বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে চলেছে। দুধ থেকে দই তৈরি হওয়া, লোহায় মরচে পড়া, খাবার হজম হওয়া, আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া – এই সমস্ত ঘটনাই একেকটি রাসায়নিক পরিবর্তনের উদাহরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো কীভাবে ঘটে? কোন অদৃশ্য শক্তি এই পরিবর্তনের পিছনে কাজ করে? রসায়ন আমাদের এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর দেয়। আর এই পরিবর্তনের পেছনের বিজ্ঞানকে বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই জানতে হবে ‘রাসায়নিক বিক্রিয়া’ সম্পর্কে।
দশম শ্রেণির রসায়নের প্রথম অধ্যায়, ‘রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং সমীকরণ’, আমাদের এই увлекательный জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে একটি রাসায়নিক পরিবর্তনকে চেনা যায়, কীভাবে এই পরিবর্তনগুলিকে একটি সহজবোধ্য ভাষায় অর্থাৎ সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়, এবং এই বিক্রিয়াগুলো কত প্রকারের হতে পারে। এই অধ্যায়ের জ্ঞান শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্য নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বোঝার জন্যও অত্যন্ত জরুরি। চলুন, এই আকর্ষণীয় অধ্যায়ের গভীরে প্রবেশ করা যাক এবং আমাদের চারপাশের পরিবর্তনগুলির রহস্য উন্মোচন করি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
রাসায়নিক বিক্রিয়া কী এবং কীভাবে চিনবেন?
যখন এক বা একাধিক পদার্থ পরিবর্তিত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট এক বা একাধিক পদার্থ তৈরি করে, তখন সেই প্রক্রিয়াটিকে রাসায়নিক বিক্রিয়া বলা হয়। যে পদার্থগুলি বিক্রিয়ায় অংশ নেয়, তাদের বলা হয় বিক্রিয়ক (Reactants), এবং বিক্রিয়ার ফলে যে নতুন পদার্থগুলি উৎপন্ন হয়, তাদের বলা হয় বিক্রিয়াজাত পদার্থ (Products)।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কীভাবে বুঝব যে একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটছে? কয়েকটি নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা এটি সনাক্ত করতে পারি:
- অবস্থার পরিবর্তন (Change in State): অনেক সময় বিক্রিয়ার ফলে পদার্থের ভৌত অবস্থার পরিবর্তন হয়। যেমন, মোমবাতি যখন জ্বলে, তখন কঠিন মোম গলে তরল হয় এবং পরে গ্যাসে (কার্বন ডাই অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প) পরিণত হয়।
- রঙের পরিবর্তন (Change in Colour): কিছু বিক্রিয়ায় পদার্থের রঙ বদলে যায়। যেমন, একটি লোহার পেরেকের উপর যখন মরচে পড়ে, তখন তার ধূসর রঙ লালচে-বাদামী হয়ে যায়। আবার, লেড নাইট্রেট (বর্ণহীন) দ্রবণে পটাশিয়াম আয়োডাইড (বর্ণহীন) দ্রবণ যোগ করলে হলুদ রঙের লেড আয়োডাইডের অধঃক্ষেপ পড়ে।
- গ্যাসের উদ্ভব (Evolution of a Gas): কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় গ্যাস উৎপন্ন হয়। যেমন, জিঙ্কের টুকরোর উপর লঘু সালফিউরিক অ্যাসিড ঢাললে বুদবুদ আকারে হাইড্রোজেন গ্যাস বের হতে থাকে।
- তাপমাত্রার পরিবর্তন (Change in Temperature): রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়তে বা কমতে পারে। যে বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হয়, তাকে তাপমোচী বিক্রিয়া (Exothermic Reaction) বলে। যেমন, কলিচুন (ক্যালসিয়াম অক্সাইড) জলে মেশালে পাত্রটি গরম হয়ে ওঠে। আর যে বিক্রিয়ায় তাপ শোষিত হয়, তাকে তাপগ্রাহী বিক্রিয়া (Endothermic Reaction) বলে। যেমন, বেরিয়াম হাইড্রোক্সাইডের সাথে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড মেশালে পাত্রটি ঠান্ডা হয়ে যায়।
NCERT বইয়ের একটি বিখ্যাত উদাহরণ হলো ম্যাগনেসিয়াম ফিতার দহন। একটি ম্যাগনেসিয়াম ফিতাকে বায়ুর উপস্থিতিতে পোড়ালে সেটি উজ্জ্বল সাদা শিখাসহ জ্বলতে থাকে এবং সাদা গুঁড়ো ছাই তৈরি করে। এই ছাই হলো ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড। এখানে ম্যাগনেসিয়াম এবং অক্সিজেন হলো বিক্রিয়ক, এবং ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড হলো বিক্রিয়াজাত পদার্থ। এটি একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার সুস্পষ্ট উদাহরণ।
রাসায়নিক সমীকরণ (Chemical Equations)
একটি রাসায়নিক বিক্রিয়াকে সংক্ষিপ্ত এবং তথ্যপূর্ণভাবে প্রকাশ করার পদ্ধতি হলো রাসায়নিক সমীকরণ। আমরা এটিকে দুটি ধাপে শিখতে পারি:
১. শব্দ-সমীকরণ (Word Equation): এক্ষেত্রে বিক্রিয়ক এবং বিক্রিয়াজাত পদার্থগুলিকে তাদের নাম দিয়ে লেখা হয়। যেমন, ম্যাগনেসিয়ামের দহনের বিক্রিয়াটিকে লেখা যায়:
ম্যাগনেসিয়াম + অক্সিজেন → ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড
এখানে বামদিকের পদার্থগুলি (LHS) হলো বিক্রিয়ক এবং ডানদিকের পদার্থটি (RHS) হলো বিক্রিয়াজাত। মাঝখানের তীরচিহ্নটি বিক্রিয়ার অভিমুখ নির্দেশ করে।
২. কঙ্কাল রাসায়নিক সমীকরণ (Skeletal Chemical Equation): শব্দ-সমীকরণের পরিবর্তে যখন পদার্থগুলির রাসায়নিক সংকেত ব্যবহার করা হয়, তখন তাকে কঙ্কাল রাসায়নিক সমীকরণ বলে। উপরের বিক্রিয়াটির কঙ্কাল সমীকরণ হবে:
Mg + O₂ → MgO
এই সমীকরণটি অনেক বেশি সংক্ষিপ্ত এবং বৈজ্ঞানিক। তবে এখানে একটি সমস্যা রয়েছে। তীরচিহ্নের বামদিকে অক্সিজেনের দুটি পরমাণু (O₂) আছে, কিন্তু ডানদিকে মাত্র একটি (MgO)। এটি ‘ভরের নিত্যতা সূত্র’ (Law of Conservation of Mass) লঙ্ঘন করে। তাই আমাদের সমীকরণটিকে সমতাবিধান করতে হবে।
রাসায়নিক সমীকরণকে সমতাবিধান করা (Balancing Chemical Equations)
ভরের নিত্যতা সূত্র অনুযায়ী, যেকোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভরের সৃষ্টি বা বিনাশ হয় না। অর্থাৎ, বিক্রিয়ার আগে বিক্রিয়কগুলির মোট ভর এবং বিক্রিয়ার পরে বিক্রিয়াজাত পদার্থগুলির মোট ভর সমান থাকে। এর অর্থ হলো, বিক্রিয়ার আগে এবং পরে প্রত্যেকটি মৌলের পরমাণুর সংখ্যা সমান থাকতে হবে। এই কারণেই আমাদের রাসায়নিক সমীকরণকে সমতাবিধান করার প্রয়োজন হয়।
আসুন, হিট অ্যান্ড ট্রায়াল (Hit and Trial) পদ্ধতিতে সমতাবিধানের ধাপগুলি একটি উদাহরণের মাধ্যমে শিখি।
উদাহরণ: আয়রন + জলীয় বাষ্প → ফেরোসোফেরিক অক্সাইড + হাইড্রোজেন
ধাপ ১: কঙ্কাল সমীকরণ লেখা
Fe + H₂O → Fe₃O₄ + H₂
ধাপ ২: পরমাণুর সংখ্যা তালিকাভুক্ত করা
| মৌল | বিক্রিয়কের দিকে পরমাণুর সংখ্যা (LHS) | বিক্রিয়াজাত পদার্থের দিকে পরমাণুর সংখ্যা (RHS) |
|---|---|---|
| আয়রন (Fe) | ১ | ৩ |
| হাইড্রোজেন (H) | ২ | ২ |
| অক্সিজেন (O) | ১ | ৪ |
ধাপ ৩: সমতাবিধান শুরু করা
সাধারণত যে যৌগটিতে সবচেয়ে বেশি পরমাণু আছে, সেটি দিয়ে শুরু করা সুবিধাজনক। এখানে Fe₃O₄ যৌগটিতে সবচেয়ে বেশি পরমাণু আছে। এর মধ্যে অক্সিজেন পরমাণুর সংখ্যা ৪। ডানদিকে ৪টি অক্সিজেন পরমাণু থাকায়, বামদিকে H₂O-এর সামনে সহগ (coefficient) হিসেবে ৪ বসাতে হবে।
Fe + 4H₂O → Fe₃O₄ + H₂
ধাপ ৪: অন্যান্য পরমাণুর সমতাবিধান করা
এখন বামদিকে হাইড্রোজেন পরমাণুর সংখ্যা হয়েছে ৪ × ২ = ৮। তাই ডানদিকে H₂-এর সামনে ৪ বসাতে হবে যাতে হাইড্রোজেনের সংখ্যা ৮ হয়।
Fe + 4H₂O → Fe₃O₄ + 4H₂
ধাপ ৫: শেষ পরমাণুর সমতাবিধান করা
এখন শুধু আয়রন (Fe) বাকি আছে। ডানদিকে ৩টি Fe পরমাণু আছে, তাই বামদিকে Fe-এর সামনে ৩ বসাতে হবে।
3Fe + 4H₂O → Fe₃O₄ + 4H₂
ধাপ ৬: চূড়ান্ত যাচাইকরণ
আসুন, শেষবারের মতো দুইদিকের পরমাণুর সংখ্যা গুনে দেখি।
- Fe: বামদিকে ৩, ডানদিকে ৩ (সমান)
- H: বামদিকে ৪ × ২ = ৮, ডানদিকে ৪ × ২ = ৮ (সমান)
- O: বামদিকে ৪ × ১ = ৪, ডানদিকে ৪ (সমান)
সুতরাং, সমীকরণটি এখন সমতাবিধানযুক্ত। চূড়ান্ত সমীকরণটি হলো: 3Fe + 4H₂O → Fe₃O₄ + 4H₂
রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রকারভেদ (Types of Chemical Reactions)
রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলিকে তাদের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রধান কয়েকটি প্রকার হলো:
১. संयोजन বিক্রিয়া (Combination Reaction)
যে বিক্রিয়ায় দুই বা ততোধিক বিক্রিয়ক পদার্থ একত্রিত হয়ে একটিমাত্র বিক্রিয়াজাত পদার্থ উৎপন্ন করে, তাকে संयोजन বিক্রিয়া বলে।
সাধারণ রূপ: A + B → AB
- উদাহরণ ১: কয়লার দহন। কার্বন (কয়লা) এবং অক্সিজেন যুক্ত হয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি করে।
C(s) + O₂(g) → CO₂(g) - উদাহরণ ২: জল গঠন। হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন গ্যাস যুক্ত হয়ে জল তৈরি করে।
2H₂(g) + O₂(g) → 2H₂O(l) - উদাহরণ ৩: কলিচুন (ক্যালসিয়াম অক্সাইড) থেকে শ্লেকড লাইম (ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড) তৈরি।
CaO(s) + H₂O(l) → Ca(OH)₂(aq) + তাপ (এটি একটি তাপমোচী বিক্রিয়া)
২. বিয়োজন বিক্রিয়া (Decomposition Reaction)
এটি संयोजन বিক্রিয়ার ঠিক বিপরীত। যে বিক্রিয়ায় একটি যৌগিক পদার্থ ভেঙে দুই বা ততোধিক সরল পদার্থে পরিণত হয়, তাকে বিয়োজন বিক্রিয়া বলে। এই বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য বাইরে থেকে শক্তি (তাপ, আলো বা বিদ্যুৎ) প্রয়োগ করতে হয়।
সাধারণ রূপ: AB → A + B
শক্তির উৎসের উপর ভিত্তি করে এটি তিন প্রকারের হয়:
- তাপীয় বিয়োজন (Thermal Decomposition): তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বিয়োজন ঘটানো হয়।
উদাহরণ: ফেরাস সালফেটকে উত্তপ্ত করলে তা ফেরিক অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড এবং সালফার ট্রাই অক্সাইডে ভেঙে যায়।
2FeSO₄(s) --(তাপ)--> Fe₂O₃(s) + SO₂(g) + SO₃(g) - তড়িৎ বিশ্লেষণ (Electrolytic Decomposition): বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে বিয়োজন ঘটানো হয়।
উদাহরণ: জলের মধ্যে বিদ্যুৎ পাঠালে তা হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন গ্যাসে ভেঙে যায়।
2H₂O(l) --(বিদ্যুৎ)--> 2H₂(g) + O₂(g) - আলোকীয় বিয়োজন (Photolytic Decomposition): আলোর উপস্থিতিতে বিয়োজন ঘটানো হয়।
উদাহরণ: সিলভার ক্লোরাইডকে সূর্যের আলোতে রাখলে তা ভেঙে রুপো এবং ক্লোরিন গ্যাসে পরিণত হয়।
2AgCl(s) --(সূর্যালোক)--> 2Ag(s) + Cl₂(g) (এই বিক্রিয়াটি সাদা-কালো ফটোগ্রাফিতে ব্যবহৃত হয়)।
৩. প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Displacement Reaction)
যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একটি বেশি সক্রিয় মৌল অপর একটি কম সক্রিয় মৌলকে তার যৌগ থেকে প্রতিস্থাপিত করে, তাকে প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে।
সাধারণ রূপ: A + BC → AC + B (এখানে A মৌলটি B-এর চেয়ে বেশি সক্রিয়)
- উদাহরণ ১: একটি লোহার পেরেককে কপার সালফেট দ্রবণে ডোবালে, লোহা (Fe) কপার (Cu)-এর চেয়ে বেশি সক্রিয় হওয়ায় কপারকে প্রতিস্থাপিত করে। দ্রবণের নীল রঙ হালকা সবুজ হয়ে যায় এবং পেরেকের উপর কপারের লালচে-বাদামী আস্তরণ পড়ে।
Fe(s) + CuSO₄(aq) → FeSO₄(aq) + Cu(s) - উদাহরণ ২: জিঙ্ক (Zn) কপার (Cu)-এর চেয়ে বেশি সক্রিয়।
Zn(s) + CuSO₄(aq) → ZnSO₄(aq) + Cu(s)
৪. দ্বি-প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Double Displacement Reaction)
যে বিক্রিয়ায় দুটি ভিন্ন যৌগের বিক্রিয়ক অণুগুলির মধ্যে আয়ন বা মূলকের পারস্পরিক বিনিময় ঘটে এবং নতুন যৌগ উৎপন্ন হয়, তাকে দ্বি-প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে।
সাধারণ রূপ: AB + CD → AD + CB
এই ধরণের বিক্রিয়ায় প্রায়শই একটি অদ্রাব্য পদার্থ বা অধঃক্ষেপ (Precipitate) তৈরি হয়। তাই এদের অধঃক্ষেপণ বিক্রিয়াও বলা হয়।
- উদাহরণ: সোডিয়াম সালফেট এবং বেরিয়াম ক্লোরাইডের জলীয় দ্রবণের বিক্রিয়ায় বেরিয়াম সালফেটের সাদা অধঃক্ষেপ এবং সোডিয়াম ক্লোরাইড উৎপন্ন হয়।
Na₂SO₄(aq) + BaCl₂(aq) → BaSO₄(s) + 2NaCl(aq)
৫. জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া (Oxidation-Reduction Reaction)
এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিক্রিয়া। পুরনো ধারণা অনুযায়ী:
- জারণ (Oxidation): কোনো পদার্থে অক্সিজেন যুক্ত হওয়া বা হাইড্রোজেন অপসারিত হওয়া।
- বিজারণ (Reduction): কোনো পদার্থ থেকে অক্সিজেন অপসারিত হওয়া বা হাইড্রোজেন যুক্ত হওয়া।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জারণ এবং বিজারণ সবসময় একসঙ্গেই ঘটে। যে বিক্রিয়ায় একই সাথে জারণ ও বিজারণ ঘটে, তাকে রেডক্স বিক্রিয়া (Redox Reaction) বলে।
- উদাহরণ: উত্তপ্ত কপার অক্সাইডের (CuO) উপর দিয়ে হাইড্রোজেন গ্যাস চালনা করলে কপার (Cu) এবং জল (H₂O) উৎপন্ন হয়।
CuO(s) + H₂(g) --(তাপ)--> Cu(s) + H₂O(l)
এখানে, CuO থেকে অক্সিজেন অপসারিত হয়ে Cu তৈরি হয়েছে। সুতরাং, CuO-এর বিজারণ ঘটেছে।
আবার, H₂-এর সাথে অক্সিজেন যুক্ত হয়ে H₂O তৈরি হয়েছে। সুতরাং, H₂-এর জারণ ঘটেছে।
যে পদার্থটি অন্যকে জারিত করে এবং নিজে বিজারিত হয়, তাকে জারক পদার্থ (Oxidising agent) বলে। এখানে CuO হলো জারক পদার্থ।
যে পদার্থটি অন্যকে বিজারিত করে এবং নিজে জারিত হয়, তাকে বিজারক পদার্থ (Reducing agent) বলে। এখানে H₂ হলো বিজারক পদার্থ।
দৈনন্দিন জীবনে জারণ-বিজারণের প্রভাব
জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া শুধুমাত্র পরীক্ষাগারেই সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
১. ধাতুর ক্ষয় (Corrosion)
যখন কোনো ধাতু তার পারিপার্শ্বিক পদার্থ যেমন জল, বায়ু, অ্যাসিড ইত্যাদির সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তখন তাকে ধাতুর ক্ষয় বলে। লোহার উপর মরচে পড়া এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। লোহা (Fe) বায়ু এবং জলীয় বাষ্পের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে লালচে-বাদামী রঙের হাইড্রেটেড আয়রন (III) অক্সাইড (Fe₂O₃.nH₂O) বা মরচে তৈরি করে। এটি একটি জারণ প্রক্রিয়া। একইভাবে, রুপোর উপর কালো আস্তরণ বা তামার উপর সবুজ আস্তরণ পড়াও ধাতুর ক্ষয়ের উদাহরণ।
২. তৈলজারণ বা দুর্গন্ধতা (Rancidity)
তেল বা চর্বিজাতীয় খাবার যখন dugo সময় ধরে বাতাসের সংস্পর্শে থাকে, তখন বায়ুর অক্সিজেন দ্বারা জারিত হয়ে তার স্বাদ ও গন্ধ পাল্টে যায়। এই ঘটনাকে তৈলজারণ বা দুর্গন্ধতা বলে। এটি প্রতিরোধ করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। যেমন:
- বায়ুরোধী পাত্রে খাবার রাখা।
- চিপসের প্যাকেটে নাইট্রোজেন গ্যাসের মতো নিষ্ক্রিয় গ্যাস ভর্তি করা, যা অক্সিজেনকে সরিয়ে দেয়।
- খাবারে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (প্রতিজারক) মেশানো।
- রেফ্রিজারেটরে খাবার সংরক্ষণ করে জারণ প্রক্রিয়াকে ধীর করা।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: রাসায়নিক সমীকরণকে সমতাবিধান করা কেন জরুরি?
উত্তর: রাসায়নিক সমীকরণকে সমতাবিধান করা ‘ভরের নিত্যতা সূত্র’ মেনে চলার জন্য অপরিহার্য। এই সূত্র অনুযায়ী, কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভরের সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। এর অর্থ হলো, বিক্রিয়ার আগে মোট পরমাণুর সংখ্যা এবং বিক্রিয়ার পরে মোট পরমাণুর সংখ্যা অবশ্যই সমান হতে হবে। একটি সমতাবিধানযুক্ত সমীকরণ নিশ্চিত করে যে বিক্রিয়ক এবং বিক্রিয়াজাত উভয় দিকেই প্রতিটি মৌলের পরমাণুর সংখ্যা সমান, যা এই মৌলিক বৈজ্ঞানিক নীতিকে সমর্থন করে।
প্রশ্ন ২: संयोजन এবং বিয়োজন বিক্রিয়ার মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: संयोजन এবং বিয়োজন বিক্রিয়া একে অপরের বিপরীত। संयोजन বিক্রিয়ায়, দুই বা ততোধিক সরল পদার্থ (বিক্রিয়ক) একত্রিত হয়ে একটি জটিল যৌগ (বিক্রিয়াজাত) তৈরি করে (A + B → AB)। অন্যদিকে, বিয়োজন বিক্রিয়ায় একটি জটিল যৌগ ভেঙে দুই বা ততোধিক সরল পদার্থে পরিণত হয় (AB → A + B)। संयोजन বিক্রিয়ায় সাধারণত শক্তি নির্গত হয়, যেখানে বিয়োজন বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য বাইরে থেকে শক্তি (তাপ, আলো বা বিদ্যুৎ) সরবরাহ করতে হয়।
প্রশ্ন ৩: জারণ এবং বিজারণ বলতে কী বোঝো? একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: জারণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে কোনো পদার্থ অক্সিজেন লাভ করে বা হাইড্রোজেন হারায়। বিজারণ হলো এর বিপরীত প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো পদার্থ অক্সিজেন হারায় বা হাইড্রোজেন লাভ করে। এই দুটি প্রক্রিয়া সবসময় একসাথে ঘটে, যাকে রেডক্স বিক্রিয়া বলা হয়। উদাহরণ: ZnO + C → Zn + CO। এই বিক্রিয়ায়, জিঙ্ক অক্সাইড (ZnO) অক্সিজেন হারিয়ে জিঙ্কে (Zn) পরিণত হয়েছে, সুতরাং ZnO-এর বিজারণ ঘটেছে। অন্যদিকে, কার্বন (C) অক্সিজেন লাভ করে কার্বন মনোক্সাইডে (CO) পরিণত হয়েছে, সুতরাং C-এর জারণ ঘটেছে।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়টি ভালোভাবে মনে রাখার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে উল্লেখ করা হলো:
- রাসায়নিক বিক্রিয়া: এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে নতুন ধর্মবিশিষ্ট নতুন পদার্থ তৈরি হয়।
- রাসায়নিক সমীকরণ: রাসায়নিক বিক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত সাংকেতিক প্রকাশ।
- সমতাবিধান: ভরের নিত্যতা সূত্র মেনে চলার জন্য সমীকরণের উভয় দিকে প্রতিটি মৌলের পরমাণুর সংখ্যা সমান করা হয়।
- সংযোজন বিক্রিয়া: দুই বা ততোধিক বিক্রিয়ক মিলে একটি উৎপাদক তৈরি করে।
- বিয়োজন বিক্রিয়া: একটি বিক্রিয়ক ভেঙে একাধিক উৎপাদক তৈরি করে। এটি তাপ, আলো বা বিদ্যুৎ শক্তির সাহায্যে ঘটে।
- প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া: একটি বেশি সক্রিয় মৌল কম সক্রিয় মৌলকে তার যৌগ থেকে সরিয়ে দেয়।
- দ্বি-প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া: দুটি যৌগের মধ্যে আয়নের পারস্পরিক বিনিময় ঘটে।
- জারণ-বিজারণ (রেডক্স) বিক্রিয়া: অক্সিজেন বা হাইড্রোজেনের আদান-প্রদান ঘটে। জারণ ও বিজারণ সর্বদা একযোগে ঘটে।
- দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব: ধাতুর ক্ষয় (Corrosion) এবং তৈলজারণ (Rancidity) হলো আমাদের চারপাশে ঘটা দুটি সাধারণ জারণ প্রক্রিয়া।