প্রেমের ‘মধুচন্দ্রিমা’! কিন্তু চাঁদের সাথে মধুর সম্পর্কটা কী?
বিয়ে মানেই একরাশ স্বপ্ন, নতুন শুরু আর একরাশ উত্তেজনা। আর এই নতুন শুরুর সবচেয়ে রোমান্টিক পর্বটার নাম হলো ‘হানিমুন’ বা ‘মধুচন্দ্রিমা’। নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীল সমুদ্র, পাহাড়ের চূড়া অথবা কোনো এক নির্জন দ্বীপে একে অপরের হাত ধরে বসে থাকা দুটি মানুষের ছবি। শব্দটা শুনলেই কেমন যেন একটা মিষ্টি মিষ্টি অনুভূতি হয়, তাই না? কিন্তু আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন, এই ‘মধু’ আর ‘চাঁদ’-এর ব্যাপারটা আসলে কী? কেন নবদম্পতির প্রথম ভ্রমণকে এমন কাব্যিক নামে ডাকা হয়? চলুন, আজ সেই গল্পের গভীরে ডুব দেওয়া যাক। আর বলে রাখি, গল্পটা যতটা মিষ্টি ভাবছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি মজাদার, অদ্ভুত এবং কিছুটা টক-ঝাল-মিষ্টি মেশানো!
মধু আর মদের স্রোতে ভেসে যাওয়া এক মাস!
কল্পনা করুন তো, আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগের কথা। সেই পঞ্চম শতকের ইউরোপ বা তারও আগের ব্যাবিলনে। সেখানে এক অদ্ভুত প্রথা চালু ছিল। বিয়ের পর, কনের বাবা তার নতুন জামাইকে মাসজুড়ে আপ্যায়ন করতেন। তবে যে সে আপ্যায়ন নয়! জামাইকে দেওয়া হতো অফুরন্ত ‘মিড’ (Mead) অর্থাৎ মধু থেকে তৈরি এক বিশেষ ধরনের মদ। বিশ্বাস করা হতো, এই মধু-মদ উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং নবদম্পতির জীবনকে মধুর করে তোলে। আর তখনকার ক্যালেন্ডার ছিল চাঁদ নির্ভর, তাই এক মাস সময়কে বলা হতো এক ‘মুন’ বা এক চান্দ্র মাস।
এই এক মাস ধরে মধু-মদ পানের প্রথা থেকেই জন্ম হয়েছিল ‘হানি মান্থ’ বা ‘মধু মাস’ কথাটির, যা সময়ের সাথে সাথে আমাদের পরিচিত ‘হানিমুন’ হয়ে উঠেছে।
ভাবুন একবার, বিয়ের পর পুরো এক মাস ধরে শ্বশুরবাড়ির টাকায় অফুরন্ত পানীয়! আজকের দিনে এমনটা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াতো, বলুন তো? তবে এটাই ছিল ‘হানিমুন’ শব্দের সবচেয়ে পুরনো এবং اصلی ধারণা। এটা ছিল ভালোবাসার চেয়েও বেশি করে এক সামাজিক প্রথা, যা নতুন সম্পর্ককে মজবুত করার এক অদ্ভুত উপায় ছিল।
সবই কি এত মিষ্টি? নাকি পেছনে আছে বিদ্রূপের কাঁটা?
গল্পটা যদি শুধু মধু-মদে এসেই থেমে যেত, তাহলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু এর সাথে জুড়ে আছে একরাশ witty বা রসিকতাপূর্ণ বিদ্রূপ! ষোড়শ শতকের দিকে ইংরেজ লেখক স্যামুয়েল জনসন এর এক নতুন ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি বললেন, নবদম্পতির ভালোবাসাটা ঠিক মধুর মতোই মিষ্টি, কিন্তু সেটা চাঁদের মতো পরিবর্তনশীল। চাঁদ যেমন পূর্ণিমাতে তার সম্পূর্ণ রূপে পৌঁছানোর পরেই ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করে, ঠিক তেমনই বিয়ের প্রথম দিকের সেই তীব্র প্রেম আর আবেগও নাকি সময়ের সাথে সাথে কমতে থাকে।
কী ভাবছেন? বেশ হতাশাজনক কথা, তাই না? রিচার্ড হুলোয়েট নামের আরেকজন লেখক ১৫৫২ সালে এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে বলেন যে, "Hony mone, a term proverbially applied to such as be newly married, which will not fall out at the first, but th'one loveth the other at the beginning exceedingly..." অর্থাৎ, নতুন বিয়ের প্রথম দিকে ভালোবাসা উপচে পড়লেও, কিছুদিন পরেই তা কমে যেতে পারে। সুতরাং, ‘হানিমুন’ শব্দটি একসময় ছিল নবদম্পতির জন্য এক মিষ্টি সতর্কবার্তা! এটা মনে করিয়ে দিত যে, এই মধুর সময়টা হয়তো চিরস্থায়ী নয়।
তাহলে আজকের হানিমুন কীভাবে এলো?
বাবিলনের মধু-মদ আর ষোড়শ শতকের রসিকতা পেরিয়ে আজকের এই रोमांटिक হানিমুনের ধারণা এলো কীভাবে? এর জন্য আমাদের ধন্যবাদ জানানো উচিত ১৯ শতকের ব্রিটিশ উচ্চবিত্ত সমাজকে। তখন এক নতুন প্রথা চালু হলো, যার নাম ছিল ‘ব্রাইডাল ট্যুর’ (Bridal tour)। নবদম্পতিরা বিয়ের পর সেইসব আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের বাড়ি ঘুরতে যেতেন, যারা বিয়েতে আসতে পারেননি। ধীরে ধীরে এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য বদলাতে শুরু করে। আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার বদলে নবদম্পতিরা নিজেদের মতো করে একান্তে সময় কাটানোর জন্য দূরে কোথাও ঘুরতে যেতে শুরু করলেন। আর এভাবেই জন্ম হলো আমাদের আজকের আধুনিক হানিমুনের।
আজ ‘হানিমুন’ শব্দটার সাথে কোনো বিদ্রূপ বা প্রাচীন প্রথার চেয়েও বেশি জড়িয়ে আছে ভালোবাসা, বোঝাপড়া আর একসাথে নতুন জীবন শুরু করার আনন্দ। এর নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসটা হয়তো একটু অদ্ভুত, একটু টক-মিষ্টি। কিন্তু এটাই তো মজা! আপনার ভালোবাসার মানুষটির সাথে যখন পরেরবার কোথাও ঘুরতে যাবেন, তখন এই গল্পটা তাকে শুনিয়ে দেবেন। দেখবেন, আপনাদের মিষ্টি সময়ে এক নতুন মজাদার অধ্যায় যুক্ত হয়ে গেছে। কারণ, সব মিষ্টি গল্পের পেছনেই তো একটু টক-ঝাল-মিষ্টি ইতিহাস লুকিয়ে থাকে, তাই না?