মৌ: স্যার, আমি কালকে ভারতের একটা ভৌগোলিক মানচিত্র দেখছিলাম। দেখলাম, আমাদের দেশের ভূপ্রকৃতিতে কত বৈচিত্র্য! কোথাও উঁচু পাহাড়, কোথাও বিস্তৃত সমভূমি, আবার কোথাও মালভূমি। এই সবকিছুর পেছনে কি কোনো কারণ আছে, নাকি এটা শুধুই প্রাকৃতিক ঘটনা?
ভূগোল স্যার: খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছ, মৌ! তোমার কৌতূহল আমাকে মুগ্ধ করে। হ্যাঁ, অবশ্যই এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। ভারতের এই অসাধারণ বৈচিত্র্যই আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় – 'ভারতের প্রাকৃতিক বিভাগ'। তোমাদের নবম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এটা শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলা ভৌগোলিক প্রক্রিয়ার ফলাফল।
মৌ: লক্ষ লক্ষ বছর! তার মানে, আমাদের দেশটা এতদিনে অনেক বদলে গেছে?
ভূগোল স্যার: একদম ঠিক বলেছ! পৃথিবী নামক আমাদের এই গ্রহটি কখনোই স্থির থাকে না। এর পৃষ্ঠের নিচে অনবরত পরিবর্তন ঘটে চলেছে, যা আমরা 'প্লেট টেকটোনিকস' নামে চিনি। এই টেকটোনিক প্লেটগুলোর গতিবিধিই ভারতের বর্তমান ভূপ্রকৃতির অন্যতম প্রধান কারণ। ভারতের বিশাল ভূখণ্ডকে প্রধানত ছয়টি প্রাকৃতিক বিভাগে ভাগ করা যায় –
- হিমালয় পর্বতমালা
- উত্তরের বিশাল সমভূমি
- উপদ্বীপীয় মালভূমি
- ভারতীয় মরুভূমি
- উপকূলীয় সমভূমি
- দ্বীপপুঞ্জ
আজ আমরা এই ছয়টি বিভাগ নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে তুমি বুঝতে পারো কেন আমাদের দেশ এত বৈচিত্র্যময়। চলো, প্রথমে আমরা হিমালয় পর্বতমালা দিয়েই শুরু করি।
হিমালয় পর্বতমালা: ভারতের মুকুট
মৌ: হিমালয়! আমার সবসময় মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বতমালাটা কীভাবে তৈরি হলো? এটা কি আমাদের দেশের জলবায়ুতেও কোনো প্রভাব ফেলে?
ভূগোল স্যার: চমৎকার প্রশ্ন, মৌ! হিমালয় শুধু বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালাই নয়, এটি ভারতের জলবায়ু, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিতে এক বিশাল প্রভাব ফেলে। এর গঠন প্রক্রিয়াটা বেশ চমকপ্রদ। আজ থেকে প্রায় ৭০ মিলিয়ন বছর আগে, ভারতীয় প্লেট উত্তর দিকে ইউরেশিয়ান প্লেটের দিকে ধেয়ে আসছিল। এই দুটি মহাদেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের ফলে সমুদ্রের পাললিক শিলা ভাঁজ হয়ে ওপরে উঠতে শুরু করে, যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আজকের সুবিশাল হিমালয় পর্বতমালার জন্ম দিয়েছে। এটি একটি নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা, যার অর্থ হলো এটি এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে!
মৌ: তাহলে কি ভূমিকম্প বা টেকটোনিক কার্যকলাপের কারণে এটা বেড়ে চলেছে?
ভূগোল স্যার: হ্যাঁ, ঠিক তাই! এই অঞ্চলে এখনও প্লেটগুলোর মধ্যে চাপ সৃষ্টি হয়, যার ফলস্বরূপ মাঝে মাঝে ভূমিকম্প হয় এবং পর্বতমালা ধীরে ধীরে উঁচু হয়। হিমালয়কে আমরা প্রধানত তিনটি সমান্তরাল পর্বতশ্রেণীতে ভাগ করতে পারি – হিমাদ্রি, হিমাচল এবং শিবালিক। এছাড়াও, এর উত্তর-পূর্ব দিকে রয়েছে পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়শ্রেণী।
১. হিমাদ্রি (বৃহৎ হিমালয়):
ভূগোল স্যার: এইটি হলো হিমালয়ের সবচেয়ে উত্তরের এবং সবচেয়ে উঁচু পর্বতশ্রেণী। এর গড় উচ্চতা প্রায় ৬,০০০ মিটার। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, মাউন্ট এভারেস্ট (নেপালে সাগরমাথা নামে পরিচিত), এবং ভারতের কাঞ্চনজঙ্ঘা এখানেই অবস্থিত। হিমাদ্রি সারা বছর বরফে ঢাকা থাকে এবং অসংখ্য হিমবাহের উৎস, যা ভারতের প্রধান নদীগুলির জন্ম দেয়। এর শিলাগুলি মূলত গ্রানাইট দ্বারা গঠিত। এই অঞ্চলের প্রধান কয়েকটি গিরিপথ হলো জজিলা, শিপকিলা, বারালাচলা এবং নাথুলা।
মৌ: বাপরে! এত উঁচু! তাহলে কি হিমাদ্রি থেকে বরফ গলে যে জল আসে, সেটাই আমাদের নদীর প্রধান উৎস?
ভূগোল স্যার: হ্যাঁ, বেশিরভাগ উত্তর ভারতীয় নদীরই প্রধান উৎস হিমাদ্রি এবং হিমাচলের হিমবাহগুলো।
২. হিমাচল (ক্ষুদ্র হিমালয়):
ভূগোল স্যার: হিমাদ্রির দক্ষিণে অবস্থিত এই শ্রেণীটি হিমাদ্রির চেয়ে কম উঁচু, গড় উচ্চতা ৩,৭০০ থেকে ৪,৫০০ মিটার। এর প্রস্থ প্রায় ৫০ কিলোমিটার। এখানে পীর পঞ্জাল, ধৌলাধার এবং মহাভারত-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্বতশ্রেণী রয়েছে। কাশ্মীর উপত্যকা, কাংড়া উপত্যকা এবং কুল্লু উপত্যকার মতো সুন্দর স্থানগুলি এখানেই অবস্থিত, যা পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এখানকার শিলাগুলো রূপান্তরিক ও পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত।
মৌ: ওহ, তাহলে শিমলা, মানালি, দার্জিলিং-এর মতো পর্যটন কেন্দ্রগুলো কি এখানেই?
ভূগোল স্যার: একদম ঠিক ধরেছ, মৌ! এই সব সুন্দর স্থানগুলো হিমাচল হিমালয়ের অংশ।
৩. শিবালিক (বহিঃ হিমালয়):
ভূগোল স্যার: এটি হিমালয়ের সবচেয়ে বাইরের বা দক্ষিণের শ্রেণী, যার গড় উচ্চতা ৯০০ থেকে ১১০০ মিটার এবং প্রস্থ ১০ থেকে ৫০ কিলোমিটার। এটি হিমালয়ের নবীনতম অংশ এবং এখানকার শিলাগুলো নদী দ্বারা বাহিত নুড়ি, পলি এবং কাদা দ্বারা গঠিত। শিবালিক এবং হিমাচল হিমালয়ের মধ্যবর্তী অনুদৈর্ঘ্য উপত্যকাগুলিকে 'দুন' বলা হয়, যেমন – দেরাদুন, কোটলি দুন, পাতলি দুন।
মৌ: 'দুন' মানে কি উপত্যকা?
ভূগোল স্যার: হ্যাঁ, ঠিক তাই। এই উপত্যকাগুলি বেশ উর্বর এবং জনবসতিপূর্ণ।
৪. পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড় (পূর্বাচল):
ভূগোল স্যার: ব্রহ্মপুত্র নদীর মহাপ্রস্থ বাঁকের পর হিমালয় দক্ষিণে বেঁকে যায় এবং ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। এগুলি মূলত প্যাটকাই বুম, নাগা পাহাড়, মণিপুর পাহাড় এবং মিজো পাহাড় নামে পরিচিত। এগুলি ঘন বন দ্বারা আবৃত এবং এখানকার উপজাতিদের জন্য প্রসিদ্ধ।
মৌ: হিমালয়ের গুরুত্বটা তাহলে কী?
ভূগোল স্যার: এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি উত্তর দিক থেকে আসা শীতল সাইবেরীয় বায়ুকে ভারতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়, যা আমাদের দেশে উষ্ণ জলবায়ু বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি অসংখ্য নদীর উৎস, যা উত্তরের সমভূমিকে উর্বর করে তোলে। তাছাড়া, এটি প্রচুর বনজ সম্পদ, খনিজ সম্পদ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস। পর্যটন ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
উত্তরের বিশাল সমভূমি: ভারতের শস্যভাণ্ডার
মৌ: হিমালয় তো বুঝলাম। কিন্তু উত্তরের এই বিস্তৃত সমভূমি কীভাবে তৈরি হলো? এটাও কি এত উর্বর?
ভূগোল স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন। হিমালয়ের দক্ষিণ দিকে যে সুবিশাল উর্বর সমভূমি রয়েছে, তা পৃথিবীর বৃহত্তম সমভূমিগুলির মধ্যে অন্যতম। এটি সিন্ধু, গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র নদ এবং তাদের অসংখ্য উপনদী দ্বারা বাহিত পলি সঞ্চয়ের ফলে গঠিত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে হিমালয়ের পাদদেশ এবং উপদ্বীপীয় মালভূমির উত্তরের নিম্নভূমির মাঝে অবস্থিত একটি বৃহৎ অববাহিকায় পলি জমা হয়ে এই সমভূমি গঠিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ২৪০ থেকে ৩২০ কিলোমিটার।
মৌ: তাহলে এই সমভূমির আলাদা কোনো ভাগ আছে কি?
ভূগোল স্যার: হ্যাঁ, একে মূলত তিনটি প্রধান বিভাগে ভাগ করা যায়: পাঞ্জাব সমভূমি, গঙ্গা সমভূমি এবং ব্রহ্মপুত্র সমভূমি।
১. পাঞ্জাব সমভূমি:
ভূগোল স্যার: এটি সিন্ধু নদ এবং তার পাঁচটি উপনদী – বিতস্তা (ঝেলম), চন্দ্রভাগা (চেনাব), ইরাবতী (রাভি), বিপাশা (বিয়াস) এবং শতদ্রু (সতলুজ) দ্বারা গঠিত। এই অঞ্চলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো 'দোয়াব', অর্থাৎ দুটি নদীর মধ্যবর্তী উর্বর ভূমি। এই সমভূমির একটি বড় অংশ পাকিস্তানে অবস্থিত।
২. গঙ্গা সমভূমি:
ভূগোল স্যার: এটি যমুনা নদী থেকে তিস্তা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি উত্তর ভারত, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশ এবং পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত। এটি ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এবং কৃষিক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
৩. ব্রহ্মপুত্র সমভূমি:
ভূগোল স্যার: এটি মূলত আসাম রাজ্যে অবস্থিত এবং ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা গঠিত। এই অঞ্চলটি ঘন বনভূমি এবং জলাভূমির জন্য পরিচিত।
মৌ: স্যার, সমভূমির মধ্যে কি ভূপ্রকৃতিগত কোনো পার্থক্য দেখা যায়?
ভূগোল স্যার: দারুণ প্রশ্ন করেছ! যদিও এটিকে একটি সমভূমি বলা হয়, তবুও এর মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম ভূপ্রাকৃতিক পার্থক্য রয়েছে। উত্তর ভারতের সমভূমিকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করা যায়, যা হিমালয়ের পাদদেশ থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণে বিস্তৃত হয়:
- ভাবর: শিবালিকের পাদদেশে ৮-১৬ কিলোমিটার চওড়া একটি সংকীর্ণ অঞ্চল। এখানে নদীগুলি নুড়ি-পাথর জমা করে, যার ফলে অনেক নদী ভূগর্ভস্থ হয়ে যায়। কৃষিকাজ হয় না।
- তরাই: ভাবরের দক্ষিণে অবস্থিত একটি জলাভূমি এবং বনভূমিপূর্ণ অঞ্চল। এখানে ভূগর্ভস্থ নদীগুলি আবার ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে। এটি বন্যপ্রাণী এবং ঘন বনের জন্য পরিচিত।
- ভাঙ্গার: এটি পুরাতন পলি দ্বারা গঠিত অপেক্ষাকৃত উঁচু সমভূমি। এখানকার মাটি কম উর্বর এবং এতে 'কঙ্কর' নামক ক্যালসিয়াম কার্বনেটের নুড়ি থাকে।
- খাদার: নদীর নিকটবর্তী নিচু এলাকা, যা নতুন পলি দ্বারা গঠিত। এটি অত্যন্ত উর্বর এবং প্রতি বছর নতুন পলি দ্বারা পুষ্ট হয়, তাই কৃষিকাজের জন্য খুবই আদর্শ।
মৌ: তাহলে খাদারই সবচেয়ে উর্বর, তাই না?
ভূগোল স্যার: একদম ঠিক। আর এই কারণেই উত্তর ভারতের সমভূমি ভারতের শস্যভাণ্ডার হিসাবে পরিচিত।
উপদ্বীপীয় মালভূমি: প্রাচীন ভারতের হৃদয়
মৌ: স্যার, মানচিত্রে দেখেছি, উত্তরের সমভূমির নিচে একটা বড় মালভূমি আছে। সেটা কি অনেক পুরোনো?
ভূগোল স্যার: হ্যাঁ, মৌ। ভারতের উপদ্বীপীয় মালভূমি হলো দেশের প্রাচীনতম ভূখণ্ডগুলির মধ্যে একটি। এটি গন্ডোয়ানা ভূখণ্ডের একটি অংশ ছিল এবং এটি লাভা প্রবাহ ও ক্ষয়কার্যের ফলে গঠিত হয়েছে। এর আকৃতি অনেকটা ত্রিভুজের মতো। এটি প্রাচীন আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত এবং খনিজ সম্পদে খুবই সমৃদ্ধ। এর গড় উচ্চতা ৬০০ থেকে ৯০০ মিটার।
মৌ: খনিজ সম্পদ? তার মানে এখানে কয়লা, লোহা এগুলো পাওয়া যায়?
ভূগোল স্যার: ঠিক ধরেছ! এই মালভূমিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: কেন্দ্রীয় উচ্চভূমি এবং দাক্ষিণাত্য মালভূমি।
১. কেন্দ্রীয় উচ্চভূমি:
ভূগোল স্যার: নর্মদা নদীর উত্তর দিকে অবস্থিত মালভূমি অঞ্চলটি 'কেন্দ্রীয় উচ্চভূমি' নামে পরিচিত। এর পশ্চিম দিকে আরাবল্লী পর্বতমালা অবস্থিত, যা ভারতের প্রাচীনতম ভঙ্গিল পর্বত। এর পূর্বে মালভূমি ছোটনাগপুর মালভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত, যা খনিজ সম্পদে এতটাই সমৃদ্ধ যে একে 'ভারতের খনিজ ভাণ্ডার' বলা হয়। বুন্দেলখণ্ড ও বাঘেলখণ্ড মালভূমিও এর অংশ। এখানকার নদীগুলো দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়, যেমন চম্বল, সিন্ধু, বেতওয়া এবং কেন।
২. দাক্ষিণাত্য মালভূমি:
ভূগোল স্যার: এটি নর্মদা নদীর দক্ষিণে অবস্থিত একটি ত্রিভুজাকার ভূখণ্ড। এর পশ্চিমে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এবং পূর্বে পূর্বঘাট পর্বতমালা অবস্থিত।
- পশ্চিমঘাট পর্বতমালা: এগুলি দাক্ষিণাত্য মালভূমির পশ্চিম সীমানা বরাবর অবস্থিত এবং প্রায় অবিচ্ছিন্ন। এদের উচ্চতা ১,৬০০ মিটার পর্যন্ত হয়। এখানকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলো আনাইমুদি (২,৬৯৫ মিটার) এবং দোদাবেট্টা (২,৬৩৭ মিটার)। পশ্চিমঘাটগুলি মৌসুমি বৃষ্টিপাতের জন্য দায়ী।
- পূর্বঘাট পর্বতমালা: এগুলি পূর্ব উপকূলের সমান্তরালভাবে বিস্তৃত এবং বিচ্ছিন্ন। এদের উচ্চতা পশ্চিমঘাটের চেয়ে কম (গড় ৬০০ মিটার) এবং মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরীর মতো নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এদের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মহেন্দ্রগিরি (১,৫০০ মিটার)।
মৌ: তাহলে দাক্ষিণাত্য মালভূমি এবং পশ্চিম ও পূর্বঘাটের মধ্যে পার্থক্য কী?
ভূগোল স্যার: দাক্ষিণাত্য মালভূমি হলো একটি বৃহৎ মালভূমি, যার কিনারা বরাবর পশ্চিম ও পূর্বঘাট পর্বতমালা অবস্থিত। পশ্চিমঘাটগুলি হিমালয়ের মতো পর্বত নয়, বরং মালভূমির একটি উঁচু খাড়া ঢাল। দাক্ষিণাত্য মালভূমির উত্তর-পশ্চিম অংশে 'দাক্ষিণাত্য ট্র্যাপ' নামে একটি অঞ্চল আছে, যা আগ্নেয় শিলা থেকে সৃষ্ট কালো মাটি (রেগুর) দ্বারা গঠিত। এই মাটি তুলো চাষের জন্য খুব উপযোগী।
মৌ: তাহলে এই মালভূমি অঞ্চলটা খনিজ সম্পদ আর চাষাবাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ?
ভূগোল স্যার: একদম! এই অঞ্চল আমাদের দেশের শিল্প এবং কৃষিতে ব্যাপক অবদান রাখে।
ভারতীয় মরুভূমি: থর মরুভূমি
মৌ: স্যার, আমাদের দেশে কি সত্যি মরুভূমি আছে? মানে রাজস্থানের সেই শুষ্ক জায়গাটা?
ভূগোল স্যার: হ্যাঁ, মৌ! আরাবল্লী পর্বতমালার পশ্চিম দিকে অবস্থিত ভারতীয় মরুভূমি বা থর মরুভূমি হলো আমাদের দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বিভাগ। এটি একটি শুষ্ক, বালুকাময় অঞ্চল, যেখানে বছরে ১৫০ মিলিমিটারেরও কম বৃষ্টিপাত হয়। এখানকার উদ্ভিদ খুব কম, কারণ জলের অভাব। এখানকার প্রধান নদী হলো লুনি, যা একটি অস্থায়ী নদী।
মৌ: অস্থায়ী নদী মানে? এটা কি সারা বছর দেখা যায় না?
ভূগোল স্যার: ঠিক ধরেছ। বৃষ্টির সময় ছাড়া এটি শুকিয়ে যায়। এখানকার ভূপ্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বালিয়াড়ি বা বালিস্তূপ, যাকে স্থানীয়ভাবে 'বার্খান' বলা হয়, যা অর্ধচন্দ্রাকার দেখতে। এই অঞ্চলটি তার অনন্য পরিবেশ এবং উট চালিত সফরের জন্য পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। ইন্দিরা গান্ধী খাল এই মরুভূমির কিছু অংশে জল সরবরাহ করে কৃষিকাজে সাহায্য করেছে।
উপকূলীয় সমভূমি: সমুদ্রের দান
মৌ: আমাদের দেশের তো সমুদ্র উপকূলও আছে। সেগুলোকে কি উপকূলীয় সমভূমি বলে?
ভূগোল স্যার: অবশ্যই! উপদ্বীপীয় মালভূমির দুই পাশেই রয়েছে সংকীর্ণ উপকূলীয় সমভূমি। এগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায় – পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি এবং পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি। এগুলি সমুদ্রের ক্ষয়কার্য এবং নদীর পলি সঞ্চয়ের ফলে গঠিত হয়েছে।
১. পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি:
ভূগোল স্যার: এটি আরব সাগরের উপকূল বরাবর অবস্থিত এবং এটি কচ্ছ থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ এবং তিন ভাগে বিভক্ত:
- কোঙ্কন উপকূল: মুম্বাই থেকে গোয়া পর্যন্ত।
- কানারা উপকূল: গোয়া থেকে ম্যাঙ্গালোর পর্যন্ত।
- মালাবার উপকূল: ম্যাঙ্গালোর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত। কেরালার এই অংশে 'কায়াল' বা লেগুন দেখা যায়, যা মাছ ধরা এবং পর্যটনের জন্য বিখ্যাত।
২. পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি:
ভূগোল স্যার: এটি বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বিস্তৃত এবং অপেক্ষাকৃত চওড়া। এর দুটি প্রধান অংশ হলো:
- উত্তরাঞ্চলীয় সরকার (Northern Circar): মহানদী থেকে কৃষ্ণা নদীর বদ্বীপ পর্যন্ত।
- করমণ্ডল উপকূল (Coromandel Coast): কৃষ্ণা নদীর বদ্বীপ থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত।
এই সমভূমিতে মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা এবং কাবেরীর মতো বড় বড় নদীর বদ্বীপ রয়েছে, যা অত্যন্ত উর্বর এবং ধান চাষের জন্য বিখ্যাত। চিল্কা হ্রদ, পুলিকট হ্রদ এবং কোলেরু হ্রদের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেগুনও এখানে দেখা যায়।
মৌ: তাহলে পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি কৃষি কাজের জন্য বেশি ভালো?
ভূগোল স্যার: হ্যাঁ, বদ্বীপগুলি উর্বর পলিমাটির জন্য কৃষির জন্য খুব উপযোগী। এই উপকূলগুলি বন্দর, মাছ ধরা এবং লবণ উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বীপপুঞ্জ: ভারতের সামুদ্রিক রত্ন
মৌ: সবশেষে আমাদের দ্বীপগুলো আছে। আন্দামান-নিকোবর আর লাক্ষাদ্বীপের কথা শুনেছি। সেগুলো কীভাবে তৈরি হলো?
ভূগোল স্যার: ভারতের মূল ভূখণ্ডের বাইরেও আমাদের দুটি প্রধান দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে – আরব সাগরের লাক্ষাদ্বীপ এবং বঙ্গোপসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।
১. লাক্ষাদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জ:
ভূগোল স্যার: এটি কেরালার মালাবার উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত। এগুলি প্রবাল দ্বারা গঠিত এবং আগে লাক্কাদ্বীপ, মিনিকয় এবং আমিনদিভি নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭৩ সালে এর নামকরণ করা হয় লাক্ষাদ্বীপ। এর রাজধানী কাভারাত্তি। এই দ্বীপপুঞ্জটি আকারে ছোট এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এটি একটি প্রবালদ্বীপের উদাহরণ।
২. আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ:
ভূগোল স্যার: এগুলি বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এবং সংখ্যায় অনেক বেশি। এগুলিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়: উত্তরে আন্দামান এবং দক্ষিণে নিকোবর। মনে করা হয়, এগুলি সমুদ্রের নিচে ডুবে থাকা পর্বতশ্রেণীর শীর্ষভাগ। এদের গঠনগত দিক থেকে আগ্নেয়গিরির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ভারতের একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, ব্যারেন দ্বীপ, এখানেই অবস্থিত। এই দ্বীপপুঞ্জটি ঘন বন দ্বারা আবৃত এবং অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। ভারতের দক্ষিণতম বিন্দু, ইন্দিরা পয়েন্ট, গ্রেট নিকোবরে অবস্থিত।
মৌ: এই দ্বীপগুলোর গুরুত্ব কি?
ভূগোল স্যার: এগুলি প্রতিরক্ষা এবং পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদের কৌশলগত অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়।
কুইজ টাইম: মৌ-এর জিজ্ঞাসা
মৌ: স্যার, এতক্ষণ যা জানলাম, তা থেকে কয়েকটা ছোট প্রশ্ন করি?
ভূগোল স্যার: অবশ্যই, মৌ। তোমার এই কৌতূহলই তো শেখার সেরা উপায়। জিজ্ঞাসা করো!
মৌ: প্রশ্ন ১: হিমালয় পর্বতমালাকে কেন নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা বলা হয়?
ভূগোল স্যার: হিমালয় পর্বতমালাকে নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা বলা হয় কারণ এটি সাম্প্রতিক ভূতাত্ত্বিক কালে, বিশেষ করে পলিওসিনের পর, ভারতীয় এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষের ফলে ভাঁজ খেয়ে ওপরে উঠে এসেছে। এটি এখনও ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থির এবং এর উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মৌ: প্রশ্ন ২: 'দোয়াব' বলতে ঠিক কী বোঝায় এবং এটি ভারতের কোন প্রাকৃতিক বিভাগে দেখা যায়?
ভূগোল স্যার: 'দোয়াব' শব্দটি দুটি নদীর মধ্যবর্তী উর্বর ভূমিকে বোঝায়। 'দো' মানে দুই এবং 'আব' মানে জল। এটি প্রধানত উত্তর ভারতের বিশাল সমভূমি, বিশেষ করে পাঞ্জাব সমভূমিতে দেখা যায়, যেখানে সিন্ধু নদের উপনদীগুলির মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলি দোয়াব নামে পরিচিত।
মৌ: প্রশ্ন ৩: ভারতের কোন প্রাকৃতিক বিভাগকে 'ভারতের খনিজ ভাণ্ডার' বলা হয় এবং কেন?
ভূগোল স্যার: ভারতের উপদ্বীপীয় মালভূমির অংশ, বিশেষ করে ছোটনাগপুর মালভূমিকে 'ভারতের খনিজ ভাণ্ডার' বলা হয়। কারণ এই অঞ্চলটি কয়লা, লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, বক্সাইট ইত্যাদি মূল্যবান খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এর ভূগর্ভস্থ গঠন বহু প্রাচীন আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত, যা খনিজ সঞ্চয়ের জন্য আদর্শ।
মৌ: প্রশ্ন ৪: পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এবং পূর্বঘাট পর্বতমালার মধ্যে দুটি প্রধান পার্থক্য বলুন।
ভূগোল স্যার: প্রধান দুটি পার্থক্য হলো: প্রথমত, পশ্চিমঘাট পর্বতমালা প্রায় অবিচ্ছিন্ন এবং উঁচু, যেখানে পূর্বঘাট পর্বতমালা বিচ্ছিন্ন ও নিচু। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমঘাটের ঢাল খাড়া এবং এটি মৌসুমি বায়ুকে আটকে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, যেখানে পূর্বঘাট নদী দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় কম উচ্চতার এবং বৃষ্টিপাতে এর ভূমিকা কম।
মৌ: ধন্যবাদ স্যার, আমার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি!
আজ আমরা কী শিখলাম?
ভূগোল স্যার: মৌ, আজ আমরা ভারতের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের এক অসাধারণ যাত্রা করলাম। চলো সংক্ষেপে দেখে নিই, আজ আমরা কী কী শিখলাম:
- হিমালয় পর্বতমালা: ভারতের উত্তরে অবস্থিত নবীন ভঙ্গিল পর্বত, যা হিমাদ্রি, হিমাচল, শিবালিক এবং পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ে বিভক্ত। এটি জলবায়ু নিয়ন্ত্রক এবং বহু নদীর উৎস।
- উত্তরের বিশাল সমভূমি: সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বাহিত পলি দ্বারা গঠিত পৃথিবীর অন্যতম উর্বর ও জনবহুল সমভূমি, যা ভাবর, তরাই, ভাঙ্গার ও খাদার অঞ্চলে বিভক্ত।
- উপদ্বীপীয় মালভূমি: ভারতের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে স্থিতিশীল ভূখণ্ড, যা কেন্দ্রীয় উচ্চভূমি ও দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে বিভক্ত। এটি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ।
- ভারতীয় মরুভূমি (থর): আরাবল্লীর পশ্চিমে অবস্থিত শুষ্ক ও বালুকাময় অঞ্চল, যেখানে লুনি নদী ও বালিয়াড়ি প্রধান বৈশিষ্ট্য।
- উপকূলীয় সমভূমি: উপদ্বীপীয় মালভূমির উভয় পাশে অবস্থিত পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি, যা বন্দর, মৎস্যচাষ ও কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
- দ্বীপপুঞ্জ: আরব সাগরের লাক্ষাদ্বীপ (প্রবাল দ্বীপ) এবং বঙ্গোপসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ (আগ্নেয়গিরি সম্পর্কিত), উভয়ই জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মৌ: হ্যাঁ স্যার, আজ ভারতের এই বিশাল বৈচিত্র্য সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে জানতে পেরে আমি সত্যিই মুগ্ধ! এখন আমি বুঝতে পারছি, কেন আমাদের দেশটা এত অনন্য। ভূগোল শুধু বইয়ের পাতা নয়, এটা আমাদের চারপাশের পৃথিবীটাকে বোঝার একটা দারুণ উপায়। আমি আরও অনেক কিছু জানতে চাই!
ভূগোল স্যার: এটাই তো আমি চাই, মৌ! তোমার এই আগ্রহই তোমাকে একজন প্রকৃত ভূগোলের শিক্ষার্থী করে তুলবে। পরের ক্লাসে আবার কথা হবে!