ফেব্রুয়ারি মাস মানেই যেন ভালোবাসার মরশুম। বাতাসে প্রেম প্রেম গন্ধ, আর প্রেমিক-প্রেমিকার দল একে অপরকে মনের কথা জানাতে ব্যস্ত। কেউ হয়তো দামি উপহার বেছে নিচ্ছেন, কেউ আবার সুন্দর করে সাজানো একগুচ্ছ গোলাপ। আর হ্যাঁ, এর সাথে একটা জিনিস প্রায়ই থাকে—ভালোবাসার কথা লেখা একটা ছোট্ট কার্ড। আচ্ছা, কখনো ভেবে দেখেছেন কি, এই যে কার্ড বা চিঠির মাধ্যমে ভালোবাসার প্রকাশ, এর শুরুটা কোথায়?

আজকের দিনে যখন একটা মেসেজ টাইপ করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে, সেই যুগে ফিরে চলুন যখন অনুভূতি প্রকাশ করার একমাত্র উপায় ছিল কালি আর কলম। আজকের গল্পটা সেই সময়কার, যখন এক বন্দী রাজকুমার অন্ধকার জেলে বসে তার ভালোবাসার মানুষটির জন্য লিখেছিলেন পৃথিবীর প্রথম ভ্যালেন্টাইন বার্তা।

এক যুদ্ধ, এক বন্দী রাজকুমার আর এক কালজয়ী প্রেমপত্র

গল্পটা প্রায় ৬০০ বছরেরও বেশি পুরনো। সালটা ছিল ১৪১৫। অ্যাজিনকোর্টের যুদ্ধে ফরাসিরা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়। সেই যুদ্ধে ফ্রান্সের ২১ বছর বয়সী ডিউক অফ অরলেন্স, চার্লসকে বন্দী করা হয়। তাকে নিয়ে আসা হয় লন্ডনের কুখ্যাত টাওয়ার অফ লন্ডনে। চারদিকে পাথরের দেওয়াল, অন্ধকার আর একাকীত্ব—এটাই হয়ে উঠেছিল তার জীবন। কিন্তু সেই নিঃসঙ্গ জীবনেও তার মনে ছিল শুধু একজনেরই ছবি, তার স্ত্রী বোনা ডি'আর্মেনিয়াকের।

যুদ্ধ আর রাজনীতির জটিল খেলায় তিনি বন্দী হলেও, তার মন ছিল ভালোবাসার কাছে স্বাধীন। সেই মন থেকেই জন্ম নিয়েছিল একরাশ কবিতা। সেই কবিতার মাধ্যমেই তিনি তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন তার না বলা কথা, তার জমে থাকা ভালোবাসা।

আজ পর্যন্ত টিকে থাকা সবচেয়ে পুরোনো ভ্যালেন্টাইন বার্তা হলো একটি কবিতা, যা ১৪১৫ সালে চার্লস, ডিউক অফ অরলেন্স, টাওয়ার অফ লন্ডনে বন্দী থাকাকালীন তার স্ত্রীকে লিখেছিলেন।

সেই চিঠিতে তিনি তার স্ত্রীকে "My very gentle Valentine" বা "আমার প্রিয় ভ্যালেন্টাইন" বলে সম্বোধন করেছিলেন। এটিই ছিল ইতিহাসে প্রথমবার, যেখানে 'ভ্যালেন্টাইন' শব্দটি ভালোবাসার মানুষ বা প্রিয়জনকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছিল। একটি কবিতার কয়েকটি লাইন ছিল এমন, "আমি ইতোমধ্যেই ভালোবাসায় কাতর, আমার প্রিয় ভ্যালেন্টাইন।" এই সহজ কথাগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর যন্ত্রণা আর অফুরন্ত ভালোবাসা।

একুশ বছর বয়সী এক রাজকুমার, যিনি কিনা রাজপ্রাসাদের আরাম ছেড়ে এক অন্ধকার কারাগারে জীবন কাটাচ্ছেন, তার কাছে ভালোবাসার স্মৃতিই ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। তার লেখা এই চিঠিগুলো শুধুই প্রেমপত্র ছিল না, ছিল তার আশার আলো। ২৫ বছরের দীর্ঘ কারাবাসে তিনি প্রায় ৬০টিরও বেশি প্রেমের কবিতা লিখেছিলেন। এই সমস্ত লেখা আজ ব্রিটিশ লাইব্রেরির সংগ্রহশালায় যত্ন করে রাখা আছে।

দুঃখের বিষয় হলো, চার্লসের স্ত্রী তার এই চিঠিগুলো পাওয়ার আগেই মারা যান। তাদের ভালোবাসার গল্পটা হয়তো সম্পূর্ণ হতে পারেনি, কিন্তু চার্লসের লেখা সেই লাইনগুলো অমর হয়ে গিয়েছে। যখন কোনো প্রেমিক বা প্রেমিকা আজও একে অপরকে 'ভ্যালেন্টাইন' বলে ডাকে, তখন অজান্তেই সেই বন্দী রাজকুমারের ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।

আজকের দিনে ভালোবাসার প্রকাশ হয়তো অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ, ভিডিও কল বা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টে আমরা সহজেই মনের কথা জানাতে পারি। কিন্তু একবার ভাবুন তো, সেই যুগে যখন প্রিয়জনের মুখটা দেখার জন্য মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো, তখন একটা চিঠির মূল্য কতখানি ছিল! চার্লসের সেই চিঠিটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভালোবাসা কোনো বাধা মানে না। কারাগারের অন্ধকার হোক বা শত শত মাইলের দূরত্ব, সত্যিকারের অনুভূতি সব প্রতিকূলতাকে জয় করতে পারে।

তাই পরেরবার যখন আপনি আপনার ভালোবাসার মানুষের জন্য কোনো কার্ড কিনবেন বা মেসেজ লিখবেন, তখন একবার সেই ফরাসি রাজকুমারের কথা মনে করবেন। যিনি ৬০০ বছর আগে আমাদের শিখিয়েছিলেন, কীভাবে শব্দের মাধ্যমে ভালোবাসাকে অমর করে রাখা যায়। ভালোবাসা আসলে সময়ের থেকেও শক্তিশালী, যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে চলে—কখনও কবিতার লাইন হয়ে, কখনও বা এক টুকরো চিঠির স্মৃতি হয়ে।