ক্যাফেটেরিয়ার কাঁচের দেয়ালের ওপার থেকে বসন্তের ম্লান আলো এসে পড়তো অরুণ চক্রবর্তীর কোঁচকানো মুখের ওপর। প্রতিদিনের মতো আজও সে বসে আছে সেই নির্দিষ্ট কোণার টেবিলে, হাতে এক কাপ ব্ল্যাক কফি আর পাশে খোলা এক পুরোনো কবিতার বই। বইটির পাতাগুলো হলদেটে, মলাট জীর্ণ, কিন্তু প্রতিটি অক্ষর অরুণার হৃদয়ে যেন টাটকা কালি দিয়ে লেখা। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থটি তার প্রথম যৌবনের প্রতিধ্বনি, লাবণ্যর স্মৃতিতে মোড়া এক সোনালী দলিল। গত চল্লিশ বছর ধরে অরুণ এই স্মৃতি আঁকড়ে বাঁচছে, একাকী।
সেদিন বসন্তের এক ঝিরিঝিরি বৃষ্টির বিকেলে প্রথম লাবণ্যকে দেখেছিল সে। ময়মনসিংহের মফস্বল শহরে তাদের বাড়ি ছিল পাশাপাশি। লাবণ্যর চুলের বেণীতে গুঁজে রাখা বুনো কাঠগোলাপের সুবাস আর তার খিলখিল হাসি আজও অরুণার কানে বাজে। সময়ের পরিক্রমায় সেই হাসি এখন শুধু স্মৃতি, আর সুবাস এক হারানো বসন্তের নিরব উপস্থিতি। অরুণ যেন এক ঘোরের মধ্যে ছিল, তার চারপাশে ব্যস্ত শহরের কোলাহল – মানুষের কথা, কাপ-প্লেটের টুংটাং শব্দ, কফি মেশিনের ঘর্ঘর – সবকিছুই তার কাছে অর্থহীন মনে হতো। সে শুধু লাবণ্যর মুখটি খুঁজতো পরিচিত মুখের ভিড়ে, এক অলীক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
স্মৃতির আনাগোনা
লাবণ্য ছিল তার প্রথম প্রেম, প্রথম বসন্তের উন্মাদনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ লনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা কাটিয়ে দিতো কবিতা আর স্বপ্ন বুননে। লাবণ্যর চোখ ছিল গভীর, এক পলকে যেন সমস্ত মহাবিশ্বের রহস্য ধরা পড়তো সেখানে। সে অরুণকে বলতো, “তুমি আমার জীবনানন্দ, তোমার লেখায় আমি নিজেকে খুঁজে পাই।” আর অরুণ হাসতো, লাবণ্যর চোখের দিকে তাকিয়ে বলতো, “তুমি আমার বনলতা, এক দিনার শান্তি।”
“আশি পেরিয়ে লাবণ্যর চোখে দেখেছিলাম এক সমুদ্রের গভীরতা, যেখানে আমার স্বপ্নের নাও ভাসতো।”
তারপর হঠাৎ করেই সব বদলে গেল। লাবণ্যর পরিবার তাদের সম্পর্ক মেনে নিতে পারল না। ভিন্ন সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক চাপ – এইসব ক্ষুদ্র দেওয়ালগুলো এক বিরাট পাহাড় হয়ে দাঁড়ালো তাদের মাঝে। একদিন লাবণ্যর বাবা তাকে জোর করে নিয়ে গেলেন অন্য শহরে, অরুণ কোনো খবর পেল না। শত চিঠি লিখেও জবাব আসেনি। লাবণ্যর পক্ষ থেকে একটিও শব্দ না পেয়ে অরুণ ভেবেছিল সে হয়তো ভুলেই গেছে তাকে। অভিমানে, যন্ত্রণায় তার হৃদয় পাথর হয়ে গিয়েছিল। যৌবনের সেই প্রখর প্রেম হঠাৎ করেই নিভে গিয়েছিল এক অমীমাংসিত আঁধারে। অরুণ তার জীবন কেটেছে এক নির্জনতায়, বিবাহ করেনি, নিজের সাহিত্যকর্মেই ডুবিয়ে রেখেছে নিজেকে।
অপ্রত্যাশিত আগমন
আজও অরুণ ক্যাফেতে বসেছিল, তার সেই জীর্ণ ‘বনলতা সেন’ বইটি খোলা ছিল ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’ কবিতার পৃষ্ঠায়। হঠাৎ তার চোখ পড়লো ক্যাফেতে প্রবেশ করা এক নারীর দিকে। মধ্যবয়সী সেই নারীর মুখাবয়ব অচেনা হলেও, তার হাঁটার ভঙ্গি, ঘাড় বাঁকিয়ে চুল সরানোর ধরন – সবকিছুই যেন অরুণকে বহু বছর আগের এক পরিচিত ছন্দে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। সে যেন এক ঝলকে দেখলো বসন্তের প্রথম বুনো কাঠগোলাপের সুবাস বয়ে আনা সেই কিশোরীকে। তার হৃদপিণ্ড দ্রুতগতিতে ধুকপুক করে উঠলো। ‘এ কি লাবণ্য? এত বছর পর?’
নারীটি অরুণার টেবিলের উল্টো দিকের টেবিলে বসলো। তার পরনে ছিল একটি নীল শাড়ি, কাঁধে একটি পশমিনা শাল। সে তার হাতে ধরা একটি ছোট্ট ডায়েরি খুলে তাতে কিছু লিখছিল। অরুণ তার প্রতিটি নড়াচড়া নিবিষ্ট মনে দেখছিল, যেন কোনো পুরনো চলচ্চিত্রের ফ্রেমে বন্দী ছবি দেখছে। ভয় হচ্ছিল, হয়তো ভুল দেখছে। হয়তো শুধু তার মনের ভ্রম। তার মনে পড়ে গেল লাবণ্যর একটা অভ্যেস ছিল, সে সব সময় তার হাতের ডায়েরিতে ছোট ছোট কবিতা বা ভাবনার টুকরো লিখে রাখতো।
“যদি সে লাবণ্য হয়, তবে এত বছর পর সে কি আমাকে চিনতে পারবে? নাকি আমার মুখ আজ তাকে বড্ড অচেনা মনে হবে?”
ইঙ্গিতের পথ
অরুণ সাহস সঞ্চয় করতে পারছিল না। যদি ভুল হয়? যদি সে লাবণ্য না হয়? এই দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর হঠাৎ তার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর পরিণতি কি হবে? সে ধীরে ধীরে নিজের হাতের বইটির দিকে তাকালো, তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বইটি এগিয়ে রাখলো তার টেবিলে, খোলা পৃষ্ঠাটি তার বুনো প্রেমের চিরন্তন সাক্ষী হয়ে। সে উঠে দাঁড়ালো, কফির বিল মিটিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো। এক অদৃশ্য টান তাকে পেছনে টেনে ধরছিল, কিন্তু তার ভয় ছিল প্রবল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, নারীটির চোখ পড়লো অরুণার ফেলে যাওয়া বইটির দিকে। সে ইতস্তত করে বইটি হাতে তুলে নিলো। তার চোখে এক ঝলক বিস্ময়, তারপর এক গভীর বেদনা ফুটে উঠলো। অরুণা তখন ক্যাফের দরজা পার হয়ে গেছে, কিন্তু তার কানের কাছে যেন লাবণ্যর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “অরুণ!”
অরুণ থমকে দাঁড়ালো। তার শরীরের প্রতিটি শিরায় যেন বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকালো। নারীটি তখন বই হাতে দাঁড়িয়ে, তার চোখে অশ্রুর রেখা। সে সত্যিই লাবণ্য। সময় হয়তো দুজনের শরীরেই তার চিহ্ন এঁকেছে, কিন্তু তাদের আত্মার যোগসূত্র ছিল অবিচ্ছিন্ন।
মুখোমুখি
তারা আবার মুখোমুখি হলো, ৪০ বছর পর। ক্যাফে ম্যানেজার তাদের জন্য আলাদা একটি নির্জন টেবিল করে দিলেন। দুজন বসলো একে অপরের সামনে, মাঝখানে এক দীর্ঘশ্বাস আর অজস্র না বলা কথা।
“লাবণ্য…” অরুণার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।
“অরুণ… তুমি এখানে?” লাবণ্যর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
তাদের কথার শুরুটা ছিল অগোছালো। কে আগে কথা বলবে, কি বলবে, বুঝতে পারছিল না কেউ। অবশেষে অরুণই নীরবতা ভাঙলো। “তোমার কি হয়েছিল লাবণ্য? কেন চলে গেলে? কেন কোনো খবর দাওনি?”
লাবণ্য দীর্ঘশ্বাস ফেললো। “বাবা জোর করে আমাকে অন্য শহরে নিয়ে গেলেন। আমার সমস্ত চিঠি তিনি আটকে রেখেছিলেন। আর তোমার চিঠিগুলোর কোনো উত্তর আমি পাইনি। ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে ভুলেই গেছ।”
অরুণার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। “আমার চিঠি… আমি তো শত শত চিঠি লিখেছিলাম! তুমি কি পাওনি?”
“সব চিঠিগুলো? আমি একটিও পাইনি, অরুণ। একটিও নয়। বাবা বলেছিলেন তুমি নাকি কাউকে চিঠি লেখোনি, নতুন কাউকে খুঁজে নিয়েছো।”
সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গেল এক মুহূর্তে। তাদের দীর্ঘ বিচ্ছেদ, না পাওয়ার যন্ত্রণা, ভুল বোঝাবুঝির পাহাড় – সবটাই ছিল এক সুগভীর ষড়যন্ত্রের ফল। দুটি জীবন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল একটি চিঠির অভাবে, একটি মিথ্যার জালে।
লাবণ্য জানালো সে বিয়ে করেনি। তার জীবনও কেটেছে অরুণের মতোই এক নির্জনতায়। তার বাবা মারা যাওয়ার পর সে ফিরে এসেছিল এই শহরে, তার হারানো স্মৃতিগুলো খুঁজতে। এই ক্যাফেটিও তার পুরনো দিনের স্মৃতির অংশ ছিল।
তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বললো। হারানো দিনগুলো ফিরে এলো গল্পের ছলে, হাসিতে আর অশ্রুতে। সূর্য যখন ডুবছে, ক্যাফের কাঁচের জানালায় শেষ বিকেলের কমলা আলো এসে পড়লো তাদের মুখের ওপর। দুটি জীর্ণ আত্মা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।
“অরুণ, আমাদের জীবন থেকে অনেকগুলো বসন্ত হারিয়ে গেছে,” লাবণ্য মৃদু স্বরে বললো।
“কিন্তু দেখো লাবণ্য, বসন্ত আবার ফিরে এসেছে। হয়তো দ্বিতীয়বার, হয়তো একটু দেরিতে, কিন্তু ফিরেছে তো।” অরুণ লাবণ্যর হাতের উপর নিজের হাত রাখলো। তার চোখে ছিল এক নতুন দীপ্তি, যা দীর্ঘ ৪০ বছর পর আবার জ্বলে উঠলো। তাদের হারানো প্রেম হয়তো নতুন করে শুরু করার সুযোগ পাচ্ছে, এক বসন্তের দ্বিতীয় আগমনের মতো।
তারা দুজনেই হাসলো। সেই হাসি ছিল গভীর, স্নিগ্ধ, আর এক নতুন ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবাহী। ক্যাফে থেকে বেরিয়ে তারা যখন শহরের আলো ঝলমলে পথের দিকে হাঁটছিল, তখন মনে হলো দুটি একাকী চাঁদ আবার তাদের নিজস্ব কক্ষপথে ফিরে এসেছে, নতুন করে এক মহাজাগতিক নৃত্য শুরু করার জন্য।