প্রেম আর উপহার যেন একে অপরের পরিপূরক। প্রিয় মানুষটির মন জয় করতে একটা ছোট্ট উপহারই অনেক সময় ম্যাজিকের মতো কাজ করে। ফুল, চকোলেট বা একটা সুন্দর কার্ড—এই ছোট ছোট জিনিসগুলো ভালোবাসার প্রকাশকে আরও মধুর করে তোলে। কিন্তু একবার ভাবুন তো, যদি সেই সুন্দর করে মোড়ানো উপহারের বাক্সটা খোলার পর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সম্পূর্ণ অর্থহীন বা নকল কিছু? ভালোবাসায় এমন ছলনা কি মেনে নেওয়া যায়? মানুষের জগতে এমনটা হলে হয়তো সম্পর্কটাই ভেঙে যাবে! তবে প্রকৃতির রাজ্যে এমন এক প্রেমিক আছে, যে এই নকল উপহার দিয়েই জিতে নেয় তার প্রেমিকার মন। চলুন, আজ শুনি সেই চালাক প্রেমিকের মজাদার গল্প।
উপহারে ছলনা, ভালোবাসার জয়!
ভালোবাসার জন্য মানুষ কত কিছুই না করে! কেউ তাজমহল গড়ে, কেউ পাহাড় কাটে। কিন্তু সবাই যে এমন বিশাল কিছু করে, তা তো নয়। বেশিরভাগ প্রেমিকই নিজের সাধ্যমতো সেরা উপহারটি তুলে দিতে চায় তার ভালোবাসার মানুষটির হাতে। এই উপহার দেওয়াটা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পশুপাখিদের জগতেও এর চল রয়েছে। তবে আজ আমরা যে প্রেমিকের কথা বলছি, সে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে একটু অন্য পথের পথিক। সে ভালোবাসার জন্য খরচ করে, কিন্তু সেই খরচে মিশে থাকে একটুখানি চালাকি আর অনেকখানি বুদ্ধির খেলা।
পৃথিবীতে এমন এক প্রজাতির মাকড়সা আছে, যারা তাদের প্রেমিকাকে সত্যিকারের উপহারের বদলে নকল বা অর্থহীন কিছু একটা সুন্দর করে সিল্ক দিয়ে মুড়ে উপহার দেয়, আর তাতেই জিতে নেয় প্রেমিকার মন!
গল্পের নায়ক হলো ‘নার্সারি ওয়েব স্পাইডার’ (Nursery Web Spider) বা ‘Pisaura mirabilis’। এই প্রজাতির পুরুষ মাকড়সারা তাদের প্রেম নিবেদনের সময় এক অদ্ভুত কৌশলের আশ্রয় নেয়। সাধারণত, পুরুষ মাকড়সা একটি শিকার ধরে, যেমন একটি মাছি বা অন্য কোনো পোকা, এবং সেটাকে নিজের শরীর থেকে বের হওয়া সিল্ক দিয়ে খুব সুন্দর করে মুড়ে ফেলে। এরপর সেই ‘নুপশিয়াল গিফট’ (nuptial gift) বা বিয়ের উপহার নিয়ে সে নারী মাকড়সার কাছে হাজির হয়। নারী মাকড়সা সেই উপহার পেয়ে খুশি হয় এবং পুরুষটিকে তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ দেয়। যতক্ষণ নারী মাকড়সা সেই খাবারটি খেতে ব্যস্ত থাকে, পুরুষ মাকড়সা তার কাজ সেরে নেয়। ব্যাপারটা অনেকটা ক্যান্ডেললাইট ডিনারের মতো, তবে একটু অন্যরকম আর কি!
কিন্তু গল্পের আসল মজাটা এখানেই। সব পুরুষ নার্সারি ওয়েব স্পাইডার এত সৎ বা পরিশ্রমী হয় না। কিছু চালাক বা বলা যেতে পারে ‘ফাঁকিবাজ’ পুরুষ মাকড়সা রয়েছে, যারা শিকার ধরার কষ্টটাই করতে চায় না। তারা উপহার দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই উপহারের ভেতরে কোনো সুস্বাদু খাবার থাকে না। তারা হয়তো একটা শুকনো পাতার টুকরো, ফুলের একটা অংশ, বা আগে খেয়ে ফেলা কোনো পোকার খোসা যত্ন করে সিল্ক দিয়ে মুড়ে ফেলে। বাইরের দিক থেকে দেখলে বোঝার কোনো উপায়ই নেই যে প্যাকেটের ভেতরে আসল জিনিস নেই! সবকিছুই নিখুঁত, শুধু আসল সারপ্রাইজটাই গায়েব।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, নারী মাকড়সা এই চালাকিটা সঙ্গে সঙ্গে ধরতে পারে না। সে সুন্দর মোড়ানো উপহারটি গ্রহণ করে এবং পুরুষটিকে তার কাঙ্ক্ষিত সুযোগ দেয়। যখন সে উপহারটি খুলতে শুরু করে, ততক্ষণে পুরুষ মাকড়সার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যায়। যদিও গবেষণায় দেখা গেছে, নকল উপহার পেলে নারী মাকড়সা খুব দ্রুত মিলন পর্ব শেষ করে দেয়, কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়েই যায়। অর্থাৎ, এই ছোট্ট ছলনার মাধ্যমেও পুরুষ মাকড়সা তার প্রেমকে সফল করে তোলে।
এই ঘটনাটা আমাদের কী শেখায়? ভালোবাসায় সততা জরুরি, কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম বড়ই অদ্ভুত। এখানে টিকে থাকার জন্য আর নিজের বংশবিস্তার করার জন্য প্রত্যেকেই নিজ নিজ কৌশল খুঁজে নেয়। এই মাকড়সার গল্পটা একদিকে যেমন মজার, তেমনই প্রকৃতির বিচিত্র নিয়মকানুনের এক দারুণ উদাহরণ। তাই পরেরবার যখন কেউ আপনাকে কোনো উপহার দেবে, তখন মোড়কটা দেখেই গলে যাবেন না, ভেতরটাও একটু দেখে নেবেন! কে বলতে পারে, হয়তো নার্সারি ওয়েব স্পাইডারের কোনো অনুকরণকারী আপনার আশেপাশেই রয়েছে!