ভালোবাসা নাকি একাকিত্ব? কোনটার ভয়ে আপনি বেশি ভীত?
একাকিত্ব জিনিসটা বেশ অদ্ভুত, তাই না? কেউ একা থাকতে ভালোবাসে, আবার কেউ একাকীত্বের ভয়ে কুঁকড়ে যায়। ভাবুন তো, আপনার পাশে কেউ নেই, কথা বলার মতো কোনো বন্ধু নেই, মনের ভাব আদানপ্রদানের কোনো সঙ্গী নেই। কী ভয়ঙ্কর একটা অনুভূতি! মানুষ সামাজিক জীব, তাই সঙ্গী ছাড়া থাকাটা তার জন্য কঠিন। কিন্তু যদি বলি, এই একাকীত্বের কষ্ট শুধু মানুষের নয়, আরও অনেকের হয়? আর সেই কষ্ট দূর করার জন্য যদি আস্ত একটা দেশ আইন বানিয়ে ফেলে?
আজ আপনাদের এমন এক দেশের গল্প শোনাব, যেখানে একা থাকাটা শুধু কষ্টের নয়, রীতিমতো বেআইনি! তবে এই আইন মানুষের জন্য নয়, তাদের আদরের পোষ্যদের জন্য। চলুন ঘুরে আসি সুইজারল্যান্ড থেকে, যেখানে প্রেম আর বন্ধুত্বের দাম এতটাই বেশি যে, সরকারও তার জন্য আইন তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের সেই অদ্ভুতুড়ে প্রেম-আইন!
সুইজারল্যান্ড বললেই আমাদের চোখে ভাসে আল্পস পর্বতমালার বরফঢাকা চূড়া, অপূর্ব সুন্দর লেক, পৃথিবীর সেরা চকোলেট আর ঘড়ির ছবি। কিন্তু এই সবকিছুর আড়ালে এমন এক আইন লুকিয়ে আছে, যা শুনলে আপনি অবাক হতে বাধ্য। এটা কোনো জটিল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক আইন নয়, বরং ভালোবাসায় মোড়া এক মিষ্টি আইন।
ব্যাপারটা কী? তাহলে খোলসা করেই বলা যাক। সুইজারল্যান্ডে এমন কিছু প্রাণী আছে, যাদের একা পোষা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ভাবছেন, ঠাট্টা করছি? একদমই না! এই দেশের সরকার তাদের দেশের অবলা প্রাণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা এতটাই গুরুত্ব দিয়ে ভাবে যে, তাদের একাকীত্ব দূর করতে আইন তৈরি করেছে। আর এই তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীটি হলো তুলতুলে, আদুরে গিনিপিগ।
সুইজারল্যান্ডে শুধুমাত্র একটি গিনিপিগ পোষা সম্পূর্ণ বেআইনি! আইন অনুযায়ী, আপনাকে অন্তত একজোড়া গিনিপিগ পুষতেই হবে।
কিন্তু কেন এমন অদ্ভুত আইন?
আসলে এর পেছনে রয়েছে গভীর বিজ্ঞান আর ভালোবাসা। গিনিপিগরা জন্মগতভাবেই খুব সামাজিক প্রাণী। বন্য পরিবেশে তারা ১০-১২ জনের ছোট ছোট দলে একসঙ্গে বাস করে। তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য বিশেষ শব্দ আছে, আছে ভাব বিনিময়ের নিজস্ব পদ্ধতি। তারা একসঙ্গে খায়, ঘুমায় আর খেলাধুলা করে। সঙ্গী ছাড়া একা থাকলে তারা ভীষণভাবে মানসিক চাপে ভোগে, যা তাদের শারীরিক অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সোজা কথায়, মানুষ যেমন একা থাকতে থাকতে ডিপ্রেশনে চলে যায়, গিনিপিগদের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়।
সুইজারল্যান্ডের সরকার প্রাণীদের এই মানসিক কষ্টকে অবহেলা করেনি। ২০০৮ সালে তারা দেশের পশু কল্যাণ আইন (Animal Welfare Act) সংশোধন করে। এই নতুন আইনে বলা হয়, যেসব প্রাণী সামাজিক বা দলবদ্ধ হয়ে থাকতে ভালোবাসে, তাদের একা রাখাটা একপ্রকার নির্যাতন হিসেবে গণ্য হবে। এই আইনের আওতায় শুধু গিনিপিগই নয়, টিয়াপাখি, গোল্ডফিশ এবং আরও কিছু সামাজিক প্রাণীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, গোল্ডফিশকেও জোড়ায় রাখতে হয় এবং এমন অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখতে হয়, যেখান থেকে তারা একে অপরকে দেখতে পায়।
যদি জোড়ার একজন সঙ্গী মারা যায়?
প্রশ্নটা খুবই منطقی। দুটো গিনিপিগ তো আর একই দিনে মারা যাবে না। তাহলে যদি একটি মারা যায়, তবে মালিক তো আইন অনুযায়ী অপরাধী হয়ে পড়বেন! এই সমস্যার সমাধানও সুইসরা বের করেছে দারুণ মজাদার উপায়ে। ভালোবাসার এই আইনকে সম্মান জানাতেই সেখানে গড়ে উঠেছে অভিনব এক পরিষেবা—'ভাড়ায় গিনিপিগ' (Rent-a-Guinea Pig)!
ব্যাপারটা ঠিক যেন সিনেমার গল্পের মতো। আপনার পোষা দুটি গিনিপিগের মধ্যে একটি মারা গেলে আপনি সাময়িকভাবে অন্য একটি গিনিপিগ ভাড়া করে আনতে পারবেন। এই ভাড়ার সঙ্গীটি আপনার একা হয়ে পড়া পোষ্যটিকে সঙ্গ দেবে, যতক্ষণ না সে বেঁচে আছে। এতে আপনার নিঃসঙ্গ গিনিপিগটিও একজন বন্ধু পেল, আর আপনিও আইন ভাঙার হাত থেকে বেঁচে গেলেন। এই পরিষেবাগুলো অনেকটা 'ম্যাচমেকিং' এজেন্সির মতো কাজ করে, যারা শোকার্ত গিনিপিগদের জন্য নতুন বন্ধু খুঁজে দেয়।
শুধু আইন নয়, এ এক ভালোবাসার পাঠ
সুইজারল্যান্ডের এই অদ্ভুত আইনটি আমাদের কী শেখায়? এটা শুধু একটা নিয়ম নয়, বরং সব প্রাণের প্রতি সম্মান আর ভালোবাসার এক অসাধারণ উদাহরণ। একটা দেশ তার অবলা প্রাণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা এতটা গভীরভাবে ভাবছে, তাদের একাকীত্বের কষ্ট দূর করতে আইন তৈরি করছে—এটা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
এই গল্পটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভালোবাসা আর সঙ্গের প্রয়োজন শুধু মানুষের নয়, প্রত্যেকটি জীবেরই আছে। পরেরবার যখন আপনার পোষ্যটির দিকে তাকাবেন, তখন শুধু তার খাবার বা স্বাস্থ্যের কথাই ভাববেন না, তার মনের কথাও বোঝার চেষ্টা করবেন। কারণ, দিনের শেষে এক কাপ গরম চকোলেটের মতো এক প্রিয় বন্ধুর উষ্ণতার প্রয়োজন সবারই হয়, সে মানুষই হোক বা এক ছোট্ট তুলতুলে গিনিপিগ!