ঘটনার প্রেক্ষাপট
১৯২২ সালের মার্চ মাস। জার্মানির বাভারিয়া প্রদেশের মিউনিখ থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তরে এক বিচ্ছিন্ন খামারবাড়ি, নাম হিন্টারকাইফেক। চারদিকে घना বন আর নির্জনতা ছাড়া কিছুই নেই। এই খামারবাড়িতে বাস করত গ্রুবার পরিবার। পরিবারের কর্তা ৬৩ বছর বয়সী আন্দ্রেয়াস গ্রুবার, তার ৭২ বছর বয়সী স্ত্রী সেজিলিয়া, তাদের ৩৫ বছর বয়সী বিধবা মেয়ে ভিক্টোরিয়া এবং ভিক্টোরিয়ার দুই সন্তান—সাত বছরের সেজিলিয়া ও দুই বছরের জোসেফ। কয়েক মাস আগেই তাদের বাড়ির পরিচারিকা অদ্ভুত সব কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার দাবি ছিল, বাড়িটা ভুতুড়ে এবং চিলেকোঠা থেকে প্রায়ই অদ্ভুত শব্দ আসে। তার জায়গায় নতুন পরিচারিকা হিসেবে এসেছিলেন মারিয়া বাউমগার্টনার। আর দুর্ভাগ্যবশত, এটিই ছিল তার জীবনের শেষ কর্মস্থল।
হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে থেকেই কিছু অলৌকিক ও ভুতুড়ে ঘটনা ঘটছিল। আন্দ্রেয়াস প্রতিবেশীদের কাছে বলেছিলেন যে, তিনি বরফের উপর কিছু অদ্ভুত পায়ের ছাপ দেখেছেন যা জঙ্গল থেকে তাদের বাড়ির দিকে এসেছে, কিন্তু ফিরে যাওয়ার কোনো চিহ্ন নেই। বাড়ির চিলেকোঠা থেকে প্রায়ই étrange পায়ের আওয়াজ পাওয়া যেত, কিন্তু সেখানে গিয়ে কাউকেই পাওয়া যেত না। এমনকি বাড়ির চাবির গোছাও একবার হারিয়ে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে গ্রুবার পরিবার এক অজানা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল।
রহস্যের জাল
৩১শে মার্চ, ১৯২২। সেই অভিশপ্ত রাতে হিন্টারকাইফেকের আকাশে হয়তো দুর্যোগের ঘনঘটা ছিল। সেদিনই নতুন পরিচারিকা মারিয়া কাজে যোগ দেন। এরপর গ্রুবার পরিবারের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। চার-চারটে দিন কেটে গেল। ৪ঠা এপ্রিল, প্রতিবেশীরা চিন্তিত হয়ে খামারবাড়িতে ঢোকার সিদ্ধান্ত নেন। যা তারা দেখলেন, তার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না।
বাড়ির গোয়ালঘরে খড়ের গাদার নিচে স্তূপ করে রাখা ছিল চারটি লাশ—আন্দ্রেয়াস, তার স্ত্রী, মেয়ে ভিক্টোরিয়া এবং নাতনি সেজিলিয়া। প্রত্যেকের মাথা ভারী কোনো অস্ত্র দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে জানা যায়, খুনী সম্ভবত পরিবারের সদস্যদের একে একে গোয়ালঘরে ডেকে এনে খুন করেছিল। এরপর সে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে এবং বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা দুই বছরের শিশু জোসেফ এবং নতুন পরিচারিকা মারিয়াকে হত্যা করে। খুন করার জন্য একটি কুড়ুল বা গাঁইতি জাতীয় অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে সবচেয়ে শিহরণ জাগানো এবং অবিশ্বাস্য বিষয়টি হলো, খুনী হত্যাকাণ্ডের পরও প্রায় তিন দিন ধরে ওই বাড়িতেই বাস করেছিল। সে বাড়ির পশুদের খাইয়েছে, রান্নাঘরে আগুন জ্বালিয়ে খাবার খেয়েছে এবং শান্তভাবে জীবনযাপন করেছে, যখন তার পাশেই পড়ে ছিল ছয়টি হিমশীতল লাশ। এই ঘটনাটি পুলিশকে হতবাক করে দেয়। একজন মানুষ কীভাবে এমন পৈশাচিক কাজের পর এত শান্ত থাকতে পারে?
সত্যের উন্মোচন
তদন্ত শুরু হওয়ার পর পুলিশ শতাধিক সন্দেহভাজনকে জেরা করে, কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি। প্রথমদিকে মনে করা হয়েছিল, হয়তো ডাকাতির উদ্দেশ্যে এই খুন করা হয়েছে, কিন্তু বাড়ির কোনো মূল্যবান জিনিস খোয়া যায়নি। বিভিন্ন তত্ত্ব সামনে আসতে থাকে। কেউ কেউ সন্দেহ করেন ভিক্টোরিয়ার প্রথম স্বামী কার্ল গ্যাব্রিয়েলকে, যিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা গেছেন বলে মনে করা হলেও তার দেহ কখনো পাওয়া যায়নি। অনেকের ধারণা ছিল, হয়তো তিনি ফিরে এসে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
আরেক সন্দেহভাজন ছিলেন প্রতিবেশী লরেঞ্জ শ্লিটেনবাউয়ার, যার সঙ্গে ভিক্টোরিয়ার গোপন সম্পর্ক ছিল বলে গুঞ্জন ছিল। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বছরের পর বছর কেটে গেছে, তদন্ত চলেছে, কিন্তু হিন্টারকাইফেকের রহস্যের জট খোলেনি। ২০০৭ সালে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মামলাটি পুনরায় তদন্ত করা হলেও কোনো অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
আজও হিন্টারকাইফেকের সেই অভিশপ্ত খামারবাড়ির গল্প জার্মানির অন্যতম ভয়ঙ্কর এবং অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। কে ছিল সেই রক্তপিপাসু হত্যাকারী? কেন সে এমন নির্মমভাবে একটি পুরো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছিল? আর কেনই বা সে মৃতদেহের সাথে তিন দিন কাটিয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও সময়ের গর্ভে হারিয়ে গেছে, যা হিন্টারকাইফেকের বাতাসকে আজও ভারী করে রেখেছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)