প্রেম যখন যুদ্ধে পরিণত হয়!
ভালোবাসার সম্পর্কে টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়। কখনও ভুল বোঝাবুঝি, কখনও বা প্রত্যাশার চাপ—কত কারণেই না মিষ্টি সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই তিক্ততা যদি একেবারে যুদ্ধক্ষেত্রে গড়ায়? যেখানে একদিকে থাকবে মানুষ আর অন্যদিকে? নাহ্, অন্য কোনো মানুষ নয়, একদল নিরীহ, লম্বা গলার পাখি! অবিশ্বাস্য মনে হলেও ইতিহাসে এমনটাই ঘটেছিল। আজ আপনাদের শোনাব তেমনই এক অদ্ভুতুড়ে ‘যুদ্ধ’-এর গল্প, যা প্রেম বা ঘৃণার নয়, বরং মানুষের ঔদ্ধত্য এবং প্রকৃতির অদম্য শক্তির এক মজাদার নিদর্শন।
অস্ট্রেলিয়ার সেই বিখ্যাত ‘ইমু যুদ্ধ’!
ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগে, ১৯৩২ সালে, সুদূর অস্ট্রেলিয়ায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত একদল প্রাক্তন সৈনিককে সে দেশের সরকার চাষবাসের জন্য জমি দিয়েছিল পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ক্যাম্পিয়ন জেলায়। নতুন উদ্যমে তারা গম চাষ শুরু করলেও তাদের ভাগ্যটা খুব একটা সুপ্রসন্ন ছিল না। বিশ্বজুড়ে তখন মহামন্দা চলছে, গমের দাম তলানিতে, আর তার উপর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো হাজির হল প্রায় ২০,০০০ ইমু পাখির এক বিশাল দল!
এই ইমুরা তাদের বার্ষিক পরিযায়ণের পথে এই নতুন শস্যক্ষেত্রগুলোকে একেবারে ‘স্বর্গ’ বলে মনে করে বসল। কচি গমের শিষ তাদের দারুণ পছন্দ হলো। তারা শুধু ফসলই খেল না, খেতের বেড়া ভেঙে দিয়ে খরগোশের মতো অন্যান্য প্রাণীদেরও ঢোকার রাস্তা করে দিল। কৃষকদের মাথায় হাত! ভালোবাসার বদলে ইমুদের এই ‘অত্যাচার’ তারা আর মেনে নিতে পারছিলেন না। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর তারা সরকারের দ্বারস্থ হলেন, আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রী স্যার জর্জ পিয়ার্স এই পাখিদের শায়েস্তা করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
ভাবা যায়? একদল নিরীহ পাখির বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করল একটি দেশের সেনাবাহিনী! দুটি লুইস মেশিনগান আর দশ হাজার রাউন্ড গুলি নিয়ে মেজর মেরেডিথের নেতৃত্বে রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান আর্টিলারির সৈন্যরা মাঠে নামল ইমুদের ‘শায়েস্তা’ করতে। জন্ম হলো ইতিহাসের সবচেয়ে মজাদার এবং অদ্ভুতুড়ে যুদ্ধ—‘The Great Emu War’-এর!
যুদ্ধ যখন প্রহসনে পরিণত হলো
সেনাবাহিনী তো বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নেমেছিল। তাদের ধারণা ছিল, মেশিনগানের সামনে নিরীহ পাখিরা আর কতক্ষণই বা টিকবে! কিন্তু ইমুরা যে এতটা চালাক আর কঠিন প্রতিপক্ষ হবে, তা তারা স্বপ্নেও ভাবেনি। যুদ্ধের প্রথম দিনেই সেনারা বুঝতে পারল, ব্যাপারটা যতটা সোজা মনে হয়েছিল, ততটা নয়। ইমুরা গুলির শব্দ পেলেই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বিদ্যুৎ গতিতে দৌড়ে পালিয়ে যেতে লাগল। তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।
সেনারা নতুন কৌশল আঁটল। একটি ট্রাকের উপর মেশিনগান বসিয়ে তাড়া করে গুলি করার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু এবারেও কপাল খারাপ! এবড়োখেবড়ো জমিতে ট্রাকের গতির চেয়ে ইমুদের দৌড়ের গতি অনেক বেশি ছিল। উল্টে, ঝাঁকুনিতে নিশানা করাই মুশকিল হয়ে গেল। শোনা যায়, একটি ইমু এতটাই জোরে দৌড়াচ্ছিল যে সে ট্রাকের স্টিয়ারিং-এ ধাক্কা মেরে পুরো গাড়িটাকেই উল্টে দেওয়ার জোগাড় করেছিল!
সবথেকে মজার ঘটনা ঘটল যখন সেনারা একটি বাঁধের কাছে প্রায় এক হাজার ইমুর একটি দলকে অ্যাম্বুশ করার পরিকল্পনা করল। তারা ভেবেছিল, একেবারে কাছ থেকে গুলি চালিয়ে বাজিমাত করবে। কিন্তু তাদের মেশিনগানটি মাত্র ১২টি ইমু মারার পরেই জ্যাম হয়ে যায়! বাকি পাখিরা চোখের নিমেষে উধাও হয়ে গেল। মেজর মেরেডিথ নিজেই হতাশ হয়ে বলেছিলেন, "যদি আমাদের এমন একটি সেনাদল থাকত যারা এই পাখিদের মতো বুলেট সহ্য করতে পারত, তাহলে তারা পৃথিবীর যেকোনো সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করতে পারত।"
শেষ পর্যন্ত জিতল কারা?
কয়েক সপ্তাহের এই ‘যুদ্ধে’ প্রায় হাজারখানেক ইমু মারা গেলেও, সেনাবাহিনীর প্রায় দশ হাজার রাউন্ড গুলি খরচ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ, প্রতি পাখি মারতে গড়ে দশটি গুলি! এই হাস্যকর পরিসংখ্যান এবং সংবাদমাধ্যমের লাগাতার ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের চাপে সরকার শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে, এই যুদ্ধে কোনও জয়-পরাজয় ঘোষিত না হলেও, এটা স্পষ্ট ছিল যে মানুষ এবং তার আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র প্রকৃতির এক নিরীহ প্রাণীর কাছে লজ্জাজনকভাবে হেরে গিয়েছিল।
এই গল্প আমাদের হাসাতে পারে, কিন্তু এর পিছনে একটি গভীর শিক্ষাও লুকিয়ে আছে। প্রকৃতিকে অবহেলা করার ফল কখনওই ভালো হয় না। অস্ট্রেলিয়ার এই ‘ইমু যুদ্ধ’ সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। এটি এমন এক অদ্ভুত ‘প্রেম-ঘৃণার’ কাহিনী, যেখানে মানুষ ভালোবেসে ফসল ফলাতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মকে সম্মান না করায় শেষ পর্যন্ত তাকেই হার মানতে হয়েছিল।