বিষয়ের ভূমিকা

ভারতের ইতিহাসে এমন কিছু শাসক এসেছেন, যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন সম্রাট অশোক। তিনি শুধু একজন দিগ্বিজয়ী যোদ্ধাই ছিলেন না, বরং একজন প্রজাহিতৈষী, দূরদর্শী এবং শান্তির পূজারী শাসক হিসেবেও পরিচিত। মৌর্য সাম্রাজ্যের তৃতীয় এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোকের জীবন কাহিনী এক নাটকীয় পরিবর্তনের গল্প। এক ভয়ংকর যুদ্ধের পর তাঁর হৃদয়ে যে পরিবর্তন এসেছিল, তা কেবল তাঁর সাম্রাজ্যের নীতিই বদলে দেয়নি, বরং বিশ্ব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

ষষ্ঠ শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের এই অধ্যায়টি আমাদের সেই মহান সম্রাটের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমরা জানব কীভাবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এক বিশাল সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নিয়েছিলেন অশোক, কোন যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁকে যুদ্ধত্যাগের প্রতিজ্ঞা করতে বাধ্য করেছিল, এবং কীভাবে তিনি ‘ধর্ম’ বা ধম্মের পথে হেঁটে এক নতুন শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। এই অধ্যায়টি শুধু একজন রাজার গল্প নয়, এটি ক্ষমতা, অনুশোচনা, মানবতা এবং শান্তির অন্বেষণের এক চিরন্তন কাহিনী। চলুন, আমরা সময় সরণি বেয়ে পিছনে ফিরে যাই এবং সম্রাট অশোকের অসাধারণ জীবন ও তাঁর সাম্রাজ্যের গভীরে প্রবেশ করি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

মৌর্য সাম্রাজ্য: এক বিশাল রাজবংশ

সম্রাট অশোকের কথা জানার আগে, আমাদের তাঁর বংশ অর্থাৎ মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে জানতে হবে। আজ থেকে প্রায় ২৩০০ বছর আগে, ভারতীয় উপমহাদেশে এক বিশাল ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে, যা ইতিহাসে মৌর্য সাম্রাজ্য নামে পরিচিত।

প্রতিষ্ঠা: এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত প্রতিভাবান যুবক। সেই সময়ে মগধ শাসন করত নন্দ বংশের রাজারা, যাঁরা খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না। চন্দ্রগুপ্ত, তাঁর গুরু ও পরামর্শদাতা চাণক্য (যিনি কৌটিল্য নামেও পরিচিত) -এর সহায়তায় নন্দ বংশকে পরাজিত করে পাটলিপুত্র (আধুনিক পাটনা) দখল করেন এবং মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। চাণক্যের লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’ থেকে আমরা তৎকালীন শাসন ব্যবস্থা ও রাজনীতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি।

সাম্রাজ্যের বিস্তার: চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কেবল মগধেই থেমে থাকেননি। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যকে উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তান ও বেলুচিস্তান থেকে শুরু করে পূর্বে বাংলা এবং দাক্ষিণাত্যে উত্তর কর্ণাটক পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন। তাঁর পর তাঁর পুত্র বিন্দুসার সাম্রাজ্যকে অটুট রাখেন। বিন্দুসারের পুত্র ছিলেন অশোক, যিনি এই সাম্রাজ্যকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যান।

রাজধানী ও প্রধান নগর: মৌর্য সাম্রাজ্যের বিশালতার কারণে এর শাসন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত।

  • রাজধানী: সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পাটলিপুত্র। এটি ছিল এক বিশাল ও সুরক্ষিত নগরী।
  • প্রাদেশিক কেন্দ্র: সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল এবং প্রতিটি প্রদেশের নিজস্ব রাজধানী ছিল। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল – তক্ষশীলা (উত্তর-পশ্চিমের প্রবেশদ্বার), উজ্জয়িনী (উত্তর থেকে দক্ষিণ ভারতে যাওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র) এবং সুবর্ণগিরি (দক্ষিণ ভারতের সোনার খনির জন্য বিখ্যাত)। এই প্রাদেশিক কেন্দ্রগুলিতে সাধারণত রাজকুমারদের ‘কুমার’ বা রাজ্যপাল হিসেবে পাঠানো হত।

এই নগরগুলিতে মূলত বণিক, সরকারি আধিকারিক এবং কারিগররা বসবাস করতেন। অন্যদিকে, সাম্রাজ্যের বেশিরভাগ এলাকা জুড়ে ছিল গ্রাম, যেখানে কৃষক ও পশুপালকরা বাস করত। মৌর্য শাসকরা এই বিশাল সাম্রাজ্যকে একত্রিত রাখতে সড়কপথ, গুপ্তচর ব্যবস্থা এবং এক শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীর উপর নির্ভর করতেন।

অশোক: সিংহাসন আরোহণ এবং কলিঙ্গ যুদ্ধ

বিন্দুসারের পর তাঁর পুত্র অশোক সিংহাসনে বসেন। বলা হয়, সিংহাসন লাভের জন্য তাঁকে তাঁর ভাইদের সঙ্গে এক কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়েছিল। সিংহাসনে বসার পর অশোক তাঁর পূর্বপুরুষদের মতোই সাম্রাজ্য বিস্তারের নীতি গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনের প্রথম দিকে তিনি ‘চণ্ডাশোক’ বা ভয়ংকর অশোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

কলিঙ্গ যুদ্ধ (The Kalinga War): অশোকের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ণায়ক ঘটনা ছিল কলিঙ্গ যুদ্ধ। কলিঙ্গ ছিল বর্তমান ওড়িশার উপকূলবর্তী একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজ্য। এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের কারণে কলিঙ্গর যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। অশোক এই রাজ্যটিকে মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন।

আনুমানিক ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অশোক এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে কলিঙ্গ আক্রমণ করেন। কলিঙ্গের মানুষ বীরের মতো প্রতিরোধ গড়ে তুললেও, অশোকের বিশাল বাহিনীর সামনে তারা পরাজিত হয়। এই যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী।

যুদ্ধের পরিনাম: যুদ্ধের পর অশোক বিজয়ী হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। কিন্তু তিনি যা দেখেন, তা তাঁর হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়। লক্ষাধিক সৈন্য নিহত হয়েছিল, আরও বেশি মানুষ আহত হয়েছিল এবং দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষকে বন্দী করে নির্বাসিত করা হয়েছিল। চারিদিকে শুধু মৃতদেহ, কান্না আর হাহাকার। ব্রাহ্মণ, শ্রমণ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ – কেউই এই ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা পায়নি। বিজয় উল্লাসের পরিবর্তে অশোকের মনে গভীর অনুশোচনা, দুঃখ এবং মানসিক যন্ত্রণা জন্মায়। তাঁর নিজের ত্রয়োদশ শিলালিপিতে তিনি এই ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়েছেন। এই উপলব্ধি তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয়। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি আর কখনও তলোয়ারের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করবেন না।

যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে ধর্মের পথে

কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্রাট অশোককে শারীরিক বিজয় এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের অসারতা শিখিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রকৃত বিজয় অস্ত্রের মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের হৃদয় জয়ের মাধ্যমে আসে। এই সময় থেকেই তাঁর জীবনে এক আধ্যাত্মিক পরিবর্তন শুরু হয়। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং উপগুপ্ত নামক এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন।

তিনি ‘চণ্ডাশোক’ থেকে ‘ধর্মাশোক’-এ রূপান্তরিত হন। তিনি যুদ্ধ এবং হিংসার পথ চিরতরে ত্যাগ করেন এবং তাঁর জীবনের বাকি সময়টা মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য উৎসর্গ করেন। তিনি এক নতুন নীতির প্রবর্তন করেন, যা ‘অশোকের ধর্ম’ বা ‘ধম্ম’ নামে পরিচিত। এই ধম্ম ছিল তাঁর সাম্রাজ্যের নতুন চালিকাশক্তি। তাঁর লক্ষ্য ছিল তরবারির জোরে নয়, বরং ভালোবাসা, করুণা এবং নৈতিকতার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করা এবং এক শান্তিপূর্ণ ও উন্নত সমাজ গড়ে তোলা।

অশোকের ধর্ম (Dhamma) কী ছিল?

একটি সাধারণ ভুল ধারণা হল, অশোকের ‘ধম্ম’ মানে বৌদ্ধধর্ম। যদিও অশোক ব্যক্তিগতভাবে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁর প্রচারিত ধম্ম কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাস বা পূজা-অর্চনার পদ্ধতি ছিল না। এটি ছিল মূলত একগুচ্ছ নৈতিক ও সামাজিক আচরণবিধি (Code of Conduct), যা সকল ধর্মের মানুষ অনুসরণ করতে পারত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি এবং সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করা।

অশোকের ধম্মের মূল নীতিগুলি ছিল নিম্নরূপ:

  • অহিংসা: কোনও জীবকে হত্যা না করা বা কষ্ট না দেওয়া। তিনি পশু বলিদান নিষিদ্ধ করেন এবং শিকার ও আনন্দের জন্য পশুহত্যা বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
  • গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা: বাবা-মা, শিক্ষক এবং অন্যান্য গুরুজনদের সম্মান করা এবং তাঁদের আদেশ মেনে চলা।
  • দয়া ও করুণা: সকলের প্রতি, বিশেষ করে দাস এবং ভৃত্যদের সঙ্গে সদয় ও মানবিক আচরণ করা। তিনি মনে করতেন, তারাও মানুষ এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো উচিত।
  • ধর্মীয় সহিষ্ণুতা: নিজের ধর্মকে সম্মান করার পাশাপাশি অন্য সব ধর্মকে সম্মান করা। কারোরই নিজের ধর্মের প্রশংসা এবং অন্য ধর্মের নিন্দা করা উচিত নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সব ধর্মের মূল কথাই হল আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং হৃদয়ের পবিত্রতা।
  • দান ও উদারতা: ব্রাহ্মণ এবং শ্রমণদের (সন্ন্যাসী) প্রতি উদার হওয়া এবং দরিদ্রদের দান করা।
  • সরল জীবনযাপন: বাহুল্য বর্জন করে সহজ, সরল এবং সৎ জীবনযাপন করা। অপ্রয়োজনীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের পরিবর্তে নৈতিক আচরণের উপর জোর দেওয়া।

অশোকের ধম্ম ছিল এক সার্বজনীন আদর্শ, যার লক্ষ্য ছিল এক উন্নত ও নৈতিক সমাজ গঠন করা, যেখানে মানুষ একে অপরের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারে।

ধর্ম প্রচারের জন্য অশোকের উদ্যোগ

সম্রাট অশোক কেবল ধম্মের নীতি তৈরি করেই থেমে থাকেননি, তিনি চেয়েছিলেন তাঁর এই বার্তা সাম্রাজ্যের প্রতিটি কোণায় এবং এমনকি দেশের বাইরেও পৌঁছে যাক। এর জন্য তিনি কিছু অভিনব এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

শিলালিপি ও স্তম্ভলিপি: অশোক তাঁর বার্তাগুলি পাথর বা স্তম্ভের গায়ে খোদাই করে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করতেন। এগুলি ‘শিলালিপি’ (Rock Edicts) এবং ‘স্তম্ভলিপি’ (Pillar Edicts) নামে পরিচিত। এই লিপিগুলি সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষা প্রাকৃতে এবং মূলত ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা হয়েছিল, যাতে সবাই তা পড়তে ও বুঝতে পারে। এগুলি ছিল অনেকটা আজকের দিনের সরকারি নির্দেশ বা বিজ্ঞাপনের মতো। এর মাধ্যমে তিনি সরাসরি প্রজাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতেন।

ধর্ম মহামাত্র নিয়োগ: অশোক ‘ধর্ম মহামাত্র’ নামে এক নতুন শ্রেণীর সরকারি কর্মচারী নিয়োগ করেন। তাঁদের কাজ ছিল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে মানুষকে ধম্মের নীতিগুলি শেখানো, তাদের সমস্যা শোনা এবং জনকল্যাণমূলক কাজ তদারকি করা। তাঁরা রাজার বার্তা বাহক হিসেবে কাজ করতেন।

ধর্ম যাত্রা: সিংহাসনে বসার আগে রাজারা শিকার বা বিহার যাত্রায় যেতেন। অশোক সেই প্রথা বদলে ‘ধর্ম যাত্রা’ শুরু করেন। তিনি নিজে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যেতেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতেন এবং তাদের ধম্মের উপদেশ দিতেন।

বিদেশে দূত প্রেরণ: অশোক তাঁর ধম্মের বার্তা কেবল নিজের সাম্রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি সিরিয়া, মিশর, গ্রিস এবং শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলিতে দূত পাঠিয়েছিলেন। তাঁর পুত্র মহেন্দ্র এবং কন্যা সংঘমিত্রা বৌদ্ধধর্ম ও ধম্মের বার্তা নিয়ে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে শান্তি ও অহিংসার বাণী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

জনকল্যাণমূলক কাজ ও অশোকের উত্তরাধিকার

অশোক বিশ্বাস করতেন যে একজন রাজার প্রধান কর্তব্য হল তাঁর প্রজাদের যত্ন নেওয়া, ঠিক যেমন একজন বাবা তাঁর সন্তানদের যত্ন নেন। তিনি তাঁর একটি শিলালিপিতে বলেছেন, “সকল প্রজা আমার সন্তান।” এই ভাবনা থেকেই তিনি বহু জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

  • সড়ক নির্মাণ: তিনি যাতায়াতের সুবিধার জন্য বহু রাস্তা তৈরি করিয়েছিলেন এবং রাস্তার ধারে ছায়া প্রদানকারী বৃক্ষ রোপণ করেছিলেন।
  • পানীয় জলের ব্যবস্থা: পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য তিনি নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর কূপ খনন করান।
  • সরাইখানা নির্মাণ: তিনি ভ্রমণকারী এবং বণিকদের বিশ্রামের জন্য সরাইখানা বা পান্থশালা তৈরি করান।
  • চিকিৎসার ব্যবস্থা: অশোক কেবল মানুষের জন্যই নয়, পশুদের জন্যও চিকিৎসালয় স্থাপন করেছিলেন। এটি সেই সময়ের নিরিখে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। তিনি ঔষধি গাছের চাষকেও উৎসাহিত করেন।

অশোকের উত্তরাধিকার: সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্য বেশিদিন টেকেনি, কিন্তু তাঁর আদর্শ আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।

  • শান্তি ও অহিংসার প্রতীক: তিনি ইতিহাসে এক বিরল উদাহরণ, যিনি যুদ্ধজয়ের পরেও হিংসার পথ ত্যাগ করে শান্তির পথ বেছে নিয়েছিলেন।
  • জাতীয় প্রতীক: তাঁর নির্মিত সারনাথের স্তম্ভশীর্ষে যে চারটি সিংহমূর্তি রয়েছে, সেটি স্বাধীন ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। স্তম্ভের নীচের ‘ধর্মচক্র’ আমাদের জাতীয় পতাকার কেন্দ্রে স্থান পেয়েছে।
  • সার্বজনীন আদর্শ: তাঁর প্রচারিত ধম্মের নীতিগুলি—যেমন সহনশীলতা, অহিংসা, এবং করুণা—আজও বিশ্বজুড়ে প্রাসঙ্গিক।

সম্রাট অশোক কেবল একজন মহান শাসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মানবতাবাদী দার্শনিক, যাঁর বার্তা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও আমাদের পথ দেখায়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: কলিঙ্গ যুদ্ধ অশোকের জীবনে কী পরিবর্তন এনেছিল?

উত্তর: কলিঙ্গ যুদ্ধ ছিল সম্রাট অশোকের জীবনের এক সন্ধিক্ষণ। এই যুদ্ধের ভয়াবহ রক্তপাত, লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু এবং বন্দিদশা দেখে অশোকের মনে গভীর অনুশোচনা ও মানসিক যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়। তিনি বুঝতে পারেন যে অস্ত্রের মাধ্যমে বিজয় প্রকৃত বিজয় নয়। এই ঘটনার পর তিনি যুদ্ধ ও হিংসার পথ চিরতরে ত্যাগ করার প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং ‘চণ্ডাশোক’ থেকে ‘ধর্মাশোক’-এ পরিণত হন। এরপর তিনি তাঁর বাকি জীবন ‘ধম্ম’ বা নৈতিকতার নীতি প্রচার এবং জনকল্যাণমূলক কাজে উৎসর্গ করেন।

প্রশ্ন ২: অশোকের 'ধর্ম' বা 'ধম্ম' বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: অশোকের 'ধম্ম' কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনার পদ্ধতি ছিল না। এটি ছিল একগুচ্ছ নৈতিক ও সামাজিক আচরণবিধি, যা সকল ধর্মের মানুষ অনুসরণ করতে পারত। এর মূল নীতিগুলি হল – অহিংসা (জীবহত্যা না করা), গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা, দাস ও ভৃত্যদের প্রতি মানবিক আচরণ, ধর্মীয় সহনশীলতা (অন্য ধর্মকে সম্মান করা), এবং সরল ও সৎ জীবনযাপন করা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও নৈতিকতার প্রতিষ্ঠা করা।

প্রশ্ন ৩: অশোক কীভাবে তাঁর বার্তা প্রজাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন?

উত্তর: অশোক তাঁর বার্তা প্রজাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একাধিক অভিনব উপায় অবলম্বন করেছিলেন। প্রথমত, তিনি তাঁর নির্দেশ ও ধম্মের বাণীগুলি পাথর ও স্তম্ভের গায়ে খোদাই করে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করেন, যা শিলালিপি ও স্তম্ভলিপি নামে পরিচিত। দ্বিতীয়ত, তিনি ‘ধর্ম মহামাত্র’ নামক বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ করেন, যাঁরা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে ধম্ম প্রচার করতেন। তৃতীয়ত, তিনি নিজে ‘ধর্ম যাত্রা’-য় বেরিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতেন এবং তাদের উপদেশ দিতেন। পরিশেষে, তিনি তাঁর শান্তির বার্তা সিরিয়া, মিশর, শ্রীলঙ্কার মতো विदेशी দেশগুলিতেও দূত মারফত পাঠিয়েছিলেন।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়টি পড়ার পর আমরা সম্রাট অশোক এবং মৌর্য সাম্রাজ্য সম্পর্কে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি মনে রাখব, তা হল:

  • মৌর্য সাম্রাজ্য: চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, যার রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র। অশোক ছিলেন এই বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট।
  • কলিঙ্গ যুদ্ধ: অশোকের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা তাঁকে যুদ্ধ ও হিংসার পথ থেকে সরিয়ে শান্তির পথে নিয়ে আসে।
  • ধম্ম: এটি অশোকের প্রবর্তিত এক নৈতিক আচরণবিধি, যার মূল ভিত্তি ছিল অহিংসা, সহনশীলতা, দয়া এবং গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা।
  • ধম্ম প্রচার: অশোক শিলালিপি, স্তম্ভলিপি, ধর্ম মহামাত্র নিয়োগ এবং ধর্ম যাত্রার মাধ্যমে তাঁর ধম্মের বাণী প্রজাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
  • জনকল্যাণমূলক কাজ: তিনি রাস্তা নির্মাণ, কূপ খনন, বৃক্ষরোপণ এবং মানুষ ও পশুর জন্য চিকিৎসালয় স্থাপন করে প্রজাহিতৈষী শাসকের পরিচয় দিয়েছিলেন।
  • অশোকের উত্তরাধিকার: অশোকের অহিংসা ও শান্তির বার্তা আজও প্রাসঙ্গিক। সারনাথের অশোকস্তম্ভ স্বাধীন ভারতের জাতীয় প্রতীক, যা তাঁর আদর্শের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার নিদর্শন।