বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের চারপাশে তাকালে আমরা অসংখ্য বিচিত্র ধরণের প্রাণী দেখতে পাই। ক্ষুদ্র পোকামাকড় থেকে শুরু করে বিশাল নীল তিমি পর্যন্ত, এই জীববৈচিত্র্য সত্যিই বিস্ময়কর। কিন্তু এই লক্ষ লক্ষ প্রজাতির প্রাণীকে আমরা কীভাবে বুঝব বা তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করব? এখানেই আসে শ্রেণিবিন্যাসের ধারণা। জীববিজ্ঞানের যে শাখায় প্রাণীদের শনাক্তকরণ, নামকরণ এবং তাদের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা স্তরে বিন্যস্ত করা হয়, তাকে প্রাণী শ্রেণিবিন্যাস বলে।

একাদশ শ্রেণির জীববিজ্ঞানের চতুর্থ অধ্যায়, 'প্রাণীজগৎ' (Animal Kingdom), আমাদের এই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই অধ্যায়টি শুধুমাত্র বিভিন্ন প্রাণীর নাম এবং তাদের বৈশিষ্ট্য মুখস্থ করার জন্য নয়, বরং এটি আমাদের শেখায় কীভাবে বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট নীতির উপর ভিত্তি করে প্রাণীদের বিভিন্ন দলে ভাগ করেছেন। এই শ্রেণিবিন্যাস আমাদের বিবর্তনের ধারা বুঝতে, বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক জানতে এবং বাস্তুতন্ত্রে তাদের ভূমিকা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। এই পোস্টে আমরা NCERT পাঠ্যক্রম অনুসারে প্রাণীজগতের শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি এবং প্রধান পর্বগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করব, যা আপনাকে এই আকর্ষণীয় বিষয়টি সহজে বুঝতে সাহায্য করবে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

প্রাণীজগতের শ্রেণিবিন্যাস কোনো এলোমেলো প্রক্রিয়া নয়। এটি কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে, যা বিভিন্ন প্রাণীগোষ্ঠীর মধ্যে বিবর্তনীয় সম্পর্ক নির্দেশ করে। আসুন, আমরা সেই ভিত্তিগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানি।

শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি (Basis of Classification)

প্রাণীদের গঠন এবং কার্যাবলীর মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে। সেগুলি হলো:

১. সংগঠনের স্তর (Levels of Organisation)

  • কোষীয় স্তর (Cellular Level): এক্ষেত্রে কোষগুলো আলগাভাবে সজ্জিত থাকে এবং কলার গঠন করে না। কাজের বিভাজন সামান্যই দেখা যায়। উদাহরণ: পরিফেরা পর্বের প্রাণী (স্পঞ্জ)।
  • কলা স্তর (Tissue Level): এখানে একই ধরনের কাজ করা কোষগুলো একত্রিত হয়ে কলা গঠন করে। উদাহরণ: নিডারিয়া এবং টিনোফোরা পর্বের প্রাণী।
  • অঙ্গ স্তর (Organ Level): বিভিন্ন কলা একত্রিত হয়ে অঙ্গ গঠন করে যা নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করে। উদাহরণ: প্লাটিহেলমিনথেস (চ্যাপ্টা কৃমি) পর্বের প্রাণীদের মধ্যে প্রথম এই স্তর দেখা যায়।
  • অঙ্গ-তন্ত্র স্তর (Organ System Level): এখানে বিভিন্ন অঙ্গ একত্রিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় কাজ করার জন্য অঙ্গ-তন্ত্র গঠন করে। যেমন - পৌষ্টিকতন্ত্র, সংবহনতন্ত্র, শ্বসনতন্ত্র ইত্যাদি। অ্যানিলিডা থেকে শুরু করে কর্ডাটা পর্যন্ত সমস্ত উচ্চতর প্রাণীদের মধ্যে এই স্তর দেখা যায়।

২. প্রতিসাম্য (Symmetry)

প্রতিসাম্য বলতে বোঝায় প্রাণীর দেহের বিভিন্ন অংশকে কেন্দ্রীয় অক্ষের সাপেক্ষে কীভাবে সাজানো হয়েছে।

  • অপ্রতিসম (Asymmetrical): যখন কোনো কাল্পনিক তল বা অক্ষ বরাবর দেহকে সমান দুটি ভাগে ভাগ করা যায় না। উদাহরণ: বেশিরভাগ স্পঞ্জ।
  • อรীয় প্রতিসাম্য (Radial Symmetry): যখন দেহকে কেন্দ্রীয় অক্ষ বরাবর যেকোনো তলে দুটি সদৃশ অংশে ভাগ করা যায়। এই প্রাণীদের সাধারণত একটি মুখ এবং বিপরীত প্রান্ত থাকে, কিন্তু কোনো বাম বা ডান দিক থাকে না। উদাহরণ: নিডারিয়া, টিনোফোরা এবং পূর্ণাঙ্গ একাইনোডার্মাটা।
  • দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসাম্য (Bilateral Symmetry): যখন দেহকে কেবল একটি নির্দিষ্ট তল বরাবর দুটি সদৃশ ডান এবং বাম অংশে ভাগ করা যায়। এই ধরনের প্রাণীদের মাথা, লেজ, পৃষ্ঠীয় এবং অঙ্কীয় দিক থাকে। উদাহরণ: অ্যানিলিডা, আর্থ্রোপোডা থেকে শুরু করে সমস্ত কর্ডাটা।

৩. ভ্রূণীয় কোষস্তর (Embryonic Layers)

ভ্রূণ অবস্থায় কোষগুলো বিভিন্ন স্তরে সজ্জিত থাকে, যেখান থেকে পরবর্তীকালে কলা এবং অঙ্গ তৈরি হয়।

  • ডিপ্লোব্লাস্টিক (Diploblastic): যে প্রাণীদের ভ্রূণে দুটি কোষস্তর—বাইরের এক্টোডার্ম এবং ভিতরের এন্ডোডার্ম থাকে। এই দুই স্তরের মাঝে একটি আঠালো, অকোষীয় স্তর মেসোগ্লিয়া থাকে। উদাহরণ: নিডারিয়া।
  • ট্রিপ্লোব্লাস্টিক (Triploblastic): যে প্রাণীদের ভ্রূণে তিনটি কোষস্তর—এক্টোডার্ম, এন্ডোডার্ম এবং এদের মাঝে মেসোডার্ম থাকে। প্লাটিহেলমিনথেস থেকে কর্ডাটা পর্যন্ত সকল প্রাণীই ট্রিপ্লোব্লাস্টিক।

৪. সিলোম বা দেহগহ্বর (Coelom)

দেহ প্রাচীর এবং পৌষ্টিকনালীর মধ্যবর্তী গহ্বর, যা মেসোডার্ম দ্বারা আবৃত থাকে, তাকে সিলোম বলে। সিলোমের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির উপর ভিত্তি করে প্রাণীদের তিন ভাগে ভাগ করা হয়:

  • অ্যাসিলোমেট (Acoelomate): এদের কোনো দেহগহ্বর থাকে না। উদাহরণ: প্লাটিহেলমিনথেস (চ্যাপ্টা কৃমি)।
  • সিউডোসিলোমেট (Pseudocoelomate): এদের দেহগহ্বরটি মেসোডার্ম দ্বারা সম্পূর্ণ আবৃত থাকে না, বরং মেসোডার্ম এক্টোডার্ম এবং এন্ডোডার্মের মাঝে বিক্ষিপ্ত পাউচ হিসাবে থাকে। উদাহরণ: অ্যাসকেলমিনথেস (গোলকৃমি)।
  • সিলোমেট বা ইউসিলোমেট (Coelomate): এদের প্রকৃত সিলোম থাকে যা সবদিক থেকে মেসোডার্মাল স্তর দ্বারা আবৃত। উদাহরণ: অ্যানিলিডা, মলাস্কা, আর্থ্রোপোডা, একাইনোডার্মাটা, হেমিকর্ডাটা এবং কর্ডাটা।

৫. খণ্ডীভবন (Segmentation)

কিছু প্রাণীর দেহ বাইরে এবং ভেতরে ক্রমান্বয়ে পুনরাবৃত্ত খণ্ডাংশে বিভক্ত থাকে। এই ঘটনাকে খণ্ডীভবন বা মেটামেরিজম বলে। উদাহরণস্বরূপ, কেঁচোর দেহ সুস্পষ্ট খণ্ডাংশে বিভক্ত। অ্যানিলিডা, আর্থ্রোপোডা এবং কর্ডাটা পর্বে এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

৬. নোটোকর্ড (Notochord)

নোটোকর্ড হলো ভ্রূণাবস্থায় মেসোডার্ম থেকে উদ্ভূত একটি দণ্ডাকার গঠন যা পৃষ্ঠীয় দিকে অবস্থান করে। যে সকল প্রাণীর জীবনে অন্তত একবার নোটোকর্ড দেখা যায় তাদের কর্ডাটা (Chordata) বলা হয়। আর যাদের নোটোকর্ড থাকে না, তাদের অ-কর্ডাটা (Non-chordata) বলা হয়।

প্রাণীজগতের শ্রেণিবিন্যাস (Classification of Animals)

উপরোক্ত ভিত্তিগুলোর উপর নির্ভর করে প্রাণীজগতকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়: অ-কর্ডাটা (Non-chordata) এবং কর্ডাটা (Chordata)। অ-কর্ডাটার মধ্যে বেশ কয়েকটি পর্ব রয়েছে।

পর্ব ১: পরিফেরা (Phylum Porifera)

এদের সাধারণত স্পঞ্জ বলা হয়। এরা মূলত সামুদ্রিক এবং অপ্রতিসম প্রাণী। এদের দেহে অসংখ্য ছিদ্র বা 'অস্টিয়া' এবং একটি বড় ছিদ্র 'অস্কিউলাম' থাকে। এদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো জল সংবহন তন্ত্র বা নালী তন্ত্র (Canal System)। এদের দেহে কোয়ানোসাইট (Choanocyte) বা কলার কোষ নামক ফ্ল্যাজেলাযুক্ত কোষ থাকে যা নালী তন্ত্রে জলের প্রবাহ বজায় রাখে। উদাহরণ: সাইকন (Sycon), স্পঞ্জিলা (Spongilla) (মিষ্টি জলের স্পঞ্জ)।

পর্ব ২: নিডারিয়া (Phylum Cnidaria)

এরা জলজ, অধিকাংশই সামুদ্রিক। এরা অরীয় প্রতিসম এবং ডিপ্লোব্লাস্টিক। এদের দেহের একটাই মুখছিদ্র থাকে যা হাইপোস্টোমের উপর অবস্থিত এবং এটি মুখ ও পায়ু উভয়ের কাজ করে। এদের কর্ষিকায় 'নিডোব্লাস্ট' বা 'নিডোসাইট' নামক দংশক কোষ থাকে, যা আত্মরক্ষা ও শিকার ধরতে সাহায্য করে। এদের জীবনচক্রে দুটি দশা দেখা যায়: পলিপ (স্থির, অযৌন) এবং মেডুসা (মুক্ত-সাঁতারু, যৌন)। উদাহরণ: হাইড্রা (Hydra), অরেলিয়া (Aurelia) বা জেলিফিশ, অ্যাডামসিয়া (Adamsia) বা সাগর কুসুম।

পর্ব ৩: টিনোফোরা (Phylum Ctenophora)

এদের সাধারণত 'সি ওয়ালনাট' (Sea Walnut) বা 'কম্ব জেলি' (Comb Jelly) বলা হয়। এরাও সামুদ্রিক, অরীয় প্রতিসম এবং ডিপ্লোব্লাস্টিক। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দেহের বাইরে আটটি সিলিয়াযুক্ত চিরুনির মতো পাত বা 'কম্ব প্লেট' (Comb Plate) থাকে, যা গমনে সাহায্য করে। এদের আরেকটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো বায়োলুমিনিসেন্স বা জীবদ্যুতি (জীবন্ত প্রাণী দ্বারা আলো নির্গমনের ক্ষমতা)। উদাহরণ: প্লুরোব্রাকিয়া (Pleurobrachia)

পর্ব ৪: প্লাটিহেলমিনথেস (Phylum Platyhelminthes)

এদের দেহ পৃষ্ঠীয়-অঙ্কীয়ভাবে চ্যাপ্টা, তাই এদের চ্যাপ্টাকৃমি বলা হয়। এরা দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম, ট্রিপ্লোব্লাস্টিক এবং অ্যাসিলোমেট প্রাণী। এদের অধিকাংশই পরজীবী হিসাবে অন্য প্রাণীর দেহে বাস করে। রেচন অঙ্গ হিসেবে এদের 'ফ্লেম কোষ' (Flame cells) থাকে। উদাহরণ: প্ল্যানেরিয়া (Planaria) (মুক্তজীবী), ফ্যাসিওলা (Fasciola) (যকৃত কৃমি), টেনিয়া (Taenia) (ফিতাকৃমি)।

পর্ব ৫: অ্যাসকেলমিনথেস (Phylum Aschelminthes)

এদের দেহ প্রস্থচ্ছেদে গোলাকার, তাই এদের গোলকৃমি বলা হয়। এরা মুক্তজীবী, জলজ বা স্থলচর অথবা উদ্ভিদ ও প্রাণীর পরজীবী হতে পারে। এরা দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম, ট্রিপ্লোব্লাস্টিক এবং সিউডোসিলোমেট। এদের পৌষ্টিকনালী সম্পূর্ণ, অর্থাৎ মুখ এবং পায়ু উভয়ই উপস্থিত। উদাহরণ: অ্যাসকারিস (Ascaris) (গোলকৃমি), উচেরেরিয়া (Wuchereria) (ফাইলেরিয়া কৃমি)।

পর্ব ৬: অ্যানিলিডা (Phylum Annelida)

এদের দেহ আংটির মতো খণ্ডক বা মেটামেয়ার দ্বারা গঠিত, তাই এদের অঙ্গুরীমাল প্রাণী বলে। এরা জলজ বা স্থলচর হতে পারে। এরা ট্রিপ্লোব্লাস্টিক, সিলোমেট এবং দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম। গমনে সাহায্য করার জন্য এদের দেহে কাইটিন নির্মিত সিটি বা প্যারাপোডিয়া থাকে। এদের সংবহনতন্ত্র বদ্ধ প্রকৃতির। রেচন অঙ্গ হলো নেফ্রিডিয়া। উদাহরণ: ফেরোটিমা (Pheretima) (কেঁচো), হিরুডিনারিয়া (Hirudinaria) (জোঁক)।

পর্ব ৭: আর্থ্রোপোডা (Phylum Arthropoda)

এটি প্রাণীজগতের বৃহত্তম পর্ব, যার মধ্যে পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কাইটিন নির্মিত বহিঃকঙ্কাল এবং সন্ধিল উপাঙ্গ (jointed appendages)। এদের দেহ মাথা, বক্ষ এবং উদর—এই তিন ভাগে বিভক্ত। এদের সংবহনতন্ত্র মুক্ত প্রকৃতির এবং দেহগহ্বর হিমোসিল নামে পরিচিত। শ্বাস অঙ্গ হিসেবে ফুলকা, বুক-গিল, বুক-লাং বা শ্বাসনালী (trachea) থাকে। উদাহরণ: আরশোলা, মশা, চিংড়ি, কাঁকড়া, মাকড়সা

পর্ব ৮: মলাস্কা (Phylum Mollusca)

এটি প্রাণীজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্ব। এরা স্থলচর বা জলচর (সামুদ্রিক বা মিষ্টি জলের) হয়। এদের দেহ নরম, অখণ্ডিত এবং একটি শক্ত ক্যালসিয়াম নির্মিত খোলক দ্বারা আবৃত থাকে। দেহ মাথা, পেশল পদ এবং ভিসেরাল হাম্প—এই তিন অংশে বিভক্ত। ভিসেরাল হাম্পের উপর একটি নরম ও স্পঞ্জি ত্বকের স্তর থাকে যাকে ম্যান্টল বলা হয়। ম্যান্টল গহ্বরে ফুলকার মতো পালক থাকে যা শ্বসন ও রেচনে সাহায্য করে। উদাহরণ: পাইলা (Pila) (শামুক), অক্টোপাস (Octopus), সেপিয়া (Sepia) (কাটলফিশ)।

পর্ব ৯: একাইনোডার্মাটা (Phylum Echinodermata)

এই পর্বের প্রাণীদের দেহ কণ্টকময়, কারণ এদের অন্তঃকঙ্কাল ক্যালসিয়াম কার্বনেট নির্মিত অসিকল দ্বারা গঠিত। এরা সকলেই সামুদ্রিক। পূর্ণাঙ্গ প্রাণীরা অরীয় প্রতিসম কিন্তু লার্ভা দশায় দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম হয়। এদের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো জল সংবহন তন্ত্র (Water Vascular System), যা গমন, খাদ্য গ্রহণ এবং শ্বসনে সাহায্য করে। উদাহরণ: অ্যাস্টেরিয়াস (Asterias) (তারা মাছ), একাইনাস (Echinus) (সমুদ্র আর্চিন)।

পর্ব ১০: হেমিকর্ডাটা (Phylum Hemichordata)

এদের আগে কর্ডাটা পর্বের একটি উপপর্ব হিসেবে গণ্য করা হতো, কিন্তু এখন এদের অ-কর্ডাটার মধ্যে একটি পৃথক পর্ব হিসাবে স্থান দেওয়া হয়েছে। এরা কৃমির মতো দেখতে সামুদ্রিক প্রাণী। এদের দেহে প্রোবোসিস, কলার এবং একটি লম্বা দেহকাণ্ড থাকে। এদের কলার অঞ্চলে একটি সংক্ষিপ্ত গঠন 'স্টোমোকর্ড' থাকে, যা নোটোকর্ডের মতো। উদাহরণ: ব্যালানোগ্লসাস (Balanoglossus)

পর্ব ১১: কর্ডাটা (Phylum Chordata)

এই পর্বের প্রাণীদের তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে:

  1. নোটোকর্ডের উপস্থিতি: জীবনের যেকোনো দশায় পৃষ্ঠীয় দিকে একটি নমনীয় দণ্ডাকার নোটোকর্ড থাকে।
  2. পৃষ্ঠীয় ফাঁপা স্নায়ুরজ্জু (Dorsal Hollow Nerve Cord): পৃষ্ঠদেশে একটি একক, ফাঁপা স্নায়ুরজ্জু থাকে।
  3. গলবিলীয় ফুলকা ছিদ্র (Pharyngeal Gill Slits): জীবনের কোনো না কোনো দশায় গলবিলের দু'পাশে একজোড়া ছিদ্র থাকে।

কর্ডাটা পর্বকে তিনটি উপপর্বে ভাগ করা হয়: ইউরোকর্ডাটা, সেফালোকর্ডাটা এবং ভার্টিব্রাটা।

উপপর্ব: ভার্টিব্রাটা (Subphylum: Vertebrata)

ভার্টিব্রাটাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এদের নোটোকর্ডটি ভ্রূণাবস্থায় তরুণাস্থি বা অস্থি নির্মিত মেরুদণ্ড (Vertebral Column) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। এদের সুগঠিত মস্তিষ্ক থাকে যা করোটিকা বা ক্রেনিয়াম দ্বারা সুরক্ষিত। ভার্টিব্রাটাকে দুটি বিভাগে ভাগ করা হয়: অ্যাগনাথা (Agnatha - চোয়ালবিহীন) এবং ন্যাθοস্টোমাটা (Gnathostomata - চোয়ালযুক্ত)।

  • শ্রেণী ১: সাইক্লোস্টোমাটা (Class: Cyclostomata) (বিভাগ: অ্যাগনাথা)

    এরা চোয়ালবিহীন এবং এদের মুখ গোলাকার ও চোষক প্রকৃতির। এরা বড় মাছের দেহে বহিঃপরজীবী হিসাবে বাস করে। দেহ আঁশবিহীন ও শ্লেষ্মা গ্রন্থিযুক্ত। উদাহরণ: পেট্রোমাইজন (Petromyzon) (ল্যামপ্রে), মিক্সিন (Myxine) (হ্যাগফিশ)।

  • শ্রেণী ২: কনড্রিকথিস (Class: Chondrichthyes) (বিভাগ: ন্যাθοস্টোমাটা)

    এদের অন্তঃকঙ্কাল তরুণাস্থি নির্মিত। এরা সামুদ্রিক প্রাণী। ত্বক প্ল্যাকয়েড আঁশ দ্বারা আবৃত। এদের কানকো থাকে না, ৫-৭ জোড়া ফুলকা ছিদ্র উন্মুক্ত থাকে। হৃৎপিণ্ড দুই প্রকোষ্ঠযুক্ত। এরা শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী। উদাহরণ: স্কোলিওডন (Scoliodon) (হাঙর), ট্রাইগন (Trygon) (স্টিং রে)।

  • শ্রেণী ৩: অস্টিকথিস (Class: Osteichthyes) (বিভাগ: ন্যাθοস্টোমাটা)

    এদের অন্তঃকঙ্কাল অস্থি নির্মিত। এরা সামুদ্রিক এবং মিষ্টি জলের উভয় পরিবেশেই বাস করে। ত্বক সাইক্লয়েড বা টিনয়েড আঁশ দ্বারা আবৃত। ফুলকাগুলি কানকো বা অপারকুলাম দ্বারা ঢাকা থাকে। হৃৎপিণ্ড দুই প্রকোষ্ঠযুক্ত। এরাও শীতল রক্তবিশিষ্ট। উদাহরণ: ল্যাবিও (Labeo) (রুই), কাতলা (Catla), হিপ্পোক্যাম্পাস (Hippocampus) (সমুদ্র ঘোড়া)।

  • শ্রেণী ৪: অ্যাম্ফিবিয়া (Class: Amphibia)

    এরা জল এবং স্থল উভয় স্থানেই বাস করতে পারে, তাই এদের উভচর বলা হয়। এদের ত্বক আর্দ্র ও আঁশবিহীন। দুটি অগ্রপদ এবং দুটি পশ্চাৎপদ থাকে। হৃৎপিণ্ড তিন প্রকোষ্ঠযুক্ত (দুটি অলিন্দ, একটি নিলয়)। এরা শীতল রক্তবিশিষ্ট। লার্ভা দশায় ফুলকা এবং পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় ফুসফুস ও ত্বকের মাধ্যমে শ্বাসকার্য চালায়। উদাহরণ: ব্য়ুফো (Bufo) (কুনোব্যাঙ), রানা (Rana) (সোনা ব্যাঙ), স্যালামান্ড্রা (Salamandra)

  • শ্রেণী ৫: রেপটিলিয়া (Class: Reptilia)

    এরা বুকে ভর দিয়ে চলে, তাই এদের সরীসৃপ বলা হয়। এদের ত্বক শুষ্ক এবং এপিডার্মাল আঁশ বা স্কুট দ্বারা আবৃত। হৃৎপিণ্ড সাধারণত অসম্পূর্ণভাবে চার প্রকোষ্ঠযুক্ত (কুমির ছাড়া, কুমিরের হৃৎপিণ্ড সম্পূর্ণ চার প্রকোষ্ঠযুক্ত)। এরা শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী (Poikilotherms)। এরা ফুসফুসের সাহায্যে শ্বাস নেয়। উদাহরণ: টিকটিকি, সাপ, কচ্ছপ, কুমির

  • শ্রেণী ৬: অ্যাভিস (Class: Aves)

    এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দেহে পালকের উপস্থিতি এবং ওড়ার ক্ষমতা (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন উটপাখি)। অগ্রপদ ডানায় রূপান্তরিত হয়েছে। অন্তঃকঙ্কাল বায়ুপূর্ণ বা নিউম্যাটিক অস্থি দ্বারা গঠিত, যা দেহকে হালকা করে। হৃৎপিণ্ড সম্পূর্ণভাবে চার প্রকোষ্ঠযুক্ত। এরা উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণী (Homeotherms), অর্থাৎ এদের দেহের তাপমাত্রা স্থির থাকে। উদাহরণ: কবুতর, ময়ূর, চড়ুই, পেঙ্গুইন

  • শ্রেণী ৭: ম্যামালিয়া (Class: Mammalia)

    এদের প্রধান শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য হলো স্তনগ্রন্থি (Mammary Gland) এবং ত্বকে লোমের উপস্থিতি। এরা উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট। হৃৎপিণ্ড চার প্রকোষ্ঠযুক্ত। চোয়ালে বিভিন্ন ধরণের দাঁত থাকে (হেটারোডন্ট)। এরা সন্তান প্রসব করে (ভিভিপ্যারাস), কিছু ব্যতিক্রম (যেমন প্লাটিপাস) ছাড়া। উদাহরণ: মানুষ, তিমি, বাদুড়, বানর, বাঘ

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

এই অধ্যায়টি পড়ার সময় ছাত্রছাত্রীদের মনে কিছু সাধারণ প্রশ্ন জাগতে পারে। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর আলোচনা করা হলো।

প্রশ্ন ১: কর্ডাটা এবং অ-কর্ডাটা প্রাণীদের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি কী কী?

উত্তর: কর্ডাটা এবং অ-কর্ডাটাদের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো হলো:

  • নোটোকর্ড: কর্ডাটাদের জীবনের কোনো না কোনো দশায় নোটোকর্ড উপস্থিত থাকে, কিন্তু অ-কর্ডাটাদের থাকে না।
  • কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র: কর্ডাটাদের স্নায়ুরজ্জু পৃষ্ঠীয়, ফাঁপা এবং একক হয়। অ-কর্ডাটাদের ক্ষেত্রে এটি অঙ্কীয়, নিরেট এবং দ্বৈত হয়।
  • হৃৎপিণ্ড: কর্ডাটাদের হৃৎপিণ্ড অঙ্কীয় দিকে অবস্থিত (যদি থাকে)। অ-কর্ডাটাদের হৃৎপিণ্ড পৃষ্ঠীয় দিকে থাকে (যদি থাকে)।
  • গলবিলীয় ফুলকা ছিদ্র: কর্ডাটাদের গলবিলীয় ফুলকা ছিদ্র থাকে, অ-কর্ডাটাদের থাকে না।
  • লেজ: কর্ডাটাদের পায়ু-পরবর্তী একটি লেজ থাকে, যা অ-কর্ডাটাদের অনুপস্থিত।

প্রশ্ন ২: সিলোম (Coelom) কী এবং শ্রেণিবিন্যাসে এর গুরুত্ব কী?

উত্তর: সিলোম হলো দেহ প্রাচীর এবং পৌষ্টিকনালীর মধ্যবর্তী গহ্বর যা মেসোডার্মাল স্তর দ্বারা আবৃত থাকে। শ্রেণিবিন্যাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এটি প্রাণীদের বিবর্তনীয় সম্পর্ক নির্ধারণে সাহায্য করে।

  • অ্যাসিলোমেট (Acoelomate): সবচেয়ে সরল প্রাণীদের (যেমন, চ্যাপ্টাকৃমি) সিলোম থাকে না, যা তাদের আদিম প্রকৃতি নির্দেশ করে।
  • সিউডোসিলোমেট (Pseudocoelomate): গোলকৃমির মতো প্রাণীদের ছদ্ম-সিলোম থাকে, যা অ্যাসিলোমেট এবং প্রকৃত সিলোমেটদের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী অবস্থা বোঝায়।
  • সিলোমেট (Coelomate): অ্যানিলিডা থেকে শুরু করে সমস্ত উন্নত প্রাণীদের প্রকৃত সিলোম থাকে। এই সিলোম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সঠিক স্থানে ধরে রাখতে, তাদের বৃদ্ধি ও কার্যকারিতায় সাহায্য করে এবং একটি হাইড্রোস্ট্যাটিক কঙ্কাল হিসাবেও কাজ করে। সিলোমের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনীয় পদক্ষেপ।

প্রশ্ন ৩: সকল ভার্টিব্রাটা কর্ডাটা, কিন্তু সকল কর্ডাটা ভার্টিব্রাটা নয় – ব্যাখ্যা কর।

উত্তর: এই উক্তিটি সম্পূর্ণ সঠিক। এর কারণ হলো:

  • 'কর্ডাটা' পর্বের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য প্রধান শর্ত হলো জীবনের যেকোনো পর্যায়ে নোটোকর্ডের উপস্থিতি। ভার্টিব্রাটা, ইউরোকর্ডাটা এবং সেফালোকর্ডাটা—এই তিনটি উপপর্বের প্রাণীদেরই নোটোকর্ড থাকে। তাই, ভার্টিব্রাটা উপপর্বের সকল প্রাণীই কর্ডাটা পর্বের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, সকল ভার্টিব্রাটা কর্ডাটা।
  • কিন্তু, 'ভার্টিব্রাটা' হওয়ার শর্ত হলো নোটোকর্ডটি অস্থি বা তরুণাস্থি নির্মিত মেরুদণ্ড দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে হবে। ইউরোকর্ডাটা (যেমন, অ্যাসিডিয়া) এবং সেফালোকর্ডাটা (যেমন, অ্যাম্ফিঅক্সাস) উপপর্বের প্রাণীদের নোটোকর্ড থাকলেও, তা মেরুদণ্ড দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় না। তাই, এরা কর্ডাটা হলেও ভার্টিব্রাটা নয়।
  • এই কারণেই বলা হয়, সকল ভার্টিব্রাটা কর্ডাটা, কিন্তু সকল কর্ডাটা ভার্টিব্রাটা নয়।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়টি থেকে আমরা প্রাণীজগতের বিশালতা এবং এর সুশৃঙ্খল শ্রেণিবিন্যাস সম্পর্কে জানতে পারলাম। আলোচনার শেষে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন:

  • শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি: প্রাণীদের শ্রেণিবিন্যাস করা হয় সংগঠনের স্তর, প্রতিসাম্য, ভ্রূণীয় কোষস্তর, সিলোম, খণ্ডীভবন এবং নোটোকর্ডের মতো মৌলিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে।
  • প্রধান পর্বসমূহ: প্রাণীজগতকে প্রধানত পরিফেরা, নিডারিয়া, টিনোফোরা, প্লাটিহেলমিনথেস, অ্যাসকেলমিনথেস, অ্যানিলিডা, আর্থ্রোপোডা, মলাস্কা, একাইনোডার্মাটা, হেমিকর্ডাটা এবং কর্ডাটা—এই পর্বগুলিতে ভাগ করা হয়েছে।
  • অ-কর্ডাটা বনাম কর্ডাটা: নোটোকর্ডের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি হলো কর্ডাটা এবং অ-কর্ডাটাদের মধ্যে মূল পার্থক্য।
  • ভার্টিব্রাটার বৈচিত্র্য: ভার্টিব্রাটা উপপর্বের মধ্যে চোয়ালবিহীন (সাইক্লোস্টোমাটা) থেকে শুরু করে মৎস্য, উভচর, সরীসৃপ, পক্ষী এবং স্তন্যপায়ী পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণীর প্রাণী রয়েছে, যারা বিভিন্ন পরিবেশে অভিযোজিত হয়েছে।
  • বিবর্তনীয় তাৎপর্য: এই শ্রেণিবিন্যাস সরলতম কোষীয় সংগঠন থেকে জটিল অঙ্গ-তন্ত্র বিশিষ্ট প্রাণীর বিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে, যা জীববিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা।

আশা করি, এই বিস্তারিত আলোচনা একাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের 'প্রাণীজগৎ' অধ্যায়টি ভালোভাবে বুঝতে এবং মনে রাখতে সাহায্য করবে।