বিষয়ের ভূমিকা
ভারত একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এই কথাটি আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কিন্তু এর আসল অর্থ কী? এর অর্থ হলো, ভারতের অর্থনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতির গভীরে কৃষি জড়িয়ে আছে। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষি শুধুমাত্র আমাদের খাদ্য সরবরাহ করে না, বরং বিভিন্ন শিল্পের জন্য কাঁচামালও জোগান দেয়। যেমন, বস্ত্র শিল্পের জন্য তুলা, চিনি শিল্পের জন্য আখ ইত্যাদি। দশম শ্রেণির ভূগোল বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়, 'কৃষি', আমাদের দেশের এই ভিত্তিপ্রস্তর সম্পর্কে এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
এই অধ্যায়ে আমরা শিখব ভারতের বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে, যেমন - জীবিকাসত্ত্বাভিত্তিক চাষ থেকে বাণিজ্যিক চাষ পর্যন্ত। আমরা জানব ভারতের তিনটি প্রধান শস্য ঋতু (রবি, খরিফ ও জাইদ) এবং এই ঋতুগুলিতে কোন কোন ফসল চাষ করা হয়। ধান, গম, মিলেট, ডাল, চা, কফি, আখ, তুলা, পাটের মতো প্রধান ফসলগুলির ভৌগোলিক অবস্থা, উৎপাদন এবং বণ্টন নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। সবশেষে, আমরা ভারতীয় কৃষির সামনে থাকা বিভিন্ন সমস্যা, সরকারি সংস্কার এবং বিশ্বায়নের প্রভাব নিয়েও জানব। চলুন, ভারতের কৃষি ব্যবস্থার এই বিস্তারিত এবং আকর্ষণীয় জগতে প্রবেশ করা যাক।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
চাষাবাদের প্রকারভেদ (Types of Farming)
ভারতের বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, বিভিন্ন জলবায়ু এবং সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণে এখানে বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ পদ্ধতি প্রচলিত আছে। মূলত, এগুলিকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
১. প্রারম্ভিক জীবিকাসত্ত্বাভিত্তিক কৃষি (Primitive Subsistence Farming)
এই ধরনের কৃষি এখনও ভারতের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রচলিত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- ছোট জমি: কৃষকরা সাধারণত জমির ছোট ছোট অংশে চাষাবাদ করেন।
- সনাতন যন্ত্রপাতি: লাঙল, কোদাল, নিড়ানির মতো খুব সাধারণ এবং পুরনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়।
- পারিবারিক শ্রম: মূলত পরিবারের সদস্যরা মিলেই চাষের কাজ করেন। বাইরে থেকে শ্রমিক নিয়োগ করা হয় না।
- প্রকৃতির উপর নির্ভরশীলতা: এই চাষ সম্পূর্ণভাবে মৌসুমী বায়ু, মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল। সেচের কোনো আধুনিক ব্যবস্থা থাকে না।
এই পদ্ধতির একটি বিশেষ রূপ হলো 'কর্তন ও দহন' কৃষি বা ঝুম চাষ (Slash-and-burn agriculture)। এক্ষেত্রে, কৃষকরা জঙ্গলের একটি অংশ পরিষ্কার করে গাছপালা পুড়িয়ে ফেলে। সেই ছাই মাটিতে মিশে সারের কাজ করে। কয়েক বছর চাষ করার পর যখন মাটির উর্বরতা কমে যায়, তখন তারা অন্য জায়গায় চলে গিয়ে একই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি করে। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে, যেমন - আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম এবং নাগাল্যান্ডে এই চাষ 'ঝুম' নামে পরিচিত। বিভিন্ন জায়গায় এর বিভিন্ন স্থানীয় নাম আছে, যেমন - মণিপুরে 'পামলৌ', ছত্তিশগড়ে 'দীপা', মধ্যপ্রদেশে 'বেওয়ার' বা 'দহিয়া' ইত্যাদি। এই পদ্ধতি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কারণ এটি বনভূমি ধ্বংস করে এবং মাটির ক্ষয় ঘটায়।
২. নিবিড় জীবিকাসত্ত্বাভিত্তিক কৃষি (Intensive Subsistence Farming)
যেসব অঞ্চলে জনসংখ্যার চাপ খুব বেশি, সেখানে এই ধরনের কৃষি দেখা যায়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, সীমিত জমি থেকে সর্বাধিক ফসল উৎপাদন করে পরিবারের ভরণপোষণ চালানো। এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- জমির উপর প্রচণ্ড চাপ: বংশ পরম্পরায় জমি ভাগ হতে হতে আয়তনে খুব ছোট হয়ে যায়, কিন্তু সেই ছোট জমি থেকেই পরিবারের চাহিদা মেটাতে হয়।
- অধিক শ্রম: এটি একটি শ্রম-নিবিড় কৃষি ব্যবস্থা। জমিতে প্রচুর পরিমাণে মানুষের শ্রম ব্যবহার করা হয়।
- উচ্চ মাত্রায় উপকরণ ব্যবহার: ফলন বাড়ানোর জন্য উচ্চ মাত্রায় জৈব সার এবং সেচ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।
ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব, হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলিতে এই ধরনের কৃষি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। উত্তরাধিকার আইনের কারণে 'জমির মালিকানার অধিকার' কৃষকদের জন্য একটি বড় সমস্যা। জমি ক্রমশ ছোট ও অলাভজনক হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা বিকল্প কর্মসংস্থানের খোঁজে থাকেন।
৩. বাণিজ্যিক কৃষি (Commercial Farming)
এই ধরনের কৃষির মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা, পরিবারের চাহিদা মেটানো নয়। এর বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- আধুনিক উপকরণের ব্যবহার: উচ্চ ফলনশীল বীজ (HYV - High Yielding Variety seeds), রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন - ট্রাক্টর, হারভেস্টার ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।
- বড় আকারের জমি: সাধারণত বড় খামারে এই চাষ করা হয়।
- বাজার কেন্দ্রিকতা: কোন ফসলের বাজারে চাহিদা বেশি, তার উপর ভিত্তি করে ফসল নির্বাচন করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে ধান একটি বাণিজ্যিক ফসল, কারণ এটি মূলত বিক্রির জন্য চাষ হয়। কিন্তু ওড়িশায় ধান একটি জীবিকাসত্ত্বাভিত্তিক ফসল, কারণ সেখানকার কৃষকরা মূলত নিজেদের খাওয়ার জন্য এটি চাষ করেন।
রোপণ কৃষি (Plantation Farming) বাণিজ্যিক কৃষিরই একটি বিশেষ রূপ। এক্ষেত্রে একটি বিশাল এলাকাজুড়ে শুধুমাত্র একটি ফসলের চাষ করা হয়। যেমন - চা, কফি, রাবার, আখ, কলা ইত্যাদি।
- পুঁজি-নিবিড়: এই চাষে প্রচুর পরিমাণে মূলধন এবং শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।
- শিল্প ও বাজারের সংযোগ: উৎপাদিত ফসল সংশ্লিষ্ট শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এই কৃষির উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসাম ও উত্তরবঙ্গের চা বাগান, কর্ণাটকের কফি বাগান এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
শস্য বিন্যাস (Cropping Pattern)
ভারতে মূলত তিনটি প্রধান শস্য ঋতু রয়েছে, যা মৌসুমী বায়ুর আগমন ও প্রত্যাগমনের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
১. রবি শস্য (Rabi Crops)
রবি শস্য শীতকালে বোনা হয় (অক্টোবর-ডিসেম্বর) এবং গ্রীষ্মকালের শুরুতে (এপ্রিল-জুন) কাটা হয়।
- প্রধান ফসল: গম, বার্লি, মটর, ছোলা, এবং সর্ষে।
- প্রয়োজনীয় জলবায়ু: বপনের সময় শীতল এবং ফসল পাকার সময় উষ্ণ ও রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া প্রয়োজন। শীতকালীন বৃষ্টিপাত (পশ্চিমী ঝঞ্ঝার কারণে) এই ফসলের জন্য খুব উপকারী।
- প্রধান উৎপাদক অঞ্চল: পাঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড এবং উত্তর প্রদেশ গমের প্রধান উৎপাদক রাজ্য। সবুজ বিপ্লবের সাফল্য এই রাজ্যগুলিতে রবি শস্যের উৎপাদনে বিশাল বৃদ্ধি ঘটিয়েছে।
২. খরিফ শস্য (Kharif Crops)
খরিফ শস্য বর্ষার শুরুতে (জুন-জুলাই) বোনা হয় এবং শরৎকালে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) কাটা হয়।
- প্রধান ফসল: ধান, ভুট্টা, জোয়ার, বাজরা, তুর (অড়হর), মুগ, উরাদ, তুলা, পাট, চিনেবাদাম এবং সয়াবিন।
- প্রয়োজনীয় জলবায়ু: এই ফসলের জন্য উচ্চ তাপমাত্রা এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত প্রয়োজন।
- প্রধান উৎপাদক অঞ্চল: ধান চাষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলি হলো আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, কেরালা এবং মহারাষ্ট্র (বিশেষত কোঙ্কন উপকূল)। পাঞ্জাব এবং হরিয়ানাতেও প্রচুর ধান চাষ হয়।
৩. জাইদ শস্য (Zaid Crops)
এটি রবি এবং খরিফ ঋতুর মধ্যবর্তী একটি ছোট গ্রীষ্মকালীন ঋতু।
- সময়কাল: মূলত মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত।
- প্রধান ফসল: তরমুজ, ফুটি, শসা, এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও পশুখাদ্য।
- বৈশিষ্ট্য: এই ফসলগুলি খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আখ চাষে প্রায় এক বছর সময় লাগে, তাই এটি কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর ফসল নয়।
ভারতের প্রধান ফসলসমূহ (Major Crops in India)
ভারত বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যশস্য এবং বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদন করে। মাটির গুণমান, জলবায়ু এবং চাষাবাদ পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে এই ফসলগুলি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ করা হয়।
খাদ্যশস্য (Grains)
- ধান (Rice): ভারতের অধিকাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য। চীন-এর পর ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদক দেশ। এটি একটি খরিফ ফসল যার জন্য উচ্চ তাপমাত্রা (২৫°C এর বেশি) এবং ১০০ সেমি-এর বেশি বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে সেচের মাধ্যমে ধান চাষ করা হয়। উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সমভূমি, উপকূলীয় অঞ্চল এবং ব-দ্বীপ অঞ্চলে ধান প্রধানত চাষ হয়।
- গম (Wheat): ভারতের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য। এটি দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অংশের প্রধান খাদ্য। এটি একটি রবি ফসল যার জন্য শীতল আবহাওয়া এবং ফসল পাকার সময় উজ্জ্বল সূর্যালোক প্রয়োজন। ৫০-৭৫ সেমি বৃষ্টিপাত গমের জন্য আদর্শ। গঙ্গা-শতদ্রু সমভূমি এবং দাক্ষিণাত্যের কৃষ্ণমৃত্তিকা অঞ্চলে গম চাষ হয়। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার এবং রাজস্থান প্রধান গম উৎপাদক রাজ্য।
- মিলেট (Millets): জোয়ার, বাজরা এবং রাগি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ মিলেট। এগুলিকে মোটা দানাশস্যও বলা হয় এবং এগুলির পুষ্টিগুণ খুব বেশি। যেমন, রাগিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য অনুখাদ্য পাওয়া যায়। জোয়ার মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশে; বাজরা রাজস্থান, উত্তর প্রদেশে; এবং রাগি কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, হিমাচল প্রদেশে বেশি উৎপাদিত হয়।
- ভুট্টা (Maize): এটি খাদ্য এবং পশুখাদ্য উভয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। এটি একটি খরিফ ফসল যার জন্য ২১°C থেকে ২৭°C তাপমাত্রা এবং পুরনো পলিমাটি প্রয়োজন। কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ ভুট্টা উৎপাদনে অগ্রণী।
- ডাল (Pulses): ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ডাল উৎপাদক এবং উপভোক্তা দেশ। নিরামিষাশীদের জন্য ডাল প্রোটিনের প্রধান উৎস। তুর (অড়হর), উরাদ, মুগ, মসুর, মটর এবং ছোলা প্রধান ডাল জাতীয় ফসল। ডাল শুষ্ক আবহাওয়াতেও জন্মাতে পারে এবং কম জলের প্রয়োজন হয়। শিম্বগোত্রীয় উদ্ভিদ হওয়ায় এগুলি বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে। তাই এগুলি প্রায়শই শস্য আবর্তনে ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ এবং কর্ণাটক প্রধান ডাল উৎপাদক রাজ্য।
খাদ্যশস্য ছাড়া অন্যান্য ফসল
- আখ (Sugarcane): এটি একটি উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর ফসল। ২১°C থেকে ২৭°C তাপমাত্রা এবং ৭৫-১০০ সেমি বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। এটি চিনি, গুড়, খান্ডসারি এবং মোলাসেস তৈরির প্রধান কাঁচামাল। উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ প্রধান আখ উৎপাদক রাজ্য।
- তৈলবীজ (Oilseeds): চিনেবাদাম, সর্ষে, নারকেল, তিল, সয়াবিন, সূর্যমুখী ইত্যাদি ভারতের প্রধান তৈলবীজ। এগুলি মূলত ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গুজরাট চিনেবাদামের বৃহত্তম উৎপাদক, এবং রাজস্থান সর্ষের বৃহত্তম উৎপাদক।
- চা (Tea): এটি একটি রোপণ কৃষি এবং গুরুত্বপূর্ণ পানীয় ফসল। চা গাছের জন্য উষ্ণ, আর্দ্র এবং তুষারমুক্ত জলবায়ু প্রয়োজন। প্রচুর বৃষ্টিপাত প্রয়োজন, কিন্তু গাছের গোড়ায় জল জমা ক্ষতিকর। তাই চা বাগানগুলি সাধারণত পাহাড়ের ঢালে তৈরি করা হয়। আসাম, পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি, তামিলনাড়ু এবং কেরালা প্রধান চা উৎপাদক অঞ্চল।
- কফি (Coffee): ভারতীয় কফি তার উৎকৃষ্ট মানের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। 'আরবিকা' জাতের কফি ভারতে চাষ হয়, যা ইয়েমেন থেকে আনা হয়েছিল। কর্ণাটকের বাবা বুদান পাহাড়ে এর চাষ প্রথম শুরু হয়েছিল এবং আজও নীলগিরি পাহাড়ের আশেপাশে কর্ণাটক, কেরালা এবং তামিলনাড়ুতে এর চাষ সীমাবদ্ধ।
অ-খাদ্য ফসল (Non-Food Crops)
- রাবার (Rubber): এটি মূলত নিরক্ষীয় অঞ্চলের ফসল, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলেও চাষ করা হয়। এর জন্য আর্দ্র জলবায়ু এবং ২০০ সেমি-র বেশি বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। কেরালা, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে রাবার চাষ হয়।
- তন্তু ফসল (Fibre Crops): তুলা, পাট, শণ এবং প্রাকৃতিক রেশম ভারতের প্রধান তন্তু ফসল।
- তুলা (Cotton): ভারত তুলার আদি জন্মভূমি বলে মনে করা হয়। বস্ত্র শিল্পের জন্য এটি প্রধান কাঁচামাল। দাক্ষিণাত্যের কৃষ্ণমৃত্তিকা অঞ্চলে তুলা সবচেয়ে ভালো হয়। এর জন্য উচ্চ তাপমাত্রা, সামান্য বৃষ্টিপাত এবং ২১০ দিন তুষারমুক্ত আবহাওয়া প্রয়োজন। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক প্রধান তুলা উৎপাদক রাজ্য।
- পাট (Jute): পাটকে 'সোনালী তন্তু' (Golden Fibre) বলা হয়। পাটের জন্য উচ্চ তাপমাত্রা এবং উর্বর, প্লাবনভূমি প্রয়োজন যেখানে প্রতি বছর নতুন পলি জমা হয়। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, ওড়িশা এবং মেঘালয় প্রধান পাট উৎপাদক রাজ্য। চট, দড়ি, ব্যাগ, কার্পেট ইত্যাদি তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়।
কৃষিতে প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার (Technological and Institutional Reforms)
স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় কৃষির উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বহু বছর ধরে ক্রমাগত জমি ব্যবহারের ফলে প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া কৃষির উন্নয়ন সম্ভব ছিল না। তাই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনা হয়:
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
- জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি: স্বাধীনতার পর জমিদারি প্রথা বাতিল করে প্রকৃত কৃষকদের হাতে জমির মালিকানা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
- জমির একত্রীকরণ (Consolidation of Holdings): কৃষকদের ছোট ও বিচ্ছিন্ন জমিগুলিকে একত্রিত করে চাষের সুবিধার্থে বড় খণ্ডে পরিণত করা হয়।
- ভূমি সংস্কার: প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যই ছিল ভূমি সংস্কার।
প্রযুক্তিগত সংস্কার
- সবুজ বিপ্লব (Green Revolution): ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে প্যাকেজ প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে সবুজ বিপ্লব শুরু হয়। উচ্চ ফলনশীল বীজ (HYV), রাসায়নিক সার এবং সেচ ব্যবস্থার ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে, বিশেষ করে গম ও ধান উৎপাদনে অভূতপূর্ব সাফল্য আসে।
- শ্বেত বিপ্লব (White Revolution): 'অপারেশন ফ্লাড'-এর মাধ্যমে দুধের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও ব্যাপক সাফল্য আসে।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে আরও কিছু ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মসূচী শুরু হয়, যার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক এবং প্রযুক্তিগত উভয় সংস্কারই অন্তর্ভুক্ত ছিল। শস্য বীমা, গ্রামীণ ব্যাংক স্থাপন, কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (KCC), ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমা প্রকল্প (PAIS) ইত্যাদি চালু করা হয়। কৃষকদের সুবিধার জন্য সরকার ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP - Minimum Support Price) ঘোষণা করে, যাতে দালাল ও ফড়েদের শোষণ থেকে কৃষকদের রক্ষা করা যায়।
জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান
কৃষি ভারতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। যদিও জিডিপি-তে (Gross Domestic Product) কৃষির অংশ সময়ের সাথে সাথে হ্রাস পেয়েছে (১৯৫১ সাল থেকে), তবুও দেশের মোট কর্মসংস্থানে এর অবদান সর্বাধিক। প্রায় ৫২% শ্রমশক্তি এখনও কৃষিক্ষেত্রে নিযুক্ত। জিডিপি-তে কৃষির ভাগ কমাটা চিন্তার বিষয়, কারণ এর ফলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও মন্দা দেখা দিতে পারে, যা সমাজের জন্য বিপজ্জনক।
ভারতীয় কৃষির আধুনিকীকরণের জন্য সরকার ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদ (ICAR), কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পশু চিকিৎসা পরিষেবা এবং আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্র স্থাপন করেছে।
খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security)
খাদ্য নিরাপত্তা মানে দেশের সকল মানুষের জন্য সর্বদা খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং তা কেনার সামর্থ্য থাকা। দেশের দরিদ্রতম অংশের জন্যও যাতে খাদ্যের অভাব না হয়, তা নিশ্চিত করাই খাদ্য নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য। এই ব্যবস্থাটির দুটি প্রধান উপাদান রয়েছে:
- বাফার স্টক (Buffer Stock): সরকার ভারতীয় খাদ্য নিগম (FCI - Food Corporation of India)-এর মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে (MSP) ধান ও গম সংগ্রহ করে। এই সংগৃহীত খাদ্যশস্যের বিশাল ভান্ডারকে বাফার স্টক বলা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো আপৎকালীন পরিস্থিতিতে এই ভান্ডার থেকে খাদ্য সরবরাহ করা হয়।
- গণবণ্টন ব্যবস্থা (Public Distribution System - PDS): এই বাফার স্টক থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে সরকার নিয়ন্ত্রিত মূল্যের দোকান (রেশন দোকান)-এর মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের কাছে কম দামে বিতরণ করা হয়।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারত খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছে এবং দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে সফল হয়েছে।
বিশ্বায়নের উপর কৃষির প্রভাব (Impact of Globalization on Agriculture)
বিশ্বায়ন ভারতীয় কৃষির জন্য নতুন সুযোগ এবং নতুন চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে এসেছে। ঔপনিবেশিক যুগেও ভারত মশলা, তুলা ইত্যাদি রপ্তানি করত। চম্পারণ আন্দোলন (১৯১৭) শুরু হয়েছিল কারণ বিহারের কৃষকদের খাদ্যশস্যের পরিবর্তে নীল চাষ করতে বাধ্য করা হচ্ছিল, যা ব্রিটিশ বস্ত্র শিল্পের জন্য প্রয়োজন ছিল।
১৯৯০ সালের পর বিশ্বায়নের ফলে ভারতীয় কৃষকদের নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। উন্নত দেশগুলি তাদের কৃষকদের প্রচুর ভর্তুকি দেয়, ফলে তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক কম থাকে। এর সাথে প্রতিযোগিতা করা ভারতীয় কৃষকদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য ভারতীয় কৃষিকে আরও দক্ষ এবং লাভজনক করে তুলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন:
- জিন বিপ্লব (Gene Revolution): জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে নতুন, উন্নত মানের এবং প্রতিকূলতা সহনশীল বীজ তৈরি করা।
- জৈব কৃষি (Organic Farming): রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা, যার বাজারে চাহিদা এবং দাম উভয়ই বেশি।
- শস্য বৈচিত্র্য: শুধুমাত্র ধান বা গমের মতো খাদ্যশস্যের উপর নির্ভর না করে ফল, ফুল, ঔষধি গাছ, শাকসবজির মতো উচ্চ মূল্যের ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: সবুজ বিপ্লব বলতে কী বোঝায় এবং ভারতীয় কৃষিতে এর প্রভাব কী ছিল?
উত্তর: ১৯৬০-এর দশকে ভারতে খাদ্য ঘাটতি মেটানোর জন্য উচ্চ ফলনশীল বীজ (HYV), রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্যশস্য, বিশেষ করে গম ও ধানের উৎপাদন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করার কর্মসূচিকে সবুজ বিপ্লব বলা হয়। এর ফলে ভারত খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও ছিল, যেমন - এটি মূলত পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশের মতো কয়েকটি রাজ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয় ও ভৌমজলের স্তর নিচে নেমে যায়।
প্রশ্ন ২: খরিফ শস্য এবং রবি শস্যের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি কী কী? উদাহরণ দিন।
উত্তর: খরিফ শস্য এবং রবি শস্যের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:
- বপনের সময়: খরিফ শস্য বর্ষার শুরুতে (জুন-জুলাই) বোনা হয়, আর রবি শস্য শীতের শুরুতে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বোনা হয়।
- কাটার সময়: খরিফ শস্য শরৎকালে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) কাটা হয়, আর রবি শস্য গ্রীষ্মের শুরুতে (এপ্রিল-জুন) কাটা হয়।
- জলবায়ু: খরিফ ফসলের জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। রবি ফসলের জন্য শীতল ও শুষ্ক জলবায়ু প্রয়োজন।
- উদাহরণ: খরিফ শস্যের উদাহরণ হলো ধান, ভুট্টা, পাট, তুলা। রবি শস্যের উদাহরণ হলো গম, ছোলা, মটর, সর্ষে।
প্রশ্ন ৩: ঝুম চাষ কী? এটি পরিবেশের উপর কী প্রভাব ফেলে?
উত্তর: ঝুম চাষ এক ধরনের প্রারম্ভিক জীবিকাসত্ত্বাভিত্তিক কৃষি, যেখানে জঙ্গলের একটি অংশ পরিষ্কার করে গাছপালা পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং সেই জমিতে কয়েক বছর চাষ করা হয়। মাটির উর্বরতা কমে গেলে সেই স্থান ত্যাগ করে অন্য জায়গায় একই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি করা হয়। এটিকে 'কর্তন ও দহন' কৃষিও বলা হয়।
পরিবেশের উপর প্রভাব:
- বনভূমি ধ্বংস: এই পদ্ধতিতে প্রচুর পরিমাণে বনভূমি নষ্ট হয়।
- মাটি ক্ষয়: গাছপালা কেটে ফেলার ফলে মাটির উপরের স্তর আলগা হয়ে যায় এবং বৃষ্টি বা বাতাসে সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
- বায়ু দূষণ: গাছপালা পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়ে বায়ু দূষণ ঘটায়।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়টি পড়ার পর আমরা ভারতীয় কৃষি সম্পর্কে যে মূল বিষয়গুলি জানতে পারলাম, তা হলো:
- ভারত একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং এর জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল।
- ভারতে মূলত তিন ধরনের চাষাবাদ পদ্ধতি প্রচলিত: প্রারম্ভিক জীবিকাসত্ত্বাভিত্তিক, নিবিড় জীবিকাসত্ত্বাভিত্তিক এবং বাণিজ্যিক কৃষি।
- ভারতের তিনটি প্রধান শস্য ঋতু হলো রবি (শীতকালীন), খরিফ (বর্ষাকালীন) এবং জাইদ (গ্রীষ্মকালীন)।
- ধান, গম, মিলেট, ডাল, আখ, চা, কফি, তুলা, পাট ইত্যাদি ভারতের প্রধান ফসল, যা দেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে চাষ করা হয়।
- স্বাধীনতার পর ভারতীয় কৃষির উন্নয়নে ভূমি সংস্কার, সবুজ বিপ্লব, শ্বেত বিপ্লবের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সংস্কারগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
- খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাফার স্টক এবং গণবণ্টন ব্যবস্থা (PDS) ভারতের দুটি প্রধান স্তম্ভ।
- বিশ্বায়নের যুগে ভারতীয় কৃষিকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যার জন্য জৈব কৃষি এবং শস্য বৈচিত্র্যায়নের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।