শাওলীর স্কলারশিপ পাওয়ার পার্টিটা জমে উঠেছিল বেশ। বসার ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে অরুন্ধতী দেখছিলেন কাচের গ্লাসে সোডার বুদবুদ ওঠা, শুনছিলেন পরিচিত-অপরিচিত মুখের হাসির ফোয়ারা। অনীশ, তাঁর স্বামী, অতিথিদের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত। তাঁর মুখে গর্বের ছাপ স্পষ্ট। শাওলী, তাঁদের একমাত্র মেয়ে, বন্ধুদের মাঝে উজ্জ্বল এক প্রজাপতির মতো উড়ছিল। মেয়ের সাফল্যে অরুন্ধতীর বুক ভরে উঠছিল, কিন্তু সেই আনন্দের গভীরে কোথাও যেন একটা চিনচিনে ব্যথা, একটা বহু পুরনো দীর্ঘশ্বাস আটকে ছিল।
সকলেই বলছিল, "অরুন্ধতী, তুমি ভাগ্যবতী। মেয়ের জন্য যা করেছ, তার ফল পেয়েছ।" তিনি মৃদু হাসছিলেন। কী করেছেন তিনি? আর পাঁচটা মায়ের মতোই তো! নিজের সবটুকু নিংড়ে দিয়ে মেয়েকে বড় করেছেন, তার স্বপ্নগুলোকে নিজের স্বপ্ন করে নিয়েছেন। কিন্তু আজ, মেয়ের ডানা মেলার মুহূর্তে তাঁর নিজের কাটা ডানার কথা কেন এত মনে পড়ছে?
পার্টি শেষ হতে হতে রাত গভীর হলো। ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দেওয়ার পর অনীশ বললেন, "শাওলীর জন্য পুরনো ট্রাঙ্কটা নামাতে হবে কাল। ওর কিছু পুরনো অ্যালবাম, শখের জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতে হবে। বিদেশে গিয়ে একা লাগবে ওর।" অরুন্ধতী শুধু মাথা নাড়লেন। ওই ট্রাঙ্কটা! ওটা শুধু শাওলীর শৈশবের নয়, ওটা অরুন্ধতীর যৌবনের সমাধিক্ষেত্র।
পরদিন দুপুরে চিলেকোঠার ঘর থেকে ধুলোমাখা বিশাল কাঠের ট্রাঙ্কটা নামানো হলো। ডালাটা খুলতেই ন্যাপথলিনের তীব্র গন্ধের সঙ্গে বেরিয়ে এল একরাশ স্মৃতি। শাওলীর ছোটবেলার ফ্রক, ভাঙা খেলনা, আঁকার খাতা। এক এক করে জিনিস সরাতে সরাতে অরুন্ধতীর হাতটা হঠাৎ থেমে গেল। একটা মখমলের থলির ভেতর ভারী, শীতল কিছু একটা তাঁর আঙুল ছুঁয়ে গেল। তাঁর হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ধূসর হয়ে যাওয়া মখমলের থলিটা কাঁপা কাঁপা হাতে বের করে আনলেন তিনি। মুখের দড়িটা খুলতেই বেরিয়ে এল একজোড়া ঘুঙুর। প্রায় একশোটা করে বল প্রতিটিতে। অক্সিজেনের অভাবে তামাটে হয়ে যাওয়া বলগুলো যেন অভিমানী মুখ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। অরুন্ধতী ঘুঙুরজোড়া হাতে তুলে নিলেন। কী আশ্চর্য! এত বছর পরেও তাদের ওজন কমেনি একটুও। বরং সময়ের ভারে যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। এই ঘুঙুরের শব্দ একদিন তাঁর পরিচয় ছিল। আজ সেই পরিচয় ধুলোর আস্তরণের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
অতীতের মঞ্চ
চোখ বন্ধ করতেই অরুন্ধতী দেখতে পেলেন একুশ বছরের এক তরুণীকে। মঞ্চের উজ্জ্বল আলোয় যার মুখ ঝলমল করছে। যার পায়ের প্রতিটি মুদ্রা, হাতের প্রতিটি ভঙ্গিমা দর্শকদের সম্মোহিত করে রাখছে। গুরুজি বলতেন, "তোর পায়ে সরস্বতীর বাস, অরু। এই ঘুঙুর শুধু বাদ্যি নয়, তোর আত্মার প্রতিধ্বনি।" কত্থকের দুনিয়ায় তখন অরুন্ধতী এক উদীয়মান নক্ষত্র। খবরের কাগজে ছবি ছাপা হতো, অনুষ্ঠানের পর গুণীজনদের প্রশংসায় ভেসে যেতেন।
সেই সময়েই আলাপ হয়েছিল অনীশের সঙ্গে। এক বন্ধুর বিয়েতে। শান্ত, সৌম্য, বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেটিকে তাঁর ভালো লেগেছিল। অনীশও তাঁর নাচের ভক্ত ছিলেন। কিন্তু ভালোবাসার পথটা ফুলের ছিল না। অনীশের পরিবার ছিল শহরের নামকরা বনেদি ব্যবসায়ী। তাঁদের বাড়িতে শিল্পের কদর ছিল, কিন্তু শিল্পী পুত্রবধূর স্থান ছিল না।
"নাচ-গান এসব শখের জন্য ঠিক আছে," অনীশের মা বলেছিলেন নিরাসক্ত গলায়, "কিন্তু বাড়ির বউ মঞ্চে উঠে পা দুলিয়ে নাচবে, এটা আমাদের পরিবারে চলে না। লোকে কী বলবে?"
অনীশ লড়াই করেছিলেন, কিন্তু পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস তাঁর ছিল না। একদিন সন্ধ্যায় গঙ্গার ঘাটে বসে তিনি অরুন্ধতীর হাত ধরে বলেছিলেন, "অরু, আমি তোমায় ছাড়া বাঁচব না। কিন্তু আমার পরিবার... তুমি কি আমার জন্য তোমার..."
কথাটা শেষ করতে পারেননি অনীশ। অরুন্ধতী তাঁর চোখের দিকে তাকিয়েছিলেন। সেই চোখে ভালোবাসা ছিল, আর ছিল অসহায়তা। সেই রাতেই তিনি তাঁর গুরুজির পায়ে হাত দিয়ে বলেছিলেন, "আমায় ক্ষমা করবেন গুরুজি। আমি আর নাচতে পারব না।" গুরুজি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, "এত বড় প্রতিভা তুই শেষ করে দিবি একটা সংসারের জন্য? পরে পস্তাবি, মা।"
অরুন্ধতী পস্তাননি। অনীশকে ভালোবেসেছিলেন, শাওলীকে পেয়ে তাঁর জগৎ পূর্ণ হয়েছিল। কিন্তু প্রতিটা উৎসবের রাতে, যখনই কোথাও নুপুরের শব্দ শুনতেন, তাঁর বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যেত। তিনি ভালো স্ত্রী, ভালো মা হওয়ার চেষ্টায় নিজের সত্তাটাকে ওই কাঠের ট্রাঙ্কে তালাবন্ধ করে দিয়েছিলেন।
বর্তমান যখন আয়না
চিলেকোঠার ঘরে অরুন্ধতীর তন্ময়তা ভাঙল শাওলীর ডাকে। "মা, কী করছ এখানে একা একা?" শাওলী ঘরে ঢুকে মায়ের হাতে ঘুঙুরজোড়া দেখে অবাক হলো। "এটা কী মা? কী সুন্দর!"
অরুন্ধতী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আমার ঘুঙুর।"
"তোমার ঘুঙুর? মানে? তুমি নাচতে?" শাওলীর গলায় বিস্ময়।
অরুন্ধতী মৃদু হাসলেন। "হ্যাঁ, একসময় নাচতাম।"
ঠিক সেই মুহূর্তে অনীশ ঘরে ঢুকলেন। পরিস্থিতি দেখে একটু অপ্রস্তুত হলেন। শাওলীর দিকে তাকিয়ে বললেন, "আরে ও কিছু না। বিয়ের আগে তোমার মা শখ করে একটু নাচ-টাচ করতেন। ছাড়ো তো ওসব পুরনো কথা।"
"শখ?" — শব্দটা তীরের মতো বিঁধল অরুন্ধতীর বুকে। তাঁর জীবনের সাধনা, তাঁর আত্মার স্পন্দন, তাঁর পরিচয়, অনীশের কাছে সেটা শুধু একটা 'শখ'? এত বছর একসঙ্গে থাকার পরেও মানুষটা তাঁকে এতটুকুও বোঝেনি? তাঁর ভেতরের শিল্পীসত্তার এই অপমান তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। কোনো কথা না বলে তিনি ঘুঙুরজোড়া আবার থলিতে ভরে ট্রাঙ্কের এক কোণে রেখে দিলেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিটা যেন জেগে উঠতে শুরু করেছিল।
শাওলীর যাওয়ার আগের দিন বাড়িতে ছোট একটা ঘরোয়া আয়োজন করা হলো। কাছের আত্মীয়স্বজনরা এসেছেন। এক কাকিমা শাওলীকে বললেন, "একা একা বিদেশে যাচ্ছিস মেয়ে, সাবধানে থাকিস। বেশি ওড়াওড়ি করিস না। শেষে আবার দেশের কথা ভুলে যাস না।"
কথাগুলো নিরীহ হলেও এর ভেতরের সুরটা অরুন্ধতীর চেনা। এই একই সুর তিনি শুনেছিলেন পঁচিশ বছর আগে। তাঁর নাচকে ব্যঙ্গ করে অনেকেই বলত, "বাড়ির মেয়ের এত ওড়াওড়ি ভালো নয়।" তিনি দেখলেন, যুগ পাল্টেছে, কিন্তু মানুষের মানসিকতা বিশেষ পাল্টায়নি। মেয়েদের স্বপ্নের ডানা ছেঁটে দেওয়ার অদৃশ্য কাঁচিটা সমাজের হাতে আজও প্রস্তুত।
সেদিন রাতে কিছুতেই ঘুম এল না অরুন্ধতীর। বিছানা ছেড়ে উঠে ছাদে চলে গেলেন। ভরা পূর্ণিমার আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। সঙ্গে করে এনেছিলেন সেই মখমলের থলিটা। অনেক দ্বিধার পর, প্রায় পঁচিশ বছর পর, তিনি ঘুঙুরজোড়া পায়ে বাঁধলেন। চামড়ার স্ট্র্যাপগুলো শক্ত হয়ে গেছে, বাঁধতে কষ্ট হলো।
তারপর চোখ বন্ধ করে দাঁড়ালেন। একটা, দুটো, তিনটে... পায়ের পাতায় মৃদু আন্দোলন করলেন। শরীরটা ভারী, পেশিগুলো শক্ত। কিন্তু তাঁর আত্মা যেন মুক্ত হতে চাইছিল। তিনি একটা ছোট্ট चक्कर নিলেন। ঝমঝম করে বেজে উঠল ঘুঙুর। সেই শব্দ রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে খানখান করে দিল। ওটা ঘুঙুরের শব্দ ছিল না, ওটা ছিল তাঁর অবদমিত ইচ্ছের আর্তনাদ, তাঁর হারিয়ে যাওয়া যৌবনের ফিসফিসানি। তিনি নাচলেন না, শুধু স্মৃতি হাতড়ালেন। পায়ের মুদ্রার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল শাওলী। মায়ের এই অচেনা রূপ সে আগে কখনও দেখেনি। চাঁদের আলোয় মায়ের ভেজা চোখ, আর তাঁর পায়ের ওই ছন্দবদ্ধ আর্তনাদ দেখে শাওলীর বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। সে প্রথমবার বুঝতে পারল, তার মা শুধু একজন মা বা স্ত্রী নন, তার থেকেও অনেক বড় তাঁর একটা পরিচয় ছিল, যেটাকে এই সংসার, এই সমাজ গলা টিপে হত্যা করেছে। তার নিজের স্বপ্নের উড়ানের জন্য যে আকাশটা তৈরি হয়েছে, তার ভিতটা যে মায়ের বিসর্জন দেওয়া স্বপ্নের উপর গড়া।
পরদিন এয়ারপোর্টে বিদায় জানানোর মুহূর্তে শাওলী তার বাবাকে পাশ কাটিয়ে সটান মাকে জড়িয়ে ধরল। কান্নারুদ্ধ গলায় সে অরুন্ধতীর কানে কানে ফিসফিস করে বলল:
"মা, ফিরে এসে আমি তোমার নাচ দেখব। তুমি আবার শুরু করবে, কথা দাও। আমার জন্য নয়, নিজের জন্য।"
অরুন্ধতী চমকে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। শাওলীর চোখে জল, কিন্তু সেই সঙ্গে ছিল গভীর শ্রদ্ধা আর বোঝাপড়া। তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেললেন।
শাওলীর বিমান আকাশে মিলিয়ে যাওয়ার পরেও অরুন্ধতী ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর হাতে ধরা ছিল গাড়ির চাবি, আর মনে হচ্ছিল যেন তিনি তাঁর পুরনো ঘুঙুরজোড়া ধরে আছেন। আজ প্রথমবার তাঁর মনে হলো, ট্রাঙ্কের ডালাটা তিনি বন্ধ করেননি, খুলে দিয়েছেন। সব শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো নতুন করে শুরু করার কোনো বয়স হয় না। তাঁর গাল বেয়ে যে জলটা গড়িয়ে পড়ছিল, তাতে শুধু বিচ্ছেদের কষ্ট ছিল না, ছিল মুক্তির স্বাদ, ছিল নতুন করে এক স্বপ্নের বীজ বোনার আশা। আকাশটা শুধু শাওলীর নয়, তাঁর জন্যও যেন একটু একটু করে নীল হচ্ছিল।