উত্তরবঙ্গের আকাশটা আজ সকাল থেকেই বিষণ্ণ। ঘন মেঘের আড়ালে সূর্য যেন মুখ লুকিয়ে আছে, আর থেকে থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো জমিদার বাড়িটাকে। এই বাড়িটা অলোকেশ রায়ের, যিনি গত মাসেই পরলোকগমন করেছেন। তার নাতনি অনন্যা শহর থেকে এসেছে এই বিশাল সম্পত্তির তদারকি করতে। অনন্যা পেশায় একজন স্থপতি, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই দাদুর কাছে রহস্য গল্পের নেশা সে পেয়েছিল উত্তরাধিকার সূত্রে।
অতীতের হাতছানি
বাড়ির দোতলার কোণের ঘরটা ছিল অলোকেশ বাবুর স্টুডিও। তিনি শুধু জমিদারই ছিলেন না, ছিলেন একজন নিপুণ চিত্রশিল্পী। অনন্যা যখন সেই ঘরের ধুলো জমা আসবাবপত্রের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিল, তখন তার নজর পড়ল ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা একটা ক্যানভাসের ওপর। ক্যানভাসটা একটা পুরনো মখমলের কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। কৌতূহলবশত কাপড়টা সরাতেই অনন্যার চোখ কপালে উঠল। সেটা একটা জলরঙের ছবি। ছবির বিষয়বস্তু খুব সাধারণ—একটি পাহাড়ি উপত্যকা, দূরে ঝর্ণা আর কাছেই একটা ছোট দেবদারু গাছ। কিন্তু ছবিটার মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যা অনন্যাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
“চিত্র যখন কথা বলে না, তখন বুঝতে হবে তার ভেতরে কোনো গভীর গোপন কথা চাপা পড়ে আছে।”
দাদুর ডায়েরিতে লেখা এই কথাটাই অনন্যার মনে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সে লক্ষ করল, ছবির দেবদারু গাছের নিচে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর আঁকা আছে, যার জানলাটা আধখোলা। অদ্ভুত বিষয় হল, আগের দিন যখন সে ঘরটা পরিষ্কার করতে এসেছিল, তখন তার মনে হয়েছিল ছবিতে ওই কুঁড়েঘরটা ছিল না। এটা কি মনের ভুল? অনন্যা ভাবল হয়তো ভ্রম হচ্ছে। কিন্তু পরদিন সকালে স্টুডিওতে পা রাখতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। কুঁড়েঘরের জানলা দিয়ে এখন একটা প্রদীপ জ্বলছে দেখা যাচ্ছে, আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক আবছা নারীমূর্তি।
রহস্যের গভীরে
অনন্যা আর স্থির থাকতে পারল না। সে বুঝতে পারল এই ছবিটা সাধারণ কোনো চিত্রকর্ম নয়। সে দাদুর পুরনো ডায়েরিগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত একটা জীর্ণ ডায়েরির পাতায় সে খুঁজে পেল একটি সংকেত—'জল যখন আয়না হয়, তখন ছায়ারা পথ দেখায়।' অনন্যা বুঝতে পারল দাদু তাকে কোনো কিছুর দিকে ইঙ্গিত করছেন। সে ছবিটাকে তুলে আনল জানালার আলোর সামনে। আলোর বিপরীতে ধরতেই সে দেখল ক্যানভাসের নিচে সূক্ষ্ম কালি দিয়ে কিছু একটা লেখা আছে। সেটা কোনো ভাষা নয়, বরং একটা মানচিত্রের টুকরো।
অনন্যা বুঝতে পারল এই জমিদার বাড়ির নিচেই কোনো গুপ্ত কক্ষ আছে। সে সেই মানচিত্র অনুসরণ করে বাড়ির পুরনো লাইব্রেরির দিকে এগিয়ে গেল। লাইব্রেরির বিশাল আলমারিগুলোর পেছনে একটা গুপ্ত দরজা সে খুঁজে পেল। দরজাটা খুলতেই ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এল। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই সে দেখল একটি ছোট্ট ঘর, যেখানে সাজানো আছে রাশি রাশি পাণ্ডুলিপি আর আঁকা ছবি।
অনাকাঙ্ক্ষিত সত্য
ঘরের মাঝখানে একটা বড় টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটি অসমাপ্ত ছবি। সেটা হুবহু সেই জলছবিটার মতো, যা অনন্যা উপরে দেখেছিল। কিন্তু এখানে ছবির নারীমূর্তির মুখ স্পষ্ট। অনন্যা চমকে উঠল—ওই মুখটা তার নিজের দিদিমার, যাকে সে কোনোদিন দেখেনি। অলোকেশ রায় তার স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন অনেক অল্প বয়সে। দিদিমা ছিলেন একজন বিপ্লবী লেখিকা, যা সমাজ জানত না। অলোকেশ বাবু এই ঘরেই তার স্ত্রীর সব নিষিদ্ধ লেখা আর ডায়েরি লুকিয়ে রেখেছিলেন যাতে ব্রিটিশ সরকারের হাত থেকে সেগুলো রক্ষা পায়।
“সৃজনশীলতা যখন সত্যের বাহক হয়, তখন তাকে দেওয়াল দিয়ে বন্দি করে রাখা অসম্ভব।”
অনন্যা অনুভব করল, তার দাদু চেয়েছিলেন কেউ একজন আসুক যে এই অমূল্য সাহিত্যভাণ্ডারকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরবে। সেই রহস্যময় জলছবিটা আসলে ছিল একটা মাধ্যম, যা অনন্যাকে এই অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের সন্ধান দিতে সাহায্য করেছে।
উপসংহার
বৃষ্টি থেমে গেছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের সোনালি আভা পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছে। অনন্যা সেই পাণ্ডুলিপিগুলো সযত্নে তার ব্যাগে ভরে নিল। সে জানত, এই ছবি আর লেখার মাধ্যমে তার দিদিমা আর দাদুর অমর প্রেম এবং সংগ্রামের গল্প আজ থেকে নতুন জীবন পাবে। বাড়ির বাইরে আসতেই তার মনে হল, স্টুডিওর সেই জলছবির নারীমূর্তিটা যেন জানলা দিয়ে তাকে দেখে মৃদু হাসছে। রহস্যের পর্দা সরে গেছে, কিন্তু ইতিহাসের সেই সুগন্ধ আজীবন অনন্যার সঙ্গী হয়ে রইল।