প্রেম, ভাজাভুজি আর কেচাপের বোতল!

একটু কল্পনা করুন তো! ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, আপনার প্লেটে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা পকোড়া, আর পাশে বসা আপনার মনের মানুষ। এমন একটা মিষ্টি মুহূর্তে আর কী চাই? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন! এক বোতল টমেটো কেচাপ। আচ্ছা, এই যে লাল টুকটুকে, মিষ্টি-টক স্বাদের সঙ্গীটি, তাকে তো আমরা শুধু ভাজাভুজির স্বাদ বাড়ানোর কাজেই ব্যবহার করি। কিন্তু যদি বলি, এই সাধারণ দেখতে কেচাপ একসময় ছিল ডাক্তারখানার হিরো? শুধু তাই নয়, তাকে রীতিমতো ‘মহৌষধ’ বলে বিক্রি করা হতো! ভাবছেন, মজা করছি? একদমই না! চলুন, আজ ডুব দেওয়া যাক কেচাপের সেই রঙিন আর অবিশ্বাস্য অতীতে।

যখন কেচাপ ছিল ‘ডাক্তার’!

আজকের দিনে টমেটো কেচাপ ছাড়া আমাদের চলেই না, কিন্তু একটা সময় ছিল যখন টমেটোকেই মানুষ ভয় পেত। ভাবা হতো, এটি এক ধরনের বিষাক্ত ফল। তবে সব ধারণা বদলে যেতে শুরু করে ১৮৩০-এর দশকে। আমেরিকার ওহাইও প্রদেশের এক ডাক্তার, নাম তাঁর জন কুক বেনেট, তিনি রীতিমতো গবেষণা করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে টমেটো মোটেই বিষাক্ত নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে প্রচুর ঔষধি গুণ। তিনিই প্রথম টমেটো কেচাপকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যান।

১৮৩০-এর দশকে টমেটো কেচাপকে ডায়রিয়া, বদহজম, জন্ডিস এবং বাত বাতের মতো রোগের অব্যর্থ ওষুধ হিসেবে বিক্রি করা হতো!

ডাক্তার বেনেট দাবি করেন, টমেটোর মধ্যে থাকা পুষ্টিগুণ শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ করে তুলতে পারে। তিনি কেচাপের এমন এক রেসিপি তৈরি করেন এবং ঘোষণা করেন যে এটি খেলে হজমের সমস্যা থেকে শুরু করে জন্ডিসের মতো রোগও সেরে যেতে পারে। সেই সময় কলেরা বা হজমের রোগ খুব সাধারণ ছিল, তাই মানুষ তাঁর এই দাবিকে লুফে নেয়। রাতারাতি ডাক্তার বেনেটের কেচাপ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুধু সস হিসেবেই নয়, এর চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি এই কেচাপকে ঘন করে ছোট ছোট বড়ি বা পিল বানিয়ে ফেলেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘টমেটো পিলস’।

কেচাপের উত্থান এবং অবাক করা পতন

ডাক্তার বেনেটের এই ‘টমেটো পিলস’ বাজারে আসতেই যেন এক নতুন যুগের সূচনা হয়। মানুষ দোকানে গিয়ে সর্দি-কাশির ওষুধের বদলে কেচাপের বড়ি চাইতে শুরু করে। খবরের কাগজে ফলাও করে ছাপা হতে থাকে এই আশ্চর্য ওষুধের গুণগান। এই বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে আরও অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের মতো করে ‘টমেটো পিলস’ বানিয়ে বাজারে ছাড়তে শুরু করে।

কিন্তু এখানেই গল্পের মোড় ঘুরে যায়। নকলনবিশের দল এমন সব পিল বানাতে শুরু করে, যাতে টমেটোর ‘ট’-ও থাকতো না। তার বদলে মেশানো হতো নানা ধরনের مضر পদার্থ এবং ল্যাক্সেটিভ বা জোলাপ। মানুষ সুস্থ হওয়ার বদলে আরও অসুস্থ হতে শুরু করে। অনেকেই বুঝতে পারেন যে তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। ধীরে ধীরে এই ‘ওষুধের’ ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে যায়। ১৮৫০ সাল নাগাদ কেচাপের এই ডাক্তারি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

শেষ কথা: ওষুধ না হোক, ভালোবাসা তো বটেই!

ডাক্তার হিসেবে কেচাপের কেরিয়ার भलेই ব্যর্থ হয়ে থাকুক, কিন্তু সে তার আসল ভালোবাসার জায়গাটা ঠিকই খুঁজে নিয়েছে আমাদের খাবারের প্লেটে। কয়েক দশক পর, হেনরি হেইঞ্জ নামের এক ব্যবসায়ী কেচাপকে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনেন, যা আজ আমাদের সকলের প্রিয়। কেচাপ হয়তো আমাদের সর্দি-কাশি সারায় না, কিন্তু মন খারাপের দিনে এক প্লেট গরম পকোড়ার সঙ্গে তার সঙ্গ যে কোনও ওষুধের চেয়ে কম নয়, তাই না?

তাই পরেরবার যখন কেচাপের বোতলটা হাতে নেবেন, তখন শুধু তার স্বাদের কথাই ভাববেন না। একবার তার সেই ডাক্তারির দিনগুলোর কথাও মনে করবেন আর মুচকি হেসে বলবেন, “বাপরে! কী দিনই না ছিল তোমার!”