বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশের এই সুন্দর, রঙিন জগত আমরা কীভাবে দেখি? কীভাবে আমরা দিনের বেলায় সূর্য, রাতের আকাশে চাঁদ-তারা, বইয়ের অক্ষর বা বন্ধুদের মুখ দেখতে পাই? এই সমস্ত কিছুর পিছনে রয়েছে এক अद्भुत প্রাকৃতিক শক্তি, যার নাম আলো (Light)। আলো ছাড়া আমাদের জীবন কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। এটি কেবল আমাদের দেখতেই সাহায্য করে না, বরং উদ্ভিদ জগতের সালোকসংশ্লেষ থেকে শুরু করে পৃথিবীর আবহাওয়া পর্যন্ত প্রায় সবকিছুকেই প্রভাবিত করে।
অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞানের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমরা আলোর রহস্যময় জগত নিয়ে আলোচনা করব। আমরা জানব কীভাবে আলো চলে, কীভাবে এটি বিভিন্ন পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়, এবং সেই প্রতিফলনের নিয়মগুলো কী কী। আমরা আরও গভীরে গিয়ে দেখব কীভাবে আমাদের চোখ, যা প্রকৃতির এক অসাধারণ সৃষ্টি, এই আলোকে ব্যবহার করে আমাদের মস্তিষ্কে প্রতিবিম্ব তৈরি করে। এই অধ্যায়ে আমরা আলোর বিচ্ছুরণ, অর্থাৎ সাদা আলোর সাতটি রঙে ভেঙে যাওয়ার মতো আকর্ষণীয় ঘটনা এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতির মতো যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্পর্কেও জানব। চলুন, এই আলোকিত সফরে বেরিয়ে পড়া যাক এবং আমাদের দৃষ্টির পেছনের বিজ্ঞানকে সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
দৃশ্যমান জগত এবং আলোর ভূমিকা
প্রথমেই যে প্রশ্নটি মাথায় আসে, তা হলো - আমরা কোনো বস্তুকে দেখি কীভাবে? উত্তরটি খুব সহজ: আলোর সাহায্যে। যখন কোনো বস্তু থেকে আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়, তখনই আমরা সেই বস্তুটিকে দেখতে পাই। এই বস্তুগুলো দুই প্রকারের হতে পারে:
- স্বপ্রভ বস্তু (Luminous Objects): যে সমস্ত বস্তুর নিজস্ব আলো আছে, তাদের স্বপ্রভ বস্তু বলা হয়। যেমন - সূর্য, তারা, জ্বলন্ত মোমবাতি, বৈদ্যুতিক বাতি ইত্যাদি। এদের দেখার জন্য অন্য কোনো আলোর উৎসের প্রয়োজন হয় না।
- অপ্রভ বস্তু (Non-luminous Objects): যে সমস্ত বস্তুর নিজস্ব আলো নেই, তাদের অপ্রভ বস্তু বলা হয়। যেমন - চাঁদ, গ্রহ, বই, টেবিল, চেয়ার, আমাদের নিজেদের শরীর ইত্যাদি। এই বস্তুগুলির উপর যখন কোনো স্বপ্রভ বস্তু থেকে আলো এসে পড়ে এবং সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়, তখনই আমরা তাদের দেখতে পাই। উদাহরণস্বরূপ, আমরা চাঁদকে দেখতে পাই কারণ সূর্যের আলো চাঁদের পৃষ্ঠে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে। একইভাবে, একটি অন্ধকার ঘরে আপনি বই দেখতে পাবেন না, কিন্তু একটি বাতি জ্বালালে সেই বাতির আলো বইয়ের উপর পড়ে প্রতিফলিত হয় এবং আপনি বইটি দেখতে পান।
সুতরাং, কোনো কিছু দেখার জন্য দুটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক: একটি আলোর উৎস থাকা এবং সেই উৎস থেকে আলো বস্তুটির উপর পড়ে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসা।
আলোর প্রতিফলন (Reflection of Light)
আলো যখন কোনো তলের উপর পড়ে, তখন তার কিছু অংশ সেই তলে বাধা পেয়ে আবার প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে। এই ঘটনাকে আলোর প্রতিফলন বলা হয়। সহজ কথায়, একটি বলকে দেওয়ালে ছুঁড়ে মারলে যেমন সেটি ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে, আলোও কোনো চকচকে পৃষ্ঠে পড়লে অনেকটা সেভাবেই ফিরে আসে।
প্রতিফলন বোঝার জন্য আমাদের কয়েকটি বিষয় জানতে হবে:
- আপতিত রশ্মি (Incident Ray): যে আলোক রশ্মি কোনো তলের উপর এসে পড়ে, তাকে আপতিত রশ্মি বলে।
- প্রতিফলিত রশ্মি (Reflected Ray): তলের উপর আপতিত হওয়ার পর যে রশ্মিটি প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যায়, তাকে প্রতিফলিত রশ্মি বলে।
- আপতন বিন্দু (Point of Incidence): তলের যে বিন্দুতে আপতিত রশ্মি এসে পড়ে, তাকে আপতন বিন্দু বলে।
- অভিলম্ব (Normal): আপতন বিন্দুতে প্রতিফলক তলের উপর অঙ্কিত লম্বকে অভিলম্ব বলা হয়। এটি একটি কাল্পনিক রেখা যা প্রতিফলক তলের সাথে ৯০° কোণ করে থাকে।
- আপতন কোণ (Angle of Incidence - ∠i): আপতিত রশ্মি এবং অভিলম্বের মধ্যবর্তী কোণকে আপতন কোণ বলে।
- প্রতিফলন কোণ (Angle of Reflection - ∠r): প্রতিফলিত রশ্মি এবং অভিলম্বের মধ্যবর্তী কোণকে প্রতিফলন কোণ বলে।
প্রতিফলনের সূত্রাবলী (Laws of Reflection)
আলোর প্রতিফলন কোনো এলোমেলো ঘটনা নয়। এটি দুটি নির্দিষ্ট নিয়ম বা সূত্র মেনে চলে, যা সমস্ত ধরণের প্রতিফলক তলের (মসৃণ বা অমসৃণ) জন্য প্রযোজ্য।
প্রথম সূত্র: আপতন কোণ (∠i) এবং প্রতিফলন কোণ (∠r) সর্বদা সমান হয়। অর্থাৎ, ∠i = ∠r।
এর অর্থ হলো, আলো যে কোণে একটি তলের উপর পড়ে, ঠিক সেই কোণেই তলটি থেকে প্রতিফলিত হয়। যদি একটি টর্চের আলো আয়নার উপর ৩০° কোণে পড়ে, তবে সেটি ৩০° কোণেই প্রতিফলিত হবে।
দ্বিতীয় সূত্র: আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে প্রতিফলকের উপর অঙ্কিত অভিলম্ব সর্বদা একই সমতলে থাকে।
এই সূত্রটি বুঝতে, কল্পনা করুন একটি টেবিলের উপর আপনি একটি সাদা কাগজ রেখেছেন। আপনি যদি একটি লেজার লাইটকে কাগজের সমতল বরাবর আয়নার উপর ফেলেন, তাহলে প্রতিফলিত রশ্মিটিও কাগজের সমতল বরাবরই ফিরে যাবে; এটি কাগজ ছেড়ে উপরে বা নীচে চলে যাবে না। আপতিত রশ্মি, অভিলম্ব এবং প্রতিফলিত রশ্মি - এই তিনটিই ওই কাগজের সমতলেই থাকবে।
প্রতিফলনের প্রকারভেদ: নিয়মিত ও বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন
প্রতিফলক তলের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে প্রতিফলনকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
১. নিয়মিত প্রতিফলন (Regular Reflection)
যখন একগুচ্ছ সমান্তরাল আলোক রশ্মি কোনো মসৃণ ও চকচকে তলের উপর (যেমন - সমতল দর্পণ, স্থির জলের পৃষ্ঠ, পালিশ করা ধাতু) আপতিত হয়, তখন প্রতিফলনের পর রশ্মিগুলো একটি নির্দিষ্ট দিকে পরস্পরের সমান্তরালভাবেই ফিরে যায়। এই ধরনের প্রতিফলনকে নিয়মিত প্রতিফলন বলে। এই প্রতিফলনের ফলেই আমরা কোনো বস্তুর সুস্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখতে পাই। আয়নায় আমরা যে নিজের মুখ দেখি, তা নিয়মিত প্রতিফলনের একটি চমৎকার উদাহরণ।
২. বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন (Diffused Reflection)
যখন একগুচ্ছ সমান্তরাল আলোক রশ্মি কোনো অমসৃণ বা খসখসে তলের উপর (যেমন - দেওয়াল, বইয়ের পাতা, কাঠ, মাটি) আপতিত হয়, তখন প্রতিফলনের পর রশ্মিগুলো পরস্পরের সমান্তরাল না থেকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের প্রতিফলনকে বিক্ষিপ্ত বা অনিয়মিত প্রতিফলন বলে।
মনে রাখবেন: বিক্ষিপ্ত প্রতিফলনের ক্ষেত্রেও কিন্তু প্রতিফলনের সূত্রগুলো লঙ্ঘিত হয় না! অমসৃণ তলের প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশ ভিন্ন ভিন্ন কোণে অবস্থান করে, তাই প্রতিটি আলোক রশ্মির জন্য আপতন কোণ ভিন্ন হয়। ফলে, প্রতিটি রশ্মি প্রতিফলনের সূত্র মেনেই ভিন্ন ভিন্ন দিকে প্রতিফলিত হয় এবং চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিক্ষিপ্ত প্রতিফলনের জন্যই আমরা সেই সমস্ত বস্তু দেখতে পাই যেগুলি আয়নার মতো চকচকে নয়। একটি বইয়ের পাতা থেকে আলোর বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন হয় বলেই ঘরের বিভিন্ন কোণ থেকে আমরা পাতাটি দেখতে পাই। যদি বইয়ের পাতা থেকে নিয়মিত প্রতিফলন হতো, তবে কেবল একটি নির্দিষ্ট কোণ থেকেই অক্ষরগুলো দেখা যেত।
প্রতিবিম্ব (Image): সদ ও অসদ
দর্পণ বা কোনো প্রতিফলক তলের সামনে কোনো বস্তু রাখলে আমরা যা দেখি, তাকে প্রতিবিম্ব বলে। প্রতিবিম্ব দুই প্রকারের হয়:
- সদ প্রতিবিম্ব (Real Image): যখন কোনো বিন্দু থেকে আসা আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হওয়ার পর 실제로 অন্য কোনো বিন্দুতে মিলিত হয়, তখন সেই বিন্দুতে গঠিত প্রতিবিম্বকে সদ প্রতিবিম্ব বলে। এই প্রতিবিম্বকে পর্দায় ফেলা যায়। সিনেমার পর্দায় আমরা যে ছবি দেখি, তা সদ প্রতিবিম্বের উদাহরণ।
- অসদ প্রতিবিম্ব (Virtual Image): যখন কোনো বিন্দু থেকে আসা আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হওয়ার পর অন্য কোনো বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয় (কিন্তু বাস্তবে মিলিত হয় না), তখন সেই বিন্দুতে গঠিত প্রতিবিম্বকে অসদ প্রতিবিম্ব বলে। এই প্রতিবিম্বকে পর্দায় ফেলা যায় না। সমতল দর্পণে আমরা আমাদের যে প্রতিবিম্ব দেখি, তা একটি অসদ প্রতিবিম্ব। আমরা আয়নার পিছনে হাত দিয়ে প্রতিবিম্বটিকে ধরতে পারি না।
সমতল দর্পণে গঠিত প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য
আমরা প্রতিদিন যে আয়না ব্যবহার করি, তা হলো সমতল দর্পণ। এতে গঠিত প্রতিবিম্বের কয়েকটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
- অসদ ও সমশীর্ষ: প্রতিবিম্বটি অসদ হয় (পর্দায় ফেলা যায় না) এবং সমশীর্ষ হয় (বস্তুর মাথা যেদিকে, প্রতিবিম্বের মাথাও সেদিকে থাকে)।
- বস্তুর আকারের সমান: প্রতিবিম্বের আকার বস্তুর আকারের সমান হয়। আপনি লম্বা হলে আপনার প্রতিবিম্বও লম্বা হবে।
- সমান দূরত্বে গঠিত: দর্পণ থেকে বস্তুর দূরত্ব যত, দর্পণের পিছনে প্রতিবিম্বের দূরত্বও ঠিক তত। আপনি আয়নার দিকে এক পা এগোলে, আপনার প্রতিবিম্বও এক পা এগিয়ে আসবে।
- পার্শ্বীয় পরিবর্তন (Lateral Inversion): প্রতিবিম্বের পার্শ্বীয় পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ, বস্তুর ডান দিককে প্রতিবিম্বের বাম দিক এবং বস্তুর বাম দিককে প্রতিবিম্বের ডান দিক বলে মনে হয়। এই কারণেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ডান হাত নাড়ালে মনে হয় প্রতিবিম্বটি তার বাম হাত নাড়াচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স গাড়ির সামনে ‘AMBULANCE’ শব্দটি উল্টো করে লেখা থাকে যাতে সামনের গাড়ির চালক তার রিয়ার-ভিউ মিররে শব্দটিকে পার্শ্বীয় পরিবর্তনের ফলে সোজাভাবে পড়তে পারে।
আলোর বিচ্ছুরণ (Dispersion of Light)
আমরা সাধারণত যে সাদা আলো দেখি, যেমন সূর্যের আলো বা বাল্বের আলো, তা আসলে একটিমাত্র রঙের আলো নয়। এটি সাতটি ভিন্ন রঙের আলোর মিশ্রণ। এই সাতটি রঙ হলো - বেগুনী (Violet), নীল (Indigo), আকাশি (Blue), সবুজ (Green), হলুদ (Yellow), কমলা (Orange) এবং লাল (Red)। এদেরকে সংক্ষেপে 'বেনীআসহকলা' (VIBGYOR) বলা হয়।
যখন সাদা আলোর রশ্মি কোনো প্রিজমের (Prism) মতো প্রতিসারক মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে যায়, তখন এটি তার উপাদান সাতটি রঙে বিশ্লিষ্ট হয়ে যায়। সাদা আলোর এই সাতটি মূল রঙে ভেঙে যাওয়ার ঘটনাকে আলোর বিচ্ছুরণ বলা হয়। এই রঙের পটিকে বর্ণালী (Spectrum) বলে।
রামধনু (Rainbow) আলোর বিচ্ছুরণের একটি প্রাকৃতিক এবং সুন্দর উদাহরণ। বৃষ্টির পর বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকা ছোট ছোট জলের কণাগুলো প্রিজমের মতো কাজ করে। যখন সূর্যের আলো এই জলের কণাগুলির মধ্যে দিয়ে যায়, তখন আলোর বিচ্ছুরণ এবং অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে, যার ফলে আকাশে আমরা সাত রঙের রামধনু দেখতে পাই।
মানব চক্ষু: আমাদের প্রাকৃতিক ক্যামেরা
আমাদের চোখ হলো প্রকৃতির তৈরি এক বিস্ময়কর অপটিক্যাল যন্ত্র, যা একটি ক্যামেরার মতোই কাজ করে। এটি আমাদের চারপাশের জগতের ছবি দেখতে সাহায্য করে। চলুন, চোখের প্রধান অংশ এবং তাদের কাজ সম্পর্কে জানি:
- কর্নিয়া (Cornea): এটি চোখের সামনের স্বচ্ছ অংশ। আলো প্রথমে কর্নিয়ার মধ্যে দিয়েই চোখে প্রবেশ করে। এটি চোখের বাইরের স্তরকে রক্ষা করে।
- আইরিস বা কনীনিকা (Iris): কর্নিয়ার পিছনে অবস্থিত একটি রঙিন পর্দা হলো আইরিস। এটিই চোখের রঙ নির্ধারণ করে (যেমন - কালো, বাদামী বা নীল)। এর প্রধান কাজ হলো পিউপিলের আকার নিয়ন্ত্রণ করে চোখে প্রবেশ করা আলোর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা।
- পিউপিল বা তারারন্ধ্র (Pupil): আইরিসের মাঝখানে থাকা ছোট কালো ছিদ্রটি হলো পিউপিল। এর মধ্যে দিয়েই আলো চোখের ভিতরে প্রবেশ করে। উজ্জ্বল আলোতে আইরিস সংকুচিত হয়ে পিউপিলকে ছোট করে দেয় যাতে কম আলো প্রবেশ করে, আবার কম আলোতে আইরিস প্রসারিত হয়ে পিউপিলকে বড় করে দেয় যাতে বেশি আলো প্রবেশ করতে পারে।
- লেন্স (Lens): পিউপিলের পিছনে একটি স্বচ্ছ, নমনীয় উত্তল লেন্স থাকে। এই লেন্সটি চোখে প্রবেশ করা আলোক রশ্মিকে প্রতিসৃত করে রেটিনার উপর ফোকাস করে একটি সদ ও উল্টো প্রতিবিম্ব তৈরি করে। সিলিয়ারি পেশি (Ciliary muscles) লেন্সের ফোকাস দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করে আমাদের কাছের এবং দূরের বস্তু স্পষ্টভাবে দেখতে সাহায্য করে।
- রেটিনা (Retina): এটি চোখের পিছনের একটি আলোক-সংবেদী পর্দা, অনেকটা ক্যামেরার ফিল্ম বা সেন্সরের মতো। লেন্স দ্বারা গঠিত প্রতিবিম্ব রেটিনার উপরেই তৈরি হয়। রেটিনায় দুই ধরণের আলোক-সংবেদী কোষ থাকে:
- রড কোষ (Rods): এই কোষগুলি অনুজ্জ্বল বা কম আলোতে সংবেদনশীল। এরা আমাদের অন্ধকারে দেখতে সাহায্য করে, কিন্তু রঙ চিনতে পারে না।
- কোন কোষ (Cones): এই কোষগুলি উজ্জ্বল আলোতে সংবেদনশীল এবং বিভিন্ন রঙ শনাক্ত করতে পারে। কোনো ব্যক্তির চোখে কোন কোষের অভাব থাকলে তিনি বর্ণান্ধ (Colour blind) হতে পারেন।
- অপটিক স্নায়ু (Optic Nerve): রড ও কোন কোষ আলোক শক্তিকে তড়িৎ সংকেতে রূপান্তরিত করে। অপটিক স্নায়ু এই সংকেতগুলোকে রেটিনা থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়।
- অন্ধবিন্দু (Blind Spot): রেটিনা এবং অপটিক স্নায়ুর সংযোগস্থলে কোনো আলোক-সংবেদী কোষ (রড বা কোন) থাকে না। তাই এই বিন্দুতে কোনো প্রতিবিম্ব গঠিত হলে তা দেখা যায় না। একে অন্ধবিন্দু বলে।
মস্তিষ্ক অপটিক স্নায়ু থেকে প্রাপ্ত সংকেতগুলোকে বিশ্লেষণ করে এবং রেটিনায় গঠিত উল্টো প্রতিবিম্বকে সোজা করে দেখায়। এভাবেই আমরা আমাদের চারপাশের জগতকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারি।
দৃষ্টির যত্ন এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য সমাধান
চোখ আমাদের জন্য একটি অমূল্য সম্পদ, তাই এর যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
চোখের যত্ন নেওয়ার কিছু উপায়:
- খুব কম বা খুব বেশি আলোতে পড়াশোনা করা উচিত নয়। এতে চোখের উপর চাপ পড়ে।
- সরাসরি সূর্য বা অন্য কোনো শক্তিশালী আলোর উৎসের দিকে তাকানো উচিত নয়।
- চোখ কখনোই ঘষা উচিত নয়। চোখে ধুলোবালি পড়লে পরিষ্কার জল দিয়ে আলতো করে ধুয়ে ফেলতে হবে।
- পড়ার সময় বই এবং চোখের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব (প্রায় ২৫ সেমি) বজায় রাখা উচিত।
- ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার, যেমন - গাজর, পালং শাক, আম, পেঁপে, দুধ, ডিম ইত্যাদি খাওয়া চোখের জন্য উপকারী। ভিটামিন-এ এর অভাবে রাতকানা রোগ হতে পারে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতি (Braille System)
কিছু মানুষ জন্মগতভাবে বা কোনো রোগের কারণে দৃষ্টিশক্তিহীন হন। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও তারা পড়ালেখা করতে পারেন। তাদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো ব্রেইল পদ্ধতি।
ফরাসি শিক্ষাবিদ লুইস ব্রেইল (Louis Braille), যিনি নিজেও একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছিলেন, ১৮২১ সালে এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ব্রেইল হলো একটি স্পর্শ-ভিত্তিক লিখন পদ্ধতি। এতে একটি আয়তক্ষেত্রাকার কাঠামোর মধ্যে ৬টি বিন্দুকে বিভিন্নভাবে উঁচু করে সাজিয়ে অক্ষর, সংখ্যা এবং বিরাম চিহ্ন তৈরি করা হয়। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আঙুলের ডগা দিয়ে এই উঁচু বিন্দুগুলো স্পর্শ করে লেখা পড়তে পারেন। বর্তমানে ব্রেইল পদ্ধতি আধুনিক প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হয়ে কম্পিউটার এবং অন্যান্য ডিভাইসেও ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জ্ঞানার্জনের পথকে আরও সুগম করেছে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: যদি কোনো রুক্ষ পৃষ্ঠে, যেমন দেওয়ালে, আলোর প্রতিফলন হয়, তাহলে কি প্রতিফলনের সূত্রগুলি ব্যর্থ হয়?
উত্তর: না, প্রতিফলনের সূত্রগুলি ব্যর্থ হয় না। বিক্ষিপ্ত প্রতিফলনের ক্ষেত্রেও প্রতিটি আলোক রশ্মি প্রতিফলনের দুটি সূত্র মেনেই প্রতিফলিত হয়। কিন্তু যেহেতু দেওয়ালের মতো রুক্ষ পৃষ্ঠের প্রতিটি বিন্দু ভিন্ন ভিন্ন দিকে মুখ করে থাকে, তাই প্রতিটি আপতিত রশ্মির জন্য অভিলম্বের দিকও ভিন্ন হয়। এর ফলে, আপতন কোণ সমান প্রতিফলন কোণ (∠i = ∠r) হওয়া সত্ত্বেও প্রতিফলিত রশ্মিগুলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাই কোনো সুস্পষ্ট প্রতিবিম্ব তৈরি হয় না, কিন্তু আমরা বস্তুটি দেখতে পাই।
প্রশ্ন ২: পেঁচা রাতের বেলায় কীভাবে মানুষের চেয়ে ভালোভাবে দেখতে পায়?
উত্তর: পেঁচার চোখের গঠন রাতের বেলা দেখার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। প্রথমত, তাদের কর্নিয়া এবং পিউপিল অনেক বড় হয়, যা চোখে বেশি পরিমাণ আলো প্রবেশ করতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাদের রেটিনায় রড কোষের (Rods) সংখ্যা মানুষের তুলনায় অনেক বেশি থাকে এবং কোন কোষের (Cones) সংখ্যা খুব কম থাকে। যেহেতু রড কোষ কম আলোতে সংবেদনশীল, তাই পেঁচারা রাতের অন্ধকারেও খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পায়।
প্রশ্ন ৩: সমতল দর্পণে আমাদের ডান হাতকে বাম হাত বলে মনে হয় কেন? এই ঘটনাকে কী বলে?
উত্তর: এই ঘটনাটিকে পার্শ্বীয় পরিবর্তন (Lateral Inversion) বলা হয়। সমতল দর্পণ বস্তুর প্রতিবিম্ব তৈরি করার সময় ডান এবং বাম দিককে উল্টে দেয়। অর্থাৎ, বস্তুর ডান অংশ প্রতিবিম্বের বাম অংশে এবং বস্তুর বাম অংশ প্রতিবিম্বের ডান অংশে দেখা যায়। এটি দর্পণের জ্যামিতিক প্রতিফলনের ফল। এই কারণেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ডান হাত নাড়ালে মনে হয় প্রতিবিম্বটি তার বাম হাত নাড়াচ্ছে।
প্রশ্ন ৪: সিনেমার পর্দায় যে ছবি দেখা যায়, তা কি সদ প্রতিবিম্ব না অসদ প্রতিবিম্ব? কেন?
উত্তর: সিনেমার পর্দায় যে ছবি দেখা যায়, তা একটি সদ প্রতিবিম্ব (Real Image)। এর কারণ হলো, প্রজেক্টর থেকে আসা আলোক রশ্মিগুলো লেন্সের মাধ্যমে প্রতিসৃত হওয়ার পর বাস্তবে পর্দার উপর মিলিত হয় এবং প্রতিবিম্ব গঠন করে। যে কোনো প্রতিবিম্বকে যদি পর্দায় ফেলা বা ধারণ করা যায়, তবে সেটি সদ প্রতিবিম্ব। অসদ প্রতিবিম্বকে পর্দায় ফেলা যায় না, যেমন সমতল দর্পণে গঠিত আমাদের প্রতিবিম্ব।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায় থেকে আমরা যা কিছু শিখলাম, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক:
- আলোর উপস্থিতির কারণেই আমরা বস্তু দেখতে পাই। আলো বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এলে আমরা তা দেখি।
- আলোর প্রতিফলন দুটি সূত্র মেনে চলে: (i) আপতন কোণ ও প্রতিফলন কোণ সমান (∠i = ∠r), এবং (ii) আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি ও অভিলম্ব একই সমতলে থাকে।
- প্রতিফলন দুই প্রকার: মসৃণ তলে নিয়মিত প্রতিফলন এবং অমসৃণ তলে বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন।
- সমতল দর্পণ সর্বদা অসদ, সমশীর্ষ, বস্তুর সমান আকারের এবং পার্শ্বীয়ভাবে পরিবর্তিত প্রতিবিম্ব গঠন করে।
- সাদা আলো আসলে সাতটি রঙের (বেনীআসহকলা) মিশ্রণ। প্রিজমের মাধ্যমে সাদা আলোকে তার উপাদান রঙে বিশ্লিষ্ট করার ঘটনাকে আলোর বিচ্ছুরণ বলে।
- মানব চক্ষু একটি প্রাকৃতিক ক্যামেরার মতো কাজ করে। এটি কর্নিয়া, আইরিস, পিউপিল, লেন্স এবং রেটিনার সাহায্যে বস্তুর প্রতিবিম্ব গঠন করে, যা অপটিক স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়।
- রেটিনায় থাকা রড কোষ কম আলোতে এবং কোন কোষ উজ্জ্বল আলো ও রঙ দেখতে সাহায্য করে।
- দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা স্পর্শের মাধ্যমে পড়ার জন্য ব্রেইল পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা লুইস ব্রেইল আবিষ্কার করেছিলেন।