প্রথম অধ্যায়: নিভে আসা আগুন
নিমাই পালের চাকাটা আজ অনেকদিন পর ঘুরছে। কিন্তু তাতে আগের মতো সেই সুর নেই। কেমন যেন একটা ক্লান্ত, অনিচ্ছুক গোঙানির মতো শব্দ উঠছে। মাটির তালটা হাতের চাপে আকার নিচ্ছে বটে, কিন্তু তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে কই! কর্মশালার ধুলোমাখা স্যাঁতস্যাঁতে বাতাসে শুধু ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর নিমাই পালের দীর্ঘশ্বাস মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। একসময় এই পালপাড়া মুখর থাকত চাকার একটানা গুঞ্জনে, রোদে শুকোতে দেওয়া সারি সারি হাঁড়ি-কলসির উপর ঠিকরে পড়ত দুপুরের সোনালি আলো। এখন সব চুপ। বেশিরভাগ উঠোনেই তালা ঝোলে। নতুন প্রজন্ম শহরে পাড়ি দিয়েছে, এই ‘মাটি ঘাঁটাঘাঁটির’ কাজে তাদের মন নেই।
“দাদু, ও দাদু! চা জুড়িয়ে গেল তো!”
বাইরে থেকে নাতি আকাশের গলা পেয়ে নিমাই পালের চিন্তায় ছেদ পড়ল। আকাশ। শহরের ছেলে। ছুটিতে এসেছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও, বাবার ধমক খেয়ে। ওর হাতে সর্বক্ষণ একটা চৌকো কাচের যন্ত্র, যার দিকে তাকিয়েই ওর দিন কেটে যায়। এই গ্রামের সবুজ, এই পুকুরের জল, এই মাটির গন্ধ—কিছুই ওকে টানে না।
নিমাই পাল হাত ধুয়ে বাইরে এলেন। আকাশ চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “সারাদিন কী যে করো এই ধুলোবালি মেখে! কলকাতায় চলো আমাদের সাথে। এখানে পড়ে থেকে কী হবে?”
কথাটা তীরের মতো বিঁধল নিমাই পালের বুকে। এই ধুলোবালি তো নয়, এটা তাঁর পূর্বপুরুষের রক্ত, তাঁর নিজের সত্তা। তিনি ম্লান হেসে বললেন, “যেখানে শেকড়, তাকে ছেড়ে গেলে কি আর বাঁচা যায় রে দাদুভাই?”
আকাশ বোঝে না। তার কাছে শেকড় মানে হাই-স্পিড ইন্টারনেট আর শহরের সুযোগ-সুবিধা। এই শান্ত, ধীরগতির জীবন তার কাছে একটা শাস্তি। সে শুধু দিন গোনে, কবে ছুটি ফুরোবে আর সে তার কোলাহলের জগতে ফিরে যাবে।
সেদিন রাতে খাওয়ার সময় আবার কথা উঠল। আকাশ তার গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ নিয়ে খুব উত্তেজিত। সে দাদুকে তার ডিজাইন করা একটা লোগো দেখাল ফোনে। নিমাই পাল ঝাপসা চোখে সেদিকে তাকিয়ে বললেন, “এসব ছবি তো মেশিনে ছাপে। এতে হাতের ছোঁয়া কই? এতে তো শিল্পীর আত্মা থাকে না।”
আকাশ বিরক্ত হয়ে বলল, “আত্মা! দাদু, যুগ পাল্টে গেছে। তোমার ওই মাটির পুতুল এখন আর কেউ কেনে না। ওসব দিয়ে পেট চলে না। ওগুলো এখন শুধু মিউজিয়ামে সাজিয়ে রাখার জিনিস।”
কথাটা নিমাই পালের আত্মসম্মানে লাগল। তিনি চুপ করে গেলেন। বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগছিল। সত্যিই কি তার এত বছরের সাধনা, তার শিল্প, শুধুই অতীতের ধ্বংসাবশেষ?
দ্বিতীয় অধ্যায়: ঐতিহ্যের সন্ধান
পরের কয়েকটা দিন দুজনের মধ্যে একটা শীতল দূরত্ব তৈরি হল। আকাশ গ্রামে ঘুরে বেড়াত সময় কাটানোর জন্য। একদিন ঘুরতে ঘুরতে সে গ্রামের প্রান্তেเก่า পোড়ো মন্দিরটার কাছে এসে পড়ল। মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ। মহাভারতের কাহিনী, সামাজিক জীবনের ছবি, ফুল-লতাপাতার নকশা—কী নেই তাতে! শত শত বছর পরেও সেই মাটির ফলকগুলো যেন জীবন্ত। আকাশ নিজের অজান্তেই ফোন বের করে ছবি তুলতে শুরু করল। প্রতিটি নকশার নিখুঁত বিন্যাস, প্রতিটি চরিত্রের অভিব্যক্তি তাকে অবাক করে দিচ্ছিল।
বাড়িতে ফিরে সে দাদুর পুরনো ট্রাঙ্কটা ঘাঁটতে শুরু করল। খুঁজে পেল একটা পুরোনো খাতা। খাতার পাতায় পাতায় পেন্সিলের টানে আঁকা অজস্র নকশা। সেই মন্দিরের টেরাকোটার কাজের মতো সূক্ষ্ম সব ডিজাইন, আবার কখনও পুকুরপাড়ের বক, উঠোনের ধারে ফুটে থাকা অপরাজিতা ফুল—সবই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে কাগজের বুকে। দাদুর হাতের আঁকা। আকাশ অবাক হয়ে দেখল, তার দাদু শুধু একজন কুমোর নন, তিনি একজন জাতশিল্পী। তার ডিজিটাল ডিজাইনের পেছনে যে ‘ডিজাইন ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা নকশার ব্যাকরণ থাকে, তার থেকেও অনেক সমৃদ্ধ এক নান্দনিক জগৎ লুকিয়ে আছে এই পুরোনো খাতার পাতায়।
তার মনে হল, সে এতদিন হীরের খনির পাশে বসে কাচ নিয়ে খেলা করছিল।
এর কিছুদিন পরেই গ্রামে বাৎসরিক মেলার ঘোষণা হল। একসময় নিমাই পালের স্টলই থাকত মেলার প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তিনি আর মেলায় দোকান দেন না। বলেন, “এখন আর খদ্দের হয় না। সবাই প্লাস্টিকের সস্তা জিনিস কেনে।”
আকাশ দাদুকে গিয়ে বলল, “দাদু, এবার মেলায় দোকান দেবে না?”
নিমাই পাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কী হবে দিয়ে? সেই তো মাছি তাড়াতে হবে বসে বসে।”
আকাশের মাথায় তখন একটা অন্য পরিকল্পনা ঘুরছে। সে ভাবছিল, সমস্যাটা পণ্যের নয়, সমস্যাটা উপস্থাপনার। ঐতিহ্যকে যদি বর্তমানের মোড়কে पेश করা যায়, তাহলে হয়তো মানুষ আবার ফিরে তাকাবে।
তৃতীয় অধ্যায়: নতুন সুরের জন্ম
আকাশ কাজে লেগে গেল। সে দাদুর সেরা কাজগুলোর ছবি তুলল খুব যত্ন করে। শুধু ছবি নয়, প্রতিটি কাজের পেছনের গল্প, নকশার উৎস, তৈরির পদ্ধতি—সবকিছু দাদুর কাছ থেকে জেনে নিয়ে গুছিয়ে লিখল। তারপর নিজের ল্যাপটপে বসে একটা সুন্দর ওয়েবসাইট আর সোশ্যাল মিডিয়া পেজ তৈরি করল। পেজের নাম দিল—‘মাটির কথা’।
সেখানে সে ছবিগুলোর সাথে গল্পগুলোও পোস্ট করতে শুরু করল। ‘এই নকশাটা মন্দিরের টেরাকোটা থেকে নেওয়া, এর নাম ‘রাসলীলা’। এই ফুলদানিটার গায়ে যে মাছের ছবি, তা গ্রামের পুকুর থেকে দাদুর নিজের চোখে দেখা।’—এই ধরনের ছোট ছোট বিবরণ জুড়ে দিল ছবির সাথে।
নিমাই পাল প্রথমে কিছুই বোঝেননি। যখন আকাশ তাঁকে ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখাল যে কলকাতা, এমনকি দিল্লি থেকেও কিছু মানুষ তাঁর কাজের প্রশংসা করছে, কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছে, তখন তাঁর ঝাপসা চোখ দুটো বিস্ময়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একজন তো কমেন্টে লিখেছেন, “This is not just pottery, this is storytelling.”
নিমাই পাল ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে নাতিকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী লিখেছে রে?”
আকাশ হেসে বলল, “লিখেছে, এটা শুধু মাটির পাত্র নয়, এটা একটা গল্প।”
সেই প্রথমবার নিমাই পালের মনে হল, তাঁর শিল্প হয়তো সত্যিই হারিয়ে যায়নি।
দুজনে মিলে ঠিক করল, এবার মেলায় তারা দোকান দেবে। তবে আগের মতো করে নয়। আকাশ দোকানের একটা নতুন ডিজাইন করল। একদিকে দাদুর মাটির কাজগুলো সুন্দর করে সাজানো, আর তার পাশে একটা স্ক্রিনে সেই কাজের পেছনের গল্প, তৈরির ভিডিও চলছে। একটা নতুন ধরনের উপস্থাপনা। ঐতিহ্য আর প্রযুক্তির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন।
মেলার দিন তাদের দোকানে ভিড় উপচে পড়ল। গ্রামের মানুষ তো বটেই, শহর থেকেও অনেকে এল, যারা ‘মাটির কথা’ পেজটা দেখে ঠিকানা খুঁজে এসেছে। সবাই শুধু জিনিস কিনছে না, তারা সেই জিনিসের পেছনের শিল্প আর শিল্পীর গল্পটাকেও সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে। নিমাই পাল অবাক হয়ে দেখলেন, কমবয়সী ছেলেমেয়েরা তাঁর কাজের প্রতি কী ভীষণ আগ্রহী!
সেদিন সন্ধ্যায়, মেলার শেষে, ক্লান্ত কিন্তু তৃপ্ত নিমাই পাল নাতির কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তুই আমার শিল্পকে নতুন জীবন দিলি রে দাদুভাই।”
আকাশের ছুটির দিন শেষ হয়ে এল। স্টেশনে তাকে ট্রেনে তুলে দিতে এসে নিমাই পাল তার হাতে একটা ছোট মাটির প্যাঁচা তুলে দিলেন। তার দাদুর বানানো প্রথম খেলনাগুলোর একটা। আকাশ যত্ন করে সেটা ব্যাগে রাখল। এবারের বিদায়বেলায় কোনো অভিমান বা দূরত্ব ছিল না, ছিল শুধু গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।
কর্মশালায় ফিরে এসে নিমাই পাল আবার তাঁর চাকার সামনে বসলেন। আজ চাকাটা ঘুরছে, আর তা থেকে এক নতুন, আত্মবিশ্বাসী সুর ভেসে আসছে। এ সুর শুধু মাটির আকার বদলের শব্দ নয়, এ সুর দুটো প্রজন্মের মেলবন্ধনের, ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের গান। তিনি জানেন, তিনি একা নন। দূরে শহরে বসে তাঁর নাতি এই সুরকে ছড়িয়ে দেবে সারা পৃথিবীতে। তাঁর চাকার গান अब থামবে না।