ‘পরমাণুর গঠন’ নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করব। এই পরমাণুর গঠন বুঝলেই তুমি জানতে পারবে কেন সোনা সোনা আর লোহা লোহা!
অর্জুন: পরমাণু? তার মানে কি এই সব কিছুকেই যদি ভাঙতে ভাঙতে যাই, তাহলে শেষে গিয়ে একটা ‘পরমাণু’ বলে কিছু পাবো?
বিজ্ঞান স্যার: ঠিক তাই, অর্জুন! পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা নিয়েই মানুষের কৌতূহল বহু প্রাচীন। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস (Democritus) চতুর্থ শতকে খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম প্রস্তাব করেন যে, যদি আমরা কোনো বস্তুকে বারবার ভাঙতে থাকি, তাহলে একসময় এমন একটি ক্ষুদ্রতম কণা পাবো যাকে আর ভাঙা যাবে না। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘অ্যাটমস’ (Atomos), যার গ্রিক অর্থ হলো ‘অবিভাজ্য’।
অর্জুন: ওহ, তাহলে পরমাণু মানেই যা আর ভাঙা যায় না?
বিজ্ঞান স্যার: হ্যাঁ, একটা সময় পর্যন্ত এটাই ধারণা ছিল। এরপর প্রায় ১৮ শতকের শেষের দিকে, বিখ্যাত বিজ্ঞানী জন ডাল্টন (John Dalton) এই ধারণাটিকে আরও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেন এবং তাঁর বিখ্যাত ডাল্টনের পরমাণুবাদ (Dalton's Atomic Theory) উপস্থাপন করেন। তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন, যা রসায়ন বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে।
ডাল্টনের পরমাণুবাদের মূল ধারণাগুলো কী ছিল?
- পরমাণু হলো অবিভাজ্য ও অবিনশ্বর: ডাল্টন বলেছিলেন যে পদার্থ অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত, যাদের পরমাণু বলে। এদের সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না।
- একই মৌলের সব পরমাণু একই রকম: অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট মৌলের (যেমন সোনা) সব পরমাণুর ভর এবং রাসায়নিক ধর্ম একই হবে।
- ভিন্ন মৌলের পরমাণু ভিন্ন রকম: ভিন্ন ভিন্ন মৌলের পরমাণুর ভর ও রাসায়নিক ধর্ম ভিন্ন হয়।
- পরমাণুর পূর্ণ সংখ্যা অনুপাতে যুক্ত হয়ে যৌগ গঠন করে: যেমন, জল (H₂O) এর একটি অণু দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু ও একটি অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে গঠিত।
অর্জুন: তাহলে তো ডাল্টন সঠিকই বলেছিলেন। কিন্তু স্যার, এই যে ‘অবিভাজ্য’ বললেন, এর মানে কি পরমাণুর ভেতরে আর কিছু নেই?
বিজ্ঞান স্যার: এইখানেই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য, অর্জুন! একসময় যা সত্য বলে মনে হয়, নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাকে ভুল প্রমাণ করতে পারে। ডাল্টনের পরমাণুবাদ বেশ কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারলেও, কিছু বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারছিল না। যেমন, কেন চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ানোর পর সেটা কাগজের টুকরোগুলোকে আকর্ষণ করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন যে পরমাণু আসলে অবিভাজ্য নয়, বরং এটি আরও কিছু ক্ষুদ্র কণা দিয়ে গঠিত। এদের আমরা উপ-পারমাণবিক কণা (Subatomic Particles) বলি।
অর্জুন: উপ-পারমাণবিক কণা? সেগুলো কী কী স্যার?
বিজ্ঞান স্যার: পরমাণুর তিনটি প্রধান উপ-পারমাণবিক কণা আছে: ইলেকট্রন (Electron), প্রোটন (Proton) এবং নিউট্রন (Neutron)। এসো, আমরা একে একে এদের আবিষ্কার ও বৈশিষ্ট্যগুলো জেনে নিই।
ইলেকট্রন আবিষ্কার: জে. জে. থমসন
বিজ্ঞান স্যার: ১৮৮৬ সালে ইউজেন গোল্ডস্টাইন (Eugen Goldstein) যদিও ‘ক্যানাল রে’ বা ‘অ্যানোড রে’ আবিষ্কার করেছিলেন, যার মাধ্যমে প্রোটনের ধারণা আসে, তবে ইলেকট্রনের আবিষ্কারের গল্পটা আগে আসে। ১৮৯৭ সালে জে. জে. থমসন (J.J. Thomson) একটি ক্যাথোড রে টিউব (Cathode Ray Tube) ব্যবহার করে একটি পরীক্ষা করেন। এই টিউবে খুব কম চাপে গ্যাস রেখে তার মধ্যে উচ্চ বিভব পার্থক্য প্রয়োগ করা হয়। তিনি দেখলেন যে ক্যাথোড থেকে এক প্রকার অদৃশ্য রশ্মি অ্যানোডের দিকে যাচ্ছে। এই রশ্মিগুলোই ছিল ইলেকট্রনের প্রবাহ।
- ইলেকট্রনের বৈশিষ্ট্য:
- ইলেকট্রন হলো ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণা। এর আধানের পরিমাণ -1.602 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব।
- এর ভর অত্যন্ত কম, হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের প্রায় ১৮৩৬ ভাগের এক ভাগ।
- ইলেকট্রন পরমাণুর নিউক্লিয়াসের বাইরে বিভিন্ন কক্ষপথে ঘুরতে থাকে।
অর্জুন: তাহলে এই ইলেকট্রনই কি ওই চিরুনি আর কাগজের টুকরোর আকর্ষণের কারণ?
বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক ধরেছ! ঘর্ষণের ফলে ইলেকট্রনের আদান-প্রদান হয়, যার ফলে বস্তুগুলো আহিত হয়ে যায় এবং পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
প্রোটন আবিষ্কার: গোল্ডস্টাইন এবং রাদারফোর্ড
বিজ্ঞান স্যার: থমসনের ইলেকট্রন আবিষ্কারের আগেই গোল্ডস্টাইন ১৮৮৬ সালে অ্যানোড রশ্মি বা ক্যানাল রশ্মি আবিষ্কার করেছিলেন। এই রশ্মিগুলো ছিল ধনাত্মক আধানযুক্ত। পরবর্তীতে, ১৯১৯ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড (Ernest Rutherford) এই ধনাত্মক কণাগুলোকে প্রোটন (Proton) নাম দেন।
- প্রোটনের বৈশিষ্ট্য:
- প্রোটন হলো ধনাত্মক আধানযুক্ত কণা। এর আধানের পরিমাণ +1.602 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব, অর্থাৎ ইলেকট্রনের আধানের সমান ও বিপরীত।
- এর ভর প্রায় একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের সমান।
- প্রোটন পরমাণুর কেন্দ্রে, যাকে আমরা নিউক্লিয়াস (Nucleus) বলি, সেখানে থাকে।
নিউট্রন আবিষ্কার: জেমস চ্যাডউইক
বিজ্ঞান স্যার: ইলেকট্রন ও প্রোটনের আবিষ্কারের পরও বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছিলেন যে পরমাণুর ভর শুধুমাত্র প্রোটন ও ইলেকট্রন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। পরমাণুর ভরের একটি বড় অংশ তখনো অজানা ছিল। ১৯৩২ সালে জেমস চ্যাডউইক (James Chadwick) এমন একটি কণার আবিষ্কার করেন যার কোনো আধান নেই, কিন্তু ভর প্রোটনের ভরের প্রায় সমান। তিনি এর নাম দিলেন নিউট্রন (Neutron)।
- নিউট্রনের বৈশিষ্ট্য:
- নিউট্রনের কোনো আধান নেই, এটি আধানহীন বা নিস্তড়িৎ কণা।
- এর ভর প্রোটনের ভরের প্রায় সমান।
- নিউট্রনও পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সাথে অবস্থান করে।
অর্জুন: তাহলে পরমাণুর কেন্দ্রে প্রোটন আর নিউট্রন থাকে, আর ইলেকট্রনগুলো বাইরে ঘোরাঘুরি করে? এটা কি অনেকটা আমাদের সৌরজগতের মতো, যেখানে সূর্য কেন্দ্রে আর গ্রহগুলো তার চারপাশে ঘোরে?
বিজ্ঞান স্যার: তোমার উপমাটা খুব ভালো, অর্জুন! তুমি পরমাণুর গঠন সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা পেয়েছ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই ধারণাগুলো একদিনে পাননি, অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর বিভিন্ন মডেলের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেছে। এসো, আমরা পরমাণুর এই মডেলগুলো নিয়ে আলোচনা করি।
পরমাণুর বিভিন্ন মডেল
১. জে. জে. থমসনের পরমাণু মডেল (Thomson's Model of Atom)
বিজ্ঞান স্যার: ইলেকট্রন আবিষ্কারের পর থমসন পরমাণুর একটি মডেল প্রস্তাব করেন। তিনি ভেবেছিলেন, পরমাণু একটি ধনাত্মক আধানযুক্ত গোলক, যার মধ্যে ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনগুলো ঠিক যেন একটি পুডিংয়ের মধ্যে কিশমিশের (Plum Pudding) মতো ছড়িয়ে আছে।
- মূল ধারণা: পরমাণু হলো একটি ধনাত্মক আধানযুক্ত গোলক যেখানে ইলেকট্রনগুলি বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো থাকে। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধান সমান হওয়ায় পরমাণু সামগ্রিকভাবে নিস্তড়িৎ হয়।
- সীমাবদ্ধতা: এই মডেলটি পরবর্তীতে করা রাদারফোর্ডের আলফা-কণা বিক্ষেপণ পরীক্ষা (Alpha-Particle Scattering Experiment) এর ফলাফল ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
২. রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল (Rutherford's Model of Atom)
অর্জুন: রাদারফোর্ড কি ওই পরীক্ষার জন্যই বিখ্যাত, যেটা আপনি কিছুক্ষণ আগে বললেন?
বিজ্ঞান স্যার: হ্যাঁ, অর্জুন! আর্নেস্ট রাদারফোর্ড এবং তাঁর সহকর্মীরা ১৯১১ সালে একটি যুগান্তকারী পরীক্ষা করেছিলেন, যা পরমাণুর গঠন সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দেয়। এই পরীক্ষাটি আলফা-কণা বিক্ষেপণ পরীক্ষা (Alpha-Particle Scattering Experiment) নামে পরিচিত।
রাদারফোর্ডের আলফা-কণা বিক্ষেপণ পরীক্ষা:
- পরীক্ষা setup: রাদারফোর্ড একটি তেজস্ক্রিয় উৎস থেকে নির্গত উচ্চ গতিসম্পন্ন ধনাত্মক আধানযুক্ত আলফা কণা (হিলিয়াম নিউক্লিয়াস) একটি খুব পাতলা সোনার পাতের (প্রায় ১০০০ পরমাণু পুরু) উপর নিক্ষেপ করেন। সোনার পাতের চারপাশে একটি বৃত্তাকার ফ্লুরোসেন্ট পর্দা রাখা হয়েছিল, যাতে আলফা কণার গতিপথ দেখা যায়।
- পর্যবেক্ষণ:
- বেশিরভাগ আলফা কণা কোনো বিচ্যুতি ছাড়াই সোনার পাত ভেদ করে সরাসরি চলে গেল।
- কিছু আলফা কণা ছোট কোণে বিচ্যুত হলো।
- খুব কম সংখ্যক আলফা কণা (প্রায় ২০,০০০ কণার মধ্যে ১টি) ১৮০ ডিগ্রি কোণে বা প্রায় একই পথে ফিরে এলো।
- সিদ্ধান্ত:
- যেহেতু বেশিরভাগ আলফা কণা সোজা চলে গেল, তার মানে পরমাণুর বেশিরভাগ স্থানই ফাঁকা।
- আলফা কণা ধনাত্মক আধানযুক্ত, তাই অল্প সংখ্যক বিচ্যুতি বোঝায় যে পরমাণুর কেন্দ্রে একটি ক্ষুদ্র, ধনাত্মক আধানযুক্ত অংশ আছে, যা আলফা কণাকে বিকর্ষণ করছে। রাদারফোর্ড এর নাম দিলেন নিউক্লিয়াস (Nucleus)।
- খুব অল্প কণা যে সরাসরি ফিরে এলো, তার মানে নিউক্লিয়াসের ভর এবং ধনাত্মক আধান খুবই ঘনভাবে একটি ক্ষুদ্র স্থানে কেন্দ্রীভূত।
অর্জুন: বাহ! তার মানে পরমাণুর ভেতরে অনেক ফাঁকা জায়গা আছে, আর কেন্দ্রে ছোট্ট একটা জায়গায় সব ধনাত্মক জিনিসগুলো জমা আছে। এটা তো খুবই দারুণ একটা আবিষ্কার!
বিজ্ঞান স্যার: একদম! এই পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে রাদারফোর্ড পরমাণুর নিউক্লিয়ার মডেল (Nuclear Model) প্রস্তাব করেন, যা সৌরজগতের মডেল (Planetary Model) নামেও পরিচিত।
- রাদারফোর্ডের মডেলের মূল ধারণা:
- পরমাণুর কেন্দ্রে একটি ক্ষুদ্র, অত্যন্ত ঘন এবং ধনাত্মক আধানযুক্ত অংশ থাকে, যাকে নিউক্লিয়াস বলে। পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর এই নিউক্লিয়াসেই কেন্দ্রীভূত থাকে।
- ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের চারপাশে বৃত্তাকার পথে খুব দ্রুত ঘোরে।
- পরমাণু সামগ্রিকভাবে নিস্তড়িৎ, কারণ নিউক্লিয়াসের ধনাত্মক আধান এবং ইলেকট্রনগুলির ঋণাত্মক আধান সংখ্যায় সমান।
- সীমাবদ্ধতা: এই মডেলটি বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়। চিরায়ত পদার্থবিদ্যার তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি আধানযুক্ত কণা (যেমন ইলেকট্রন) যদি একটি বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকে, তাহলে তা অবিরাম শক্তি বিকিরণ করবে এবং শক্তি হারাতে হারাতে একসময় নিউক্লিয়াসে এসে পতিত হবে। এর ফলে পরমাণু অস্থায়ী হয়ে যাবে, কিন্তু আমরা জানি পরমাণু স্থিতিশীল। এই মডেল পরমাণুর স্থিতিশীলতা ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
৩. বোরের পরমাণু মডেল (Bohr's Model of Atom)
অর্জুন: তাহলে কি রাদারফোর্ডের মডেল ভুল ছিল?
বিজ্ঞান স্যার: পুরোপুরি ভুল ছিল না, অর্জুন। রাদারফোর্ড পরমাণুর কেন্দ্র সম্পর্কে একটি বিপ্লবী ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মডেলের সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য নীল্স বোর (Niels Bohr) ১৯১৩ সালে একটি নতুন মডেল প্রস্তাব করেন, যা বোরের পরমাণু মডেল নামে পরিচিত। বোর, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক এবং আইনস্টাইনের কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করে রাদারফোর্ডের মডেলের ত্রুটিগুলো সংশোধন করেন।
- বোরের মডেলের মূল ধারণা:
- ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের চারপাশে কিছু নির্দিষ্ট বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘোরে, যাদের বিচ্ছিন্ন কক্ষপথ (Discrete Orbits) বা শক্তির স্তর (Energy Shells) বলা হয়।
- এই নির্দিষ্ট কক্ষপথগুলিতে ঘোরার সময় ইলেকট্রনগুলি কোনো শক্তি বিকিরণ করে না, তাই তারা স্থিতিশীল থাকে।
- এই কক্ষপথগুলোকে K, L, M, N... অক্ষর দিয়ে অথবা 1, 2, 3, 4... সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয়। সবচেয়ে ভেতরের কক্ষপথটি (K-shell) প্রথম শক্তি স্তর (n=1), তারপরেরটি L-shell (n=2) ইত্যাদি।
- ইলেকট্রন যখন একটি নির্দিষ্ট শক্তি স্তর থেকে অন্য শক্তি স্তরে লাফিয়ে যায় (উচ্চ শক্তি স্তরে গেলে শক্তি শোষণ করে, নিম্ন শক্তি স্তরে গেলে শক্তি বিকিরণ করে), তখন শক্তি শোষিত বা বিকিরিত হয়।
অর্জুন: ওহ, তার মানে ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের চারপাশে কোনো রকম শক্তি না হারিয়ে ঘুরতে পারে, যদি তারা তাদের নির্দিষ্ট শক্তি স্তরে থাকে। তাহলে পরমাণু স্থিতিশীল থাকে!
বিজ্ঞান স্যার: ঠিক ধরেছ! বোরের মডেল পরমাণুর স্থিতিশীলতা এবং হাইড্রোজেন পরমাণুর বর্ণালী সফলভাবে ব্যাখ্যা করতে পেরেছিল। এটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দিকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
ইলেকট্রনের বন্টন: বোর-বুরি স্কিম
বিজ্ঞান স্যার: এখন প্রশ্ন হলো, এই বিভিন্ন শক্তি স্তরে ইলেকট্রনগুলো কীভাবে বন্টিত থাকে? বোর এবং বুরি (Bohr and Bury) পরমাণুর বিভিন্ন কক্ষে ইলেকট্রন বন্টনের জন্য কিছু নিয়ম প্রস্তাব করেন, যা বোর-বুরি স্কিম (Bohr-Bury Scheme) নামে পরিচিত।
- মূল নিয়মগুলি:
- একটি কক্ষে সর্বোচ্চ ইলেকট্রন ধারণ ক্ষমতা 2n² সূত্র দ্বারা নির্ধারিত হয়, যেখানে 'n' হলো কক্ষপথের সংখ্যা বা শক্তির স্তর (যেমন, K-কক্ষের জন্য n=1, L-কক্ষের জন্য n=2 ইত্যাদি)।
- K-কক্ষ (n=1): সর্বোচ্চ ইলেকট্রন = 2 × (1)² = 2
- L-কক্ষ (n=2): সর্বোচ্চ ইলেকট্রন = 2 × (2)² = 8
- M-কক্ষ (n=3): সর্বোচ্চ ইলেকট্রন = 2 × (3)² = 18
- N-কক্ষ (n=4): সর্বোচ্চ ইলেকট্রন = 2 × (4)² = 32
- সবচেয়ে বাইরের কক্ষপথে (valence shell) সর্বোচ্চ ৮টি ইলেকট্রন থাকতে পারে।
- ভেতরের কক্ষপথগুলো পুরোপুরি পূর্ণ না হলে বাইরের কক্ষপথে ইলেকট্রন প্রবেশ করে না। (তবে এটি উচ্চতর শ্রেণীর জন্য কিছু ব্যতিক্রম আছে)।
- একটি কক্ষে সর্বোচ্চ ইলেকট্রন ধারণ ক্ষমতা 2n² সূত্র দ্বারা নির্ধারিত হয়, যেখানে 'n' হলো কক্ষপথের সংখ্যা বা শক্তির স্তর (যেমন, K-কক্ষের জন্য n=1, L-কক্ষের জন্য n=2 ইত্যাদি)।
অর্জুন: তাহলে সোডিয়ামের (পারমাণবিক সংখ্যা ১১) ইলেকট্রন বিন্যাস কেমন হবে?
বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন! সোডিয়ামের পারমাণবিক সংখ্যা ১১, তার মানে এর ১১টি ইলেকট্রন আছে।
- K-কক্ষ (n=1): 2টি ইলেকট্রন (কারণ এর সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা 2)
- L-কক্ষ (n=2): 8টি ইলেকট্রন (কারণ এর সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা 8, এবং K-কক্ষ পূর্ণ হওয়ার পর বাকি ইলেকট্রন এখানে আসে)
- M-কক্ষ (n=3): 1টি ইলেকট্রন (মোট 2+8=10টি ইলেকট্রন হয়ে গেছে, বাকি 1টি M-কক্ষে যায়)
পারমাণবিক সংখ্যা, ভর সংখ্যা এবং ভ্যালেন্সি
১. পারমাণবিক সংখ্যা (Atomic Number, Z)
বিজ্ঞান স্যার: অর্জুন, তুমি কি জানো কোন জিনিসটা একটি মৌলকে অন্য মৌল থেকে আলাদা করে? সেটা হলো তার পারমাণবিক সংখ্যা (Atomic Number), যাকে আমরা 'Z' দিয়ে প্রকাশ করি।
- সংজ্ঞা: একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত প্রোটনের মোট সংখ্যাকে সেই মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা বলে।
- গুরুত্ব: যেহেতু একটি নিরপেক্ষ পরমাণুতে প্রোটনের সংখ্যা ও ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান হয়, তাই পারমাণবিক সংখ্যা ইলেকট্রনের সংখ্যাও নির্দেশ করে। এটি মৌলের মৌলিক পরিচয় বহন করে। যেমন, যার পারমাণবিক সংখ্যা ১ সে হাইড্রোজেন, যার ৮ সে অক্সিজেন, আর যার ১১ সে সোডিয়াম।
অর্জুন: তার মানে, যদি প্রোটনের সংখ্যা বদলে যায়, তাহলে কি মৌলটাই বদলে যাবে?
বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক বলেছ! প্রোটনের সংখ্যা বদলালে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মৌলে পরিণত হবে। এটাই মৌলের পরিচয়।
২. ভর সংখ্যা (Mass Number, A)
বিজ্ঞান স্যার: পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রন থাকে। এই প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যাকে ভর সংখ্যা (Mass Number) বলে, যাকে 'A' দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
- সংজ্ঞা: ভর সংখ্যা = প্রোটনের সংখ্যা + নিউট্রনের সংখ্যা।
- কারণ: ইলেকট্রনের ভর অত্যন্ত কম হওয়ায় পরমাণুর মোট ভর মূলত প্রোটন ও নিউট্রনের উপর নির্ভর করে।
একটি মৌলকে প্রতীক দিয়ে প্রকাশ করার সময়, পারমাণবিক সংখ্যাকে নিচে বাম দিকে এবং ভর সংখ্যাকে উপরে বাম দিকে লেখা হয়। যেমন, সোডিয়ামকে আমরা ₁₁Na²³ এভাবে লিখতে পারি। এর মানে হল, সোডিয়ামের পারমাণবিক সংখ্যা ১১ এবং ভর সংখ্যা ২৩। তাহলে, এর প্রোটন সংখ্যা ১১, ইলেকট্রন সংখ্যা ১১ এবং নিউট্রন সংখ্যা = ভর সংখ্যা – প্রোটন সংখ্যা = ২৩ – ১১ = ১২।
অর্জুন: বাহ, এটা তো খুব পরিষ্কার হয়ে গেল!
৩. ভ্যালেন্সি বা যোজ্যতা (Valency)
বিজ্ঞান স্যার: এবার আসি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণায়— ভ্যালেন্সি (Valency)। পরমাণুগুলো কেন একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে অণু তৈরি করে, তা এই ভ্যালেন্সি দিয়ে বোঝা যায়।
- সংজ্ঞা: কোনো মৌলের পরমাণুর অন্যান্য মৌলের পরমাণুর সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতাকে সেই মৌলের ভ্যালেন্সি বা যোজ্যতা বলে।
- কারণ: প্রতিটি পরমাণু চায় তার সবচেয়ে বাইরের কক্ষপথটিকে পূর্ণ করতে, অর্থাৎ আটটি ইলেকট্রন (বা হাইড্রোজেন, হিলিয়ামের ক্ষেত্রে ২টি) রাখতে। এই অবস্থাকে অষ্টক সূত্র (Octet Rule) বলে। এটি অর্জন করার জন্য পরমাণু ইলেকট্রন বর্জন, গ্রহণ বা ভাগাভাগি করে। এই বর্জন, গ্রহণ বা ভাগাভাগির সংখ্যাই হলো তার ভ্যালেন্সি।
উদাহরণ:
- সোডিয়াম (Na): ইলেকট্রন বিন্যাস 2, 8, 1। বাইরের কক্ষে 1টি ইলেকট্রন আছে। অষ্টক পূর্ণ করার জন্য এটি 1টি ইলেকট্রন বর্জন করতে চায়। তাই এর ভ্যালেন্সি 1।
- ক্লোরিন (Cl): ইলেকট্রন বিন্যাস 2, 8, 7। বাইরের কক্ষে 7টি ইলেকট্রন আছে। অষ্টক পূর্ণ করার জন্য এটি 1টি ইলেকট্রন গ্রহণ করতে চায়। তাই এর ভ্যালেন্সি 1।
- অক্সিজেন (O): ইলেকট্রন বিন্যাস 2, 6। বাইরের কক্ষে 6টি ইলেকট্রন আছে। অষ্টক পূর্ণ করার জন্য এটি 2টি ইলেকট্রন গ্রহণ করতে চায়। তাই এর ভ্যালেন্সি 2।
যদি বাইরের কক্ষে 1, 2, 3 বা 4টি ইলেকট্রন থাকে, তবে সাধারণত সেই সংখ্যাই তার ভ্যালেন্সি হয় (কারণ তারা ইলেকট্রন বর্জন করে বা ভাগাভাগি করে)। যদি 5, 6, 7টি ইলেকট্রন থাকে, তবে (8 - ইলেকট্রন সংখ্যা) হলো তার ভ্যালেন্সি (কারণ তারা ইলেকট্রন গ্রহণ করে)।
অর্জুন: তাহলে নিয়ন বা আর্গনের মতো নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলির ভ্যালেন্সি কত হবে?
বিজ্ঞান স্যার: চমৎকার প্রশ্ন, অর্জুন! নিয়ন (ইলেকট্রন বিন্যাস 2, 8) এবং আর্গন (ইলেকট্রন বিন্যাস 2, 8, 8) এদের সবচেয়ে বাইরের কক্ষপথগুলো সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ। অর্থাৎ, তাদের অষ্টক পূর্ণ আছে। তাই তারা সাধারণত ইলেকট্রন বর্জন, গ্রহণ বা ভাগাভাগি করতে চায় না। এর অর্থ হলো তাদের ভ্যালেন্সি শূন্য। এই জন্যই তাদের নিষ্ক্রিয় গ্যাস (Noble Gases) বলা হয়, কারণ তারা রাসায়নিকভাবে খুব কম সক্রিয়।
আইসোটোপ এবং আইসোবার
১. আইসোটোপ (Isotopes)
বিজ্ঞান স্যার: এইবার আমরা এমন কিছু পরমাণু নিয়ে আলোচনা করব যা শুনে তুমি হয়তো অবাক হবে। একই মৌলের পরমাণু হলেও তাদের ভর ভিন্ন হতে পারে! এদেরকেই আমরা আইসোটোপ (Isotopes) বলি।
- সংজ্ঞা: একই মৌলের যেসব পরমাণুর পারমাণবিক সংখ্যা (প্রোটন সংখ্যা) একই, কিন্তু ভর সংখ্যা (নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন হওয়ার কারণে) ভিন্ন, তাদের আইসোটোপ বলে।
- উদাহরণ:
- হাইড্রোজেনের আইসোটোপ: হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপ আছে:
- প্রোটিয়াম (₁H¹): 1টি প্রোটন, 0টি নিউট্রন। এটিই সাধারণ হাইড্রোজেন।
- ডিউটেরিয়াম (₁H²): 1টি প্রোটন, 1টি নিউট্রন। এটিকে 'ভারী হাইড্রোজেন'ও বলা হয়।
- ট্রিটিয়াম (₁H³): 1টি প্রোটন, 2টি নিউট্রন। এটি তেজস্ক্রিয়।
- কার্বনের আইসোটোপ: কার্বনের প্রধান দুটি আইসোটোপ হলো C-12 (⁶C¹²) এবং C-14 (⁶C¹⁴)। উভয়েরই প্রোটন সংখ্যা ৬। কিন্তু C-12 এর নিউট্রন সংখ্যা ৬ (12-6), আর C-14 এর নিউট্রন সংখ্যা ৮ (14-6)।
- ক্লোরিনের আইসোটোপ: ক্লোরিনের দুটি প্রধান আইসোটোপ আছে - Cl-35 (₁₇Cl³⁵) এবং Cl-37 (₁₇Cl³⁷)। উভয়ের প্রোটন সংখ্যা ১৭।
- হাইড্রোজেনের আইসোটোপ: হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপ আছে:
- গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার:
- ইউরেনিয়াম-235 (U-235): পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে এবং পারমাণবিক বোমা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
- কোবাল্ট-60 (Co-60): ক্যান্সার চিকিৎসায় (রেডিওথেরাপি) ব্যবহৃত হয়।
- আয়োডিন-131 (I-131): গলগণ্ড (goiter) রোগের চিকিৎসায় এবং থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা নিরীক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
- কার্বন-14 (C-14): জীবাশ্মের বয়স নির্ণয়ে (Carbon dating) ব্যবহৃত হয়।
অর্জুন: একই মৌল হয়েও ভর আলাদা, এটা তো খুব আশ্চর্যের! কিন্তু কেন এমন হয়?
বিজ্ঞান স্যার: কারণ তাদের নিউট্রন সংখ্যা আলাদা। প্রোটন সংখ্যা একই হওয়ায় তাদের রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই থাকে, কিন্তু ভরের পার্থক্যের কারণে তাদের ভৌত ধর্মে (যেমন ঘনত্ব, গলনাঙ্ক) কিছু পার্থক্য দেখা যায়।
২. আইসোবার (Isobars)
বিজ্ঞান স্যার: আইসোটোপের ঠিক উল্টো একটা ধারণা হলো আইসোবার (Isobars)।
- সংজ্ঞা: ভিন্ন ভিন্ন মৌলের যেসব পরমাণুর ভর সংখ্যা একই, কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা ভিন্ন, তাদের আইসোবার বলে।
- উদাহরণ:
- আর্গন (₁₈Ar⁴⁰) এবং ক্যালসিয়াম (₂₀Ca⁴⁰): আর্গনের পারমাণবিক সংখ্যা ১৮ এবং ক্যালসিয়ামের পারমাণবিক সংখ্যা ২০। কিন্তু উভয়ের ভর সংখ্যা ৪০। অর্থাৎ, এরা দুটি ভিন্ন মৌল, কিন্তু তাদের ভর সংখ্যা একই।
- সোডিয়াম (₁₁Na²⁴) এবং ম্যাগনেশিয়াম (₁₂Mg²⁴): এদের দুজনেরই ভর সংখ্যা ২৪, কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা ভিন্ন।
অর্জুন: তার মানে আইসোবারগুলো পুরো ভিন্ন মৌল, শুধু তাদের ভর এক? কিন্তু আইসোটোপগুলো একই মৌল, শুধু ভর আলাদা?
বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক বলেছ, অর্জুন! তোমার এই তুলনাটা খুব ভালো। আইসোটোপের ক্ষেত্রে প্রোটন সংখ্যা একই, নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন। আর আইসোবারের ক্ষেত্রে প্রোটন সংখ্যা ভিন্ন, কিন্তু প্রোটন ও নিউট্রনের যোগফল (ভর সংখ্যা) একই।
প্রশ্ন-উত্তর পর্ব
অর্জুন: স্যার, আজ আমরা অনেক কিছু শিখলাম। আমার মনে কিছু প্রশ্ন আসছে, যদি অনুমতি দেন...
বিজ্ঞান স্যার: অবশ্যই, অর্জুন! প্রশ্ন করাই তো শেখার সবচেয়ে ভালো উপায়। বলো তোমার কী প্রশ্ন?
অর্জুন:
১. ডাল্টনের পরমাণু মডেলের প্রধান সীমাবদ্ধতা কী ছিল, যা পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা দূর করেন?
বিজ্ঞান স্যার: ডাল্টনের পরমাণু মডেলের প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল যে তিনি পরমাণুকে অবিভাজ্য ও অবিনশ্বর কণা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের মতো উপ-পারমাণবিক কণা আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে পরমাণুকে আরও ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি এবং বিভাজ্য। এছাড়া, তিনি একই মৌলের সব পরমাণুর ভর একই হবে বলেছিলেন, যা আইসোটোপ আবিষ্কারের পর ভুল প্রমাণিত হয়।
২. রাদারফোর্ডের আলফা-কণা বিক্ষেপণ পরীক্ষার মূল পর্যবেক্ষণ ও তার থেকে আসা সিদ্ধান্তগুলো সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করুন।
বিজ্ঞান স্যার: রাদারফোর্ডের আলফা-কণা বিক্ষেপণ পরীক্ষার তিনটি মূল পর্যবেক্ষণ ছিল: ১) বেশিরভাগ আলফা কণা পাতলা সোনার পাত ভেদ করে সোজা চলে গেল; ২) কিছু কণা ছোট কোণে বিচ্যুত হলো; এবং ৩) খুব কম সংখ্যক কণা ১৮০ ডিগ্রি কোণে ফিরে এলো। এই পর্যবেক্ষণগুলি থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে, পরমাণুর বেশিরভাগ স্থান ফাঁকা, পরমাণুর কেন্দ্রে একটি ক্ষুদ্র, অত্যন্ত ঘন ও ধনাত্মক আধানযুক্ত অংশ আছে (নিউক্লিয়াস), এবং পরমাণুর সমস্ত ভর এই নিউক্লিয়াসেই কেন্দ্রীভূত।
৩. বোরের পরমাণু মডেল কীভাবে রাদারফোর্ডের মডেলের সীমাবদ্ধতা দূর করেছিল?
বিজ্ঞান স্যার: রাদারফোর্ডের মডেল পরমাণুর স্থিতিশীলতা ব্যাখ্যা করতে পারেনি, কারণ চিরায়ত পদার্থবিদ্যা অনুযায়ী ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করে নিউক্লিয়াসে পতিত হওয়ার কথা। বোর এই সীমাবদ্ধতা দূর করেন কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করে। তিনি প্রস্তাব করেন যে ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের চারপাশে কিছু নির্দিষ্ট বিচ্ছিন্ন কক্ষপথে (শক্তি স্তর) ঘোরে এবং এই কক্ষপথগুলিতে ঘোরার সময় কোনো শক্তি বিকিরণ করে না। ফলে ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসে পতিত হয় না এবং পরমাণু স্থিতিশীল থাকে।
৪. আইসোটোপ কী এবং দৈনন্দিন জীবনে এর দুটি ব্যবহার বলুন।
বিজ্ঞান স্যার: আইসোটোপ হলো একই মৌলের যেসব পরমাণুর পারমাণবিক সংখ্যা (প্রোটন সংখ্যা) একই, কিন্তু ভর সংখ্যা (নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন হওয়ার কারণে) ভিন্ন। এর মানে তাদের রাসায়নিক ধর্ম একই হলেও ভৌত ধর্ম ভিন্ন হতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে আইসোটোপের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো: ১) কোবাল্ট-60 (Co-60) ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপিতে ব্যবহৃত হয়, এবং ২) কার্বন-14 (C-14) জীবাশ্মের বয়স নির্ণয়ে (কার্বন ডেটিং) ব্যবহৃত হয়। আরও আছে ইউরেনিয়াম-235 পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে, আয়োডিন-131 থাইরয়েড রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায়।
আজ আমরা কী শিখলাম?
বিজ্ঞান স্যার: অর্জুন, আজ আমরা পরমাণুর গঠন সম্পর্কে অনেক গভীরে গিয়ে শিখলাম। তোমার কী মনে হচ্ছে, এই দীর্ঘ আলোচনা থেকে তুমি কী কী মূল বিষয় শিখতে পেরেছ?
অর্জুন: স্যার, আজ আমি যা শিখলাম তা সত্যিই অসাধারণ! আমি বুঝতে পারলাম যে:
- পরমাণু হলো পদার্থের মূল একক, যা একসময় অবিভাজ্য ভাবা হলেও এখন জানি এটি ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে গঠিত।
- ইলেকট্রন ঋণাত্মক, প্রোটন ধনাত্মক এবং নিউট্রন নিস্তড়িৎ। প্রোটন ও নিউট্রন নিউক্লিয়াসে থাকে, আর ইলেকট্রন তার চারপাশে ঘোরে।
- বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা, যেমন ডাল্টন, থমসন, রাদারফোর্ড এবং বোর, কীভাবে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে পরমাণুর গঠনের মডেলগুলো উপস্থাপন করেছেন এবং কীভাবে একে অপরের সীমাবদ্ধতা দূর করেছেন।
- বোরের মডেল অনুযায়ী, ইলেকট্রনগুলি নির্দিষ্ট শক্তি স্তরে (কক্ষপথ) ঘুরে এবং এই কক্ষপথগুলো K, L, M, N... নামে পরিচিত।
- একটি মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা (প্রোটন সংখ্যা) তার পরিচয় নির্ধারণ করে, আর ভর সংখ্যা হলো প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যা।
- যোজ্যতা (Valency) হলো পরমাণুর যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা, যা বাইরের কক্ষের ইলেকট্রনের সংখ্যা দ্বারা নির্ধারিত হয় এবং পরমাণু অষ্টক পূরণের চেষ্টা করে।
- আইসোটোপ হলো একই মৌলের ভিন্ন ভরের পরমাণু (নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন), আর আইসোবার হলো ভিন্ন মৌলের একই ভরের পরমাণু (প্রোটন সংখ্যা ভিন্ন)।
- আইসোটোপের অনেক ব্যবহার আছে, যেমন ক্যান্সার চিকিৎসা, কার্বন ডেটিং, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন।
বিজ্ঞান স্যার: অসাধারণ সারসংক্ষেপ, অর্জুন! তুমি সবকিছু খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে বলতে পেরেছ। মনে রাখবে, এই পরমাণুর গঠন বোঝা আধুনিক রসায়ন এবং পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি। ভবিষ্যতে যখন আরও উচ্চতর শ্রেণিতে উঠবে, তখন পরমাণুর আরও জটিল গঠন এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে জানতে পারবে। আপাতত এই মৌলিক ধারণাগুলো খুব ভালোভাবে আত্মস্থ করো।
অর্জুন: আজ আমার অনেক ভুল ধারণা ভেঙে গেল, স্যার। সত্যিই আজকের ক্লাসটা খুব মজাদার আর শিক্ষণীয় ছিল! আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ!
বিজ্ঞান স্যার: তোমাকে স্বাগতম, অর্জুন! তোমার কৌতূহল এভাবেই বজায় রেখো। এটাই একজন বিজ্ঞানীর আসল গুণ।