অনির্বাণ বিশ্বাস করে, প্রত্যেকটা পুরনো জিনিসের একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে। শুধু ধুলো বা ন্যাপথলিনের নয়, সময়ের গন্ধ। উত্তর কলকাতার এক রবিবারের দুপুরে, শোভাবাজারের এক ভাঙাচোরা বাড়ির একতলার এক অন্ধকার ঘরে বসে থাকা পুরনো জিনিসের হাটে সেই গন্ধটাই খুঁজছিল সে। পেশায় ফটোগ্রাফার, কিন্তু ইদানিং তার ক্যামেরার লেন্সে নতুন কোনও গল্প ধরা দিচ্ছিল না। সব কিছুই কেমন যেন বিবর্ণ, প্রাণহীন।
একগাদা বাতিল টাইপরাইটার, মরচে ধরা কাঁসার বাসন আর পুরনো গ্রামোফোন রেকর্ডের ভিড়ে জিনিসটা তার চোখে পড়ল। একটা পুরনো আগফা বক্স ক্যামেরা। চামড়ার কেসটা জায়গায় জায়গায় ফেটে গেছে, রূপোলি অংশগুলো কালচে। অনির্বাণের মনে হলো, ওটা যেন তাকে ডাকছে। সামান্য দরাদরি করে ক্যামেরাটা কিনে নিল সে। মনের মধ্যে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। এই যন্ত্রটা হয়তো তার ছবি তোলার ইচ্ছেটাকে আবার জাগিয়ে তুলবে।
বাড়ি ফিরে ক্যামেরাটা পরিষ্কার করতে গিয়েই অনির্বাণ জিনিসটা আবিষ্কার করল। ভেতরে একটা ফিল্ম রোল রয়ে গেছে! সময়ের ভারে লেবেল বিবর্ণ, কিন্তু অক্ষত। বুকের ভেতরটা ধক্ করে উঠল। এই রোলে কী ধরা আছে? কোন সময়ের গল্প? কোন মানুষের মুখ?
“একটা অসমাপ্ত ফিল্ম রোল একটা না বলা গল্পের মতো। তার শেষটা জানার জন্য মন আঁকুপাঁকু করে।”
পরদিন সকালে অনির্বাণ গেল বউবাজারের এক সরু গলির ভেতরে হরিপদ দাসের স্টুডিওতে। হরিপদবাবু প্রায় সত্তরের কোঠায়, এই ডিজিটাল যুগেও অ্যানালগ ক্যামেরার মহত্ত্ব বাঁচিয়ে রেখেছেন। অনির্বাণকে দেখে হাসলেন, “কী হে ছোকরা, আবার কোন জঞ্জাল কুড়িয়ে আনলে?”
রোলটা দেখে হরিপদবাবুর চোখ চকচক করে উঠল। “আরে! এ তো বহু পুরনো জিনিস। ডেভলপ করা যাবে, কিন্তু ছবি আসবে কিনা গ্যারান্টি নেই।”
অপেক্ষার দুটো দিন যেন দুটো যুগের মতো মনে হচ্ছিল অনির্বাণের। অবশেষে হরিপদবাবুর ফোন এল। “চলে এসো। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
অতীতের জানালা
ডার্করুমের আবছা লাল আলোয় অনির্বাণ যখন প্রথম ছবিটা দেখল, তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। একটা মেয়ের মুখ। কুড়ি-বাইশ বছর বয়স হবে। টানা টানা চোখ, কোঁকড়ানো চুল কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। পরনে সাধারণ সালোয়ার কামিজ, কিন্তু হাসিটায় এমন এক সারল্য আছে যা মন ছুঁয়ে যায়। দ্বিতীয় ছবিতে মেয়েটি একটা পুরনো বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে, পেছনে আবছা হয়ে যাওয়া কলকাতার রাস্তা। তৃতীয় ছবিতে সে একলাইব্রেরিতে বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে, মুখে গভীর মনোযোগ।
রোলটায় মোট আটটা ছবি ছিল। সাতটা ছবিতেই ছিল ওই মেয়েটি। কখনও হাসছে, কখনও আনমনা। প্রতিটা ছবিতেই একটা অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে। যেন মেয়েটি শুধু ক্যামেরার সামনে পোজ দেয়নি, নিজের আত্মার একটা অংশ রেখে গেছে।
কিন্তু শেষ ছবিটা ছিল একদম আলাদা। অষ্টম ছবি।
ছবিটা অস্পষ্ট, কাঁপা হাতে তোলা। মেয়েটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, তার মুখে হাসি নেই, বরং এক তীব্র আর্তি। তার হাতটা যেন কিছু একটার দিকে বাড়ানো, কিন্তু কীসের দিকে তা বোঝা যাচ্ছে না। ছবির একটা কোণ অন্ধকার, যেন কেউ জোর করে ক্যামেরাটা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। এই ছবিটা দেখার পর অনির্বাণের মনটা খচখচ করতে লাগল। এই হাসিখুশি মেয়েটির জীবনে এমন কী ঘটেছিল যার ছাপ এই শেষ ছবিতে?
মেয়েটির পরিচয় কী? এই ছবিগুলো কবে তোলা? আর কেনই বা এই রোলটা ক্যামেরার ভেতরেই রয়ে গেল?
অনির্বাণ ছবিগুলোকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল। দ্বিতীয় ছবিটার পেছনে একটা বাড়ির নম্বর আবছা দেখা যাচ্ছে। আর একটা সাইনবোর্ডের ভাঙা অংশ, যাতে লেখা ‘ঘোষ সুইটস’।
এই দুটো সূত্রই যথেষ্ট ছিল। অনির্বাণ ঠিক করল, সে এই রহস্যের শেষ দেখবে।
ছায়ার সন্ধানে
পরের কয়েকটা দিন অনির্বাণ পুরনো কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতে লাগল। অবশেষে, বাগবাজারের এক গলিতে সে খুঁজে পেল সেই বাড়িটা। এখন তার অবস্থা জরাজীর্ণ, দেওয়ালে বট-অশ্বত্থের চারা। একতলায় একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া মিষ্টির দোকান, তার সাইনবোর্ডে এখনও পড়া যায় ‘ঘোষ সুইটস’।
বাড়ির সামনে এক চায়ের দোকানে বসে থাকা এক বৃদ্ধকে ছবিগুলো দেখাল অনির্বাণ। ভদ্রলোক ছবিগুলোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এ তো মায়া। অবনী ঘোষের ছোট মেয়ে। কী যে ছিল মেয়েটা! যেন এক ঝলক হাওয়া। সারা পাড়া মাতিয়ে রাখত।”
অনির্বাণের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। “ছিল মানে? উনি এখন কোথায়?”
বৃদ্ধ উদাসভাবে বললেন, “সে কথা কেই বা জানে। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। একদিন সকালে শোনা গেল, মায়া বাড়িতে নেই। কেউ বলল পালিয়ে গেছে, কেউ বলল বড়লোকদের বাড়ির ছেলে ভুলিয়ে নিয়ে গেছে। ওর বাবা লজ্জায়, অপমানে কিছুদিন পর ব্যবসাপাতি গুটিয়ে এ পাড়া থেকেই উঠে গেল। মায়ার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।”
“একটা হারিয়ে যাওয়া মানুষ পেছনে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে যায়। সেই প্রশ্নগুলোই হয়তো তাকে বাঁচিয়ে রাখে অন্যের স্মৃতিতে।”
অনির্বাণ হতাশ হলো। তাহলে কি গল্পটা এখানেই শেষ? একটা অসমাপ্ত প্রেমের করুণ পরিণতি? শেষ ছবিটার অস্পষ্ট আর্তি কি তাহলে তার হারিয়ে যাওয়ারই ইঙ্গিত?
মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে এল সে। ছবিগুলো টেবিলে ছড়িয়ে রাখল। মায়ার হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, মেয়েটার জন্য কিছু একটা করা উচিত। তার গল্পটা এভাবে হারিয়ে যেতে পারে না।
হতাশ হয়ে সে আবার পুরনো ক্যামেরাটা হাতে তুলে নিল। চামড়ার খাপটার ভেতরটা আঙুল দিয়ে অনুভব করতে লাগল। হঠাৎই, ভেতরের লাইনিং-এর এক জায়গায় আঙুলটা আটকে গেল। একটা আলগা সুতো। অনির্বাণ সামান্য টান দিতেই লাইনিং-এর একটা অংশ খুলে এল। ভেতরে একটা পাতলা কাগজের মতো কিছু একটা ভাঁজ করা।
কম্পিত হাতে অনির্বাণ সেটা বের করল। একটা পুরনো ট্রেনের টিকিট। হাওড়া থেকে দিল্লি। তারিখটা মায়ার হারিয়ে যাওয়ার ঠিক পরের দিনের। আর টিকিটের সাথে একটা ছোট্ট চিরকুট। বিবর্ণ কালিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—
“বাবা, জানি তুমি আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করবে না। কিন্তু যে জীবন তুমি আমার জন্য বেছেছিলে, সেই খাঁচায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি আমার নিজের আকাশ খুঁজতে চললাম। আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমি ভালো থাকব। ইতি, তোমার ‘অবাধ্য’ মায়া।”
হঠাৎ করেই সবটা পরিষ্কার হয়ে গেল অনির্বাণের কাছে। মায়া হারিয়ে যায়নি, সে পালিয়েও যায়নি। সে নিজের ইচ্ছায় নতুন জীবন শুরু করতে গেছিল। শেষ ছবিটা কোনও দুর্ঘটনার ইঙ্গিত ছিল না। ওটা ছিল তার প্রতিবাদের ছবি, তার মুক্তির আগের মুহূর্ত। দরজার বাইরে হয়তো তার বাবা দাঁড়িয়েছিলেন, তাকে আটকানোর চেষ্টা করছিলেন। সেই মুহূর্তটাই কাঁপা হাতে ক্যামেরায় বন্দি হয়ে গেছিল।
অনির্বাণ মায়ার ছবির দিকে আবার তাকাল। এবার তার মুখে আর করুণা ছিল না, ছিল শ্রদ্ধা। চল্লিশ বছর আগে একটা মেয়ে সমাজের সব নিয়ম ভেঙে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছোটার সাহস দেখিয়েছিল। তার গল্পটা ট্র্যাজেডি নয়, সাহসিকতার।
অনির্বাণ নিজের ডিজিটাল ক্যামেরাটা তুলে নিল। লেন্সের ঢাকনাটা খুলল। তার মনে হলো, অনেকদিন পর সে আবার নতুন করে গল্প দেখার চোখ ফিরে পেয়েছে। টেবিলের ওপর রাখা মায়ার ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে হাসল। তারপর ক্যামেরাটা চোখে লাগিয়ে জানালার বাইরের কর্মব্যস্ত কলকাতার দিকে তাক করল। তার মনে হলো, প্রত্যেকটা সাধারণ মুখের পেছনেও হয়তো মায়ার মতোই অসাধারণ সব গল্প লুকিয়ে আছে। তাকে শুধু সেই গল্পগুলো খুঁজে বের করতে হবে। ছবির ভেতরের ছায়া নয়, ছায়ার ভেতরের আলোটাকে ধরতে হবে।