বিষয়ের ভূমিকা

আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, তার দিকে তাকালে কী দেখতে পাই? কোথাও উঁচু পাহাড়, কোথাও বিশাল সমভূমি, আবার কোথাও গভীর উপত্যকা। কিন্তু পৃথিবী কি সবসময় এমনই ছিল? উত্তর হলো, না। আমাদের এই গ্রহের উপরিভাগ বা ভূ-ত্বক কিন্তু স্থির নয়। এটি প্রতিনিয়ত, খুব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। ঠিক যেমন আমাদের শরীর সময়ের সাথে সাথে বদলায়, পৃথিবীর উপরিভাগও লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বদলে চলেছে এবং ভবিষ্যতেও বদলাতে থাকবে।

এই fascinating পরিবর্তনের পেছনের রহস্যটা কী? এর পেছনে কাজ করে দুটি প্রধান শক্তি—একটি পৃথিবীর ভেতর থেকে, অন্যটি পৃথিবীর বাইরে থেকে। সপ্তম শ্রেণির ভূগোল বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়, 'আমাদের পরিবর্তনশীল পৃথিবী'-তে আমরা এই শক্তিগুলো এবং তাদের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন ভূমিরূপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। এই অধ্যায়টি আমাদের পায়ের নিচের মাটির অসাধারণ গতিশীলতা এবং প্রকৃতির সৃষ্টিশীল ও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা সম্পর্কে এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি দেবে। চলুন, এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় পৃথিবীর গোপন কথাগুলো জেনে নেওয়া যাক।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

পৃথিবীর পরিবর্তনকে বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে এর গঠন এবং এর পেছনের মূল চালিকাশক্তি সম্পর্কে জানতে হবে। এই অধ্যায়ের মূল ধারণাগুলিকে আমরা কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করব।

১. ভূ-ত্বকীয় পাত (Lithospheric Plates): পৃথিবীর চলমান বর্ম

আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের স্তরটিকে বলা হয় ভূ-ত্বক বা লিথোস্ফিয়ার (Lithosphere)। এটি কোনো অখণ্ড স্তর নয়, বরং কয়েকটি বড় এবং ছোট, অনিয়মিত আকারের খণ্ডে বিভক্ত। এই খণ্ডগুলোকেই বলা হয় ভূ-ত্বকীয় পাত বা লিথোস্ফিয়ারিক প্লেট (Lithospheric Plates)।

ভাবতে পারেন, একটি সেদ্ধ ডিমের খোসা যদি ফাটিয়ে দেওয়া হয়, তবে যেমন অনেকগুলো ছোট-বড় খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়, পৃথিবীর ভূ-ত্বকও ঠিক তেমনই। এই পাতগুলো হলো—ইউরেশীয় পাত, আফ্রিকান পাত, উত্তর আমেরিকান পাত, দক্ষিণ আমেরিকান পাত, ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান পাত, অ্যান্টার্কটিক পাত এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত।

এই পাতগুলো চলে কীভাবে?

এই পাতগুলো স্থির নয়। এগুলো পৃথিবীর ভেতরের অর্ধ-গলিত, সান্দ্র স্তর বা অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere)-এর ওপর খুব ধীরে ধীরে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। পৃথিবীর কেন্দ্রের প্রচণ্ড তাপের কারণে ভেতরের গলিত ম্যাগমা পরিচলন স্রোত (Convection Current) তৈরি করে। এই স্রোতের কারণে ম্যাগমা গরম হয়ে ওপরে ওঠে, আবার ঠান্ডা হয়ে নিচে নেমে যায়। এই চক্রাকার গতিই ওপরের পাতগুলোকে বছরে মাত্র কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত ঠেলতে থাকে। এই সামান্য গতিই লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পাহাড়, পর্বতমালা এবং মহাদেশের মতো বিশাল কাঠামো তৈরি করেছে।

২. পৃথিবীর গতি: অভ্যন্তরীণ এবং বহির্জাত শক্তি

পৃথিবীর উপরিভাগের পরিবর্তনের জন্য দায়ী শক্তিগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:

  • অভ্যন্তরীণ শক্তি (Endogenic Forces): যে শক্তিগুলো পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে উৎপন্ন হয়।
  • বহির্জাত শক্তি (Exogenic Forces): যে শক্তিগুলো পৃথিবীর পৃষ্ঠের ওপরে কাজ করে।

ক) অভ্যন্তরীণ শক্তি (Endogenic Forces)

এই শক্তিগুলো পৃথিবীর ভেতরের তাপ এবং চাপের কারণে সৃষ্টি হয়। এদের প্রভাব কখনও আকস্মিক এবং বিধ্বংসী, আবার কখনও খুব ধীর এবং গঠনমূলক।

১. আকস্মিক শক্তি (Sudden Forces): এই শক্তিগুলো হঠাৎ করে কাজ করে এবং ভূ-পৃষ্ঠে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়। এর প্রধান উদাহরণ হলো:

  • ভূমিকম্প (Earthquake): যখন ভূ-ত্বকীয় পাতগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়, ঘষা খায় বা একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়, তখন ভূ-ত্বকে প্রচণ্ড শক্তি জমা হয়। এই শক্তি যখন হঠাৎ করে মুক্তি পায়, তখন পৃথিবী কেঁপে ওঠে। একেই ভূমিকম্প বলে।
    • কেন্দ্র (Focus): ভূ-অভ্যন্তরে যে স্থান থেকে শক্তির মুক্তি ঘটে, তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বলে।
    • উপকেন্দ্র (Epicentre): কেন্দ্রের ঠিক সোজাসুজি ভূ-পৃষ্ঠের ওপরের স্থানটিকে উপকেন্দ্র বলে। উপকেন্দ্রেই কম্পনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে এবং ক্ষয়ক্ষতিও এখানেই সর্বাধিক হয়।
    • ভূমিকম্প তরঙ্গ (Seismic Waves): কেন্দ্র থেকে শক্তি তরঙ্গের আকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই তরঙ্গগুলোই কম্পন সৃষ্টি করে। ভূমিকম্প মাপা হয় রিখটার স্কেলে (Richter Scale) এবং যে যন্ত্রের সাহায্যে মাপা হয়, তাকে বলে সিসমোগ্রাফ (Seismograph)।
  • আগ্নেয়গিরি (Volcano): আগ্নেয়গিরি হলো ভূ-পৃষ্ঠের ওপর একটি মুখ বা ছিদ্রপথ, যা দিয়ে পৃথিবীর অভ্যন্তরের উত্তপ্ত, গলিত শিলা (ম্যাগমা), গ্যাস, ছাই এবং পাথর প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে আসে। যখন ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠের বাইরে বেরিয়ে আসে, তখন তাকে লাভা বলা হয়। এই লাভা ঠান্ডা ও কঠিন হয়ে আগ্নেয় পর্বত তৈরি করে।
  • ভূমিধস (Landslide): মাধ্যাকর্ষণের টানে যখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রচুর পরিমাণে মাটি, পাথর ও শিলাখণ্ড হঠাৎ করে নিচে নেমে আসে, তাকে ভূমিধস বলে।

২. ধীর গতিসম্পন্ন শক্তি (Diastrophic Forces): এই শক্তিগুলো খুব ধীরে ধীরে, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কাজ করে এবং পর্বতমালা বা মালভূমির মতো বিশাল ভূমিরূপ গঠন করে। হিমালয় পর্বতমালার গঠন এই ধীর গতির শক্তির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভারতীয় পাত এবং ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষের ফলেই হিমালয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

খ) বহির্জাত শক্তি (Exogenic Forces)

এই শক্তিগুলো পৃথিবীর পৃষ্ঠে ক্রমাগত কাজ করে চলেছে এবং ভূমিরূপকে পরিবর্তন করছে। এর প্রধান দুটি প্রক্রিয়া হলো:

  • আবহবিকার (Weathering): শিলা যখন তার নিজের জায়গায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি যেমন—তাপ, চাপ, বৃষ্টিপাত, বায়ু ইত্যাদির প্রভাবে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, তখন তাকে আবহবিকার বলে।
  • ক্ষয়ীভবন (Erosion): বায়ু, জল, হিমবাহের মতো গতিশীল প্রাকৃতিক শক্তিগুলো যখন আবহবিকারের ফলে সৃষ্ট শিলাখণ্ডগুলোকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যায়, তখন তাকে ক্ষয়ীভবন বলে। এই শক্তিগুলো শুধুমাত্র বহনই করে না, ভূ-পৃষ্ঠকে ঘষে মেজে মসৃণও করে।

৩. প্রধান ভূমিরূপ এবং তাদের সৃষ্টিকারী শক্তি

ক্ষয়ীভবন এবং সঞ্চয়কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন বহির্জাত শক্তি পৃথিবীতে নানা ধরনের সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপ তৈরি করে। চলুন, এই শক্তিগুলোর কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।

ক) নদীর কাজ (Work of a River)

নদী তার প্রবাহপথে তিন ধরনের কাজ করে—ক্ষয়, বহন ও সঞ্চয়। নদীর গতিপথ এবং কাজের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ভূমিরূপ তৈরি হয়।

  • জলপ্রপাত (Waterfall): নদী যখন পার্বত্য অঞ্চলে কোনো খাড়া ঢাল বা কঠিন শিলাস্তর থেকে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন জলপ্রপাত তৈরি হয়। যেমন—উত্তর আমেরিকার নায়াগ্রা জলপ্রপাত।
  • নদীর বাঁক বা মিয়েন্ডার (Meander): সমভূমিতে নদীর স্রোতের বেগ কমে যাওয়ায় নদী এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়। এই সর্পিল বাঁকগুলোকে মিয়েন্ডার বলে।
  • অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ (Ox-bow Lake): অনেক সময় নদীর বাঁক অতিরিক্ত বেঁকে গিয়ে প্রায় বৃত্তাকার রূপ নেয়। পরবর্তীকালে নদী সেই বাঁক ছেড়ে সোজা পথে প্রবাহিত হতে শুরু করে এবং পরিত্যক্ত বাঁকটি হ্রদে পরিণত হয়। এর আকৃতি অনেকটা ঘোড়ার খুরের মতো হওয়ায় একে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ বলে।
  • প্লাবনভূমি (Floodplain): বর্ষাকালে নদীতে জল বাড়লে নদী দুই কূল ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বন্যার জল নেমে যাওয়ার পর পলিমাটি সঞ্চিত হয়ে যে উর্বর সমভূমি তৈরি হয়, তাকে প্লাবনভূমি বলে।
  • স্বাভাবিক বাঁধ (Levees): বন্যার সময় নদীর দুই তীরে পলি জমে যে উঁচু পাড়ের মতো অংশ তৈরি হয়, তাকে স্বাভাবিক বাঁধ বলে।
  • ব-দ্বীপ (Delta): নদী যখন মোহনার কাছে সমুদ্রে মেশে, তখন তার স্রোতের বেগ প্রায় শূন্য হয়ে যায়। ফলে নদী বাহিত সমস্ত পলি, বালি, কাদা মোহনায় জমা হয়ে মাত্রাহীন বাংলা 'ব' অক্ষরের মতো বা গ্রিক অক্ষর ডেল্টা (Δ)-এর মতো যে ভূমিরূপ তৈরি করে, তাকে ব-দ্বীপ বলে। আমাদের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ।

খ) সমুদ্র তরঙ্গের কাজ (Work of Sea Waves)

সমুদ্রের ঢেউ অবিরাম উপকূলে আঘাত করে ক্ষয় ও সঞ্চয় কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠন করে।

  • সামুদ্রিক গুহা (Sea Cave): সমুদ্রের ঢেউ ক্রমাগত উপকূলের দুর্বল শিলাস্তরে আঘাত করার ফলে গহ্বরের সৃষ্টি হলে তাকে সামুদ্রিক গুহা বলে।
  • সামুদ্রিক খিলান (Sea Arch): যখন গুহাগুলো বড় হতে হতে কোনো শৈলশিরার এপার-ওপার প্রসারিত হয়ে যায়, তখন কেবল ছাদটি খিলানের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। একে সামুদ্রিক খিলান বলে।
  • স্ট্যাক (Stack): খিলানের ছাদটিও একসময় ভেঙে পড়ে এবং দেওয়ালের মতো অংশগুলো স্তম্ভের আকারে দাঁড়িয়ে থাকে। এদের স্ট্যাক বলা হয়।
  • সমুদ্র-ভৃগু (Sea Cliff): সমুদ্রের ধারে খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে থাকা পাথুরে উপকূলকে সমুদ্র-ভৃগু বলে।
  • বেলাভূমি বা সৈকত (Beach): সমুদ্রের ঢেউ বাহিত নুড়ি, বালি, কাঁকর ইত্যাদি উপকূলের সমতল অংশে জমা হয়ে বেলাভূমি বা সৈকত তৈরি করে।

গ) হিমবাহের কাজ (Work of Ice/Glaciers)

উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বা মেরু অঞ্চলে বিশাল বরফের চলমান স্তরকে হিমবাহ বলে। হিমবাহ তার চলার পথে উপত্যকার মাটি ও পাথরকে ক্ষয় করে এবং সেই পদার্থগুলো অন্যত্র জমা করে।

  • হিমবাহ উপত্যকা (Glacial Valley): হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে ইংরেজি 'U' অক্ষরের মতো আকৃতির উপত্যকা তৈরি হয়।
  • গ্রাবরেখা (Moraine): হিমবাহ বাহিত শিলাখণ্ড, নুড়ি, বালি, কাদা ইত্যাদি উপত্যকার বিভিন্ন অংশে জমা হয়ে যে ভূমিরূপ তৈরি করে, তাকে গ্রাবরেখা বলে।

ঘ) বায়ুর কাজ (Work of Wind)

বায়ুর ক্ষয় ও সঞ্চয় কাজ মূলত মরুভূমি অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, কারণ সেখানে গাছপালা কম এবং মাটি আলগা থাকে।

  • মাশরুম রক বা গৌর (Mushroom Rock): মরুভূমিতে বায়ুপ্রবাহের সাথে উড়ে চলা বালুকণা শিলাস্তূপের ওপরের অংশের চেয়ে নিচের অংশে বেশি আঘাত করে। ফলে শিলার নিচের অংশ বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ওপরের অংশ ব্যাঙের ছাতার মতো চওড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একে মাশরুম রক বলে।
  • বালিয়াড়ি (Sand Dune): বায়ু যখন এক জায়গা থেকে বালি উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে অন্য জায়গায় জমা করে ছোট ছোট পাহাড়ের মতো স্তূপ তৈরি করে, তখন তাকে বালিয়াড়ি বলে।
  • লোয়েস (Loess): খুব সূক্ষ্ম বালুকণা যখন বায়ুর দ্বারা বাহিত হয়ে মরুভূমি থেকে অনেক দূরে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে সঞ্চিত হয়, তখন তাকে লোয়েস সমভূমি বলে। চীনের লোয়েস সমভূমি এর একটি বিখ্যাত উদাহরণ।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: ভূ-ত্বকীয় পাতগুলো কেন চলে?

উত্তর: ভূ-ত্বকীয় পাতগুলো পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা অর্ধ-গলিত, সান্দ্র অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের ওপর ভাসমান। পৃথিবীর কেন্দ্রের প্রচণ্ড তাপের কারণে এই স্তরে থাকা ম্যাগমা উত্তপ্ত হয়ে ওপরে ওঠে এবং ঠান্ডা হয়ে আবার নিচে নেমে যায়। এই চক্রাকার গতি, যা পরিচলন স্রোত (Convection Current) নামে পরিচিত, একটি কনভেয়র বেল্টের মতো কাজ করে এবং এর ওপর থাকা পাতগুলোকে খুব ধীরে ধীরে সরাতে থাকে।

প্রশ্ন ২: অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ কীভাবে তৈরি হয়?

উত্তর: সমভূমিতে নদীর স্রোতের বেগ কম থাকায় নদী এঁকেবেঁকে চলে, যাকে মিয়েন্ডার বা নদীর বাঁক বলে। সময়ের সাথে সাথে ক্ষয় ও সঞ্চয়ের কারণে এই বাঁকগুলো আরও প্রকট হয় এবং দুটি বাঁকের মধ্যবর্তী অংশ খুব কাছাকাছি চলে আসে। বন্যার সময় নদী ওই সংকীর্ণ অংশ দিয়ে সোজা পথে প্রবাহিত হতে শুরু করে। পরবর্তীকালে পরিত্যক্ত বাঁকটির মুখে পলি জমে মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং একটি হ্রদের আকার ধারণ করে। এর আকৃতি ঘোড়ার খুরের মতো হওয়ায় একে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ বলে।

প্রশ্ন ৩: আবহবিকার এবং ক্ষয়ীভবনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: আবহবিকার এবং ক্ষয়ীভবন দুটিই বহির্জাত প্রক্রিয়া হলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। আবহবিকার হলো একটি স্থিতিশীল প্রক্রিয়া, যেখানে শিলা তার নিজের জায়গায় তাপমাত্রা, চাপ, জল বা রাসায়নিক ক্রিয়ার কারণে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এখানে পদার্থের কোনো স্থানান্তর ঘটে না। অন্যদিকে, ক্ষয়ীভবন একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, যেখানে বায়ু, জল, হিমবাহের মতো প্রাকৃতিক শক্তিগুলো আবহবিকারে সৃষ্ট শিলাখণ্ডগুলোকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিয়ে যায় বা বহন করে। সহজ কথায়, আবহবিকার হলো শিলা ভাঙার প্রক্রিয়া আর ক্ষয়ীভবন হলো সেই ভাঙা অংশগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া।

প্রশ্ন ৪: ভূমিকম্পের সময় বিল্ডিং কেন ভেঙে পড়ে এবং কী সতর্কতা নেওয়া উচিত?

উত্তর: ভূমিকম্পের সময় পৃথিবী কেঁপে ওঠে কারণ ভূ-অভ্যন্তর থেকে শক্তি তরঙ্গের আকারে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে। এই কম্পনের ফলে মাটি নড়তে থাকে, যার ওপর বিল্ডিং দাঁড়িয়ে থাকে। যদি বিল্ডিংটি ভূমিকম্প প্রতিরোধক হিসেবে ডিজাইন করা না হয়, তবে এই প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে তার কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভেঙে যায়। ভূমিকম্পের সময় নিরাপদ থাকতে হলে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, যেমন—ভূমিকম্প চলাকালীন কোনো শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নেওয়া, কাঁচের জানালা বা আলমারি থেকে দূরে থাকা এবং শান্ত থাকা। আগে থেকে প্রস্তুতি হিসেবে বাড়ির নিরাপদ স্থানগুলো চিহ্নিত করে রাখা এবং একটি জরুরি কিট প্রস্তুত রাখা উচিত।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা পৃথিবীর পরিবর্তনশীল প্রকৃতি সম্পর্কে যা যা শিখলাম, তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক:

  • পৃথিবীর উপরিভাগ বা ভূ-ত্বক কয়েকটি বড় ও ছোট পাতে বিভক্ত, যেগুলোকে ভূ-ত্বকীয় পাত বলে।
  • এই পাতগুলো পৃথিবীর অভ্যন্তরের পরিচলন স্রোতের কারণে খুব ধীরে ধীরে চলমান।
  • পৃথিবীর ভূমিরূপের পরিবর্তন ঘটায় দুটি প্রধান শক্তি: অভ্যন্তরীণ শক্তি (Endogenic Forces) এবং বহির্জাত শক্তি (Exogenic Forces)।
  • অভ্যন্তরীণ শক্তির কারণে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি এবং পর্বত গঠনের মতো ঘটনা ঘটে।
  • বহির্জাত শক্তি, যেমন—নদী, বায়ু, হিমবাহ এবং সমুদ্র তরঙ্গ, ক্ষয়ীভবন ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ভূমিরূপ (যেমন—ব-দ্বীপ, বালিয়াড়ি, জলপ্রপাত) তৈরি করে।
  • আমাদের চারপাশের পাহাড়, নদী, সমভূমি—সবই লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলা এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোর ফল। পৃথিবী একটি জীবন্ত, গতিশীল গ্রহ যা প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে তুলছে।