কলকাতা, ১৭ অক্টোবর ২০২৫: রাজ্য রাজনীতিতে ফের একগুচ্ছ নতুন ঘটনাপ্রবাহ, যা বাংলার আগামী দিনের দিকনির্দেশ করতে চলেছে। প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনের জল্পনা তুঙ্গে, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে শাসক-বিরোধী তরজা চরমে, এবং উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি ও ফরাক্কা বাঁধের উপযোগিতা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কড়া মন্তব্যে উত্তাল রাজ্য। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে।

শোভন চট্টোপাধ্যায়ের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনের জল্পনা তুঙ্গে

দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন নিয়ে জল্পনা এখন তুঙ্গে। গতকাল, ১৬ অক্টোবর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের এক একান্ত বৈঠক হয়। এই বৈঠক প্রায় দু'ঘণ্টা ধরে চলে বলে সূত্র মারফত জানা গেছে। বৈঠকের বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে না এলেও, রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন, শোভনের তৃণমূলে ফেরা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

এর আগে গত সেপ্টেম্বরে দুর্গাপূজার চতুর্থীর দুপুরে শোভন চট্টোপাধ্যায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পর শোভনের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখা গিয়েছিল এবং তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে 'আগের অভিষেকের চেয়ে এই অভিষেক অনেক পরিণত'। বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ও তখন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে শোভনের দলে ফেরা 'এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা'। একসময় তৃণমূলের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে কলকাতা পুরসভার মেয়র পদে এক দশকের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব সামলেছেন শোভন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে তিনি বিজেপি-তে যোগ দিলেও, সেখানেও থিতু হতে পারেননি এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। এখন মনে করা হচ্ছে, পাহাড়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তৃণমূলে তাঁর ফেরার বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি মিলেছে। বীরভূমে সম্প্রতি ১০০টি পরিবারের বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগদানের ঘটনাও স্থানীয় রাজনৈতিক দৃশ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, যেখানে তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল সরাসরি পতাকা তুলে দেন।

(আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)

ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) বিতর্ক ও তৃণমূলের প্রতিবাদ সভা

রাজ্যে আসন্ন ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া (Systematic Voters' List Revision - SIR) নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। আগামী ২ নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গে এই নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর প্রতিবাদে তৃণমূল কংগ্রেস নভেম্বরের শুরুতেই কলকাতার শহিদ মিনারে এক বিশাল প্রতিবাদ সভার আয়োজন করার পরিকল্পনা করেছে।

তৃণমূলের অভিযোগ, এই সংশোধন প্রক্রিয়ার আড়ালে বিজেপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাংলার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গরিব, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন যে, বাংলা থেকে একজনেরও নাম বাদ গেলে তিনি তা মেনে নেবেন না। তিনি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও তোপ দেগেছেন এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অমিত শাহকে একহাত নিয়েছেন। অন্যদিকে, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর দাবি করেছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় বাংলায় প্রায় এক কোটিরও বেশি 'অনুপ্রবেশকারী' ভোটারের নাম বাদ পড়বে। এই মন্তব্যের জেরে রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তৃণমূলের পাল্টা প্রশ্ন, সংশোধনের আগেই এই সংখ্যাটা কীভাবে জানা গেল, যা কেন্দ্রের শাসক দলের নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত বহন করছে। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও, বিরোধীরা মনে করছেন যে এর কিছু পদক্ষেপ কেন্দ্রের ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।

(আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)

ফরাক্কা বাঁধের উপযোগিতা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কড়া প্রশ্ন ও উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি

উত্তরবঙ্গে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফরাক্কা বাঁধের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কড়া মন্তব্য করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে শুখা মরসুমে চাষের জন্য জল মেলে না, উলটে বর্ষাকালে লকগেট খুলে এলাকার পর এলাকাকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এই বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে হুংকার দিয়ে বলেছেন, 'বাঁধ রেখে লাভ কী?'

উত্তরবঙ্গের বিপর্যয়ের পিছনে ইন্দো-ভুটান নদী কমিশন তৈরি না হওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী ভারত-ভুটান নদী কমিশন গঠনের দাবি তুলেছেন এবং সেখানে বাংলার প্রতিনিধি রাখার কথা বলেছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন যে ভুটানের জল প্রবেশ উত্তরবঙ্গে কমাতে হবে এবং তাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, তিনি জল নিয়ে তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি। রাজ্য সরকার সূত্রে জানা গেছে, নদী বিষয়ক ভারত-ভুটান বিশেষজ্ঞ কমিটিতে যোগ দিতে জলপাইগুড়ি ডিভিশনের কমিশনার অনুপ আগরওয়ালের দিল্লি আসার কথা থাকলেও, তিনি এসেছেন কিনা সেই তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়। এদিকে, খড়্গপুর আইআইটি-ও উত্তরবঙ্গের বন্যা বিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, ত্রাণসামগ্রী নিয়ে গেছে পড়ুয়া, কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা। তবে, কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পঞ্জাবের বন্যাকে জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করলেও, পশ্চিমবঙ্গের বিপর্যয় পরিস্থিতিকে কেন নয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

(আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)

এবারের কালীপুজোর আগে রাজ্যজুড়ে এই তিনটি প্রধান ঘটনাপ্রবাহ রাজনৈতিক এবং সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এগুলির আরও বিস্তারিত প্রভাব দেখা যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।