ঈশিতা: স্যার, আমি সেদিন পার্কে বসে দেখছিলাম একটা আপেল গাছ থেকে পড়লো। আর দেখলাম একটা পাতা বাতাসে উড়ে অনেকক্ষণ পর মাটিতে নামলো। কেন এমন হয়? সবকিছুই তো শেষ পর্যন্ত নিচের দিকেই পড়ে?
বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন করেছো, ঈশিতা! তোমার এই সাধারণ প্রশ্নটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের মহাবিশ্বের এক অসাধারণ রহস্যের উত্তর, যা তোমাদের নবম শ্রেণির বিজ্ঞানের মহাকর্ষ (Gravitation) অধ্যায়ের মূল বিষয়। সবকিছুই নিচের দিকে পড়ে, কারণ পৃথিবী তাদের ওপর একটি অদৃশ্য শক্তি প্রয়োগ করে টানে। এই শক্তিকেই আমরা বলি মহাকর্ষ (Gravitation) বা পৃথিবীর ক্ষেত্রে অভিকর্ষ (Gravity)।
ঈশিতা: মহাকর্ষ? এটা কি শুধু পৃথিবীর টানের ব্যাপার?
বিজ্ঞান স্যার: না, শুধু পৃথিবীর টান নয়। মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলকেই বলা হয় মহাকর্ষ। নিউটনের সেই বিখ্যাত গল্পটা তো শুনেছো? তিনি একদিন আপেল গাছের নিচে বসেছিলেন, এমন সময় একটা আপেল তাঁর মাথার ওপর পড়লো। তখন তিনি ভাবতে শুরু করলেন, আপেলটা কেন উপরে না গিয়ে নিচে পড়লো? চাঁদ বা অন্যান্য গ্রহগুলো কেন পৃথিবীর ওপর পড়ে না? এই চিন্তা থেকেই তিনি মহাকর্ষের সূত্র আবিষ্কার করেন।
ঈশিতা: বাহ! তাহলে নিউটন স্যার এটা আবিষ্কার করেছিলেন? কিন্তু কীভাবে এই আকর্ষণ কাজ করে? সব বস্তুই কি সব বস্তুকে টানে?
বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক ধরেছো! নিউটন তাঁর মহাকর্ষের সর্বজনীন সূত্র (Universal Law of Gravitation)-এ বলেছেন যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু কণা একে অপরকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বল বস্তু কণা দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
- অর্থাৎ, বস্তুর ভর যত বেশি হবে, আকর্ষণ বলও তত বেশি হবে।
- আর বস্তুদের মধ্যে দূরত্ব যত বাড়বে, আকর্ষণ বল তত কমবে, তবে দূরত্বের বর্গের হারে কমবে। এর মানে হলো, দূরত্ব দ্বিগুণ হলে আকর্ষণ বল চারগুণ কমে যাবে।
এই সূত্রটিকে আমরা গাণিতিকভাবে প্রকাশ করি F = G(m1m2/r²) দিয়ে। এখানে:
- F হলো মহাকর্ষ বল।
- m1 এবং m2 হলো বস্তু কণা দুটির ভর।
- r হলো তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব।
- আর G হলো মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (Universal Gravitational Constant)। এর মান মহাবিশ্বের সব জায়গায় একই থাকে।
ঈশিতা: ওহ, এখন বুঝতে পারছি কেন পৃথিবীর টান এত শক্তিশালী। কারণ পৃথিবীর ভর অনেক বেশি! কিন্তু স্যার, এই 'G' এর মানটা কী? এটা কি আমাদের মনে রাখতে হবে?
বিজ্ঞান স্যার: হ্যাঁ, 'G' এর মান একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা, প্রায় 6.674 × 10⁻¹¹ Nm²/kg²। তোমাদের সরাসরি এই মান মুখস্থ রাখার চেয়ে এর গুরুত্বটা বোঝা বেশি জরুরি। এই 'G' এর কারণেই মহাবিশ্বের গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র—সবকিছুই নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে এবং একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে। এই মহাকর্ষই সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহদের ঘোরার ব্যবস্থা করে, চাঁদকে পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার ব্যবস্থা করে এবং সমুদ্রে জোয়ার-ভাটার কারণও কিন্তু এই মহাকর্ষ!
ঈশিতা: তাহলে স্যার, এই যে আমরা বলি 'অভিকর্ষ', এটা কি মহাকর্ষেরই একটি বিশেষ রূপ?
বিজ্ঞান স্যার: চমৎকার প্রশ্ন, ঈশিতা! হ্যাঁ, অভিকর্ষ (Gravity) হলো মহাকর্ষের একটি বিশেষ উদাহরণ, যখন একটি বস্তু পৃথিবী কর্তৃক আকৃষ্ট হয়। অর্থাৎ, মহাকর্ষ যখন পৃথিবী এবং অন্য কোনো বস্তুর মধ্যে কাজ করে, তখন তাকে আমরা অভিকর্ষ বলি। এই অভিকর্ষের কারণেই সবকিছু নিচের দিকে পড়ে, আমাদের ওজন অনুভব হয় এবং বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর চারপাশে আটকে থাকে।
ভর (Mass) এবং ওজন (Weight) – এক নয়, কিন্তু কেন?
ঈশিতা: স্যার, আমার মনে হয় ভর আর ওজন একই জিনিস। আমি দোকানে গিয়ে যখন বলি, 'এক কেজি আলু দিন', তখন তো ওজনই বুঝি, তাই না?
বিজ্ঞান স্যার: এইখানেই একটি বড় ভুল ধারণা অনেকের থাকে, ঈশিতা। ভর (Mass) এবং ওজন (Weight) দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। চলো, এটা পরিষ্কার করে নিই।
-
ভর (Mass): একটি বস্তুর মধ্যে মোট পদার্থের পরিমাণকে তার ভর বলে। এটি একটি বস্তুর মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ভর কখনো পরিবর্তিত হয় না, আপনি পৃথিবীতে থাকুন বা চাঁদে, আপনার ভর একই থাকবে। ভরের একক হলো কিলোগ্রাম (kg)। এটি একটি স্কেলার রাশি, অর্থাৎ এর শুধু মান আছে, কোনো দিক নেই।
-
ওজন (Weight): কোনো বস্তুকে পৃথিবী যে বল দিয়ে আকর্ষণ করে, সেটাই হলো তার ওজন। ওজন হলো একটি বল, তাই এর একক নিউটন (N)। ওজন বস্তুর ভর এবং অভিকর্ষজ ত্বরণের (g) গুণফল: W = mg। যেহেতু অভিকর্ষজ ত্বরণ 'g' পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে (যেমন মেরু অঞ্চলে বা বিষুব রেখায়) সামান্য ভিন্ন হতে পারে, তাই আপনার ওজনও সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে। চাঁদে বা মঙ্গল গ্রহে 'g' এর মান পৃথিবীর চেয়ে কম, তাই আপনার ওজন সেখানে কম হবে। এটি একটি ভেক্টর রাশি, অর্থাৎ এর মান এবং দিক উভয়ই আছে (পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে)।
তাহলে, যখন আপনি এক কেজি আলু চান, তখন আপনি আলুর ভর জানতে চান, ওজন নয়। তবে দৈনন্দিন জীবনে আমরা 'ওজন' শব্দটি ভরের অর্থেই ব্যবহার করে থাকি, যা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
ঈশিতা: ওহ! তাহলে আমার ওজন চাঁদে কম হবে? তার মানে আমি চাঁদে হালকা অনুভব করব?
বিজ্ঞান স্যার: একদম! চাঁদের পৃষ্ঠে অভিকর্ষজ ত্বরণ পৃথিবীর প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। তাই আপনার ওজন চাঁদে পৃথিবীর ওজনের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ হবে। এর মানে আপনি সেখানে অনেক হালকা অনুভব করবেন এবং সহজে লাফিয়ে উঠতে পারবেন! এটা হলো মুক্ত পতন (Free Fall) এর একটি মজার দিক।
মুক্ত পতন (Free Fall) এবং অভিকর্ষজ ত্বরণ (Acceleration due to Gravity)
ঈশিতা: মুক্ত পতন মানে কি? কোনো বাধা ছাড়া নিচে পড়া?
বিজ্ঞান স্যার: হ্যাঁ, ঠিক তাই! যখন কোনো বস্তুর ওপর শুধু অভিকর্ষ বল কাজ করে এবং অন্য কোনো বল (যেমন বাতাসের বাধা) কাজ করে না, তখন সেই বস্তুর পতনকে মুক্ত পতন (Free Fall) বলে। এমন অবস্থায় বস্তুটি একটি নির্দিষ্ট হারে তার গতি বাড়ায়। এই গতি বৃদ্ধির হারকে বলা হয় অভিকর্ষজ ত্বরণ (Acceleration due to Gravity), যাকে আমরা 'g' দিয়ে প্রকাশ করি।
পৃথিবীর পৃষ্ঠে 'g' এর গড় মান প্রায় 9.8 m/s²। এর মানে হলো, মুক্ত পতনে থাকা বস্তুর বেগ প্রতি সেকেন্ডে 9.8 মিটার/সেকেন্ড করে বাড়ে। মজার ব্যাপার হলো, বাতাসের বাধা না থাকলে, একটি পালক এবং একটি ভারী পাথর একই সময়ে নিচে পড়বে!
ঈশিতা: এটা তো খুব অদ্ভুত! একটা ভারী পাথর আর একটা হালকা পালক একসঙ্গে পড়বে? কিন্তু আমি তো দেখি পাথর আগে পড়ে!
বিজ্ঞান স্যার: হ্যাঁ, বাস্তবে তুমি পাথরকেই আগে পড়তে দেখবে, কারণ বাতাসের বাধা পালকের ওপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। কিন্তু যদি আমরা একটি শূন্যস্থান তৈরি করতে পারি, যেখানে কোনো বাতাস নেই, তাহলে তুমি দেখবে যে পালক এবং পাথর ঠিক একই সময়ে মাটিতে পড়ছে। গ্যালিলিও এই পরীক্ষাটি করেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, অভিকর্ষজ ত্বরণ বস্তুর ভরের ওপর নির্ভর করে না।
ঈশিতা: স্যার, এই 'g' আর আগে যে 'G' এর কথা বললেন, সেগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কী?
বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন, ঈশিতা! 'G' (মহাকর্ষীয় ধ্রুবক) মহাবিশ্বের সব জায়গায় একই থাকে, এটি একটি ধ্রুব সংখ্যা। কিন্তু 'g' (অভিকর্ষজ ত্বরণ) স্থানীয়। 'g' এর মান পৃথিবীর ভর (M) এবং পৃথিবীর ব্যাসার্ধ (R) এর ওপর নির্ভর করে। এর সম্পর্ক হলো: g = GM/R²। যেহেতু পৃথিবী পুরোপুরি গোলাকার নয় এবং তার ঘনত্বেরও কিছুটা ভিন্নতা আছে, তাই 'g' এর মান পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সামান্য পরিবর্তিত হয়। মেরু অঞ্চলে 'g' এর মান বিষুব রেখার চেয়ে কিছুটা বেশি।
ধাক্কা (Thrust) এবং চাপ (Pressure)
ঈশিতা: স্যার, আমি দেখেছিলাম একজন ছুতার একটি ছোট পেরেককে খুব সহজে কাঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু পুরো হাত দিয়ে চেষ্টা করলেও আমি সেটা পারছিলাম না। এর কারণ কী?
বিজ্ঞান স্যার: এই প্রশ্নের উত্তরটি লুকানো আছে ধাক্কা (Thrust) এবং চাপ (Pressure) এর ধারণার মধ্যে, যা মহাকর্ষের সাথেই তোমাদের এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
-
ধাক্কা (Thrust): কোনো তলের ওপর লম্বভাবে প্রযুক্ত বলকে ধাক্কা বা থ্রাস্ট বলে। এর এককও নিউটন (N)। পেরেক ঠোকার সময় হাতুড়ি দিয়ে তুমি পেরেকের মাথার ওপর যে বল প্রয়োগ করছো, সেটা হলো ধাক্কা।
-
চাপ (Pressure): প্রতি একক ক্ষেত্রফলে যে লম্ব বল প্রযুক্ত হয়, তাকে চাপ বলে। এর মানে, চাপ = ধাক্কা / ক্ষেত্রফল বা P = F/A। চাপের একক হলো প্যাসকেল (Pa) বা নিউটন প্রতি বর্গমিটার (N/m²)।
তোমার ছুতারের উদাহরণে, হাতুড়ি পেরেকটির মাথার ওপর একটি নির্দিষ্ট ধাক্কা দিচ্ছে। কিন্তু পেরেকটির সূক্ষ্ম অগ্রভাগ একটি খুব ছোট ক্ষেত্রফলের ওপর সেই ধাক্কাকে কেন্দ্রীভূত করে। যেহেতু চাপ ক্ষেত্রফলের ব্যস্তানুপাতিক (ক্ষেত্রফল কমলে চাপ বাড়ে), তাই অগ্রভাগে বিশাল চাপ তৈরি হয়, যা কাঠকে ভেদ করে পেরেককে ঢুকিয়ে দেয়। তুমি যখন হাত দিয়ে চেষ্টা করছো, তখন সেই একই ধাক্কা তোমার আঙুলের একটি বৃহত্তর ক্ষেত্রফলের ওপর ছড়িয়ে পড়ে, ফলে চাপ অনেক কম হয় এবং পেরেক ঢোকে না।
ঈশিতা: ওহ, বুঝেছি! তার মানে, কাঁটা চামচের সরু অংশ দিয়ে সহজেই খাবার কাটা যায়, কিন্তু পেছনের মোটা অংশ দিয়ে কাটে না?
বিজ্ঞান স্যার: একদম সঠিক! ছুরি কেন এত ধারালো হয়? যাতে এটি খুব ছোট ক্ষেত্রফলের ওপর বল প্রয়োগ করে বিশাল চাপ তৈরি করতে পারে এবং সহজেই জিনিস কেটে ফেলতে পারে। আবার, মরুভূমিতে উটের পা কেন চওড়া হয়? যাতে তাদের দেহের ওজন অনেক বেশি ক্ষেত্রফলের ওপর ছড়িয়ে পড়ে, ফলে চাপ কমে এবং তারা বালিতে সহজে ডুবে না গিয়ে হাঁটতে পারে। এই সবই চাপ এর ধারণা থেকে আসে।
প্লবতা (Buoyancy) এবং আর্কিমিডিসের নীতি (Archimedes’ Principle)
ঈশিতা: স্যার, আমি যখন সুইমিং পুলে ডুব দিই, তখন আমার শরীর যেন হালকা মনে হয়। আবার একটা ছোট্ট লোহার পেরেক জলে ডুবে যায়, কিন্তু একটা বিশাল বড় লোহার জাহাজ ভেসে থাকে। এটা কেন হয়?
বিজ্ঞান স্যার: এই রহস্যের পেছনে রয়েছে প্লবতা (Buoyancy) এবং আর্কিমিডিসের নীতি (Archimedes’ Principle)। এটিও তোমাদের মহাকর্ষ অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ এটি তরল পদার্থের মধ্যে বস্তুর আচরণ ব্যাখ্যা করে।
যখন কোনো বস্তুকে কোনো তরল বা গ্যাসীয় পদার্থে আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করা হয়, তখন সেই তরল বা গ্যাসীয় পদার্থ বস্তুর ওপর একটি ঊর্ধ্বমুখী বল প্রয়োগ করে। এই ঊর্ধ্বমুখী বলকে প্লবতা (Buoyancy) বা প্লবতা বল (Buoyant Force) বলে। এই প্লবতা বলের কারণেই তুমি জলে নিজেকে হালকা অনুভব করো।
আর্কিমিডিসের নীতি এই প্লবতা বলের পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে। আর্কিমিডিসের নীতি অনুসারে:
“যখন কোনো বস্তুকে কোনো তরল বা গ্যাসীয় পদার্থে আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করা হয়, তখন বস্তুটি যে পরিমাণ তরল বা গ্যাসীয় পদার্থকে অপসারিত করে, সেই অপসারিত তরল বা গ্যাসীয় পদার্থের ওজনের সমান একটি ঊর্ধ্বমুখী প্লবতা বল বস্তুর ওপর প্রযুক্ত হয়।”
সহজ কথায়, একটি বস্তুকে যখন জলে ডোবানো হয়, তখন বস্তুটি নিজের আয়তনের সমান পরিমাণ জলকে সরিয়ে দেয়। এই সরিয়ে দেওয়া জলের যে ওজন, সেই ওজনের সমান একটি ঊর্ধ্বমুখী বল বস্তুটির ওপর কাজ করে, যা তাকে ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
ঈশিতা: তাহলে লোহার পেরেক কেন ডুবে যায় আর লোহার জাহাজ কেন ভাসে?
বিজ্ঞান স্যার: চমৎকার প্রশ্ন! এর কারণ হলো ঘনত্ব (Density)। ঘনত্ব হলো ভর/আয়তন (Mass/Volume)।
-
পেরেক: একটি লোহার পেরেকের ঘনত্ব জলের ঘনত্বের চেয়ে অনেক বেশি। যখন পেরেকটিকে জলে ডোবানো হয়, তখন এটি খুব কম পরিমাণ জল অপসারিত করে। অপসারিত জলের ওজন পেরেকের ওজনের চেয়ে অনেক কম হয়, তাই প্লবতা বল পেরেকের ওজন কমাতে পারে না এবং পেরেকটি ডুবে যায়।
-
জাহাজ: একটি লোহার জাহাজের আকৃতি এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এটি অনেক বড় আয়তনের জলকে অপসারিত করতে পারে। যদিও জাহাজটি লোহা দিয়ে তৈরি, কিন্তু এর ভেতরের অংশ ফাঁপা থাকার কারণে এর সামগ্রিক বা গড় ঘনত্ব (Average Density) জলের ঘনত্বের চেয়ে কম হয়। যখন জাহাজটি জলে থাকে, তখন এটি তার নিজস্ব ওজনের চেয়ে বেশি ওজনের জল অপসারিত করে। আর্কিমিডিসের নীতি অনুসারে, এই অপসারিত জলের ওজন জাহাজের ওপর প্রযুক্ত প্লবতা বলের সমান। যেহেতু এই প্লবতা বল জাহাজের ওজনের চেয়ে বেশি বা সমান হয়, তাই জাহাজটি ভেসে থাকে।
ঈশিতা: তার মানে, একটা বস্তুর ঘনত্ব যদি জলের ঘনত্বের চেয়ে কম হয়, তাহলে সেটা ভাসবে, আর বেশি হলে ডুবে যাবে?
বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক বলেছো! এটাই হলো প্লবতার মূল কথা। বরফ জলের ওপর ভাসে, কারণ বরফের ঘনত্ব জলের চেয়ে কম। ডিম সাধারণ জলে ডুবে যায়, কিন্তু লবণ জলে ভাসে, কারণ লবণ জল সাধারণ জলের চেয়ে ঘন।
আপেক্ষিক ঘনত্ব (Relative Density)
ঈশিতা: এই যে ঘনত্ব বেশি না কম, এটা আমরা কীভাবে মাপি?
বিজ্ঞান স্যার: এর জন্য আমরা আপেক্ষিক ঘনত্ব (Relative Density) ব্যবহার করি। আপেক্ষিক ঘনত্ব হলো কোনো বস্তুর ঘনত্ব এবং জলের ঘনত্বের অনুপাত। এর কোনো একক নেই, কারণ এটি দুটি একই রাশির অনুপাত।
আপেক্ষিক ঘনত্ব = বস্তুর ঘনত্ব / জলের ঘনত্ব
যদি কোনো বস্তুর আপেক্ষিক ঘনত্ব 1-এর বেশি হয়, তার মানে বস্তুটি জলের চেয়ে ঘন এবং ডুবে যাবে। আর যদি 1-এর কম হয়, তাহলে বস্তুটি জলের চেয়ে হালকা এবং ভেসে থাকবে। 1 হলে বস্তুটি জলে সম্পূর্ণ ডুবে ভেসে থাকবে, অর্থাৎ জলে ভাসবে কিন্তু তার উপরিভাগ জলের তল বরাবর থাকবে।
ঈশিতা: তাহলে দুধ কতটা খাঁটি, সেটাও কি আপেক্ষিক ঘনত্ব দিয়ে মাপা যায়?
বিজ্ঞান স্যার: হ্যাঁ, যায়! দুধের আপেক্ষিক ঘনত্ব মাপার জন্য ল্যাক্টোমিটার (Lactometer) নামে একটি যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যা আর্কিমিডিসের নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। একটি খাঁটি ল্যাক্টোমিটার তরলে যে গভীরতায় ডোবে, সেটা দেখে দুধের বিশুদ্ধতা বোঝা যায়। একই নীতি ব্যবহার করে তরল পদার্থের ঘনত্ব মাপার জন্য হাইগ্রোমিটার (Hydrometer) ব্যবহার করা হয়।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব
ঈশিতা: স্যার, এই অধ্যায়ের কিছু প্রশ্ন আছে আমার মনে, যা বুঝতে পারলে পুরো বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে।
বিজ্ঞান স্যার: অবশ্যই, জিজ্ঞাসা করো!
ঈশিতা: প্রশ্ন ১: মহাকর্ষের সর্বজনীন সূত্রটি কেন মহাবিশ্বের সব জায়গায় প্রযোজ্য?
বিজ্ঞান স্যার: উত্তর: মহাকর্ষের সর্বজনীন সূত্রটিকে 'সর্বজনীন' বলা হয় কারণ এটি শুধুমাত্র পৃথিবীর বস্তুদের ক্ষেত্রেই নয়, বরং মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু কণিকার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এটি গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি সহ সকল মহাজাগতিক বস্তুর আচরণ ব্যাখ্যা করে। এই সূত্র বস্তুর ভর এবং দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে একটি সার্বজনীন নিয়ম স্থাপন করে, যা কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়।
ঈশিতা: প্রশ্ন ২: মুক্ত পতনের সময় বস্তুর ত্বরণ কেন তার ভরের ওপর নির্ভর করে না?
বিজ্ঞান স্যার: উত্তর: মুক্ত পতনের সময় বস্তুর ত্বরণ, অর্থাৎ অভিকর্ষজ ত্বরণ (g), তার ভরের ওপর নির্ভর করে না কারণ, যদিও পৃথিবীর আকর্ষণ বল (মহাকর্ষ বল) বস্তুর ভরের ওপর নির্ভর করে (F = mg), কিন্তু নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র অনুসারে F = ma, যেখানে 'a' হলো ত্বরণ। অভিকর্ষের ক্ষেত্রে এই ত্বরণকে আমরা 'g' বলি। তাহলে, mg = ma বা mg = m*g_new (এখানে g_new ত্বরণ বোঝাতে), অর্থাৎ ত্বরণ (g) = F/m। মহাকর্ষ বল (F) বস্তুর ভরের (m) সমানুপাতিক, তাই F/m অনুপাতটি সর্বদা একটি নির্দিষ্ট মান (g) দেয়, যা বস্তুর ভর থেকে স্বাধীন। সহজভাবে বললে, পৃথিবী একটি বড় বস্তুকে যে পরিমাণ বেশি বলে টানে, সেই বস্তুর ভরও তত বেশি হওয়ায় তাকে ত্বরান্বিত করতে সেই বেশি বলেরই প্রয়োজন হয়, ফলে ত্বরণ একই থাকে।
ঈশিতা: প্রশ্ন ৩: বস্তুর আপেক্ষিক ঘনত্ব কেন একটি এককবিহীন রাশি?
বিজ্ঞান স্যার: উত্তর: আপেক্ষিক ঘনত্ব হলো কোনো বস্তুর ঘনত্ব এবং জলের ঘনত্বের অনুপাত। যেহেতু এটি দুটি একই ভৌত রাশির (ঘনত্ব) অনুপাত, তাই তাদের এককগুলো বাতিল হয়ে যায় এবং আপেক্ষিক ঘনত্বের কোনো একক থাকে না। এটি কেবল একটি সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয়, যা বোঝায় বস্তুটি জলের চেয়ে কত গুণ ঘন বা হালকা।
ঈশিতা: প্রশ্ন ৪: চাঁদে আমার ওজন পৃথিবীর চেয়ে কম হলেও আমার ভর কেন একই থাকে?
বিজ্ঞান স্যার: উত্তর: তোমার শরীরের মধ্যে মোট যে পদার্থের পরিমাণ আছে, সেটি হলো তোমার ভর। তুমি যে স্থানেই যাও না কেন, এই পদার্থের পরিমাণ পরিবর্তিত হয় না, তাই তোমার ভর স্থির থাকে। কিন্তু ওজন হলো একটি বল, যা তোমার ভরের ওপর কাজ করে এবং সেই গ্রহের অভিকর্ষজ ত্বরণ ('g') এর ওপর নির্ভরশীল (W = mg)। যেহেতু চাঁদের ভর পৃথিবীর ভরের চেয়ে কম, তাই চাঁদের অভিকর্ষজ ত্বরণ (g_চাঁদ) পৃথিবীর অভিকর্ষজ ত্বরণের (g_পৃথিবী) চেয়ে কম। ফলস্বরূপ, তোমার ওজন চাঁদে পৃথিবীর চেয়ে কম হয়, কিন্তু তোমার আসল ভর একই থাকে।
আজ আমরা কী শিখলাম?
বিজ্ঞান স্যার: তাহলে ঈশিতা, আজ আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম। চলো, সংক্ষেপে দেখে নিই কী কী শিখলাম?
ঈশিতা: হ্যাঁ স্যার, আমি বলতে পারি! আমরা শিখলাম:
- মহাকর্ষ: মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে।
- মহাকর্ষের সর্বজনীন সূত্র: নিউটনের সূত্র যা বলে আকর্ষণ বল ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
- ভর ও ওজন: ভর হলো বস্তুর পদার্থের পরিমাণ, যা স্থির থাকে। ওজন হলো অভিকর্ষ বল, যা স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়।
- অভিকর্ষজ ত্বরণ (g): মুক্ত পতনে থাকা বস্তুর গতি বৃদ্ধির হার, যা বস্তুর ভরের ওপর নির্ভর করে না।
- ধাক্কা (Thrust) ও চাপ (Pressure): ধাক্কা হলো লম্বভাবে প্রযুক্ত বল, আর চাপ হলো প্রতি একক ক্ষেত্রফলে প্রযুক্ত ধাক্কা। ছোট ক্ষেত্রফলের ওপর বেশি চাপ পড়ে।
- প্লবতা (Buoyancy): তরলে নিমজ্জিত বস্তুর ওপর তরল কর্তৃক প্রযুক্ত ঊর্ধ্বমুখী বল।
- আর্কিমিডিসের নীতি: প্লবতা বল অপসারিত তরলের ওজনের সমান।
- আপেক্ষিক ঘনত্ব: কোনো বস্তুর ঘনত্ব এবং জলের ঘনত্বের অনুপাত, যা বস্তুটি ভাসবে না ডুববে তা নির্ধারণ করে।
বিজ্ঞান স্যার: অসাধারণ, ঈশিতা! তুমি খুব সুন্দরভাবে সবকিছু বুঝতে পেরেছো। মনে রাখবে, এই ধারণাগুলো আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া অনেক প্রাকৃতিক ঘটনাকে বুঝতে সাহায্য করে এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করে। মহাকর্ষ থেকে শুরু করে প্লবতা পর্যন্ত, সব ধারণাই একে অপরের সাথে যুক্ত এবং মহাবিশ্বের নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানের এই মজার দিকগুলো নিয়ে আরও জানার জন্য প্রস্তুত থেকো!
ঈশিতা: হ্যাঁ স্যার! আজ অনেক কিছু শিখলাম। মনে হচ্ছে বিজ্ঞান আর ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয়, বরং খুব মজার!