ভালোবাসা প্রকাশের কতই না মাধ্যম! কেউ লেখে কবিতা, কেউ আঁকে ছবি, আবার কেউ মনের সব আবেগ উজাড় করে দেয় নাচের ছন্দে। নাচ মানেই তো আনন্দ, মুক্তি আর ভালোবাসার উদযাপন। কিন্তু যদি বলি, এমন এক সময় ছিল যখন এই নাচই হয়ে উঠেছিল এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুর কারণ? যখন শত শত মানুষ নেচেছিল, কিন্তু আনন্দে নয়, এক অজানা যন্ত্রণায়! গল্পটা ভালোবাসার নয়, বরং এক অদ্ভুত মহামারীর, যা ইতিহাসের পাতায় ‘ডান্সিং প্লেগ’ নামে পরিচিত।
সেই অদ্ভুত ‘ডান্সিং প্লেগ’ (The Dancing Plague of 1518)
সময়টা ১৫১৮ সালের জুলাই মাস। স্থান, তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত স্ট্রাসবার্গ শহর, যা এখন ফ্রান্সে অবস্থিত। [2, 7] সবকিছুই স্বাভাবিক চলছিল, কিন্তু হঠাৎই একদিন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। फ्राउ ट्रोफिया (Frau Troffea) নামের এক মহিলা তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তায় একা একাই নাচতে শুরু করেন। [4, 8] তাঁর নাচে কোনো গান ছিল না, ছিল না কোনো আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। বরং তাঁর মুখজুড়ে ছিল যন্ত্রণা আর অসহায়ত্বের ছাপ। দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন নিজের ইচ্ছায় নাচছেন না, কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাঁকে নাচতে বাধ্য করছে।
ফ্রান্সে ১৫১৮ সালে এক विचित्र মহামারী ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে মানুষ কোনো কারণ ছাড়াই নাচতে শুরু করে এবং ক্লান্তি, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত নাচতে থাকে। [3, 5]
প্রথমদিকে, শহরবাসী বিষয়টিকে পাগলামি ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু যখন फ्राउ ট্রোফিয়া টানা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নাচতে থাকলেন, তখন সবার টনক নড়ল। [5, 11] এর চেয়েও ভয়ের বিষয় ছিল, এক সপ্তাহের মধ্যে আরও প্রায় ৩৪ জন মানুষ তাঁর সাথে এই অদ্ভুত নাচে যোগ দেয়। [5] আগস্ট মাস আসতে আসতে এই সংখ্যাটা ৪০০ ছাড়িয়ে যায়! [2] পুরুষ, মহিলা, শিশু নির্বিশেষে সবাই এই অদ্ভুত নাচের শিকার হচ্ছিল। তাদের পা রক্তাক্ত হয়ে যেত, শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ত, কিন্তু নাচ থামত না। [12, 14]
শহরের কর্তৃপক্ষ রীতিমতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। সেই সময়ের চিকিৎসকেরা মনে করলেন, এর কারণ হয়তো ‘গরম রক্ত’। আর এর প্রতিকার হলো আরও বেশি করে নাচা, যাতে শরীর থেকে এই অতিরিক্ত উত্তাপ বেরিয়ে যায়। [3, 5] এই অদ্ভুত তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে, প্রশাসন আরও বিস্ময়কর এক পদক্ষেপ নেয়। তারা নাচুনেদের জন্য একটি কাঠের মঞ্চ তৈরি করে দেয় এবং এমনকি পেশাদার বাদক দলও ভাড়া করে আনে, যাতে নাচের পরিবেশ বজায় থাকে! [5, 6] কিন্তু এই সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হয়। বাজনার শব্দে আরও বেশি মানুষ এই গণ উন্মাদনায় যোগ দিতে শুরু করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, প্রতিদিন প্রায় ১৫ জন মানুষ ক্লান্তি, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকে নাচতে নাচতেই মারা যেতে শুরু করে। [3]
যখন সব উপায় ব্যর্থ হলো, তখন কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারল যে এটি কোনো শারীরিক অসুস্থতা নয়, বরং কোনো অপদেবতার অভিশাপ। [6, 11] তারা সেইন্ট ভিটাস (St. Vitus) নামের এক ধর্মযাজকের অভিশাপকে এর কারণ হিসেবে ধরে নেয়, কারণ স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনিই মানুষকে নাচতে বাধ্য করার ক্ষমতা রাখতেন। [5, 11] শেষ পর্যন্ত, নাচুনেদের সেইন্ট ভিটাসের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে এই মহামারীর অবসান ঘটে। [2, 6]
কিন্তু কেন হয়েছিল এই অদ্ভুত ঘটনা? আধুনিক গবেষকরা এর পেছনে বেশ কিছু তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় তত্ত্বটি হলো ‘মাস সাইকোজেনিক ইলনেস’ বা গণ হিস্টিরিয়া। [2] সেই সময় স্ট্রাসবার্গের মানুষ চরম দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য এবং রোগের প্রকোপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। [4, 12] এই চরম মানসিক চাপ থেকেই হয়তো এই গণ হিস্টিরিয়ার জন্ম হয়েছিল। আরেকটি তত্ত্বে বলা হয়, রাই শস্যে জন্মানো ‘এরগট’ (Ergot) নামক এক প্রকার ছত্রাকের বিষক্রিয়ার কারণে এমনটা হতে পারে, যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। [3, 5]
কারণ যা-ই হোক না কেন, ১৫১৮ সালের সেই ‘ডান্সিং প্লেগ’ আজও ইতিহাসের এক অমীমাংসিত এবং অদ্ভুতুড়ে রহস্য হয়ে রয়ে গেছে। এ যেন এক এমন ‘প্রেমের গল্প’, যেখানে প্রেমাস্পদ ছিল ‘নাচ’ আর তার পরিণতি ছিল শুধুই ‘মৃত্যু’। ভালোবাসার ছন্দে আমরা নাচি বটে, কিন্তু স্ট্রাসবার্গের সেই মানুষগুলোর জন্য নাচ ছিল এক ভয়ঙ্কর নেশা, যা তাদের মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিয়েছিল।