রিনা: স্যার, আমি স্কুলে বন্ধুদের সাথে খেলছিলাম, হঠাৎ করে গরম কড়াইয়ে হাত লেগে গেল! আর আমি চোখের পলকে হাতটা সরিয়ে নিলাম। এটা কীভাবে হলো? আমি তো ভাবতেও পারিনি এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া করব!
বিজ্ঞান স্যার: বাহ রিনা, খুব চমৎকার একটি প্রশ্ন করেছ! তোমার এই অভিজ্ঞতাটিই আজ আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু, যা তোমাদের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের অধ্যায় ৭, 'নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়' (Control and Coordination) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তুমি যে দ্রুত হাত সরিয়ে নিলে, তাকে বলে প্রতিবর্ত ক্রিয়া বা রিফ্লেক্স অ্যাকশন (Reflex Action)। এটি আমাদের শরীরের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি অংশ।
নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় কী এবং কেন প্রয়োজন?
বিজ্ঞান স্যার: আচ্ছা রিনা, তুমি কি জানো আমাদের শরীরকে একটি জটিল যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে? এই যন্ত্রের প্রতিটি অংশ যেমন হাত, পা, চোখ, কান, এমনকি ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোও একে অপরের সাথে সঠিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে কাজ করে। এই বোঝাপড়া বজায় রাখা এবং পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে চলার ক্ষমতাকেই আমরা নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় বলি। যেমন তুমি দৌড়ানোর সময় তোমার পা চলে, হাত দোলে, শ্বাসপ্রশ্বাস বাড়ে, হৃদস্পন্দন বাড়ে – এই সব কাজগুলো এক সাথে কে নিয়ন্ত্রণ করে?
রিনা: হুমম, ঠিক ধরেছেন স্যার। আমি যখন সাইকেল চালাই, তখন চোখ দিয়ে রাস্তা দেখি, হাত দিয়ে হ্যান্ডেল ধরি, পা দিয়ে প্যাডেল করি, আর কান দিয়ে আশপাশের শব্দ শুনি। এই সব কাজগুলো যেন একসাথে ঘটে যায়। কিন্তু কীভাবে?
বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক বলেছ! আমাদের শরীরে এই নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় মূলত দুটি প্রধান ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘটে: স্নায়ুতন্ত্র (Nervous System) এবং অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র (Endocrine System)। এই দুটি তন্ত্র একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে আমাদের শরীরকে স্বাভাবিক রাখে এবং বাইরের পরিবেশের সাথে সাড়া দিতে সাহায্য করে। শুধু প্রাণীজগতেই নয়, উদ্ভিদ জগতেও কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় ব্যবস্থা রয়েছে, যা আমরা পরে আলোচনা করব।
প্রাণীদেহের স্নায়ুতন্ত্র: বিদ্যুতের তারের মতো
বিজ্ঞান স্যার: চলো প্রথমে প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করা যাক। স্নায়ুতন্ত্র হলো এক ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা শরীরজুড়ে বার্তা বহন করে। একে আমরা বিদ্যুতের তারের জালের সাথে তুলনা করতে পারি। আমাদের শরীর লক্ষ লক্ষ বিশেষ কোষ দিয়ে তৈরি, যাদের আমরা বলি নিউরন বা স্নায়ুকোষ (Neuron)। এই নিউরনগুলোই হলো স্নায়ুতন্ত্রের মূল একক।
রিনা: নিউরন? এটা দেখতে কেমন হয় স্যার?
বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন! একটি নিউরনের তিনটি প্রধান অংশ থাকে: কোষদেহ (Cell body বা Soma), ডেন্ড্রাইট (Dendrite) এবং অ্যাক্সন (Axon)। কোষদেহের মধ্যে নিউক্লিয়াস থাকে। ডেন্ড্রাইটগুলো দেখতে গাছের শাখার মতো, যা অন্য নিউরন বা সংবেদী কোষ থেকে তথ্য গ্রহণ করে। আর অ্যাক্সন হলো একটি লম্বা তন্তুর মতো অংশ, যা কোষদেহ থেকে তথ্যকে দূরে নিয়ে যায় এবং অন্য নিউরন বা পেশী বা গ্রন্থিতে পৌঁছে দেয়। এই তথ্যগুলো বৈদ্যুতিক সংকেত বা রাসায়নিক সংকেত আকারে নিউরনের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।
রিনা: তার মানে আমার হাত যখন গরম কড়াই ছুঁয়েছিল, তখন সেই গরমের অনুভূতিটা কোনো নিউরন দিয়ে আমার মস্তিষ্কে গিয়েছিল?
বিজ্ঞান স্যার: ঠিক তাই! এই পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে ঘটে। তোমার হাতের ত্বকে থাকা বিশেষ সংবেদী নিউরন (Sensory Neurons) গরমের অনুভূতিকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে। এই সংকেতগুলো সংবেদী নিউরন থেকে সুষুম্নাকাণ্ড (Spinal Cord) হয়ে মস্তিষ্কে (Brain) পৌঁছায়। মস্তিষ্ক সেই সংকেতকে বিশ্লেষণ করে এবং প্রতিক্রিয়া হিসেবে একটি নির্দেশ দেয়, যা মোটর নিউরন (Motor Neurons) এর মাধ্যমে তোমার হাতের পেশীতে পৌঁছায়। পেশী তখন সংকুচিত হয়ে হাতকে সরিয়ে নেয়। এই দ্রুত প্রতিক্রিয়াগুলো, যেমন তোমার গরম কড়াই থেকে হাত সরিয়ে নেওয়া, এগুলোকে প্রতিবর্ত ক্রিয়া (Reflex Action) বলে।
প্রতিবর্ত ক্রিয়া ও প্রতিবর্ত চাপ (Reflex Arc)
বিজ্ঞান স্যার: প্রতিবর্ত ক্রিয়া হলো এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত, অনৈচ্ছিক এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া, যা মস্তিষ্কের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই ঘটে। এটি শরীরের যেকোনো সম্ভাব্য বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই প্রতিবর্ত ক্রিয়া যে পথে সম্পন্ন হয়, তাকে প্রতিবর্ত চাপ (Reflex Arc) বলে। এর একটি সরল পথ হলো:
- সংবেদী গ্রাহক (Receptor): যেমন তোমার ত্বকের তাপ গ্রাহক।
- সংবেদী নিউরন (Sensory Neuron): গ্রাহক থেকে তথ্য সুষুম্নাকাণ্ডে নিয়ে যায়।
- মধ্যবর্তী নিউরন (Relay Neuron বা Interneuron): সুষুম্নাকাণ্ডের মধ্যে সংকেত প্রক্রিয়াকরণ করে।
- চেষ্টীয় নিউরন (Motor Neuron): সুষুম্নাকাণ্ড থেকে প্রতিক্রিয়া নির্দেশ পেশীতে নিয়ে আসে।
- কারক (Effector): যেমন তোমার হাতের পেশী, যা কাজ করে (হাত সরিয়ে নেয়)।
রিনা: তার মানে মস্তিষ্ক পুরোপুরি জড়িত থাকে না?
বিজ্ঞান স্যার: প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার সময় সরাসরি জড়িত থাকে না। সুষুম্নাকাণ্ডই অনেক প্রতিবর্ত ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। তবে এই সংকেতগুলো মস্তিষ্কেও পৌঁছায়, যার ফলে তুমি পরে গরম লাগার অনুভূতি এবং হাত সরানোর বিষয়টি বুঝতে পারো। মস্তিষ্ক পরে এই তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া করবে তা শিখতে সাহায্য করে।
মস্তিষ্ক: আমাদের শরীরের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ
বিজ্ঞান স্যার: আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মস্তিষ্ক। এটি শরীরের সমস্ত ক্রিয়াকলাপ, যেমন চিন্তা করা, শেখা, মনে রাখা, দেখা, শোনা, নড়াচড়া করা, এমনকি আমাদের আবেগ-অনুভূতিও নিয়ন্ত্রণ করে। মস্তিষ্ক তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত:
- গুরুমস্তিষ্ক (Forebrain): এটি মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় অংশ এবং প্রধানত চিন্তাভাবনা, স্মৃতি, বুদ্ধি, ইচ্ছা এবং সংবেদন (যেমন শোনা, দেখা, স্বাদ, গন্ধ, স্পর্শ) নিয়ন্ত্রণ করে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সেরিব্রাম (Cerebrum)।
- মধ্যমস্তিষ্ক (Midbrain): এটি গুরুমস্তিষ্ক এবং পশ্চাদমস্তিষ্কের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এবং কিছু প্রতিবর্ত ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন চোখের নড়াচড়া।
- পশ্চাদমস্তিষ্ক (Hindbrain): এতে তিনটি অংশ আছে – পনস (Pons), লঘুমস্তিষ্ক (Cerebellum) এবং সুষুম্নাশীর্ষক (Medulla Oblongata)।
- লঘুমস্তিষ্ক: এটি শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং পেশী সঞ্চালন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমন্বয় সাধন করে, যেমন সাইকেল চালানো বা সোজা হয়ে দাঁড়ানো।
- সুষুম্নাশীর্ষক: এটি অনৈচ্ছিক ক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন হৃদস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস, রক্তচাপ, বমি করা, কাশি ইত্যাদি।
- পনস: এটি শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানে সাহায্য করে।
রিনা: ওয়াও! আমাদের মস্তিষ্ক তো একটা কম্পিউটারের থেকেও জটিল, তাই না স্যার? এতে এত কাজ একসাথে হয়!
বিজ্ঞান স্যার: ঠিক ধরেছ রিনা! কম্পিউটারের তুলনায় মস্তিষ্ক অনেক বেশি শক্তিশালী এবং অভিযোজনক্ষম। মস্তিষ্কের সুরক্ষা খুব জরুরি, তাই এটি মাথার খুলির (Cranium) হাড় দিয়ে ঘেরা থাকে এবং এর চারপাশে মেনিনজেস (Meninges) নামক তিনটি পর্দা এবং সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (Cerebrospinal Fluid) দ্বারা সুরক্ষিত থাকে, যা এটিকে আঘাত থেকে রক্ষা করে। সুষুম্নাকাণ্ড মেরুদণ্ডের হাড়ের (Vertebral Column) মধ্যে সুরক্ষিত থাকে।
অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র: রাসায়নিক বার্তার বাহক
বিজ্ঞান স্যার: স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে কাজ করে, কিন্তু আমাদের শরীরের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আছে, যা ধীরগতিতে কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এটিকে আমরা বলি অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র (Endocrine System)। এই তন্ত্র হরমোন (Hormones) নামক বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ তৈরি ও ক্ষরণ করে।
রিনা: হরমোন? এগুলো কী স্যার?
বিজ্ঞান স্যার: হরমোন হলো এক ধরনের রাসায়নিক বার্তাবাহক, যা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে সরাসরি রক্তে মিশে যায় এবং রক্তের মাধ্যমে শরীরের নির্দিষ্ট লক্ষ্য কোষে (Target Cells) পৌঁছায়, যেখানে তারা কাজ করে। স্নায়ুতন্ত্রের তুলনায় হরমোনের প্রভাব সাধারণত ধীর এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়।
গুরুত্বপূর্ণ অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও তাদের হরমোন
বিজ্ঞান স্যার: আমাদের শরীরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি আছে, যার প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট হরমোন ক্ষরণ করে:
- পিটুইটারি গ্রন্থি (Pituitary Gland): এটি মস্তিষ্কের নিচে অবস্থিত এবং 'মাস্টার গ্রন্থি' নামে পরিচিত। কারণ এটি অন্যান্য অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি বৃদ্ধি হরমোন (Growth Hormone) সহ অনেক হরমোন ক্ষরণ করে। বৃদ্ধি হরমোনের অভাবে বামনত্ব (Dwarfism) বা অতিরিক্ত ক্ষরণে অতিকায়ত্ব (Gigantism) দেখা যায়।
- থাইরয়েড গ্রন্থি (Thyroid Gland): গলার সামনের দিকে অবস্থিত। এটি থাইরক্সিন (Thyroxine) হরমোন ক্ষরণ করে, যা শরীরের বিপাক (Metabolism), বৃদ্ধি এবং বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। থাইরক্সিন উৎপাদনের জন্য আয়োডিন অপরিহার্য। আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড রোগ (Goitre) হতে পারে।
- অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি (Adrenal Gland): প্রতিটি বৃক্কের (Kidney) উপরে অবস্থিত। এটি অ্যাড্রেনালিন (Adrenaline) হরমোন ক্ষরণ করে। এই হরমোনকে 'লড়াই বা পলায়ন হরমোন' (Fight or Flight Hormone) বলা হয়, কারণ এটি বিপদ বা মানসিক চাপ পরিস্থিতিতে শরীরকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত করে, যেমন হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস বাড়ানো, রক্তচাপ বাড়ানো।
- প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয় (Pancreas): এটি পাকস্থলীর নিচে অবস্থিত। এটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন ক্ষরণ করে: ইনসুলিন (Insulin) এবং গ্লুকাগন (Glucagon)। ইনসুলিন রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এর অভাবে ডায়াবেটিস (Diabetes) রোগ হয়।
- শুক্রাশয় (Testes) (পুরুষদের): টেস্টোস্টেরন (Testosterone) হরমোন ক্ষরণ করে, যা পুরুষের গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্য (Secondary Sexual Characteristics) বিকাশে সাহায্য করে।
- ডিম্বাশয় (Ovaries) (নারীদের): ইস্ট্রোজেন (Estrogen) এবং প্রোজেস্টেরন (Progesterone) হরমোন ক্ষরণ করে, যা নারীর গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্য ও প্রজনন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
রিনা: স্যার, তাহলে কি স্নায়ুতন্ত্র এবং হরমোন একসাথে কাজ করে?
বিজ্ঞান স্যার: একেবারে ঠিক ধরেছ! এদের কাজ একে অপরের পরিপূরক। যেমন, তুমি যখন কোনো বিপদের সম্মুখীন হও, তখন স্নায়ুতন্ত্র মস্তিষ্কে দ্রুত সংকেত পাঠায়, আর মস্তিষ্ক অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিকে অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ করতে নির্দেশ দেয়। এই অ্যাড্রেনালিন তখন শরীরকে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত করে তোলে। স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত সাড়া দেয়, আর হরমোন ধীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে, যা শরীরের সামগ্রিক হোমিয়োস্ট্যাসিস (Homeostasis) বা অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
উদ্ভিদের নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়: আলোর প্রতি ভালোবাসা
রিনা: স্যার, প্রাণীদের কথা তো বুঝলাম। কিন্তু গাছপালা তো আর দৌড়ায় না, ওদের কি স্নায়ুতন্ত্র আছে?
বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো প্রশ্ন রিনা! না, উদ্ভিদের কোনো স্নায়ুতন্ত্র নেই। তাদের নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় পুরোটাই উদ্ভিদ হরমোন (Plant Hormones) বা ফাইটো হরমোন (Phytohormones) এবং পরিবেশগত উদ্দীপনার প্রতি সাড়া দেওয়ার মাধ্যমে ঘটে। উদ্ভিদের বৃদ্ধি, বিকাশ, ফুল ফোঁটা, ফল ধরা, এমনকি পাতার ঝরে পড়া – এই সবই হরমোনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
উদ্ভিদ হরমোন এবং তাদের কাজ
বিজ্ঞান স্যার: প্রধান কয়েকটি উদ্ভিদ হরমোন হলো:
- অক্সিন (Auxin): এটি প্রধানত কান্ডের অগ্রভাগে উৎপন্ন হয় এবং কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজন ঘটিয়ে উদ্ভিদের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এটি আলোর দিকে কান্ডের বাঁকা হওয়া (ফটোট্রপিজম) এবং অভিকর্ষের দিকে মূলের বৃদ্ধি (জিওট্রপিজম) নিয়ন্ত্রণ করে।
- জিব্বেরেলিন (Gibberellins): এটি কান্ডের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, বীজের সুপ্তাবস্থা ভাঙতে এবং ফুল ফোটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- সাইটোকাইনিন (Cytokinins): এটি কোষ বিভাজনকে উৎসাহিত করে, যা ফলের বৃদ্ধি এবং বীজের সুপ্তাবস্থা ভাঙতে সাহায্য করে।
- অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (Abscisic Acid – ABA): এটি বৃদ্ধির প্রতিরোধক হরমোন। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধি কমিয়ে দেয়, বীজের সুপ্তাবস্থা রক্ষা করে এবং জলশূন্যতা বা অন্যান্য প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পাতার পত্ররন্ধ্র (Stomata) বন্ধ করতে সাহায্য করে। এটি পাতার ঝরে পড়া (Abscission) নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।
- ইথিলিন (Ethylene): এটি একমাত্র গ্যাসীয় হরমোন। এটি প্রধানত ফলের পরিপক্কতা এবং পাকার জন্য দায়ী।
উদ্ভিদের চলন: সাড়া দেওয়ার গল্প
বিজ্ঞান স্যার: উদ্ভিদ বিভিন্ন বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রতি সাড়া দেয়। তাদের এই সাড়া দেওয়াকে চলন (Movement) বলে। চলন দুই প্রকারের হয়:
- ট্রপিক চলন (Tropic Movement): এটি একটি নির্দিষ্ট উদ্দীপকের (যেমন আলো, জল, অভিকর্ষ) দিকে বা তার থেকে দূরে উদ্ভিদের বৃদ্ধির কারণে ঘটে। এটি উদ্দীপকের দিকের ওপর নির্ভরশীল।
- ফটোট্রপিজম (Phototropism): আলোর দিকে উদ্ভিদের কান্ড বা শাখা-প্রশাখার বৃদ্ধি। যেমন, সূর্যমুখী ফুল সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে।
- জিওট্রপিজম (Geotropism): অভিকর্ষ বলের দিকে বা তার বিরুদ্ধে চলন। যেমন, মূল মাটির গভীরে প্রবেশ করে (ধনাত্মক জিওট্রপিজম) এবং কান্ড মাটির ওপরের দিকে বৃদ্ধি পায় (ঋণাত্মক জিওট্রপিজম)।
- হাইড্রোট্রপিজম (Hydrotropism): জলের উৎসের দিকে মূলের বৃদ্ধি।
- কেমোট্রপিজম (Chemotropism): রাসায়নিক পদার্থের প্রতি সাড়া দিয়ে চলন। যেমন, পরাগনালিকার ডিম্বকের দিকে বৃদ্ধি।
- নাস্টিক চলন (Nastic Movement): এই চলন উদ্দীপকের দিকের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি পরিবেশগত উদ্দীপকের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে।
- সিসমোনাস্টি (Seismonasty): স্পর্শ বা ঝাঁকুনি দ্বারা চলন। যেমন, লজ্জাবতী গাছের পাতা স্পর্শ করলে গুটিয়ে যায়।
- ফোটোনাস্টি (Photonasty): আলোর তীব্রতা দ্বারা প্রভাবিত চলন। যেমন, কিছু ফুল সকালে ফোটে এবং সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যায়।
- থার্মোনাস্টি (Thermonasty): তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রতি সাড়া দিয়ে চলন। যেমন, টিউলিপ ফুলের পাপড়ি তাপমাত্রা বাড়লে খোলে।
রিনা: এটা খুব মজার! তার মানে গাছপালাও আমাদের মতোই বাইরের জিনিস দেখে বা বুঝে কিছু একটা করে, কিন্তু তাদের পদ্ধতিটা আলাদা?
বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক বলেছ! তাদের সাড়া দেওয়ার পদ্ধতি আলাদা, কিন্তু উদ্দেশ্য একই – নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং পরিবেশে ভালোভাবে মানিয়ে চলা।
রিনা ও বিজ্ঞান স্যারের প্রশ্ন-উত্তর পর্ব
রিনা: স্যার, আমার এই অধ্যায় থেকে আরও কিছু প্রশ্ন আছে, আপনি কি উত্তর দেবেন?
বিজ্ঞান স্যার: অবশ্যই রিনা, জিজ্ঞাসা করো!
রিনা: প্রশ্ন ১: ইনসুলিনের কাজ কী এবং এর অভাবে কী রোগ হয়?
বিজ্ঞান স্যার: উত্তর: ইনসুলিন একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন যা প্যানক্রিয়াস থেকে ক্ষরিত হয়। এর প্রধান কাজ হলো রক্তের অতিরিক্ত শর্করাকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করা এবং গ্লাইকোজেন (Glycogen) রূপে যকৃতে (Liver) ও পেশীতে সঞ্চয় করা, যার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। ইনসুলিনের অভাবে কোষগুলো রক্ত থেকে শর্করা নিতে পারে না এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়, যা ডায়াবেটিস মেলিটাস (Diabetes Mellitus) নামক রোগের কারণ।
রিনা: প্রশ্ন ২: দুটি ট্রপিক চলনের উদাহরণ দিন এবং ব্যাখ্যা করুন।
বিজ্ঞান স্যার: উত্তর: দুটি ট্রপিক চলনের উদাহরণ হলো ফটোট্রপিজম এবং জিওট্রপিজম।
- ফটোট্রপিজম: এটি হলো আলোর প্রতি উদ্ভিদের চলন। কান্ড সবসময় আলোর উৎসের দিকে বৃদ্ধি পায়, তাই এটি ধনাত্মক ফটোট্রপিজম দেখায়। মূল সাধারণত আলোর থেকে দূরে বৃদ্ধি পায়, যা ঋণাত্মক ফটোট্রপিজম। অক্সিন হরমোন এর জন্য দায়ী। আলোর অনুপস্থিতিতে কান্ডের যেদিকে অক্সিনের ঘনত্ব বেশি হয়, সেদিকের কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং কান্ড আলোর দিকে বেঁকে যায়।
- জিওট্রপিজম: এটি অভিকর্ষ বলের প্রতি উদ্ভিদের চলন। মূল সবসময় অভিকর্ষ বলের দিকে, অর্থাৎ মাটির গভীরে বৃদ্ধি পায়, তাই এটি ধনাত্মক জিওট্রপিজম দেখায়। কান্ড সবসময় অভিকর্ষ বলের বিপরীত দিকে, অর্থাৎ মাটির ওপরের দিকে বৃদ্ধি পায়, তাই এটি ঋণাত্মক জিওট্রপিজম।
রিনা: প্রশ্ন ৩: মস্তিষ্কের কোন অংশ শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে?
বিজ্ঞান স্যার: উত্তর: মস্তিষ্কের পশ্চাদমস্তিষ্কের অন্তর্গত লঘুমস্তিষ্ক (Cerebellum) শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং পেশী সঞ্চালন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমন্বয় সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন, যখন তুমি সোজা হয়ে হাঁটো, সাইকেল চালাও বা কোনো সূক্ষ্ম কাজ করো, তখন লঘুমস্তিষ্কই এই কাজগুলো মসৃণভাবে করতে সাহায্য করে।
রিনা: প্রশ্ন ৪: অ্যাড্রেনালিন হরমোনকে 'লড়াই বা পলায়ন হরমোন' বলা হয় কেন?
বিজ্ঞান স্যার: উত্তর: অ্যাড্রেনালিন হরমোন অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হয়। একে 'লড়াই বা পলায়ন হরমোন' বলা হয় কারণ এটি শরীরকে কোনো বিপদজনক বা মানসিক চাপের পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে প্রস্তুত করে। যখন আমরা ভয় পাই, উত্তেজিত হই বা কোনো বিপদের সম্মুখীন হই, তখন অ্যাড্রেনালিন রক্তে মিশে যায় এবং নিম্নলিখিত পরিবর্তন ঘটায়:
- হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।
- শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বাড়ায়।
- পেশীগুলিতে রক্ত সরবরাহ বাড়ায়।
- যকৃতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেনকে গ্লুকোজে রূপান্তরিত করে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়, যা পেশীগুলোকে অতিরিক্ত শক্তি সরবরাহ করে।
আজ আমরা কী শিখলাম?
বিজ্ঞান স্যার: তাহলে রিনা, আজ আমরা নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় সম্পর্কে অনেক কিছু শিখলাম। চলো দেখি তুমি কী কী মনে রাখতে পেরেছ।
রিনা: হ্যাঁ স্যার, আমি চেষ্টা করছি।
- রিনা: আমরা শিখলাম যে আমাদের শরীর দুটি প্রধান ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় – স্নায়ুতন্ত্র আর হরমোন ব্যবস্থা। স্নায়ুতন্ত্র খুব দ্রুত কাজ করে, আর হরমোন একটু ধীরে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
- বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক! আর স্নায়ুতন্ত্রের মূল একক কী?
- রিনা: স্নায়ুতন্ত্রের মূল একক হলো নিউরন। এর ডেন্ড্রাইট তথ্য গ্রহণ করে আর অ্যাক্সন তথ্য বহন করে।
- বিজ্ঞান স্যার: খুব ভালো! আর প্রতিবর্ত ক্রিয়া কী?
- রিনা: প্রতিবর্ত ক্রিয়া হলো দ্রুত আর অনৈচ্ছিক প্রতিক্রিয়া, যেমন গরম কড়াই থেকে হাত সরিয়ে নেওয়া। এটা সুষুম্নাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে।
- বিজ্ঞান স্যার: চমৎকার! মস্তিষ্কের তিনটি প্রধান অংশ কী কী?
- রিনা: গুরুমস্তিষ্ক, মধ্যমস্তিষ্ক আর পশ্চাদমস্তিষ্ক। গুরুমস্তিষ্ক আমাদের চিন্তা আর বুদ্ধির জন্য, আর লঘুমস্তিষ্ক শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে।
- বিজ্ঞান স্যার: একদম ঠিক। হরমোন কী এবং কিছু হরমোনের কাজ বলতে পারবে?
- রিনা: হরমোন হলো রাসায়নিক বার্তাবাহক। ইনসুলিন রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে, অ্যাড্রেনালিন বিপদ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে আর থাইরক্সিন আমাদের বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে।
- বিজ্ঞান স্যার: খুব সুন্দর! আর উদ্ভিদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে?
- রিনা: উদ্ভিদের স্নায়ুতন্ত্র নেই, তারা উদ্ভিদ হরমোন যেমন অক্সিন, জিব্বেরেলিন দিয়ে বৃদ্ধি আর চলন নিয়ন্ত্রণ করে। ফটোট্রপিজম মানে আলোর দিকে বেড়ে ওঠা আর জিওট্রপিজম মানে মাটির দিকে মূলের বেড়ে ওঠা।
- বিজ্ঞান স্যার: রিনা, তুমি আজ খুব মন দিয়ে শিখেছ! এই অধ্যায়টি সত্যিই আমাদের শরীর ও প্রকৃতির বিস্ময়কর প্রক্রিয়াগুলো বুঝতে সাহায্য করে। মনে রাখবে, আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কীভাবে একে অপরের সাথে সমন্বয় করে কাজ করে, তা বোঝা বিজ্ঞানের এক অপূর্ব দিক।
- রিনা: ধন্যবাদ স্যার! আজ অনেক নতুন জিনিস জানতে পারলাম। এখন থেকে আমি আমার চারপাশের জগৎকে অন্যভাবে দেখব।