বিয়েবাড়ি মানেই হইচই, আনন্দ, আর একরাশ রঙিন ছবি। বর-বউয়ের ঠিক পাশেই ঝলমল করতে থাকেন একদল বন্ধু—ব্রাইডスメড আর গ্রুমসમેন। দেখতে কী ভালোই না লাগে! মনে হয়, ভালোবাসার এই সুন্দর মুহূর্তটায় কাছের মানুষেরা যেন এক একটা রঙিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন, এই যে বন্ধুরা বর-বউয়ের পাশে প্রায় একই রকম সেজেগুজে দাঁড়িয়ে থাকেন, এর পেছনের কারণটা কী? নিছকই একটা স্টাইল স্টেটমেন্ট, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ভালোবাসাকে বাঁচানোর এক অবিশ্বাস্য গল্প?
আজকের দিনে ব্রাইডスメড বা গ্রুমসમેন থাকাটা হয়তো একটা ফ্যাশন। কিন্তু হাজার হাজার বছর আগে, এটা ছিল ভালোবাসার জন্য তৈরি করা এক মজবুত বর্ম! এই প্রথা আজকের নয়, এর শেকড় লুকিয়ে আছে প্রাচীন রোমের মাটিতে, যেখানে প্রেম আর কুসংস্কার হাত ধরাধরি করে চলত। চলুন, আজ ডুব দেওয়া যাক ইতিহাসের সেই অদ্ভুত গলিতে, যেখানে বন্ধুরা শুধু বিয়ের সাক্ষী থাকতেন না, হয়ে উঠতেন ভালোবাসার ‘বডিগার্ড’!
বিয়েতে কেন থাকে ব্রাইডスメড আর গ্রুমসમેન?
আপনার প্রিয় বন্ধু বা বোনের বিয়েতে একই রঙের শাড়ি বা লেহেঙ্গা পরেছেন, কিংবা বরের বন্ধুরা সবাই মিলে একই ডিজাইনের পাঞ্জাবি? এই দৃশ্যটা আমাদের সবার চেনা। কিন্তু এর আসল কারণটা জানলে আপনি অবাক হতে বাধ্য। এটা কোনো আধুনিক ট্রেন্ড নয়, বরং ভালোবাসাকে অশুভ শক্তির হাত থেকে বাঁচানোর এক প্রাচীন রোমান কৌশল।
প্রাচীন রোমে, বর এবং কনেকে অশুভ আত্মা বা হিংসাপরায়ণ প্রাক্তন প্রেমিকের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য, ব্রাইডスメড এবং গ্রুমসમેনরা হুবহু তাঁদের মতোই পোশাক পরতেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—আসল দম্পতিকে খুঁজে পেতেই যেন বিভ্রান্ত হয়ে যায় অশুভ শক্তি!
ভাবুন একবার দৃশ্যটা! রোমানরা বিশ্বাস করত যে, বিয়ে বা যেকোনো আনন্দের অনুষ্ঠানে অশুভ আত্মারা ভিড় করে। তাদের হিংসাপূর্ণ নজর নাকি নবদম্পতির সুখ কেড়ে নিতে পারে। শুধু তাই নয়, ছিল প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক বা প্রেমিকার বদলা নেওয়ার ভয়ও! এমন বিপদ থেকে বাঁচতে তারা এক অদ্ভুত সুন্দর পরিকল্পনা করে।
রোমান আইন অনুযায়ী, একটি বিয়ের জন্য দশজন সাক্ষীর প্রয়োজন হতো। এই দশজন সাক্ষীই বর ও কনের মতো একই রকম পোশাক পরতেন। ফলে তৈরি হতো এক গোলকধাঁধা। দশ জোড়া ‘নকল’ বর-বউয়ের ভিড়ে আসল দম্পতিকে খুঁজে বের করা শয়তানের পক্ষেও কঠিন হয়ে যেত! কোনো দুষ্ট আত্মা বা রাগী প্রাক্তন প্রেমিক যখন আক্রমণ করতে আসত, তারা বুঝতেই পারত না কাকে নিশানা বানাবে। আর এই সুযোগেই আসল বর-বউ তাদের বিয়ের পবিত্র শপথটুকু নিরাপদে সেরে ফেলতেন। এটা ছিল বন্ধুত্বের এক অসাধারণ উদাহরণ—ভালোবাসাকে রক্ষা করার জন্য সবাই মিলে এক হয়ে যাওয়া।
শুধু পোশাকই নয়, ব্রাইডスメডরা এমনকী সুগন্ধি গুল্ম আর রসুনের তোড়াও হাতে রাখতেন, যাতে তার গন্ধে অশুভ শক্তি দূরে পালিয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে সেই কুসংস্কারের ভয় হয়তো কেটে গেছে, কিন্তু ভালোবাসার পাশে দাঁড়ানোর সেই সুন্দর প্রথাটা আজও রয়ে গেছে। আজ হয়তো অশুভ আত্মারা নেই, কিন্তু বিয়ের টেনশন, চাপ, আর একরাশ দায়িত্ব সামলানোর জন্য বন্ধুদের পাশে থাকাটা ঠিক ততটাই জরুরি।
তাই পরেরবার যখন কোনো বিয়েতে ব্রাইডスメড বা গ্রুমসમેনদের দেখবেন, তখন শুধু তাদের সুন্দর পোশাকের দিকেই তাকাবেন না। মনে করবেন, ওরা শুধু বন্ধু নয়, ওরা ভালোবাসার সেই প্রাচীন প্রহরী। হাজার হাজার বছর ধরে যারা নিজেদেরকে ঢাল বানিয়ে আগলে রেখেছে দুটি মানুষের স্বপ্নকে। এই প্রথা আসলে এটাই শেখায়—ভালোবাসা একা নয়, তাকে আগলে রাখার জন্য একদল ভালো বন্ধুও লাগে। আপনার জীবনেও কি এমন ‘বডিগার্ড’ বন্ধু আছে?