ঘটনার প্রেক্ষাপট
আজ থেকে প্রায় একশ তিরিশ বছর আগের কথা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ। আমেরিকার নিউ ইংল্যান্ডের রোড আইল্যান্ডের এক্সেটার (Exeter) শহর। সময়টা ছিল বিজ্ঞানের জয়যাত্রার, কিন্তু এই শহরের বুকে তখন এক আদিম আতঙ্ক থাবা বসিয়েছে। এক অদৃশ্য শত্রু, যাকে তখন মানুষ ‘কনজাম্পশন’ বা ক্ষয় রোগ নামে চিনত, আজ আমরা যাকে যক্ষ্মা বা টিউবারকিউলোসিস (Tuberculosis) বলি। এই রোগ যখন কোনো পরিবারে হানা দিত, তখন একের পর এক সদস্য মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। চিকিৎসাশাস্ত্র তখন আজকের মতো উন্নত ছিল না, তাই অসহায় মানুষ এর কারণ খুঁজত লোককথা আর কুসংস্কারের মধ্যে। তাদের বিশ্বাস ছিল, মৃতদের মধ্যে কেউ একজন ‘ভ্যাম্পায়ার’ হয়ে ফিরে আসছে এবং রাতের অন্ধকারে নিজেরই পরিবারের জীবিত সদস্যদের প্রাণশক্তি শুষে নিচ্ছে।
এই অন্ধবিশ্বাস আর ভয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জর্জ ব্রাউন ও তার পরিবার। ১৮৮৩ সালে জর্জের স্ত্রী মেরি এলিজা এই ক্ষয় রোগে মারা যান। এর কয়েক মাস পরেই তাদের বড় মেয়ে মেরি অলিভেরও একই পরিণতি হয়। পরপর দুটি মৃত্যু পরিবারটিকে শোকের অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়। কিন্তু অভিশাপ যেন তাদের পিছু ছাড়েনি। কয়েক বছর পর, ১৮৯১ সালে, জর্জের একমাত্র ছেলে এডউইন এবং আরেক কন্যা, ১৯ বছর বয়সী মার্সি ব্রাউনও এই ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত হয়।
রহস্যের জাল
শহরের মানুষ ফিসফাস শুরু করে দিল। তাদের বদ্ধমূল ধারণা হলো, ব্রাউন পরিবারের মৃতদের মধ্যে কেউ একজনই এই রোগের জন্য দায়ী। সে কবর থেকে উঠে এসে জীবিতদের রক্ত শুষে নিচ্ছে। এই আতঙ্ক এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, শোকাহত বাবা জর্জ ব্রাউন প্রতিবেশীদের চাপে এক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। ১৮৯২ সালের ১৭ই মার্চ, গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা, স্থানীয় ডাক্তার এবং একজন সাংবাদিককে সাথে নিয়ে তিনি তার মৃত স্ত্রী ও দুই মেয়ের কবর খোঁড়ার অনুমতি দেন।
প্রথমে মেরি এলিজা ও মেরি অলিভের কফিন খোলা হলো। দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ায় তাদের দেহ স্বাভাবিকভাবেই কঙ্কালে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এরপর যখন মার্সির কফিন খোলা হলো, তখন উপস্থিত সকলের শিরদাঁড়া দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। মাত্র দুই মাস আগে মারা যাওয়া মার্সির দেহে পচনের কোনো চিহ্নই ছিল না। তার চুল-নখ দেখে মনে হচ্ছিল যেন এখনও বাড়ছে এবং হৃৎপিণ্ড ও যকৃতে তখনও তরল রক্ত জমাট বেঁধে ছিল।
কুসংস্কারে আচ্ছন্ন গ্রামবাসীদের কাছে এটাই ছিল অকাট্য প্রমাণ। মার্সিই সেই ‘ভ্যাম্পায়ার’, যে তার ভাই এডউইনের জীবন কেড়ে নিতে ফিরে এসেছে। अंधবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তারা এক নারকীয় কাজ করল। তারা মার্সির হৃৎপিণ্ড ও যকৃৎ কেটে বের করে আনে, পাশের এক পাথরের ওপর সেগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলে। এরপর সেই ছাই জলে মিশিয়ে একটি ‘মহৌষধ’ তৈরি করা হয় এবং ক্ষয় রোগে মৃত্যুপথযাত্রী এডউইনকে খাওয়ানো হয়, এই বিশ্বাসে যে এতে তার জীবন বাঁচবে।
সত্যের উন্মোচন
কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর τελετουργ কোনও কাজে আসেনি। সেই জল খাওয়ার দুই মাস পরেই এডউইন মারা যায়। তাহলে কি মার্সি সত্যিই ভ্যাম্পায়ার ছিল? আধুনিক বিজ্ঞান এর সহজ ব্যাখ্যা দেয়। যক্ষ্মা একটি সংক্রামক রোগ, যা সহজেই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাই একের পর এক মৃত্যু অস্বাভাবিক ছিল না। আর মার্সির দেহটি এত ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকার কারণ হলো, সে মারা গিয়েছিল জানুয়ারির তীব্র শীতে। বরফ পড়ার কারণে মাটি খোঁড়া সম্ভব ছিল না বলে তার দেহটি একটি পাথরের ভল্টে রেখে দেওয়া হয়েছিল, যা প্রাকৃতিক ফ্রিজের কাজ করেছিল। তাই তার দেহে পচন ধরেনি। হৃৎপিণ্ডে পাওয়া তরল রক্তও যক্ষ্মা রোগেরই একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল।
মার্সি ব্রাউনের ঘটনাটি ‘নিউ ইংল্যান্ড ভ্যাম্পায়ার প্যানিক’-এর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং শেষ নথিভুক্ত ঘটনা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে বিজ্ঞান ও যুক্তির অভাবে ভয় এবং কুসংস্কার একটি সমাজকে গ্রাস করতে পারে এবং নিরপরাধকে দোষী সাব্যস্ত করে এক করুণ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। মার্সি কোনো দানব ছিল না, সে ছিল তার পরিবার এবং সমাজের অন্ধবিশ্বাসের এক অসহায় শিকার।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)