বিষয়ের ভূমিকা

আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি যে আমাদের পায়ের নিচের মাটিটি স্থির নয়? আপাতদৃষ্টিতে পৃথিবীকে স্থির মনে হলেও, এটি ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের কিছু ঘটে অত্যন্ত ধীরগতিতে, যা আমরা টেরও পাই না, আবার কিছু ঘটে চোখের পলকে—যেমন ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরি। সপ্তম শ্রেণির ভূগোলের এই তৃতীয় অধ্যায়টি আমাদের শেখায় কীভাবে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক শক্তিগুলো আমাদের এই গ্রহের রূপ বদলে দিচ্ছে। এই অধ্যায়টি কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, বরং আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি তাকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. লিথোস্ফিয়ারিক প্লেট (Lithospheric Plates)

পৃথিবীর লিথোস্ফিয়ার বা শিলামণ্ডল কতগুলো বড় এবং ছোট প্লেটে বিভক্ত, যাদের লিথোস্ফিয়ারিক প্লেট বলা হয়। এই প্লেটগুলো স্থির নয়; এগুলো প্রতি বছর মাত্র কয়েক মিলিমিটার করে ধীরে ধীরে নড়াচড়া করে। কিন্তু কেন এগুলো নড়ে? এর কারণ হলো পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা গলিত ম্যাগমা (Molten Magma)। পৃথিবীর ভেতরে এই ম্যাগমা বৃত্তাকার পথে ঘোরে, যার ফলে প্লেটগুলোর সঞ্চালন ঘটে। এই প্লেটগুলোর নড়াচড়াই পৃথিবীর উপরিভাগে সমস্ত পরিবর্তনের মূল কারণ।

২. অন্তর্জাত বল ও বহির্জাত বল (Endogenic and Exogenic Forces)

পৃথিবীর এই পরিবর্তনের পেছনে দুটি প্রধান শক্তি বা বল কাজ করে:

  • অন্তর্জাত বল (Endogenic Forces): যে শক্তিগুলো পৃথিবীর অভ্যন্তরে উৎপন্ন হয়। এই বলগুলো মাঝে মাঝে হঠাৎ পরিবর্তন ঘটায় (যেমন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি) আবার মাঝে মাঝে অত্যন্ত ধীরগতিতে পর্বত গঠন করে।
  • বহির্জাত বল (Exogenic Forces): যে শক্তিগুলো পৃথিবীর উপরিভাগে কাজ করে। নদী, বায়ু, সমুদ্র তরঙ্গ এবং হিমবাহের মাধ্যমে ঘটা ক্ষয় ও সঞ্চয় এর অন্তর্গত।

৩. আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্প

আগ্নেয়গিরি: এটি ভূপৃষ্ঠের একটি ছিদ্র বা ফাটল যার মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরের গলিত পদার্থ (ম্যাগমা) হঠাৎ বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে বেরিয়ে আসা এই পদার্থকে বলা হয় 'লাভা'।

ভূমিকম্প: লিথোস্ফিয়ারিক প্লেটগুলো যখন একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় বা সরে যায়, তখন ভূপৃষ্ঠে কম্পন সৃষ্টি হয়। এই কম্পনকেই ভূমিকম্প বলে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলকে বলা হয় 'ফোকাস' (Focus) এবং ফোকাসের ঠিক ওপরে ভূপৃষ্ঠের বিন্দুটিকে বলা হয় 'উপকেন্দ্র' (Epicenter)। উপকেন্দ্রের কাছে ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে এবং দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে কম্পনের তীব্রতা কমে আসে।

৪. প্রধান ভূমিরূপ গঠন (Major Landforms)

ভূপৃষ্ঠের ক্রমাগত ক্ষয় (Weathering) এবং অপসারণের (Erosion) ফলে বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠিত হয়। জল, বায়ু এবং বরফ এই ক্ষয়কাজের প্রধান মাধ্যম।

নদীর কাজ (Work of a River):

  • জলপ্রপাত: নদী যখন কোনো খাড়া ঢাল থেকে শক্ত শিলার ওপর আছড়ে পড়ে, তখন জলপ্রপাত তৈরি হয়।
  • মিয়েন্ডার বা নদীবাঁক: সমভূমি অঞ্চলে নদী যখন আঁকাবাঁকা পথে চলে, তখন সেই বাঁকগুলোকে মিয়েন্ডার বলে।
  • অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ: ক্রমাগত ক্ষয় ও সঞ্চয়ের ফলে মিয়েন্ডারগুলো মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘোড়ার খুরের মতো হ্রদ তৈরি করে।
  • বদ্বীপ (Delta): নদীর মোহনায় পলি জমে যে ত্রিভুজাকার ভূখণ্ড তৈরি হয়, তাকে বদ্বীপ বলে।

সমুদ্র তরঙ্গের কাজ (Work of Sea Waves):

সমুদ্রের ঢেউ উপকূলীয় অঞ্চলে ক্ষয় ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে বিশেষ রূপ তৈরি করে:

  • সমুদ্র গুহা (Sea Caves): ঢেউয়ের ধাক্কায় পাথরে গর্ত তৈরি হলে তাকে সমুদ্র গুহা বলে।
  • সমুদ্র তোরণ (Sea Arches): গুহাটি আরও বড় হয়ে যখন কেবল ছাদটি অবশিষ্ট থাকে।
  • স্ট্যাক (Stacks): ছাদ ভেঙে গিয়ে যখন কেবল দেওয়ালের মতো অংশ দাঁড়িয়ে থাকে।

হিমবাহের কাজ (Work of Ice):

হিমবাহ হলো বরফের নদী। এগুলো পাথর ক্ষয় করে গভীর খাত তৈরি করে। বরফ গলে গেলে এই খাতগুলো জলে ভরে হ্রদ তৈরি করে। হিমবাহ যে পলি ও পাথর বহন করে আনে, তা সঞ্চিত হয়ে 'গ্লেসিয়াল মোরেন' (Glacial Moraine) বা গ্রাবরেখা তৈরি করে।

বায়ুর কাজ (Work of Wind):

মরুভূমি অঞ্চলে বায়ু প্রধান শক্তি। এখানে দেখা যায়:

  • ছত্রাক শিলা (Mushroom Rocks): বায়ুর ক্ষয়কাজের ফলে নিচের অংশ সরু এবং উপরের অংশ চওড়া হয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো আকার নেয়।
  • বালিয়াড়ি (Sand Dunes): বায়ু যখন বালু বয়ে নিয়ে এক জায়গায় স্তূপ করে রাখে।
  • লোয়েস (Loess): খুব হালকা বালি যখন বহুদূরে উড়ে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে জমা হয় (যেমন চীনের লোয়েস সমভূমি)।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১. লিথোস্ফিয়ারিক প্লেট কেন নড়াচড়া করে?
উত্তর: পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা গলিত ম্যাগমা বৃত্তাকার গতিতে ঘোরে। এই ম্যাজমার তাপ ও চাপের প্রভাবেই ওপরের লিথোস্ফিয়ারিক প্লেটগুলো অত্যন্ত ধীরগতিতে নড়াচড়া করে।

২. অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ কীভাবে গঠিত হয়?
উত্তর: নদী যখন সমভূমি অঞ্চলে প্রবাহিত হয়, তখন সেটি আঁকাবাঁকা বা মিয়েন্ডার পথে চলে। সময়ের সাথে সাথে ক্ষয় ও সঞ্চয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিয়েন্ডারের বাঁকগুলো একে অপরের কাছে চলে আসে এবং একসময় মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই বিচ্ছিন্ন অংশটিই ঘোড়ার খুরের মতো হ্রদ বা অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ গঠন করে।

৩. ভূমিকম্প থেকে বাঁচার কিছু উপায় কী কী?
উত্তর: ভূমিকম্পের সময় আমাদের উচিত কোনো মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নেওয়া, দেওয়ালের কোণে দাঁড়ানো এবং কাঁচের জানালা, চিমনি বা আগুনের উৎস থেকে দূরে থাকা। খোলা মাঠও নিরাপদ স্থান হিসেবে গণ্য হয়।

সারসংক্ষেপ

  • পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ লিথোস্ফিয়ারিক প্লেট দ্বারা গঠিত যা ক্রমাগত সঞ্চরণশীল।
  • অন্তর্জাত বল (ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি) এবং বহির্জাত বল (নদী, বায়ু, হিমবাহ) ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন ঘটায়।
  • নদী তার যাত্রাপথে জলপ্রপাত, মিয়েন্ডার এবং বদ্বীপ সৃষ্টি করে।
  • সমুদ্র তরঙ্গ উপকূলে গুহা, তোরণ এবং স্ট্যাক গঠন করে।
  • মরুভূমিতে বায়ুর মাধ্যমে ছত্রাক শিলা এবং বালিয়াড়ি তৈরি হয়।
  • হিমবাহের সঞ্চয়ের ফলে গ্রাবরেখা বা মোরেন গঠিত হয়।