ঘটনার প্রেক্ষাপট

সাল ১৯৮৬। জাপানের রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জের একেবারে দক্ষিণের একটি দ্বীপ ইয়োনাগুনি। শান্ত, অপূর্ব সুন্দর এই দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ এর সামুদ্রিক জীবন। শীতকালে এখানকার সমুদ্রে ঝাঁকে ঝাঁকে হ্যামারহেড শার্ক দেখতে পাওয়া যায়, যা স্কুবা ডাইভারদের জন্য এক স্বর্গ। সেই বছর, স্থানীয় একজন ডাইভার, কিহাচিরো আরতাকে, হ্যামারহেড শার্ক দেখার জন্য সমুদ্রের গভীরে ডুব দিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন হাঙ্গরের বদলে তার চোখে যা পড়ল, তা তাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল। সমুদ্রের প্রায় ২৫ মিটার গভীরে তিনি দেখতে পান বিশাল এক পাথরের কাঠামো, যা দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো। এর ধারগুলো একেবারে সোজা, যেন কেউ নিখুঁতভাবে কেটে তৈরি করেছে।

আরতাকে প্রথমে ভেবেছিলেন, এটি হয়তো প্রাকৃতিক কোনো পাথরের গঠন। কিন্তু যতবার তিনি সেখানে ডুব দিয়েছেন, তার সন্দেহ ততই ঘনীভূত হয়েছে। তিনি দেখেছিলেন বিশাল সোপান, চাতাল, এবং এমন কিছু গঠন যা দেখে মনে হচ্ছিল যেন মানুষের হাতে তৈরি। এই আবিষ্কারের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং সারা বিশ্বের ভূতত্ত্ববিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং ইতিহাসবিদদের মধ্যে তীব্র কৌতূহলের জন্ম দেয়। শুরু হয় এক নতুন রহস্যের যাত্রা—ইয়োনাগুনির ডুবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ (Yonaguni Monument)। প্রশ্ন ওঠে, এটি কি প্রকৃতির এক অদ্ভুত খামখেয়াল, নাকি এক সুপ্রাচীন বিলুপ্ত সভ্যতার নীরব সাক্ষী?

রহস্যের জাল

এই বিশাল কাঠামোটি প্রায় ১৬৫ ফুট লম্বা এবং ৬৫ ফুট চওড়া। এর গঠন এতটাই জ্যামিতিক যে একে প্রাকৃতিক বলে মেনে নিতে অনেক বিশেষজ্ঞই নারাজ। রিউকিউস বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক ভূতত্ত্ববিদ মাসাকি কিমুরা তার জীবনের প্রায় দুই দশক এই রহস্যের পেছনে ব্যয় করেছেন। অসংখ্যবার ডুব দিয়ে এবং তথ্য সংগ্রহ করে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এটি কোনোভাবেই প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হতে পারে না। তার মতে, এটি একটি মানবসৃষ্ট মনোলিথিক কাঠামো, যা প্রায় ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ বছর আগে তৈরি হয়েছিল। যদি তার দাবি সত্যি হয়, তবে এটি মিশরের পিরামিডের চেয়েও প্রাচীন এক সভ্যতার নিদর্শন।

কিমুরা এই কাঠামোর মধ্যে একটি দুর্গ, মন্দির, স্টেডিয়াম এবং এমনকি রাস্তার মতো দেখতে গঠনেরও সন্ধান পেয়েছেন। তিনি দাবি করেন, এর গায়ে খোদাই করা কিছু চিহ্নও খুঁজে পাওয়া গেছে, যা দেখতে অনেকটা প্রাণীর মতো। একটি নির্দিষ্ট পাথরকে তিনি ‘ডুবন্ত স্ফিংস’ বলে চিহ্নিত করেছেন, যা তার মতে প্রাচীন ওকিনাওয়ার কোনো রাজার মুখের আদলে তৈরি। কিমুরার তত্ত্ব অনুযায়ী, শেষ বরফ যুগে যখন সমুদ্রের জলস্তর আজকের চেয়ে অনেক নিচে ছিল, তখন এই শহরটি ভূমির ওপরেই ছিল। পরবর্তীকালে এক ভয়াবহ ভূমিকম্প বা সুনামির কারণে পুরো শহরটি সমুদ্রের অতলে তলিয়ে যায়। এই অঞ্চলটি অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ, এবং ১৭৭১ সালে এখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুনামিগুলোর একটি আঘাত হেনেছিল, যা এই তত্ত্বকে আরও জোরালো করে।

কিন্তু বৈজ্ঞানিক মহলের সবাই কিমুরার এই তত্ত্বকে সমর্থন করেননি। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট স্কোকের মতো অনেক ভূতত্ত্ববিদ মনে করেন, এই কাঠামোটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। তাদের মতে, ইয়োনাগুনি দ্বীপের বেলেপাথর (sandstone) স্বাভাবিকভাবেই স্তর এবং ফাটল বরাবর ভেঙে এমন জ্যামিতিক আকার ধারণ করতে পারে। টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া এবং শক্তিশালী সমুদ্রস্রোত হাজার হাজার বছর ধরে এই অদ্ভুত আকৃতি তৈরি করেছে। তাদের যুক্তি হলো, কাঠামোটি একটি অখণ্ড শিলা থেকে তৈরি, আলাদা আলাদা ব্লক দিয়ে নয়, যা মানবসৃষ্ট নির্মাণের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। এমনকি জাপানের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা বা ওকিনাওয়া সরকারও এটিকে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

সত্যের উন্মোচন

ইয়োনাগুনির ডুবন্ত শহরের রহস্য নিয়ে বিতর্ক আজও অব্যাহত। একদল বিজ্ঞানী যখন এটিকে হারানো ‘মু’ বা লেমুরিয়া সভ্যতার অংশ বলে মনে করেন, তখন অন্যদল এটিকে প্রকৃতির এক অসাধারণ শিল্পকর্ম বলে আখ্যা দেন। মাসাকি কিমুরার মতো গবেষকরা বিশ্বাস করেন, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে মানব ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায়, যা আমাদের শেখানো ইতিহাসের চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন। অন্যদিকে, রবার্ট স্কোকের মতো বিজ্ঞানীরা এটিকে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল বলেই মনে করেন।

সত্যিটা কী, তা হয়তো সময়ই বলবে। প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই রহস্যের ওপর থেকে হয়তো একদিন পর্দা উঠবে। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, ইয়োনাগুনির এই পিরামিড এক অধরা রহস্য হয়েই থেকে যাবে। এটি কি এক উন্নত প্রাচীন সভ্যতার সমাধি, যারা প্রকৃতির করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে গিয়েছিল? নাকি এটি প্রকৃতিরই এক বিস্ময়কর সৃষ্টি, যা আমাদের কল্পনাকে উসকে দেয়? উত্তর যাই হোক না কেন, জাপানের গভীর নীল জলের নিচে এই নীরব স্মৃতিস্তম্ভ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীর বুকে এখনও এমন অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে, যার নাগাল পাওয়া মানুষের পক্ষে আজও সম্ভব হয়নি।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)