বিষয়ের ভূমিকা

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের বিশ্ব রাজনীতিকে বুঝতে হলে একটি শব্দবন্ধ প্রায়ই আমাদের সামনে আসে - 'ঠান্ডা যুদ্ধ' বা 'Cold War'। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব মূলত দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একদিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী দেশগুলির জোট, আর অন্যদিকে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির শিবির। এই দুটি মহাশক্তিধর দেশের নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আদর্শগত সংঘাত চলেছিল, তাকেই আমরা ঠান্ডা যুদ্ধ বলি। এই সময়কালে বিশ্ব ব্যবস্থা ছিল 'দ্বি-মেরু' (Bipolar), অর্থাৎ ক্ষমতার দুটি কেন্দ্রবিন্দু ছিল - ওয়াশিংটন এবং মস্কো।

কিন্তু ১৯৯১ সালে হঠাৎ করেই এই ব্যবস্থার একটি মেরু, অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভেঙে পড়ে। এই ঘটনাটি ছিল বিশ্ব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। দ্বাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায়, 'দ্বি-মেরুতার অবসান' (The End of Bipolarity), ঠিক এই ঐতিহাসিক পর্বটি নিয়েই আলোচনা করে। এই অধ্যায়ে আমরা জানব সোভিয়েত ব্যবস্থা ঠিক কী ছিল, কেন এবং কীভাবে এত শক্তিশালী একটি রাষ্ট্র ভেঙে গেল, এবং এর পতনের পর বিশ্ব রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছিল। বার্লিন প্রাচীরের পতন থেকে শুরু করে 'শক থেরাপি'র মতো অর্থনৈতিক মডেল, সবকিছুই এই অধ্যায়ের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। চলুন, এই আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের গভীরে প্রবেশ করা যাক এবং বুঝি কীভাবে আজকের একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চ প্রস্তুত হয়েছিল।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

সোভিয়েত ব্যবস্থা কী ছিল? (What was the Soviet System?)

সোভিয়েত ইউনিয়ন, যার পুরো নাম ছিল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রগুলির সংঘ (Union of Soviet Socialist Republics বা USSR), আনুষ্ঠানিক ভাবে ১৯২২ সালে গঠিত হয়েছিল। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি রাশিয়ায় ক্ষমতা দখল করে এবং বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এই রাষ্ট্র এবং তার ব্যবস্থাটিই 'সোভিয়েত ব্যবস্থা' নামে পরিচিত। এর কিছু মূল বৈশিষ্ট্য ছিল:

  • আদর্শগত ভিত্তি: সোভিয়েত ব্যবস্থা সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের আদর্শের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল একটি শ্রেণিহীন, শোষণহীন এবং সমতাবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে উৎপাদনের সমস্ত উপকরণের মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।
  • রাজনৈতিক ব্যবস্থা: সোভিয়েত ইউনিয়নে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি ছিল একমাত্র রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে গণতন্ত্র, বাক্স্বাধীনতা বা বহু দলীয় নির্বাচনের কোনো স্থান ছিল না। রাষ্ট্র ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত এবং আমলাতান্ত্রিক। নাগরিকদের জীবনযাত্রার উপর রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল।
  • অর্থনৈতিক ব্যবস্থা: এখানকার অর্থনীতি ছিল একটি পরিকল্পিত অর্থনীতি (Planned Economy)। ব্যক্তিগত মালিকানার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। জমি থেকে শুরু করে কলকারখানা, সবকিছুই ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। রাষ্ট্রই পরিকল্পনা করত কী উৎপাদিত হবে, কতটা হবে এবং তার দাম কত হবে। এই ব্যবস্থায় ভারী শিল্প এবং প্রতিরক্ষাখাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
  • সোভিয়েত ব্লক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ, যেমন পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানি ইত্যাদি, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বলয়ে চলে আসে। এই দেশগুলিকে নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন 'ওয়ারশ চুক্তি' (Warsaw Pact) নামে একটি সামরিক জোট গঠন করে, যা ছিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন NATO জোটের পাল্টা। এই দেশগুলি সোভিয়েত মডেল অনুসরণ করত।

তবে এই ব্যবস্থার কিছু ইতিবাচক দিকও ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশুর যত্ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ভর্তুকি দিত এবং বেকারত্ব প্রায় ছিল না বললেই চলে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল উন্নত এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যাতায়াতের সুবিধা ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলি প্রকট হতে শুরু করে।

গর্বাচেভ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সংস্কার (Gorbachev and the Reforms in the USSR)

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এক গভীর সংকটের সম্মুখীন হয়। অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল, প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেশটি পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল এবং আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ (১৯৭৯-৮৯) দেশের অর্থনীতির উপর 엄청 চাপ সৃষ্টি করেছিল। জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল এবং কমিউনিস্ট পার্টির দুর্নীতিগ্রস্ত শাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। ঠিক এই পরিস্থিতিতে ১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচেভ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

গর্বাচেভ বুঝতে পেরেছিলেন যে সোভিয়েত ব্যবস্থাকে বাঁচাতে হলে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। তিনি দুটি যুগান্তকারী নীতির সূচনা করেন:

  1. পেরেস্রোইকা (Perestroika - পুনর্গঠন): এটি ছিল অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত অর্থনীতিকে স্থবিরতা থেকে বের করে আনা। গর্বাচেভ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কিছু শিথিলতা এনে অর্থনীতিতে বাজারের কিছু উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে বিকেন্দ্রীভূত করতে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে।
  2. গ্লাসনস্ত (Glasnost - খোলামেলা আলোচনা বা স্বচ্ছতা): এটি ছিল রাজনৈতিক সংস্কার। এর মাধ্যমে নাগরিকদের বাক্স্বাধীনতা দেওয়া হয় এবং সরকারের কাজের সমালোচনা করার অধিকার দেওয়া হয়। গর্বাচেভ মনে করেছিলেন যে, ব্যবস্থার ভেতরের দুর্নীতি এবং অদক্ষতা দূর করতে হলে একটি খোলামেলা পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। 'গ্লাসনস্ত'-এর ফলে সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং অন্যান্য গণমাধ্যমগুলি প্রথমবারের মতো সরকারের সমালোচনা শুরু করে এবং দেশের আসল সমস্যাগুলি জনগণের সামনে তুলে ধরে।

গর্বাচেভের উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। তিনি সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে গণতান্ত্রিক রূপ দিয়ে একে আরও শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার এই সংস্কারগুলি এমন কিছু শক্তিকে মুক্ত করে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 'গ্লাসনস্ত'-এর ফলে মানুষ যখন কথা বলার স্বাধীনতা পেল, তখন তারা শুধু সরকারের সমালোচনা করেই থামেনি, বরং সোভিয়েত ব্যবস্থার মূল ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রে জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ জেগে ওঠে এবং স্বাধীনতার দাবি জোরালো হতে থাকে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণ (Reasons for the Collapse of the Soviet Union)

সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো একটি মহাশক্তির পতন কোনো একটি কারণে ঘটেনি। এর পেছনে একাধিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কারণ জড়িত ছিল। প্রধান কারণগুলি হল:

  • রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা: সোভিয়েত অর্থনীতি বহু বছর ধরেই স্থবির ছিল। ভারী শিল্প এবং সামরিক খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার ফলে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের অভাব দেখা দেয়। খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতো এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেশটি পশ্চিমা বিশ্বের থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল। রাজনৈতিকভাবে, কমিউনিস্ট পার্টির একদলীয় শাসন জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতি এবং স্বজনপোষণ ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
  • জনগণের আকাঙ্ক্ষা: 'গ্লাসনস্ত'-এর ফলে সোভিয়েত নাগরিকরা পশ্চিমা বিশ্বের জীবনযাত্রা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে জানতে পারে। তারা নিজেদের দেশের অর্থনৈতিক पिछड़ा অবস্থা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। এর ফলে তাদের মধ্যে সোভিয়েত ব্যবস্থার প্রতি মোহভঙ্গ হয় এবং তারা পরিবর্তন চাইতে শুরু করে।
  • গর্বাচেভের সংস্কারের প্রভাব: গর্বাচেভের সংস্কারগুলি, যা ব্যবস্থাকে বাঁচানোর জন্য শুরু করা হয়েছিল, তা ironically এর পতনকে ত্বরান্বিত করে। 'পেরেস্রোইকা' অর্থনীতির উন্নতি ঘটাতে ব্যর্থ হয়, বরং এটি পুরনো এবং নতুন ব্যবস্থার মধ্যে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করে। অন্যদিকে 'গ্লাসনস্ত' জনগণের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ এবং জাতীয়তাবাদী চেতনাকে উস্কে দেয়।
  • জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষা: সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, বাল্টিক প্রজাতন্ত্র (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া) সহ ১৫টি ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তার প্রজাতন্ত্রের একটি সংঘ। গর্বাচেভের সংস্কারের পর এই প্রজাতন্ত্রগুলিতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। তারা মস্কোর কেন্দ্রীয় শাসন থেকে মুক্তি চেয়ে স্বাধীনতার দাবি জানাতে শুরু করে।
  • পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত প্রভাবের অবসান: গর্বাচেভ স্পষ্ট করে দেন যে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না। এর ফলে ১৯৮৯ সালে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া এবং অন্যান্য দেশগুলিতে কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটে। সবচেয়ে বড় প্রতীকী ঘটনা ছিল ১৯৮৯ সালের ৯ই নভেম্বর বার্লিন প্রাচীরের পতন, যা ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই ঘটনাগুলি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলিকে আরও উৎসাহিত করে।
  • ১৯৯১ সালের আগস্ট অভ্যুত্থান (The August Coup): গর্বাচেভের সংস্কারে ক্ষুব্ধ হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কট্টরপন্থীরা ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে। তারা গর্বাচেভকে গৃহবন্দী করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। কিন্তু রাশিয়ান ফেডারেশনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের নেতৃত্বে জনগণ এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলেও এটি গর্বাচেভের ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয় এবং ইয়েলৎসিনকে একজন জাতীয় বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এর পরই সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রজাতন্ত্রগুলির বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়।

অবশেষে, ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুশের নেতারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দেওয়ার এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির কমনওয়েলথ (Commonwealth of Independent States - CIS) গঠনের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ২৫শে ডিসেম্বর, ১৯৯১, মিখাইল গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল পতাকা ক্রেমলিন থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বশক্তির পতন ঘটে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলাফল (Consequences of the Disintegration)

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী এবং বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব পড়েছিল।

বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব:

  • ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথে সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় ৪৫ বছর ধরে চলা আদর্শগত সংঘাত এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার অবসান ঘটে।
  • একমেরু বিশ্বের উত্থান: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একমাত্র মহাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশ্ব ব্যবস্থা দ্বি-মেরু থেকে 'একমেরু' (Unipolar) হয়ে যায়, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত।
  • নতুন দেশগুলির উত্থান: সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এর ফলে ইউরোপ এবং এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায়।
  • আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং সহযোগিতা: একদিকে যেমন ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের ফলে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা কমে আসে, তেমনই অন্যদিকে বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন সংঘাতের সৃষ্টি হয়। যেমন - যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়া এবং সেখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়া। চেচনিয়ার মতো জায়গায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে।
  • সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সংকট: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক এবং সাম্যবাদী আদর্শের পরাজয় হিসেবে দেখা হয়। অনেক দেশেই এই আদর্শ তার আবেদন হারায়।

সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির উপর প্রভাব - 'শক থেরাপি':

সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি যখন সমাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্ব ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলি একটি বিশেষ অর্থনৈতিক মডেলের প্রস্তাব দেয়। এই মডেলটি 'শক থেরাপি' (Shock Therapy) নামে পরিচিত।

শক থেরাপির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল:

  • রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে দ্রুত মুক্তবাজার অর্থনীতিতে রূপান্তর।
  • রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ব্যাপক বেসরকারীকরণ। অর্থাৎ, সরকারি কলকারখানা এবং প্রতিষ্ঠানগুলি ব্যক্তিগত মালিকানায় বিক্রি করে দেওয়া।
  • বৈদেশিক বাণিজ্য উন্মুক্ত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো।
  • মুদ্রার অবাধ রূপান্তরযোগ্যতা।

উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনা। কিন্তু এর ফলাফল ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

শক থেরাপির ফলাফল:

  • অর্থনৈতিক ধ্বংস: রাশিয়াসহ বেশিরভাগ প্রজাতন্ত্রে 'শক থেরাপি' অর্থনীতির উন্নতি না ঘটিয়ে তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্রীয় শিল্পগুলি বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে ব্যাপক বেকারত্ব দেখা দেয়।
  • মূল্যবৃদ্ধি: রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার ফলে মুদ্রাস্ফীতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। রাশিয়ার মুদ্রা রুবলের দাম পড়ে যায়। মানুষের জমানো পুঁজি শেষ হয়ে যায়।
  • সামাজিক সংকট: সামাজিক সুরক্ষার পুরনো সোভিয়েত ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ে। এর ফলে দারিদ্র্য এবং অসাম্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ধনী এবং গরিবের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে। একটি নতুন মাফিয়া চক্রের উত্থান ঘটে যারা অর্থনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
  • 'ইতিহাসের বৃহত্তম গ্যারাজ সেল': বেসরকারীকরণের নামে রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এর ফলে কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি রাতারাতি বিশাল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে, যাদের 'অলিগার্ক' (Oligarch) বলা হয়।

মোটকথা, 'শক থেরাপি' সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির জনগণের জন্য এক বিরাট ধাক্কা ছিল এবং এর নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে তাদের অনেক বছর সময় লেগেছিল।

ভারত এবং সোভিয়েত-পরবর্তী দেশসমূহ (India and the Post-Soviet Countries)

ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ভারতের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক ছিল বহুমাত্রিক:

  • রাজনৈতিক: কাশ্মীর প্রসঙ্গসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে সমর্থন করত। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
  • অর্থনৈতিক: সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সরকারি ক্ষেত্রের স্টিল প্ল্যান্ট (যেমন - ভিলাই, বোকারো) এবং ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠায় প্রযুক্তিগত এবং আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল।
  • সামরিক: ভারত তার বেশিরভাগ সামরিক সরঞ্জাম সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আমদানি করত।
  • সাংস্কৃতিক: সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতীয় সংস্কৃতি, বিশেষ করে হিন্দি সিনেমা, অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ভারত তার অন্যতম বিশ্বস্ত বন্ধুকে হারায়। তবে ভারত সোভিয়েত-পরবর্তী সমস্ত দেশের সাথে, বিশেষ করে রাশিয়ার সাথে, সুসম্পর্ক বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করে। আজও রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সহযোগী এবং উভয় দেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে একসাথে কাজ করে। ভারত মধ্য এশিয়ার নতুন দেশগুলির সাথেও শক্তি, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক স্থাপন করেছে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: দ্বি-মেরুতা বলতে কী বোঝায় এবং এর অবসান কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

উত্তর: দ্বি-মেরুতা বলতে এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে ক্ষমতা এবং প্রভাব দুটি প্রধান কেন্দ্র বা 'মেরু'-তে কেন্দ্রীভূত থাকে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় বিশ্ব ব্যবস্থা দ্বি-মেরু ছিল, যার দুটি মেরু ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর অবসান গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ এটি ঠান্ডা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়, বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের একমাত্র মহাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে নতুন দেশের জন্ম হয় এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন ধরনের সহযোগিতা ও সংঘাতের সূচনা হয়।

প্রশ্ন ২: গর্বাচেভের 'পেরেস্রোইকা' এবং 'গ্লাসনস্ত' নীতি দুটি কী ছিল?

উত্তর: মিখাইল গর্বাচেভের দুটি প্রধান সংস্কার নীতি ছিল 'পেরেস্রোইকা' এবং 'গ্লাসনস্ত'। 'পেরেস্রোইকা' বা 'পুনর্গঠন' ছিল একটি অর্থনৈতিক সংস্কার, যার লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত অর্থনীতিকে বিকেন্দ্রীভূত করা এবং এতে বাজারের কিছু উপাদান যুক্ত করা। 'গ্লাসনস্ত' বা 'খোলামেলা আলোচনা' ছিল একটি রাজনৈতিক সংস্কার, যার মাধ্যমে নাগরিকদের বাক্স্বাধীনতা এবং সরকারের কাজের সমালোচনা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ এবং গণতান্ত্রিক করে তোলা।

প্রশ্ন ৩: 'শক থেরাপি' কী ছিল এবং এর ফলাফল কী হয়েছিল?

উত্তর: 'শক থেরাপি' ছিল সোভিয়েত-পরবর্তী দেশগুলিতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে দ্রুত রূপান্তরিত হওয়ার একটি মডেল। এর অধীনে রাষ্ট্রীয় শিল্পের ব্যাপক বেসরকারীকরণ, মুক্ত বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয়। এর ফলাফল বেশিরভাগ দেশের জন্য বিপর্যয়কর ছিল। এর ফলে শিল্প ধ্বংস হয়, ব্যাপক বেকারত্ব দেখা দেয়, মুদ্রাস্ফীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং সমাজে অসাম্য ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। এটি একটি নতুন ধনী অলিগার্ক শ্রেণির জন্ম দেয়।

প্রশ্ন ৪: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রধান পরিবর্তন কী হয়েছিল?

উত্তর: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল দ্বি-মেরু বিশ্বের অবসান এবং একটি একমেরু বিশ্বের উত্থান, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র মহাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এটি ঠান্ডা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়, অস্ত্র প্রতিযোগিতা হ্রাস করে এবং বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রসার ঘটায়। তবে এটি বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন জাতিগত সংঘাত এবং অস্থিতিশীলতারও জন্ম দেয়।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়ের আলোচনা থেকে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারলাম। আসুন, মূল বিষয়গুলি আর একবার দেখে নেওয়া যাক:

  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিশ্ব ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে দ্বি-মেরু ছিল।
  • সোভিয়েত ব্যবস্থা ছিল একটি একদলীয়, কেন্দ্রীভূত এবং রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছিল।
  • মিখাইল গর্বাচেভের 'পেরেস্রোইকা' এবং 'গ্লাসনস্ত' সংস্কারগুলি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
  • ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের একটি প্রতীকী মুহূর্ত ছিল।
  • অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং গর্বাচেভের সংস্কারের মতো একাধিক কারণে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে।
  • সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং বিশ্ব একমেরু হয়ে যায়, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • সাবেক সোভিয়েত দেশগুলিতে 'শক থেরাপি'র মাধ্যমে পুঁজিবাদে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল এবং এটি ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করেছিল।
  • ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তার উত্তরসূরি রাষ্ট্র, বিশেষ করে রাশিয়ার সাথে, শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রেখেছে।