প্রেমের গল্প তো কতই শুনেছেন! লাইলি-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট... কিন্তু ভালোবাসার জন্য একটা গোটা দেশ আইন বানিয়ে ফেলেছে, এমন গল্প শুনেছেন কি? ভাবছেন, এ আবার কেমন কথা! যেখানে একাকীত্ব, মানে একা থাকাটা শুধু কষ্টের নয়, রীতিমতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ! তবে এই আইন কিন্তু আপনার বা আমার জন্য নয়। এই মিষ্টি ভালোবাসার আইনটি হলো পৃথিবীর অন্যতম আদুরে প্রাণী গিনিপিগের জন্য।

এক অদ্ভুত দেশ সুইজারল্যান্ড, যেখানে প্রেম আর সঙ্গী ছাড়া থাকাটা এতটাই গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় যে, তা প্রাণীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। হয়তো ভাবছেন, মজা করছি? একদমই না! সুইজারল্যান্ডের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনি যদি একটি মাত্র গিনিপিগ পোষার কথা ভাবেন, তাহলে কিন্তু আপনি আইন ভাঙছেন!

একাকীত্ব যখন আইনত নিষিদ্ধ!

হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। সুইজারল্যান্ডের আইন অনুযায়ী, বাড়িতে একা একটি গিনিপিগ রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি। এর কারণটা কোনো অদ্ভুত খেয়াল নয়, বরং গভীর ভালোবাসা আর সহানুভূতির এক অসাধারণ উদাহরণ। বিজ্ঞানীরা বলেন, গিনিপিগ অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। বুনো পরিবেশে ওরা দল বেঁধে থাকতে ভালোবাসে। একসাথে খেলা করে, খুনসুটি করে, এমনকি নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে মনের কথাও বলে! ওদের কাছে সঙ্গী থাকাটা ঠিক আমাদের জীবনে বন্ধু বা ভালোবাসার মানুষের মতো জরুরি।

যখন ওদের একা রাখা হয়, তখন ওরা ভীষণ একাকীত্বে ভোগে, মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওদের ছোট্ট মনে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। সুইজারল্যান্ডের সরকার প্রাণীদের এই কষ্টটা এতটাই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে যে, ২০০৮ সালে তারা দেশের পশু কল্যাণ আইনে এই যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। এই আইন অনুযায়ী, যে সমস্ত প্রাণী সামাজিক, যেমন গিনিপিগ, তোতাপাখি বা গোল্ডফিশ, তাদের সঙ্গী ছাড়া একা রাখা যাবে না। সরকার যেন এখানে এক ভালোবাসার অভিভাবকের ভূমিকা নিয়েছে, যে নিশ্চিত করছে তার দেশের কোনো ছোট্ট বাসিন্দাও যেন একা থাকার কষ্টে না ভোগে।

সুইজারল্যান্ডে, আইনত একটি মাত্র গিনিপিগ পোষা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ! কারণ, একাকীত্ব যে ওদের জন্য ভীষণ কষ্টের এবং সে দেশের আইন অনুযায়ী একাকীত্ব এক ধরনের নির্যাতন।

গল্পটা এখানেই শেষ নয়, বরং আরও মজার মোড় নেয়। ধরুন, আপনার দুটি আদরের গিনিপিগ আছে। একদিন বয়সের কারণে বা অসুস্থ হয়ে তার মধ্যে একজন মারা গেল। এখন তো অন্যজন একা হয়ে গেল! তাহলে কি আপনি আইন ভাঙলেন? আপনার আদরের বন্ধুটিও তো তার সঙ্গীকে হারিয়ে শোকে কাতর। এই কঠিন পরিস্থিতিতে কী হবে?

সুইসরা এরও এক মিষ্টি সমাধান বের করেছে। ভালোবাসার এই দেশে বন্ধুর অভাব হয় না, তা সে মানুষ হোক বা গিনিপিগ। এই সমস্যার সমাধানের জন্য সেখানে গড়ে উঠেছে 'গিনিপিগ ভাড়া দেওয়ার পরিষেবা' বা 'Rent-a-Guinea Pig' সার্ভিস! ব্যাপারটা অনেকটা ঘটকালি বা ডেটিং সার্ভিসের মতো। আপনার একা হয়ে যাওয়া গিনিপিগের জন্য আপনি সাময়িকভাবে একজন বন্ধু ভাড়া করে আনতে পারেন। এই 'ভাড়াটে বন্ধু' আপনার পোষ্যের পাশে থেকে তাকে সঙ্গ দেবে, তার একাকীত্ব দূর করবে, যতক্ষণ না সে তার শোক কাটিয়ে উঠছে বা স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে। ভাবা যায়, একটা দেশের আইন কতটা সংবেদনশীল হতে পারে!

এই অদ্ভুত কিন্তু মানবিক আইনটা আমাদের কী শেখায়? শেখায় যে, ভালোবাসা আর companionship শুধু মানুষের একচেটিয়া নয়। প্রতিটি প্রাণেরই একজন সঙ্গীর প্রয়োজন হয়। আমাদের আশেপাশের অবোলা প্রাণীরাও একাকীত্বে কষ্ট পায়, তাদেরও মন খারাপ হয়। সুইজারল্যান্ড হয়তো আমাদের এটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ কাউকে একা ফেলে রাখা।

তাই পরেরবার যখন কোনো পোষ্যকে দেখবেন, শুধু তার সৌন্দর্য বা মিষ্টি স্বভাবই নয়, তার মনের কথাও ভাবার চেষ্টা করবেন। আর মনে রাখবেন, পৃথিবীর এক কোণে এমন একটা দেশ আছে, যেখানে ভালোবাসার আইন এতটাই জোরালো যে, একাকীত্ব সেখানে সত্যিই এক শাস্তিযোগ্য অপরাধ! হয়তো এই আইনটা মানুষের জন্যেও কোনো একদিন চালু হলে মন্দ হতো না, তাই না?