ঘটনার প্রেক্ষাপট
কল্পনা করুন, আপনি পুরনো বইয়ের দোকানে ধুলোয় ঢাকা একটি প্রাচীন পুঁথি খুঁজে পেলেন। তার পাতাগুলো বিবর্ণ, চামড়া দিয়ে বাঁধানো। আপনি পাতা ওল্টালেন, কিন্তু একি! অক্ষরের সারি আপনার চোখের সামনে, অথচ একটি বর্ণও আপনি চিনতে পারছেন না। ছবিগুলো আরও অদ্ভুত—এমন গাছপালা যা পৃথিবীতে নেই, আকাশে এমন নক্ষত্রপুঞ্জ যা কেউ কখনও দেখেনি, আর এমন সব নকশা যা আপনার কল্পনাকেও হার মানায়। এটি কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়, এটি হলো ভয়নিক পাণ্ডুলিপি (Voynich Manuscript)—বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বই।
গল্পের শুরু ১৯১২ সালে। পোল্যান্ডের বই ব্যবসায়ী উইলফ্রিড ভয়নিক ইতালির এক জেসুইট কলেজের প্রাচীন সংগ্রহশালায় এই অদ্ভুত পাণ্ডুলিপিটি খুঁজে পান। প্রায় ২৪০ পাতার এই বইটি হাতে লেখা, যার ভাষা ও লিপি সম্পূর্ণ অজানা। এর প্রতিটি পাতায় রয়েছে রহস্যময় ছবি—অচেনা উদ্ভিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানের নকশা, আর নগ্ন নারীদের অদ্ভুত সব ভঙ্গিমায় আঁকা চিত্র। ভয়নিক ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো মধ্যযুগের কোনো হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানের ভান্ডার আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, তিনি আসলে এমন এক রহস্যের দরজা খুলেছেন, যা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ ও কোড ব্রেকারদের রাতের ঘুম কেড়ে নেবে।
রহস্যের জাল
ভয়নিক পাণ্ডুলিপির রহস্যের জাল তার প্রতিটি পাতায় বোনা। বইটিকে মোটামুটি ছয়টি ভাগে ভাগ করা যায়, কিন্তু প্রতিটি ভাগই একে অপরের চেয়ে বেশি রহস্যময়।
১. উদ্ভিদের জগৎ: বইটির সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন উদ্ভিদের রঙিন ছবি। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো, এর মধ্যে একটি গাছেরও পরিচয় বিজ্ঞানীরা খুঁজে পাননি। এদের পাতা, ফুল, ফলের গঠন পৃথিবীর কোনো পরিচিত উদ্ভিদের সাথে মেলে না। মনে হয় যেন অন্য কোনো গ্রহের উদ্ভিদবিদ্যার বই।
২. জ্যোতির্বিদ্যা: কিছু পাতায় রয়েছে সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রের ছবি, যা দেখতে রাশিচক্রের মতো। কিন্তু এই নকশাগুলো আমাদের পরিচিত জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে মেলে না। এমন সব নক্ষত্রপুঞ্জ আঁকা রয়েছে, যা খালি চোখে দেখা যায় না। তাহলে প্রায় ৬০০ বছর আগে এর লেখক কীভাবে এই নকশা আঁকলেন?
৩. জীববিদ্যা: এই অংশটি সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর। এখানে অসংখ্য নগ্ন নারীর ছবি রয়েছে, যারা সবুজ রঙের তরলে ভরা অদ্ভুত সব নলের মধ্যে দিয়ে সাঁতার কাটছে বা স্নান করছে। এই ছবিগুলোর অর্থ কী? এটি কি কোনো অজানা চিকিৎসা পদ্ধতির বর্ণনা, নাকি কোনো গুপ্ত সাধনার সংকেত?
৪. মহাজাগতিক ও ওষুধপত্র: এছাড়াও রয়েছে মহাজাগতিক নকশা ও বিভিন্ন শিকড়-বাকড়ের ছবি, যা দেখে মনে হয় কোনো ওষুধের প্রস্তুত প্রণালী লেখা রয়েছে। কিন্তু যে ভাষায় লেখা, তার পাঠোদ্ধার না হওয়ায় সবই অনুমান মাত্র।
তবে ছবির চেয়েও বড় রহস্য এর ভাষা। ‘ভয়নিচিজ’ (Voynichese) নামে পরিচিত এই লিপিতে প্রায় ২৫-৩০টি অক্ষর রয়েছে। লেখাগুলো বাঁ দিক থেকে ডান দিকে পড়া হয় এবং দেখে মনে হয় লেখক অত্যন্ত সাবলীলভাবে এটি লিখেছেন, কোথাও কোনো দ্বিধা বা কাটাকুটি নেই। ভাষাবিদরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, এই ভাষার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ছন্দ ও নিয়ম আছে, যা যেকোনো স্বাভাবিক ভাষার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আজ পর্যন্ত এর একটি শব্দেরও অর্থ বের করা সম্ভব হয়নি।
রহস্য আরও ঘনীভূত হয় যখন জানা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ কোড ব্রেকাররাও এই পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধার করতে পারেননি। উইলিয়াম ফ্রিডম্যানের মতো কিংবদন্তী ক্রিপ্টোগ্রাফার, যিনি জাপানের পার্পল কোড ভেঙে দিয়েছিলেন, তিনিও এই বইয়ের সামনে এসে হাল ছেড়ে দেন। তিনি তার জীবনের একটা বড় অংশ এর পেছনে ব্যয় করেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। তার মতে, এটি কোনো সাধারণ কোড নয়, বরং এমন এক কৃত্রিম ভাষায় লেখা যার চাবিকাঠি চিরতরে হারিয়ে গেছে।
সত্যের উন্মোচন
তাহলে কি এই পাণ্ডুলিপিটি একটি নিখুঁত ধাপ্পাবাজি? হয়তো মধ্যযুগের কোনো চালাক ব্যক্তি সবাইকে বোকা বানানোর জন্য এই অর্থহীন বই লিখেছিলেন? এই তত্ত্বটিও খুব জোরালো। হয়তো কোনো ধনী সংগ্রাহককে ধোঁকা দেওয়ার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল।
তবে বিজ্ঞানের অগ্রগতি এই রহস্যের উপর কিছুটা আলো ফেলেছে। ২০০৯ সালে অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা রেডিওকার্বন ডেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে জানতে পারেন, পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো ১৪০৪ থেকে ১৪৩৮ সালের মধ্যে তৈরি। অর্থাৎ, এটি কোনো আধুনিক জালিয়াতি নয়, বরং এর বয়স সত্যিই প্রায় ৬০০ বছর। এই আবিষ্কারের ফলে এটি নিশ্চিত হয় যে বইটি মধ্যযুগেরই সৃষ্টি।
আধুনিক যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করেও এর রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু গবেষক দাবি করেছেন, এই ভাষাটি হিব্রু বা তুর্কি ভাষার কোনো প্রাচীন রূপ হতে পারে, যা বিশেষ কোডের মাধ্যমে লেখা হয়েছে। কিন্তু তাদের দাবি সর্বজনীনভাবে গৃহীত হয়নি এবং কেউই পুরো পাণ্ডুলিপিটির একটি যৌক্তিক অনুবাদ দিতে পারেননি।
আজও ভয়নিক পাণ্ডুলিপিটি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেইনেক রেয়ার বুক অ্যান্ড ম্যানুস্ক্রিপ্ট লাইব্রেরিতে সযত্নে রক্ষিত আছে। এটি এক জীবন্ত প্রহেলিকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি কি কোনো হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার শেষ চিহ্ন? কোনো অ্যালকেমিস্টের গোপন নোটবুক? নাকি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রতারণা? উত্তরটি হয়তো বইটির মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে, সেই অচেনা অক্ষরে, যা আজও আমাদের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)