ভালোবাসার গল্পে কত কিছুই না হয়! কেউ তাজমহল গড়ে, কেউ পাহাড় কাটে, আবার কেউ সাত সাগর তেরো নদী পাড়ি দেয়। কিন্তু যদি বলি, ভালোবাসার জন্য কেউ নিজের বয়সকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেয়? বুড়ো হয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসে শৈশবে, শুধুমাত্র নতুন করে জীবনটা শুরু করার জন্য? অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে, তাই না? কিন্তু আমাদের এই পৃথিবীতে এমন একজন প্রেমিক সত্যিই আছে। তবে সে কোনো राजकुमार নয়, বরং সাগরের গভীরের এক বিস্ময়কর বাসিন্দা!
কে এই আজব প্রেমিক?
এই প্রেমিকের নাম Turritopsis dohrnii, তবে ভালোবাসার জগতে সে 'অমর জেলিফিশ' নামেই বেশি পরিচিত। এই ছোট্ট, স্বচ্ছ প্রাণীটি আকারে আপনার কড়ে আঙুলের নখের চেয়েও ছোট। কিন্তু তার ক্ষমতার কথা শুনলে চমকে উঠবেন। সাধারণ নিয়ম হলো, জন্মালে মরতে হবে। কিন্তু এই জেলিফিশ প্রকৃতির এই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিব্যি বেঁচে থাকে। ঠিক যেন সিনেমার বেঞ্জামিন বাটন, যার বয়স বাড়ার বদলে কমে! আর এই অদ্ভুত ক্ষমতার পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্যরকম ভালোবাসার দর্শন।
ভাবুন তো, জীবন সায়াহ্নে এসে আপনার মনে হলো, "ইশ! যদি আরেকবার প্রথম থেকে সবটা শুরু করা যেত?" এই জেলিফিশ কিন্তু শুধু ভাবনায় থেমে থাকে না, কাজটা করেও দেখায়। যখন সে বার্ধক্যের শিকার হয়, অসুস্থ হয়ে পড়ে বা কোনোভাবে আঘাত পায়, তখন সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার বদলে এক অদ্ভুত পথ বেছে নেয়।
পৃথিবীতে এটিই একমাত্র পরিচিত প্রাণী, যে যৌন পরিপক্কতা লাভের পরেও নিজের জীবনচক্রকে সম্পূর্ণ উল্টোদিকে ঘুরিয়ে শৈশবের ‘পলিপ’ দশায় ফিরে যেতে পারে এবং নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে।
কীভাবে সম্ভব এই টাইম-ট্র্যাভেল?
এই জেলিফিশের জীবনচক্র দুটো ধাপে বিভক্ত। শৈশবে সে থাকে 'পলিপ' (Polyp) রূপে, যা সমুদ্রের তলায় কোনো পাথরের সাথে আটকে থাকে। আর প্রাপ্তবয়স্ক হলে সে মুক্তভাবে সাঁতার কেটে বেড়ায়, যাকে আমরা 'মেডুসা' (Medusa) বা জেলিফিশ বলি। সাধারণ জেলিফিশরা মেডুসা দশায় কিছুদিন বেঁচে থাকার পর মারা যায়। কিন্তু আমাদের গল্পের নায়ক এখানেই আলাদা।
যখন Turritopsis dohrnii বিপদের সম্মুখীন হয়, তখন সে নিজের টেনট্যাকল বা শুঁড়গুলো গুটিয়ে নেয়, শরীরটাকে একটা ছোট্ট বলের মতো বানিয়ে ফেলে এবং সমুদ্রের গভীরে স্থির হয়ে বসে পড়ে। এরপর শুরু হয় তার আসল ম্যাজিক! 'ট্রান্সডিফারেন্সিয়েশন' (Transdifferentiation) নামক এক বিরল কোষীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে তার পরিণত কোষগুলোকে একেবারে নতুন কোষে রূপান্তরিত করে ফেলে। সোজা কথায়, সে নিজের শরীরকে রিসেট করে শৈশবের পলিপ দশায় ফিরে যায়। সেখান থেকে আবার নতুন করে মেডুসার জন্ম হয়, যারা জিনগতভাবে আগের জেলিফিশটির হুবহু ক্লোন।
ভালোবাসার জন্য অমরত্ব
এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই অদ্ভুত ক্ষমতা? বিজ্ঞানীরা বলেন, এটা তার বেঁচে থাকার কৌশল। কিন্তু আমরা তো গল্পের মানুষ, আমরা এর মধ্যে ভালোবাসা খুঁজে নিতেই পারি। कल्पना করুন, অনন্তকাল ধরে সাগরের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে এক জেলিফিশ। হয়তো কোনোদিন সে তার সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু সে হাল ছাড়েনি। মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে বারবার ফিরে আসে সে, শৈশবে। নতুন করে জীবন শুরু করে, এই আশায় যে আবার হয়তো দেখা হবে! তার এই অমরত্ব যেন এক অন্তহীন অপেক্ষা।
এই জেলিফিশের কাছে মৃত্যু মানে শেষ নয়, বরং নতুন করে শুরু করার একটা সুযোগ। সে আমাদের শেখায়, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, ফিরে আসা যায়। ভালোবাসা ফুরিয়ে যায় না, শুধু নতুন করে নিজেকে খুঁজে নেওয়ার অপেক্ষায় থাকে। যদিও বিজ্ঞানীরা বলেন যে, অন্য কোনো প্রাণী এদের খেয়ে ফেললে বা রোগে আক্রান্ত হলে এরা মারা যেতে পারে। তাই এদের অমরত্ব আসলে বার্ধক্যজনিত মৃত্যুকে হার মানানো।
তবে সত্যিটা হলো, এই ছোট্ট প্রাণীটির অসাধারণ ক্ষমতা আমাদের অবাক করে দেয়। ১৯৮৮ সালে এক জার্মান ছাত্র ঘটনাচক্রে প্রথম এই বিষয়টি আবিষ্কার করেন। তখন থেকে বিজ্ঞানীরা এই জেলিফিশের অমরত্বের রহস্য নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন। কে জানে, হয়তো একদিন এই ছোট্ট প্রেমিকের কাছ থেকেই মানুষও বয়সকে হার মানানোর অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে!
শেষ পর্যন্ত, Turritopsis dohrnii-এর গল্পটা শুধু বিজ্ঞানের নয়, এ এক আশার গল্প, এক অন্তহীন ভালোবাসার গল্প। যে গল্প আমাদের বলে, সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও মরে না, প্রয়োজনে শৈশবে ফিরে গিয়ে আবার নতুন করে শুরু হয়।