বিষয়ের ভূমিকা

পুষ্টি হলো জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। উদ্ভিদের মতো প্রাণীরা নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না। তাদের খাদ্যের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই ব্লগে আমরা এনসিইআরটি (NCERT) সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্ত্রকের দ্বিতীয় অধ্যায় 'প্রাণীদের পুষ্টি' (Nutrition in Animals) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। প্রাণীরা কীভাবে খাদ্য গ্রহণ করে, তাদের দেহে খাদ্যের জটিল উপাদানগুলি কীভাবে সরল উপাদানে পরিণত হয় এবং কীভাবে তা শোষিত হয়—এই সমস্ত বিষয় এখানে সহজ বাংলায় আলোচনা করা হয়েছে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

প্রাণীদের পুষ্টির মধ্যে মূলত খাদ্যগ্রহণ (Ingestion), পরিপাক (Digestion), শোষণ (Absorption), আত্মীকরণ (Assimilation) এবং বর্জন (Egestion)—এই পাঁচটি ধাপ অন্তর্ভুক্ত থাকে। নিচে প্রতিটি ধাপ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. খাদ্য গ্রহণের বিভিন্ন পদ্ধতি

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য গ্রহণের পদ্ধতি আলাদা আলাদা:

  • মৌমাছি ও হামিংবার্ড: এরা ফুল থেকে মধু বা মকরন্দ চুষে খায়।
  • সাপ (যেমন অজগর): এরা শিকারকে আস্ত গিলে খায়।
  • জলজ প্রাণী: এরা জলের মধ্যে ভেসে থাকা খাদ্যের ক্ষুদ্র কণা ছেঁকে খায়।
  • অ্যামিবা: অ্যামিবা তার ক্ষণপদ (pseudopodia) ব্যবহার করে খাদ্য কণা গিলে ফেলে।

২. মানবদেহের পরিপাক তন্ত্র

মানুষের পরিপাক তন্ত্র একটি দীর্ঘ নল বা পৌষ্টিকনালী এবং কয়েকটি গ্রন্থি নিয়ে গঠিত। পৌষ্টিকনালীর প্রধান অংশগুলি হলো:

  • মুখগহ্বর (Buccal Cavity): এখানে দাঁত, জিভ এবং লালার গ্রন্থি থাকে। দাঁত খাদ্যকে কাটে এবং পিষে ছোট করে। লালাগ্রন্থি থেকে লালারস নির্গত হয় যাতে অ্যামাইলেজ নামক উৎসেচক থাকে, যা শর্করাকে হজম করতে সাহায্য করে।
  • গ্রাসনালী (Esophagus): মুখ থেকে খাদ্য গ্রাসনালীর মাধ্যমে পাকস্থলীতে পৌঁছায়। পেরিস্টালসিস (Peristalsis) বা তরঙ্গের মতো সংকোচনের মাধ্যমে খাদ্য নিচে নামে।
  • পাকস্থলী (Stomach): এটি একটি থলির মতো অঙ্গ। এর প্রাচীর থেকে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড এবং পাচক রস ক্ষরিত হয়, যা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং প্রোটিন হজমে সাহায্য করে।
  • ক্ষুদ্রান্ত্র (Small Intestine): এটি প্রায় ৭.৫ মিটার দীর্ঘ একটি কুন্ডলী পাকানো নল। এখানে যকৃৎ (Liver) থেকে পিত্তরস এবং অগ্ন্যাশয় (Pancreas) থেকে অগ্ন্যাশয় রস এসে মেশে। ক্ষুদ্রান্ত্রে সম্পূর্ণ পরিপাক সম্পন্ন হয় এবং খাদ্যের সারবস্তু রক্তে শোষিত হয়।
  • বৃহদান্ত্র (Large Intestine): এটি ক্ষুদ্রান্ত্রের চেয়ে চওড়া কিন্তু ছোট। এখানে অপাচ্য খাদ্য থেকে জল শোষিত হয় এবং মল তৈরি হয়।
  • মলদ্বার (Anus): এর মাধ্যমে অপাচ্য বর্জ্য পদার্থ দেহ থেকে বাইরে নিষ্কাশিত হয়।

৩. ঘাস খাওয়া প্রাণীদের পরিপাক বা রোমন্থন

গরু, ছাগল বা মহিষের মতো তৃণভোজী প্রাণীরা দ্রুত ঘাস গিলে রুুমেন (Rumen) নামক একটি বিশেষ অঙ্গে জমা করে। একে আংশিক পরিপাক খাদ্য বা 'কাড' (Cud) বলে। পরে এই কাড মুখে ফিরে আসে এবং প্রাণীটি তা ভালোভাবে চিবিয়ে নেয়। এই প্রক্রিয়াকে রোমন্থন (Rumination) বলে। ঘাসে সেলুলোজ থাকে যা হজম করার জন্য বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার প্রয়োজন হয়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: লালারসের কাজ কী?

উত্তর: লালারস মুখের মধ্যে খাদ্যকে নরম ও পিচ্ছিল করে যাতে গিলতে সুবিধা হয়। লালারসে উপস্থিত উৎসেচক বা অ্যামাইলেজ খাদ্যের জটিল শর্করাকে সরল শর্করায় পরিণত করে।

প্রশ্ন ২: অ্যামিবার পরিপাক প্রক্রিয়া কীভাবে ঘটে?

উত্তর: অ্যামিবা তার ক্ষণপদের সাহায্যে খাদ্য কণা ঘিরে ধরে খাদ্য গহ্বর (Food vacuole) তৈরি করে। এই গহ্বরে পাচক রস নিঃসৃত হয় যা খাদ্যকে ভেঙে সরল উপাদানে পরিণত করে এবং কোষের সাইটোপ্লাজমে শোষিত হয়।

প্রশ্ন ৩: যকৃতের কাজ কী?

উত্তর: যকৃত হলো মানবদেহের সবচেয়ে বড় গ্রন্থি। এটি পিত্তরস (Bile juice) উৎপন্ন করে যা পিত্তথলিতে জমা থাকে। পিত্তরস চর্বি বা লিপিড জাতীয় খাদ্য হজম করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সারসংক্ষেপ

  • প্রাণীদের পুষ্টির মূল পর্যায়গুলি হলো: খাদ্যগ্রহণ, পরিপাক, শোষণ, আত্মীকরণ এবং বর্জন।
  • মানুষের মুখগহ্বর, গ্রাসনালী, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র নিয়ে পৌষ্টিকনালী গঠিত।
  • ক্ষুদ্রান্ত্রে খাদ্যের সমস্ত উপাদানের পরিপাক ও শোষণ সম্পূর্ণ হয়।
  • তৃণভোজী প্রাণীরা রোমন্থন বা জাবর কাটার মাধ্যমে সেলুলোজ জাতীয় খাদ্য হজম করে।