পদার্থের রহস্য: একটি আলোচনা

আকাশ: নমস্কার, স্যার! আমি আজ স্কুলে আসার পথে দেখছিলাম, পাশের বাড়ির রান্নাঘর থেকে গরম বিরিয়ানির গন্ধ ভেসে আসছে। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, আমি বেশ কিছুটা দূরে ছিলাম, তবুও গন্ধটা পাচ্ছিলাম। এটা কীভাবে সম্ভব, স্যার?

বিজ্ঞান স্যার: খুব সুন্দর একটা প্রশ্ন করেছো, আকাশ! তোমার এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের এক চমৎকার অধ্যায়ের উত্তর। এটাই হলো আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়, নবম শ্রেণির প্রথম অধ্যায় – ‘আমাদের চারপাশের পদার্থ’ (Matter in Our Surroundings)। তোমার প্রশ্নের উত্তরটা হলো, গরম খাবারের গন্ধ বাতাসের মধ্যে দিয়ে ভেসে তোমার নাক পর্যন্ত পৌঁছেছে।

আকাশ: কিন্তু স্যার, বাতাস তো খালি মনে হয়। এর মধ্যে দিয়ে গন্ধ কীভাবে আসে?

বিজ্ঞান স্যার: এখানেই আসল মজা! বাতাস খালি নয়। আমাদের চারপাশে যা কিছু আমরা দেখি বা অনুভব করি, যেমন – এই চেয়ার, টেবিল, জল, বাতাস, এমনকি ওই গরম বিরিয়ানি – সবই ‘পদার্থ’ দিয়ে তৈরি। আর পদার্থ তৈরি হয় অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দিয়ে। এই কণাগুলো এতই ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না।

পদার্থ কী এবং এর কণাগুলোর প্রকৃতি

আকাশ: পদার্থ? তার মানে যার ভর আছে এবং যা কিছুটা জায়গা নেয়, তাই তো?

বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক! সংজ্ঞানুসারে, যে বস্তুর নির্দিষ্ট ভর আছে এবং যা স্থান দখল করে, তাকেই আমরা পদার্থ বলি। প্রাচীন দার্শনিকেরা বলতেন, সবকিছুই পঞ্চভূত বা পাঁচটি মূল উপাদান (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) দিয়ে তৈরি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলেন, সমস্ত পদার্থই ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত।

আকাশ: কণা দিয়ে তৈরি? কিন্তু একটা কাঠের টুকরো তো একটানা বা অখণ্ড বলে মনে হয়, বালির মতো কণা কণা তো লাগে না!

বিজ্ঞান স্যার: চমৎকার প্রশ্ন! এটাই বিজ্ঞানীদের মধ্যেও একটা বড় প্রশ্ন ছিল। এটা বোঝার জন্য একটা সহজ পরীক্ষা করা যাক। ধরো, এক গ্লাস জলে তুমি এক চামচ চিনি মেশালে। কিছুক্ষণ নাড়ানোর পর চিনিটা কোথায় যায়?

আকাশ: চিনিটা তো গুলে যায়, স্যার। আর দেখা যায় না।

বিজ্ঞান স্যার: ঠিক তাই। চিনিটা অদৃশ্য হয়ে যায় কারণ জলের কণাগুলোর মধ্যে কিছুটা ফাঁকা জায়গা থাকে। চিনির কণাগুলো সেই ফাঁকা জায়গায় ঢুকে পড়ে, তাই জলের স্তরও বিশেষ বাড়ে না। এটা প্রমাণ করে যে পদার্থ অখণ্ড নয়, বরং কণা দিয়ে তৈরি এবং সেই কণাগুলোর মধ্যে ফাঁক থাকে।

পদার্থের কণাগুলো কতটা ছোট?

আকাশ: বাহ্! দারুণ তো! কিন্তু এই কণাগুলো ঠিক কতটা ছোট হতে পারে?

বিজ্ঞান স্যার: আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি ছোট। আরেকটা উদাহরণ দিই। ধরো, আমরা এক বালতি জলে মাত্র কয়েকটা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (KMnO₄)-এর দানা মেশালাম। দেখবে পুরো জলটাই বেগুনি হয়ে গেছে। এখন ওই রঙিন জল থেকে এক মগ জল নিয়ে আরেকটা পরিষ্কার জলের বালতিতে মেশাও। কী দেখবে?

আকাশ: দ্বিতীয় বালতির জলটাও হালকা বেগুনি হয়ে যাবে।

বিজ্ঞান স্যার: একদম। এইভাবে যদি আমরা ৮-১০ বারও করতে থাকি, তাহলেও শেষ বালতির জলেও হালকা বেগুনি আভা থাকবে। এর মানে হলো, ওই সামান্য কয়েকটা দানার মধ্যে লক্ষ লক্ষ কোটি কণা ছিল, যা বারবার ভাগ হতে হতে বিশাল পরিমাণ জলকে রঙিন করতে পেরেছে। ভাবো, কণাগুলো তাহলে কতটা ক্ষুদ্র!

পদার্থের কণার বৈশিষ্ট্য

আকাশ: তার মানে, আমরা পদার্থের কণা সম্পর্কে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারলাম, তাই না স্যার? প্রথমত, পদার্থ কণা দিয়ে তৈরি। দ্বিতীয়ত, এই কণাগুলো খুব ছোট। আর তৃতীয়ত, কণাগুলোর মধ্যে ফাঁকা স্থান থাকে।

বিজ্ঞান স্যার: অসাধারণ, আকাশ! তুমি একদম ঠিক ধরেছ। এর সাথে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে।

১. পদার্থের কণাগুলো অনবরত গতিশীল থাকে: কণাগুলোর নিজস্ব গতিশক্তি (Kinetic Energy) আছে। এই কারণেই কিন্তু তুমি গরম বিরিয়ানির গন্ধ পেয়েছিলে। গরম খাবারের কণাগুলোর গতিশক্তি বেশি হওয়ায়, তারা দ্রুত বাতাসের কণাগুলোর সাথে মিশে গিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঠান্ডা খাবারের গন্ধ কিন্তু অত সহজে পাওয়া যায় না, কারণ তার কণাগুলোর গতিশক্তি কম থাকে। একেই বলে ব্যাপন বা Diffusion।

২. পদার্থের কণাগুলো একে অপরকে আকর্ষণ করে: কণাগুলোর মধ্যে এক ধরনের আকর্ষণ বল কাজ করে, যাকে আন্তঃআণবিক আকর্ষণ বল (Intermolecular Force of Attraction) বলে। এই বলের কারণেই পদার্থগুলো একসাথে জুড়ে থাকে। তবে এই আকর্ষণ বল সব পদার্থে সমান নয়। একটা লোহার পেরেক আর এক টুকরো চকের কথা ভাবো। কোনটাকে ভাঙা সহজ?

আকাশ: চক ভাঙা অনেক সহজ, স্যার।

বিজ্ঞান স্যার: কারণ চকের কণাগুলোর মধ্যে আকর্ষণ বল লোহার কণাগুলোর চেয়ে অনেক দুর্বল। এই আকর্ষণ বলের তারতম্যের কারণেই আমরা পদার্থের বিভিন্ন অবস্থা দেখতে পাই।

পদার্থের বিভিন্ন অবস্থা: কঠিন, তরল ও গ্যাসীয়

আকাশ: ও আচ্ছা! এইজন্যই কিছু জিনিস কঠিন, কিছু তরল আর কিছু গ্যাসীয় হয়?

বিজ্ঞান স্যার: একদম! পদার্থের প্রধানত তিনটি ভৌত অবস্থা আছে – কঠিন (Solid), তরল (Liquid) এবং গ্যাসীয় (Gas)। চলো, এদের বৈশিষ্ট্যগুলো কণার ধর্মের নিরিখে বোঝার চেষ্টা করি।

১. কঠিন অবস্থা (Solid State)

বিজ্ঞান স্যার: কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন থাকে। কারণ, এর কণাগুলো খুব কাছাকাছি থাকে, তাদের মধ্যে ফাঁকা স্থান খুব কম এবং আকর্ষণ বল অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই কণাগুলো নিজেদের জায়গায় শুধু কাঁপতে পারে, কিন্তু স্থান পরিবর্তন করতে পারে না। যেমন – পাথর, বই, চেয়ার।

আকাশ: কিন্তু স্যার, একটা রাবার ব্যান্ডকে তো আমরা টেনে লম্বা করতে পারি, ওর আকার তো बदल যায়। আবার ধরুন, লবণ বা চিনিকে যে পাত্রে রাখি, সেই পাত্রের আকার নেয়। তাহলে ওরা কি কঠিন নয়?

বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন। রাবার ব্যান্ডের ওপর বল প্রয়োগ করলে আকার বদলায়, কিন্তু বল সরিয়ে নিলে আবার আগের আকারে ফিরে আসে। আর লবণ বা চিনির প্রত্যেকটা দানা কিন্তু কঠিন এবং তাদের নিজস্ব আকার আছে। আমরা যখন পাত্রে রাখি, তখন দানাগুলো একসাথে পাত্রের আকার নেয়, কিন্তু প্রতিটি কণার আকার একই থাকে। আর স্পঞ্জের কথা ভাবলে, স্পঞ্জের মধ্যে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে যাতে বাতাস ভরা থাকে। আমরা চাপ দিলে ওই বাতাস বেরিয়ে যায়, তাই ওটা সংকুচিত হয়। স্পঞ্জটা কিন্তু কঠিনই।

২. তরল অবস্থা (Liquid State)

বিজ্ঞান স্যার: তরল পদার্থের নির্দিষ্ট আয়তন থাকলেও নির্দিষ্ট আকার থাকে না। যে পাত্রে রাখা হয়, সেই পাত্রের আকার ধারণ করে। কারণ, এর কণাগুলোর মধ্যে দূরত্ব কঠিনের চেয়ে বেশি এবং আকর্ষণ বল কিছুটা দুর্বল। তাই কণাগুলো একে অপরের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যেতে পারে, অর্থাৎ প্রবাহিত হতে পারে। যেমন – জল, দুধ, তেল।

আকাশ: তার মানে, জলের কণাগুলো কঠিনের কণার চেয়ে বেশি স্বাধীন?

বিজ্ঞান স্যার: হ্যাঁ, ঠিক তাই। ওরা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে চলাচল করতে পারে, কিন্তু সেই সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারে না, কারণ তখনও ওদের মধ্যে যথেষ্ট আকর্ষণ বল কাজ করে।

৩. গ্যাসীয় অবস্থা (Gas State)

বিজ্ঞান স্যার: গ্যাসীয় পদার্থের নির্দিষ্ট আকার বা আয়তন, কোনোটিই নেই। একে যে পাত্রে রাখা হয়, সেই পাত্রের পুরো জায়গা দখল করে নেয়। কারণ, গ্যাসীয় পদার্থের কণাগুলোর মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি এবং আকর্ষণ বল প্রায় নেই বললেই চলে। তাই কণাগুলো অত্যন্ত দ্রুত এবং এলোমেলোভাবে চারিদিকে ছুটে বেড়ায়। যেমন – বাতাস, অক্সিজেন, রান্নার গ্যাস (LPG)।

আকাশ: এই কারণেই কি গ্যাসের কণাগুলো পাত্রের দেওয়ালে চাপ সৃষ্টি করে?

বিজ্ঞান স্যার: একদম। কণাগুলো দ্রুত ছোটাছুটি করার সময় পাত্রের ভেতরের দেওয়ালে ক্রমাগত ধাক্কা খায়, আর এই ধাক্কার ফলেই চাপের সৃষ্টি হয়।

পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন

আকাশ: স্যার, আমরা তো জানি যে জলকে ঠান্ডা করলে বরফ (কঠিন) হয়, আর গরম করলে বাষ্প (গ্যাস) হয়। তার মানে, পদার্থ তার অবস্থা পরিবর্তন করতে পারে?

বিজ্ঞান স্যার: অবশ্যই পারে। তাপমাত্রা বা চাপের পরিবর্তন ঘটিয়ে পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন করা যায়।

তাপমাত্রার প্রভাব: গলন ও স্ফুটন

বিজ্ঞান স্যার: যখন আমরা কোনো কঠিন পদার্থকে তাপ দিই, তখন তার কণাগুলোর গতিশক্তি বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে এমন এক অবস্থায় পৌঁছায় যখন কণাগুলোর গতিশক্তি তাদের আকর্ষণ বলকে অতিক্রম করে ফেলে। তখন কণাগুলো নিজেদের নির্দিষ্ট অবস্থান ছেড়ে চলাচল শুরু করে এবং কঠিন পদার্থটি গলে তরলে পরিণত হয়।

আকাশ: এই নির্দিষ্ট তাপমাত্রাকেই কি গলনাঙ্ক (Melting Point) বলে?

বিজ্ঞান স্যার: ঠিক বলেছ। যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কোনো কঠিন পদার্থ গলে তরলে পরিণত হয়, তাকে ওই পদার্থের গলনাঙ্ক বলে। বরফের গলনাঙ্ক হলো ০° সেলসিয়াস বা ২৭৩.১৫ কেলভিন। একটা মজার বিষয় হলো, যখন বরফ গলতে থাকে, তখন তুমি যতই তাপ দাও না কেন, পুরো বরফ গলে জল না হওয়া পর্যন্ত তাপমাত্রা ০° সেলসিয়াসের বেশি হবে না।

আকাশ: কিন্তু তাপ তো দেওয়া হচ্ছে, তাহলে সেই তাপটা যায় কোথায়?

বিজ্ঞান স্যার: চমৎকার প্রশ্ন! এই তাপটা পদার্থের কণাগুলোর মধ্যেকার আকর্ষণ বলকে ভাঙতে বা দুর্বল করতে খরচ হয়ে যায়। এই তাপকে বলা হয় ‘লীন তাপ’ (Latent Heat)। যেহেতু এটা কঠিনকে তরলে পরিণত করতে ব্যবহৃত হয়, তাই এর নাম ‘গলনের লীন তাপ’ (Latent Heat of Fusion)। একইভাবে, যখন তরলকে তাপ দেওয়া হয়, তখন তার কণাগুলোর গতিশক্তি বাড়ে এবং একসময় তারা তরলের উপরিভাগ থেকে মুক্ত হয়ে গ্যাসীয় অবস্থায় চলে যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলে স্ফুটন (Boiling)। যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এটা ঘটে, তাকে বলে স্ফুটনাঙ্ক (Boiling Point)। জলের স্ফুটনাঙ্ক হলো ১০০° সেলসিয়াস। এখানেও, পুরো জল বাষ্পে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত তাপমাত্রা ১০০° সেলসিয়াসের বেশি হয় না। এখানে যে লীন তাপ ব্যবহৃত হয়, তাকে বলে ‘বাষ্পীভবনের লীন তাপ’ (Latent Heat of Vaporization)।

ঊর্ধ্বপাতন (Sublimation)

আকাশ: স্যার, সব পদার্থই কি কঠিন থেকে তরল, তারপর গ্যাস হয়?

বিজ্ঞান স্যার: না, কিছু পদার্থ আছে যারা তাপ পেলে তরল না হয়ে সরাসরি কঠিন থেকে গ্যাসীয় অবস্থায় রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলে ঊর্ধ্বপাতন। যেমন – কর্পূর, ন্যাপথলিন, অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড। দেখবে, জামাকাপড়ে রাখা ন্যাপথলিন বলগুলো কিছুদিন পর ছোট হতে হতে উধাও হয়ে যায়, কিন্তু কোনো ভেজা দাগ থাকে না।

বাষ্পীভবন (Evaporation)

আকাশ: স্যার, স্ফুটন আর বাষ্পীভবনের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে?

বিজ্ঞান স্যার: খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাষ্পীভবন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে কোনো তরল তার স্ফুটনাঙ্কের চেয়ে কম যেকোনো তাপমাত্রায় বাষ্পে পরিণত হয়। এটা শুধুমাত্র তরলের উপরিভাগে ঘটে। অন্যদিকে, স্ফুটন একটি সামগ্রিক ঘটনা (Bulk Phenomenon), যা নির্দিষ্ট স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছানোর পর তরলের সমস্ত অংশ থেকে বাষ্প তৈরি করে। ভেজা কাপড় শুকিয়ে যাওয়া, পুকুরের জল কমে যাওয়া – এ সবই বাষ্পীভবনের উদাহরণ।

আকাশ: বাষ্পীভবন কী কী বিষয়ের ওপর নির্ভর করে?

বিজ্ঞান স্যার: মূলত চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:

  • পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল (Surface Area): ক্ষেত্রফল বাড়লে বাষ্পীভবনের হার বাড়ে। তাই আমরা কাপড় মেলে শুকাই।
  • তাপমাত্রা (Temperature): তাপমাত্রা বাড়লে কণাগুলোর গতিশক্তি বাড়ে, তাই বাষ্পীভবন দ্রুত হয়।
  • আর্দ্রতা (Humidity): বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণকে আর্দ্রতা বলে। আর্দ্রতা বেশি থাকলে বাষ্পীভবনের হার কমে যায়।
  • বায়ুপ্রবাহ (Wind Speed): বাতাস বইলে জলীয় বাষ্প দ্রুত সরে যায়, ফলে বাষ্পীভবনের হার বেড়ে যায়।

আকাশ: স্যার, একটা জিনিস খেয়াল করেছি, হাতে স্পিরিট বা অ্যাসিটোন ঢাললে ঠান্ডা লাগে। কেন?

বিজ্ঞান স্যার: কারণ বাষ্পীভবনের ফলে শীতলতার সৃষ্টি হয় (Evaporation causes cooling)। স্পিরিট যখন তোমার হাত থেকে বাষ্পীভূত হয়, তখন বাষ্পে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় লীন তাপ তোমার হাতের তালু থেকে সংগ্রহ করে। ফলে তোমার তালু তাপ হারায় এবং ঠান্ডা অনুভব হয়। এই একই কারণে গরমকালে মাটির কলসির জল ঠান্ডা থাকে এবং ঘাম হলে আমাদের শরীর ঠান্ডা হয়।

বিশেষ প্রশ্নোত্তর পর্ব

আকাশ: স্যার, আমি কি আপনাকে অধ্যায়ের কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে পারি?

বিজ্ঞান স্যার: অবশ্যই, আকাশ। তোমার মনে যা প্রশ্ন আছে, করতে পারো।

প্রশ্ন ১: গরম ও শুষ্ক দিনে ডেজার্ট কুলার বেশি ঠান্ডা করে কেন?

বিজ্ঞান স্যার: ডেজার্ট কুলার বাষ্পীভবন নীতির ওপর কাজ করে। গরম ও শুষ্ক দিনে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকে এবং তাপমাত্রা বেশি থাকে। এই দুটি শর্তই দ্রুত বাষ্পীভবনের জন্য আদর্শ। কুলারের ভেতরের প্যাড দিয়ে যখন জল গড়ায়, তখন গরম ও শুষ্ক বাতাস সেই জলের দ্রুত বাষ্পীভবন ঘটায়। এই বাষ্পীভবনের জন্য প্রয়োজনীয় লীন তাপ বাতাস থেকে শোষিত হয়, ফলে বাতাস ঠান্ডা হয়ে যায় এবং আমরা ঠান্ডা হাওয়া পাই। বর্ষাকালে আর্দ্রতা বেশি থাকায় বাষ্পীভবনের হার কমে যায়, তাই কুলার ততটা কার্যকর হয় না।

প্রশ্ন ২: কাপের চেয়ে পিরিচে ঢেলে গরম চা বা দুধ তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয় কেন?

বিজ্ঞান স্যার: এর কারণ হলো পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল। পিরিচের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল কাপের চেয়ে অনেক বেশি। আমরা জানি, ক্ষেত্রফল বাড়লে বাষ্পীভবনের হার বাড়ে। তাই পিরিচে চা ঢাললে তা দ্রুত বাষ্পীভূত হয় এবং বাষ্পীভবনের ফলে শীতলতা সৃষ্টির নীতি অনুযায়ী চা তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়ে যায়।

প্রশ্ন ৩: ২৫°C, ০°C এবং ১০০°C তাপমাত্রায় জলের ভৌত অবস্থা কী হবে?

বিজ্ঞান স্যার: এটা জলের গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্কের ওপর নির্ভর করে।

  • ২৫°C: এই তাপমাত্রা জলের গলনাঙ্ক (০°C) থেকে বেশি কিন্তু স্ফুটনাঙ্ক (১০০°C) থেকে কম। তাই ২৫°C তাপমাত্রায় জল তরল অবস্থায় থাকবে।
  • ০°C: এটি জলের গলনাঙ্ক। এই তাপমাত্রায় জল কঠিন (বরফ) এবং তরল (জল) – উভয় অবস্থাতেই থাকতে পারে। বরফ গলতে শুরু করে এবং জল জমতে শুরু করে এই তাপমাত্রাতেই।
  • ১০০°C: এটি জলের স্ফুটনাঙ্ক। এই তাপমাত্রায় জল তরল থেকে গ্যাসীয় (বাষ্প) অবস্থায় রূপান্তরিত হতে শুরু করে। তাই এখানে জল তরল এবং গ্যাসীয় উভয় অবস্থাতেই পাওয়া যেতে পারে।

আজ আমরা কী শিখলাম?

বিজ্ঞান স্যার: তাহলে আকাশ, আজকের আলোচনা থেকে আমরা ‘আমাদের চারপাশের পদার্থ’ সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। চলো, একবার সংক্ষেপে দেখে নিই মূল বিষয়গুলো।

  • আমাদের চারপাশের সবকিছুই পদার্থ দিয়ে তৈরি, যা ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত।
  • পদার্থের কণাগুলোর মধ্যে ফাঁকা স্থান থাকে, এরা অনবরত গতিশীল এবং একে অপরকে আকর্ষণ করে।
  • কণাগুলোর মধ্যেকার আকর্ষণ বল ও দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে পদার্থের তিনটি অবস্থা হয় – কঠিন, তরল ও গ্যাসীয়।
  • কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন আছে। তরলের নির্দিষ্ট আয়তন থাকলেও আকার নেই। আর গ্যাসের নির্দিষ্ট আকার বা আয়তন কোনোটিই নেই।
  • তাপমাত্রা বা চাপের পরিবর্তন করে পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন করা যায়। যেমন – গলন, স্ফুটন, ঘনীভবন, জমাট বাঁধা এবং ঊর্ধ্বপাতন।
  • অবস্থার পরিবর্তনের সময় কণাগুলোর আকর্ষণ বল ভাঙার জন্য যে তাপ প্রয়োজন হয়, তাকে লীন তাপ বলে।
  • বাষ্পীভবন একটি পৃষ্ঠতলীয় ঘটনা যা স্ফুটনাঙ্কের চেয়ে কম तापমাত্রায় ঘটে এবং এর ফলে শীতলতার সৃষ্টি হয়।

আকাশ: ধন্যবাদ, স্যার! আজ আমি বুঝতে পারলাম, একটা সাধারণ গন্ধের পেছনেও কত গভীর বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে। পদার্থের এই কণার জগতটা সত্যিই খুব আকর্ষণীয়। এখন থেকে আমি আমার চারপাশের সব কিছুকে অন্য চোখে দেখব।

বিজ্ঞান স্যার: এটাই তো বিজ্ঞানের আসল আনন্দ, আকাশ! প্রশ্ন করা এবং তার উত্তর খোঁজার মধ্যেই লুকিয়ে আছে শেখার প্রকৃত মজা।