প্রথম অধ্যায়: ধুলোমাখা রহস্য
অনির্বাণ যখন প্রথম চন্দনপুরের ‘জ্ঞানসাগর’ গ্রন্থাগারে পা রেখেছিল, তখন তার মনে হয়েছিল সময় যেন এখানে থমকে গেছে। কলকাতার কোলাহল থেকে বহুদূরে, গঙ্গার ধারে এই ছোট্ট শহরের লাইব্রেরিটা ছিল তার প্রথম চাকরি। পুরোনো কাঠের আলমারি, হলদে হয়ে যাওয়া বইয়ের পাতা আর ধুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত মায়াবী গন্ধ—অনির্বাণ প্রথম দিনেই এই জায়গাটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল।
কাজটা নেহাতই সহজ ছিল—বই গোছানো, ক্যাটালগ মেলানো আর মাঝে মাঝে দু-একজন বৃদ্ধ পাঠকের সঙ্গে মৃদুস্বরে কথা বলা। কিন্তু মাসখানেকের মধ্যেই অনির্বাণ এক অদ্ভুত অসঙ্গতি খুঁজে পেল। সমস্যাটা ছিল একটা নির্দিষ্ট বই নিয়ে—'চন্দনপুরের লোককথা'। আচার্য্য দীননাথ সেনের লেখা এই বইটা ছিল লাইব্রেরির এক অমূল্য সম্পদ। কিন্তু অনির্বাণ লক্ষ করল, লাইব্রেরির মূল ক্যাটালগের বিবরণের সঙ্গে বর্তমান বইটির কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমবার সে এটাকে ছাপার ভুল বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কৌতূহলবশত সে পুরোনো রেজিস্টার খাতা ঘাঁটতে শুরু করল। আর তখনই ব্যাপারটা তার কাছে আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। সে দেখল, গত পঞ্চাশ বছরে তিনবার এই বইটি 'হারিয়ে গেছে' বলে রেকর্ড করা হয়েছে এবং প্রতিবারই কয়েক মাস বা বছরখানেক পর তা শেলফে আবার ফিরে এসেছে। প্রতিবার ফিরে আসার পরেই ক্যাটালগের সঙ্গে তার অমিল আরও বেড়েছে।
“যেন কেউ বইটাকে চুপিচুপি নিয়ে গিয়ে নিজের মতো করে সম্পাদনা করে আবার ফিরিয়ে দিয়ে যায়। কিন্তু কেন? কে এই অদৃশ্য সম্পাদক?”
এই চিন্তাটা অনির্বাণকে পেয়ে বসল। পুরোনো গ্রন্থাগারিক, মন্মথবাবু, অবসরের আগে তাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে গেছিলেন। কিন্তু এই বইটার ব্যাপারে তিনি শুধু বলেছিলেন, “ওটা ওরকমই। কিছু বইয়ের নিজস্ব জীবন থাকে, বুঝলে হে ছোকরা।” কথাটা তখন অনির্বাণের কাছে হেঁয়ালির মতো লেগেছিল, এখন তার অর্থ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
একদিন এক পুরোনো আলমারির পেছনে ধুলো ঝাড়তে গিয়ে সে একটা চামড়া বাঁধানো ডায়েরি খুঁজে পেল। এটা ছিল জ্ঞানসাগর গ্রন্থাগারের প্রথম গ্রন্থাগারিক, উইলিয়াম হ্যারিসনের ব্যক্তিগত নোটবুক। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা জায়গায় এসে তার চোখ আটকে গেল। ১৮৯২ সালের একটা এন্ট্রি।
“The Folklore book has a guardian. He corrects what history forgets. He is the guardian of words.”
এর নিচে একটা অস্পষ্ট সংকেত—'যেখানে বটগাছের ছায়া সময়ের হিসেব রাখে'। অনির্বাণের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। এটা কোনো সাধারণ অসঙ্গতি নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর রহস্য।
দ্বিতীয় অধ্যায়: ছায়ার সন্ধানে
হ্যারিসনের ডায়েরির ওই cryptic লাইনটা অনির্বাণকে নতুন পথে চালিত করল। 'যেখানে বটগাছের ছায়া সময়ের হিসেব রাখে'—এর মানে কী হতে পারে? চন্দনপুরে পুরোনো বটগাছ অনেক আছে। কিন্তু সময়ের হিসেব? তার হঠাৎ মনে পড়ল লাইব্রেরির পেছনের বাগানে একটা বিশাল পুরোনো বটগাছ আছে, যার পাশে একটা শ্যাওলা ধরা সূর্যঘড়ি অযত্নে পড়ে রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে তৈরি, কিন্তু এখন প্রায় অকেজো।
পরদিন বিকেলে অনির্বাণ জায়গাটা ভালো করে পরীক্ষা করতে গেল। সূর্যঘড়িটার পাথরের বেদিতে অনেক লেখা খোদাই করা, তার মধ্যে একটা নাম তার চোখে পড়ল—'দত্ত বংশ'। চন্দনপুরের সবচেয়ে পুরোনো এবং সম্ভ্রান্ত পরিবার। এই লাইব্রেরিটাও তাদেরই পূর্বপুরুষদের দানে তৈরি।
অনির্বাণ শহরের староদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারল, দত্ত পরিবারের বর্তমান কর্তা হলেন বীরেন দত্ত। একজন অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাসের অধ্যাপক। একা থাকেন পুরোনো পৈতৃক বাড়িতে, লাইব্রেরি থেকে বেশি দূরে নয়। লোকজনের সঙ্গে বিশেষ মেশেন না। সবাই তাকে একটু সমীহ করে চলে।
এক বিকেলে সাহস সঞ্চয় করে অনির্বাণ বীরেনবাবুর বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল। দরজা খুললেন এক সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ, চোখে পুরু কাঁচের চশমা। অনির্বাণের পরিচয় পেয়ে তিনি তাকে ভেতরে আসতে বললেন। বাড়িটা যেন আরেকটা লাইব্রেরি। চারিদিকে শুধু বই আর পুরোনো পুঁথির গন্ধ।
“জ্ঞানসাগর থেকে এসেছ? ভালো। आजकल তো ওমুখো হয় না কেউ,” শান্ত গলায় বললেন বীরেনবাবু।
অনির্বাণ ইতস্তত করে তার আসার কারণটা বলল। 'চন্দনপুরের লোককথা' বইটির কথা এবং তার পরিবর্তনের রহস্যটা খুলে বলল সে। সব শুনে বীরেনবাবুর মুখে এক অদ্ভুত শান্ত হাসি ফুটে উঠল। তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে অনির্বাণকে তার ব্যক্তিগত পড়ার ঘরে নিয়ে গেলেন।
“কিছু ইতিহাস বইয়ের পাতায় লেখা থাকে, আর কিছু ইতিহাসকে রক্ষা করতে হয়। তুমি কোনটা বিশ্বাস করো, অনির্বাণ?”
বীরেনবাবু একটা পুরোনো সিন্দুক থেকে কিছু বিবর্ণ পুঁথি আর হাতে লেখা ডায়েরি বের করলেন। সেগুলো ছিল আচার্য্য দীননাথ সেনের বইটির মূল পাণ্ডুলিপি এবং দত্ত পরিবারের পূর্বপুরুষদের লেখা রোজনামচা।
তৃতীয় অধ্যায়: অভিভাবকের স্বীকারোক্তি
“দীননাথ সেন একজন গুণী লোক ছিলেন, কিন্তু তার গবেষণায় কিছু ভুল ছিল,” বলতে শুরু করলেন বীরেনবাবু। “তিনি চন্দনপুরের এক স্থানীয় নায়ক, রঘুনাথ সিংহকে ভুলভাবে একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন। তার তথ্যের উৎস ছিল ব্রিটিশদের লেখা রিপোর্ট, যা ছিল পক্ষপাতদুষ্ট।”
তিনি দেখালেন, তার পূর্বপুরুষেরা, যারা রঘুনাথ সিংহের সহযোগী ছিলেন, তাদের লেখা ডায়েরিতে আসল ঘটনাটা লিপিবদ্ধ আছে। রঘুনাথ বিশ্বাসঘাতক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন শহীদ। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে সেই সত্যি প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না।
“আমার প্রপিতামহ প্রথম এই ভুলটা সংশোধন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বইটা ততদিনে ছাপা হয়ে গেছে এবং লাইব্রেরিতে স্থান পেয়ে গেছে। তখন তিনি একটা উপায় বের করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম 'শব্দের অভিভাবক'।”
বীরেনবাবু জানালেন, তারপর থেকে দত্ত পরিবারের প্রত্যেক প্রজন্ম এই দায়িত্ব পালন করে আসছে। তারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর লাইব্রেরি থেকে বইটি সরিয়ে আনেন, তারপর পারিবারিক দলিল অনুসারে খুব সন্তর্পণে একটা বা দুটো শব্দ বা বাক্য পরিবর্তন করে দেন। এমনভাবে করেন যাতে ব্যাপারটা কারও চোখে না পড়ে, কিন্তু ইতিহাসের ভুলটা ধীরে ধীরে মুছে যায়।
“আমরা ইতিহাসকে ধ্বংস করিনি, আমরা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। সত্যিটাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিয়েছি। এটা আমাদের পরিবারের ব্রত,” বলতে বলতে বীরেনবাবুর গলা ধরে এল।
অনির্বাণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার সামনে এক অবিশ্বাস্য সত্যি উন্মোচিত হয়েছে। লাইব্রেরির নিয়ম, ক্যাটালগের পবিত্রতা—এসবের ঊর্ধ্বে এক বৃহত্তর সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা সে দেখতে পাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, এটা কোনো অপরাধ নয়, এটা এক নীরব সংগ্রাম।
বীরেনবাবু অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার বয়স হয়েছে। আমার পর এই দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ নেই। হ্যারিসন সাহেব আমার দাদুর বন্ধু ছিলেন, তিনি আমাদের এই কাজের কথা জানতেন এবং সম্মান করতেন। তাই তিনি ওই সংকেতটা রেখে গেছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে তোমার মতো কোনো যোগ্য মানুষ এই রহস্যের গভীরে পৌঁছাতে পারে।”
একটা নীরব প্রশ্ন অনির্বাণের চোখের সামনে ভাসছিল। বীরেন দত্ত তাকে শুধু অতীতের গল্প শোনাতে ডাকেননি, তাকে ভবিষ্যতের দিকে একটা পথের ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন।
সেদিন রাতে লাইব্রেরিতে ফিরে এসে অনির্বাণ 'চন্দনপুরের লোককথা' বইটি আবার হাতে নিল। এখন আর তার কাছে এটা শুধু একটা বই ছিল না, ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক বিশ্বাসের দলিল। সে বইটার একটা পাতায় নতুন সংশোধিত অংশটা দেখল। 'বিশ্বাসঘাতক রঘুনাথ' এর বদলে লেখা হয়েছে 'বীর রঘুনাথ'। একটা মাত্র শব্দের পরিবর্তন, কিন্তু তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক শতাব্দীর নীরব সাধনা।
অনির্বাণ একটা নতুন ডায়েরি খুলল। প্রথম পাতায় সে লিখল—
“কিছু বই পাঠকের অপেক্ষায় থাকে, আর কিছু বই তার অভিভাবকের অপেক্ষায়। আজ থেকে আমি এই শব্দের নতুন অভিভাবক।”
জ্ঞানসাগর গ্রন্থাগারের ধুলোমাখা বাতাসে এক নতুন রহস্য আরও গভীর হয়ে উঠল, আর তার সাক্ষী রইল শুধু রাতের নিস্তব্ধতা।