বিষয়ের ভূমিকা
নমস্কার বন্ধুরা! আজকের আলোচনার বিষয় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ – শক্তি। আমরা যে আলো জ্বালাই, গাড়ি চালাই, রান্না করি বা কারখানায় জিনিসপত্র তৈরি করি, তার সবকিছুর পেছনেই রয়েছে শক্তি। আর এই শক্তির একটা বড় অংশ আসে কয়লা এবং পেট্রোলিয়ামের মতো উৎস থেকে। অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েই বিস্তারিত জানবো।
এই অধ্যায়টি কেবল পরীক্ষার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে বোঝার জন্যও অত্যন্ত জরুরি। আমরা জানব কীভাবে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মাটির নিচে এই সম্পদগুলো তৈরি হয়েছে, কীভাবে আমরা সেগুলোকে তুলে এনে ব্যবহার করছি এবং এর ফলে আমাদের পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়ছে। এই অধ্যায়ের মাধ্যমে আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuels) কী, তাদের প্রকারভেদ, ব্যবহার এবং সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাবো। চলুন, এই আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ যাত্রায় আমরা একসঙ্গে সামিল হই এবং আমাদের শক্তির উৎসগুলির রহস্য উন্মোচন করি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. প্রাকৃতিক সম্পদ: অফুরন্ত বনাম ফুরন্ত
আমাদের আলোচনা শুরু করার আগে, 'প্রাকৃতিক সম্পদ' (Natural Resources) কী, তা বোঝা দরকার। প্রকৃতি থেকে আমরা যা কিছু পাই এবং আমাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করি, তাই হলো প্রাকৃতিক সম্পদ। যেমন – বায়ু, জল, মাটি, খনিজ পদার্থ, বন, বন্যপ্রাণী ইত্যাদি।
প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে প্রাকৃতিক সম্পদকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ (Inexhaustible Natural Resources): এই ধরনের সম্পদ প্রকৃতিতে অফুরন্ত পরিমাণে উপস্থিত এবং মানুষের কার্যকলাপের দ্বারা সহজে শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। যেমন: সূর্যরশ্মি, বায়ু। আমরা যতই সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তি ব্যবহার করি না কেন, তা ফুরিয়ে যাবে না।
- ফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ (Exhaustible Natural Resources): এই সম্পদগুলো প্রকৃতিতে সীমিত পরিমাণে রয়েছে এবং মানুষের ব্যবহারের ফলে একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে। এদের তৈরি হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে, কিন্তু ব্যবহারের হার অনেক বেশি। যেমন: বন, বন্যপ্রাণী, খনিজ পদার্থ, কয়লা, পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস। আমাদের আজকের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু – কয়লা ও পেট্রোলিয়াম – এই শ্রেণীর অন্তর্গত।
২. জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuels): লক্ষ বছরের সঞ্চিত শক্তি
কয়লা, পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাসকে একত্রে জীবাশ্ম জ্বালানি বলা হয়। কেন এদের এমন নামকরণ? কারণ, এগুলি লক্ষ লক্ষ বছর আগে মৃত জীব অর্থাৎ উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ বা জীবাশ্ম (Fossils) থেকে তৈরি হয়েছে।
ভাবতে পারো, কীভাবে এটা সম্ভব? লক্ষ লক্ষ বছর আগে, গাছপালা এবং সামুদ্রিক প্রাণী মারা যাওয়ার পর তাদের দেহাবশেষ জলাশয় বা সমুদ্রের তলায় জমা হতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে কাদা, বালি এবং মাটির স্তর তাদের ওপর জমতে থাকে। মাটির গভীরের প্রচণ্ড চাপ (High Pressure) এবং তাপের (High Temperature) প্রভাবে, বায়ুর অনুপস্থিতিতে, এই মৃত জীবদেহগুলি ধীরে ধীরে রাসায়নিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে কয়লা, পেট্রোলিয়াম বা প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরিত হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই ধীর যে এতে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর সময় লেগে যায়। তাই জীবাশ্ম জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে তা আর সহজে তৈরি করা সম্ভব নয়।
৩. কয়লা (Coal): কালো হীরের গল্প
কয়লা আমাদের কাছে খুব পরিচিত একটি জ্বালানি। এটি পাথরের মতো শক্ত এবং কালো রঙের হয়। মূলত, কয়লা হলো কার্বনের একটি রূপ। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে রেল ইঞ্জিন চালানো এবং বিভিন্ন শিল্পে জ্বালানি হিসেবে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
কয়লা তৈরির প্রক্রিয়া (Carbonization)
প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বছর আগে, পৃথিবীর নিচু জলাভূমিগুলিতে বিশাল এবং ঘন অরণ্য ছিল। বন্যা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই গাছপালা মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। তাদের উপর ধীরে ধীরে আরও মাটির স্তর জমতে থাকে। ফলে, তারা মাটির অনেক গভীরে চলে যায় যেখানে বায়ুর উপস্থিতি প্রায় ছিলই না। মাটির গভীরের উচ্চ চাপ এবং তাপমাত্রা মৃত উদ্ভিদকে ধীরে ধীরে কয়লায় রূপান্তরিত করে। মৃত উদ্ভিদ থেকে ধীর প্রক্রিয়ায় কয়লায় রূপান্তরের এই ঘটনাকে কার্বোনাইজেশন (Carbonization) বলা হয়। যেহেতু এটি উদ্ভিদের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি হয়, তাই কয়লাকে একটি জীবাশ্ম জ্বালানি হিসেবে গণ্য করা হয়।
কয়লার উপজাত দ্রব্য (Products from Coal)
শিল্পক্ষেত্রে কয়লাকে উত্তপ্ত করে বিভিন্ন দরকারী পদার্থ তৈরি করা হয়। এই পদার্থগুলিকে কয়লার উপজাত দ্রব্য বলা হয়। প্রধান তিনটি উপজাত দ্রব্য হলো:
- কোক (Coke): এটি একটি কঠিন, ছিদ্রযুক্ত এবং প্রায় বিশুদ্ধ কার্বন (প্রায় ৯৮%)। এটি ধূসর-কালো বর্ণের হয়। কয়লাকে বায়ুর অনুপস্থিতিতে তীব্রভাবে উত্তপ্ত করলে কোক পাওয়া যায়। এটি একটি উৎকৃষ্ট জ্বালানি কারণ এটি পুড়লে খুব কম ধোঁয়া উৎপন্ন হয়। স্টিল উৎপাদন এবং বিভিন্ন ধাতু নিষ্কাশনে বিজারক পদার্থ হিসেবে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
- কোল টার বা আলকাতরা (Coal Tar): এটি একটি অপ্রীতিকর গন্ধযুক্ত, ঘন, কালো তরল। এটি প্রায় ২০০টি বিভিন্ন পদার্থের মিশ্রণ। কোল টার থেকে প্রাপ্ত পদার্থগুলি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বহু জিনিস, যেমন - কৃত্রিম রঙ, ওষুধ, বিস্ফোরক, সুগন্ধি, প্লাস্টিক, রং, ফটোগ্রাফিক সামগ্রী এবং ছাদ তৈরির সামগ্রী নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। আগে রাস্তার পিচ ঢালাইয়ের জন্য আলকাতরা ব্যবহার করা হতো, যদিও এখন তার জায়গায় পেট্রোলিয়াম জাত দ্রব্য বিটুমিন ব্যবহার করা হয়।
- কোল গ্যাস (Coal Gas): কয়লা থেকে কোক তৈরির সময় যে গ্যাসীয় পদার্থ উৎপন্ন হয়, তাই হলো কোল গ্যাস। এটি একটি দাহ্য গ্যাস এবং মূলত হাইড্রোজেন, মিথেন ও কার্বন মনোক্সাইডের মিশ্রণ। অতীতে এটি রাস্তা বা কারখানায় আলো জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এটি অনেক শিল্পে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৪. পেট্রোলিয়াম (Petroleum): তরল সোনা
গাড়ি, স্কুটার বা মোটরবাইক চালানোর জন্য আমরা যে পেট্রোল বা ডিজেল ব্যবহার করি, তা আসে পেট্রোলিয়াম থেকে। পেট্রোলিয়াম শব্দটি দুটি ল্যাটিন শব্দ 'পেট্রা' (Petra), যার অর্থ পাথর এবং 'ওলিয়াম' (Oleum), যার অর্থ তেল থেকে এসেছে। অর্থাৎ, পেট্রোলিয়াম মানে 'পাথরের তেল'। এটি মাটির গভীরে পাথরের স্তরের মধ্যে পাওয়া যায়।
পেট্রোলিয়াম তৈরির প্রক্রিয়া
কয়লার মতো পেট্রোলিয়ামও জীবাশ্ম থেকে তৈরি হয়, তবে এর উৎস ভিন্ন। লক্ষ লক্ষ বছর আগে সমুদ্রে বসবাসকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদ ও প্রাণী (যেমন - প্ল্যাঙ্কটন) মারা যাওয়ার পর তাদের দেহ সমুদ্রের তলায় জমা হতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে তাদের ওপর বালি এবং কাদার স্তর পড়ে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বায়ুর অনুপস্থিতি, উচ্চ তাপ এবং চাপের কারণে এই মৃত জীবদেহগুলি পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরিত হয়।
পেট্রোলিয়াম শোধন (Refining of Petroleum)
খনি থেকে যে পেট্রোলিয়াম তোলা হয়, তা একটি ঘন, তৈলাক্ত, গাঢ় রঙের তরল। একে অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল (Crude Oil) বলা হয়। এটি বিভিন্ন পদার্থের এক জটিল মিশ্রণ এবং সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। তাই একে ব্যবহারযোগ্য করার জন্য বিভিন্ন উপাদানকে আলাদা করার প্রয়োজন হয়।
পেট্রোলিয়ামের বিভিন্ন উপাদানকে পৃথক করার এই প্রক্রিয়াকে শোধন (Refining) বলা হয়। এই কাজটি পেট্রোলিয়াম শোধনাগার বা রিফাইনারিতে (Petroleum Refinery) করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় আংশিক পাতন (Fractional Distillation) নামক একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে অপরিশোধিত তেলকে একটি বড় চুল্লিতে প্রায় ৪০০°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে বাষ্পে পরিণত করা হয়। এরপর এই বাষ্পকে একটি উঁচু টাওয়ারে (Fractionating Column) পাঠানো হয়। টাওয়ারের বিভিন্ন উচ্চতায় তাপমাত্রা ভিন্ন ভিন্ন থাকে (নিচে বেশি, উপরে কম)।
পেট্রোলিয়ামের যে উপাদানগুলির স্ফুটনাঙ্ক (Boiling Point) বেশি, সেগুলি টাওয়ারের নিচের দিকে কম তাপমাত্রায় তরলে পরিণত হয় এবং যেগুলির স্ফুটনাঙ্ক কম, সেগুলি টাওয়ারের উপরের দিকে বেশি উচ্চতায় ঠান্ডা হয়ে তরলে পরিণত হয়। এভাবে বিভিন্ন উচ্চতা থেকে বিভিন্ন পদার্থ সংগ্রহ করা হয়।
পেট্রোলিয়ামের বিভিন্ন উপাদান ও তাদের ব্যবহার
আংশিক পাতনের মাধ্যমে প্রাপ্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং তাদের ব্যবহার নিচে দেওয়া হলো:
- তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (LPG - Liquefied Petroleum Gas): এটি সবচেয়ে কম স্ফুটনাঙ্কের উপাদান। বাড়িতে এবং শিল্পে জ্বালানি হিসেবে রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়।
- পেট্রোল (Petrol/Gasoline): মোটর গাড়ি, স্কুটার এবং এরোপ্লেনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ড্রাই ক্লিনিং-এর জন্য দ্রাবক হিসেবেও এর ব্যবহার আছে।
- কেরোসিন (Kerosene): স্টোভ, ল্যাম্প এবং জেট বিমানের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- ডিজেল (Diesel): ভারী যানবাহন যেমন ট্রাক, বাস, ট্রাক্টর এবং রেল ইঞ্জিন চালাতে ব্যবহৃত হয়। জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর ব্যবহার রয়েছে।
- লুব্রিকেটিং তেল বা পিচ্ছিলকারক তেল (Lubricating Oil): যন্ত্রপাতির ঘর্ষণ কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
- প্যারাফিন মোম (Paraffin Wax): মোমবাতি, ভ্যাসলিন, মলম এবং ওয়াক্স পেপার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
- বিটুমিন (Bitumen): রাস্তা নির্মাণে (পিচ ঢালাই) এবং জলরোধী আস্তরণ হিসেবে ছাদে ব্যবহৃত হয়।
পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে অনেক উপকারী পদার্থ পাওয়া যায়, যেগুলিকে পেট্রোকেমিক্যালস (Petrochemicals) বলা হয়। এগুলি ডিটারজেন্ট, কৃত্রিম তন্তু (পলিয়েস্টার, নাইলন, অ্যাক্রিলিক), পলিথিন এবং অন্যান্য কৃত্রিম প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এর বিশাল বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে পেট্রোলিয়ামকে 'কালো সোনা' (Black Gold) বলা হয়।
৫. প্রাকৃতিক গ্যাস (Natural Gas)
প্রাকৃতিক গ্যাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম জ্বালানি। এটি পেট্রোলিয়াম খনিতেই তেলের স্তরের উপরে জমা থাকে। এটি পাইপলাইনের মাধ্যমে সহজে পরিবহন করা যায়।
যখন প্রাকৃতিক গ্যাসকে উচ্চ চাপে সংকুচিত করে সংরক্ষণ করা হয়, তখন তাকে সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা CNG (Compressed Natural Gas) বলা হয়। CNG-কে বর্তমানে পরিবহনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কারণ এটি পেট্রোল বা ডিজেলের তুলনায় কম দূষণ ছড়ায়। এটি একটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি (Cleaner Fuel)।
প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান হলো মিথেন। এটি সরাসরি জ্বালানি হিসেবে বাড়ি এবং কারখানায় ব্যবহার করা যায়। 또한, এটি বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ এবং সার উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
৬. প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং সংরক্ষণ
আমরা আগেই জেনেছি যে কয়লা এবং পেট্রোলিয়ামের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিগুলি ফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। এগুলি তৈরি হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে, কিন্তু আমরা যেভাবে দ্রুতগতিতে এগুলি ব্যবহার করছি, তাতে আগামী কয়েকশ বছরের মধ্যেই এগুলির ভান্ডার শেষ হয়ে যেতে পারে।
এছাড়াও, এই জ্বালানিগুলি পোড়ানোর ফলে পরিবেশে মারাত্মক দূষণ হয়। এদের দহনের ফলে কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড-এর মতো ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত হয়।
- বায়ু দূষণ: এটি শ্বাসকষ্ট এবং অন্যান্য রোগের কারণ হয়।
- অ্যাসিড বৃষ্টি (Acid Rain): সালফার ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড বৃষ্টির জলের সাথে মিশে অ্যাসিড তৈরি করে, যা ফসল, মাটি এবং ঐতিহাসিক সৌধের ক্ষতি করে।
- বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming): কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বায়ুমণ্ডলে বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের একটি প্রধান কারণ।
এই কারণে আমাদের এই মূল্যবান সম্পদগুলির विवेकपूर्ण ব্যবহার করা উচিত। ভারতে, পেট্রোলিয়াম কনজারভেশন রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন (PCRA) মানুষকে পেট্রোল/ডিজেল বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন পরামর্শ দেয়। যেমন:
- যতটা সম্ভব, মাঝারি এবং স্থির গতিতে গাড়ি চালানো।
- ট্র্যাফিক সিগন্যালে বা যখন অপেক্ষা করতে হয়, তখন গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ রাখা।
- গাড়ির টায়ারের চাপ সঠিক রাখা।
- নিয়মিত গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করা।
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুতের মতো বিকল্প শক্তির উৎসের ব্যবহার বাড়ানোই হলো ভবিষ্যতের পথ।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: জীবাশ্ম জ্বালানিকে ফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ বলা হয় কেন?
উত্তর: জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস) লক্ষ লক্ষ বছর আগে মৃত জীবদেহ থেকে তৈরি হয়েছে। প্রকৃতিতে এদের ভান্ডার সীমিত। এদের তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর, কিন্তু মানুষের ব্যবহারের হার অনেক বেশি। এই কারণে, অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে একদিন এদের ভান্ডার শেষ হয়ে যাবে। তাই এগুলিকে ফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ বলা হয়।
প্রশ্ন ২: কোক-এর বৈশিষ্ট্য এবং ব্যবহারগুলি কী কী?
উত্তর: কোক হলো কয়লার একটি উপজাত দ্রব্য। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো: এটি একটি কঠিন, ছিদ্রযুক্ত এবং প্রায় বিশুদ্ধ কার্বনের রূপ (ধূসর-কালো বর্ণের)। এটি পোড়ালে খুব কম ধোঁয়া উৎপন্ন হয়। ব্যবহার: ১. এটি একটি উৎকৃষ্ট জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২. ইস্পাত বা স্টিল উৎপাদনে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ৩. বিভিন্ন ধাতু (যেমন লোহা) নিষ্কাশনের সময় এটি বিজারক পদার্থ হিসেবে কাজ করে।
প্রশ্ন ৩: পেট্রোলিয়ামকে 'কালো সোনা' বলা হয় কেন?
উত্তর: পেট্রোলিয়ামকে তার 엄청 বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে 'কালো সোনা' বলা হয়। অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম দেখতে কালো এবং ঘন তরল। এটিকে শোধন করে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন, LPG, লুব্রিকেটিং তেল, মোম, বিটুমিনের মতো বহু মূল্যবান পদার্থ পাওয়া যায়। এছাড়াও, পেট্রোকেমিক্যালস শিল্পে এর উপজাত দ্রব্য ব্যবহার করে প্লাস্টিক, ডিটারজেন্ট, কৃত্রিম তন্তুর মতো অসংখ্য জিনিস তৈরি হয়। সোনার মতো মূল্যবান এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় একে এই নামে ডাকা হয়।
প্রশ্ন ৪: CNG ব্যবহারের সুবিধাগুলি কী কী?
উত্তর: CNG বা সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের প্রধান সুবিধাগুলি হলো: ১. এটি একটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। পেট্রোল বা ডিজেলের তুলনায় এটি পুড়লে অনেক কম দূষণকারী গ্যাস (যেমন কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড) উৎপন্ন হয়। ২. এটি সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা যায়, ফলে পরিবহন সহজ। ৩. এটি তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং এর দহন ক্ষমতাও বেশি। এই কারণগুলির জন্য যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে এর ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে।
সারসংক্ষেপ
আসুন, এক নজরে এই অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি মনে করে নিই:
- প্রাকৃতিক সম্পদ দুই প্রকার: অফুরন্ত (সূর্যরশ্মি, বায়ু) এবং ফুরন্ত (কয়লা, পেট্রোলিয়াম, বন)।
- জীবাশ্ম জ্বালানি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মৃত জীবদেহ থেকে উচ্চ চাপ ও তাপে তৈরি হয়। কয়লা, পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস হলো প্রধান জীবাশ্ম জ্বালানি।
- কয়লা মূলত উদ্ভিদ থেকে তৈরি হয় (কার্বোনাইজেশন প্রক্রিয়ায়)। এর উপজাত দ্রব্য হলো কোক, কোল টার এবং কোল গ্যাস।
- পেট্রোলিয়াম বা অপরিশোধিত তেল সামুদ্রিক জীব থেকে তৈরি হয়। পেট্রোলিয়াম শোধনাগারে আংশিক পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একে শোধন করে LPG, পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন, মোম, বিটুমিন ইত্যাদি পাওয়া যায়।
- প্রাকৃতিক গ্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। CNG (সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস) যানবাহনে ব্যবহৃত হয়।
- জীবাশ্ম জ্বালানির ভান্ডার সীমিত এবং এদের ব্যবহারে বায়ু দূষণ ও বিশ্ব উষ্ণায়ন-এর মতো পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টি হয়।
- আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই সম্পদগুলি সংরক্ষণ করা এবং শক্তির বিকল্প উৎসের ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।