বিষয়ের ভূমিকা
দশম শ্রেণির ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় 'ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উদয়' (The Rise of Nationalism in Europe) বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে আধুনিক ইউরোপের মানচিত্র গঠিত হয়েছিল এবং কীভাবে রাজতন্ত্রের শাসন থেকে বেরিয়ে মানুষ নিজস্ব জাতিরাষ্ট্র (Nation-State) গঠনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। ফ্রেডরিক সরিওর চিত্রকর্ম থেকে শুরু করে ফরাসি বিপ্লব, নেপোলিয়নের কোড, এবং জার্মানি-ইতালির একত্রীকরণ—এই সমস্ত ঘটনাই ছিল ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। বাংলায় এই ধারণাগুলি পরিষ্কার করে বুঝতে পারলে পরীক্ষার প্রস্তুতি অনেক সহজ হবে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উত্থান কোনো একদিনে ঘটেনি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, সামাজিক পরিবর্তন এবং বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন। নিচে প্রধান ধারণাগুলি আলোচনা করা হলো:
১. ফ্রেডরিক সরিওর স্বপ্ন এবং ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব
১৮৪৮ সালে ফরাসি চিত্রশিল্পী ফ্রেডরিক সরিও চারটি প্রিন্টের একটি সিরিজ তৈরি করেছিলেন, যেখানে তিনি গণতান্ত্রিক এবং সামাজিক প্রজাতন্ত্রের একটি বিশ্বের কল্পনা করেছিলেন। এই ছবির মূল বার্তা ছিল—ইউরোপের মানুষ রাজতন্ত্রের শৃঙ্খল ভেঙে জাতিরাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে চলেছে। অন্যদিকে, ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ছিল জাতীয়তাবাদের প্রথম সুস্পষ্ট প্রকাশ। ফরাসি বিপ্লব শুধু ফ্রান্সেই নয়, সারা ইউরোপে 'স্বদেশপ্রেম' ও 'নাগরিকত্ব' (La Patrie এবং Le Citoyen)-এর ধারণা ছড়িয়ে দেয়। বিপ্লবীরা ঘোষণা করেন যে মানুষের ঐক্য এবং সমান অধিকারই হবে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
২. নেপোলিয়নের শাসন এবং সিভিল কোড
ফরাসি বিপ্লবের পর ক্ষমতায় আসেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। তিনি ১৮০৪ সালে প্রবর্তন করেন বিখ্যাত নাপোলিয়নিক কোড (Civil Code of 1804), যা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা দূর করে এবং আইনের চোখে সমতা প্রতিষ্ঠা করে। নেপোলিয়নের সংস্কারের মূল দিকগুলি ছিল:
- জন্মসূত্রে প্রাপ্ত সমস্ত বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা।
- আইনের চোখে সমতা এবং সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত করা।
- ডাচ প্রজাতন্ত্র, সুইজারল্যান্ড, ইতালি এবং জার্মানিতে প্রশাসনিক বিভাগ সহজ করা।
- ওজন ও পরিমাপের একক পদ্ধতি চালু করা এবং সাধারণ মুদ্রা প্রচলন করা।
তবে, প্রাথমিক পর্যায়ে নেপোলিয়নকে মুক্তিদাতা মনে হলেও, পরবর্তীতে ফরাসি আধিপত্যের কারণে কর বৃদ্ধি, সেনায় বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবং সেন্সরশিপের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
৩. ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং রক্ষণশীলতার উত্থান
১৮১৫ সালে ওয়াটার্লুর যুদ্ধে নেপোলিয়নের পতনের পর অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ডিউক মেটারনিখের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় ভিয়েনা কংগ্রেস। এর উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপে পুরোনো রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। এই সময় রক্ষণশীল শাসকরা বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং যেকোনো ধরনের ভিন্নমত দমন করতে পুলিশ রাষ্ট্র গড়ে তোলে। কিন্তু বিপ্লবী ও উদারপন্থীরা চুপ থাকেনি; তারা গোপন সমাজ (যেমন জোসেফ ম্যাৎসিনীর 'ইয়ং ইতালি') গঠন করে আন্দোলন চালিয়ে যায়।
৪. বিপ্লবীদের যুগ এবং রোমান্টিসিজম
১৮৩০ থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত সময়কালকে 'বিপ্লবীদের যুগ' বলা হয়। এই সময়ে গ্রিসের স্বাধীনতা যুদ্ধ (যাতে ইউরোপের বুদ্ধিজীবীরাও সাহায্য করেছিলেন) জাতীয়তাবাদী আবেগকে চাঙ্গা করে তোলে। একই সঙ্গে, শিল্প ও কবিতার মাধ্যমে সংস্কৃতি এক বিরাট ভূমিকা পালন করে। একে বলা হয় রোমান্টিসিজম (Romanticism)। জার্মান দার্শনিক জোহান গটফ্রিড হার্ডার দাবি করেছিলেন যে সত্যিকারের জার্মান সংস্কৃতি (Das Volk) লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের লোকগীতি, লোকনৃত্য ও লোককথার মধ্যে। মাতৃভাষার চর্চা এবং লোকসাহিত্যই হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদের বাহক।
৫. জার্মানি এবং ইতালির একত্রীকরণ
উনিশ শতকের মধ্যভাগে জাতীয়তাবাদ রক্ষণশীল থেকে আরও বেশি আক্রমণাত্মক রূপ নেয় এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির সাথে যুক্ত হয়।
- জার্মানির একত্রীকরণ: প্রুশিয়ার প্রধান মন্ত্রী অটো ভন বিসমার্ক 'রক্ত ও লোহা' (Blood and Iron) নীতির মাধ্যমে জার্মানিকে একত্রিত করার দায়িত্ব নেন। অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক এবং ফ্রান্সের সাথে তিনটি সফল যুদ্ধের পর ১৮৭১ সালে কাইজার প্রথম উইলিয়ামকে প্রধান করে জার্মান সাম্রাজ্য ঘোষিত হয়।
- ইতালির একত্রীকরণ: ইতালি তখন বিক্ষিপ্ত রাজ্যে বিভক্ত ছিল। ক্যাভুর, জুসেপ্পে গ্যারিবল্ডি এবং জোসেফ ম্যাৎসিনীর অবিরাম প্রচেষ্টায় এবং সাহসিকতায় ১৮৬১ সালে ভিক্টর ইমানুয়েল দ্বিতীয়কে রাজা ঘোষণা করে একটি ঐক্যবদ্ধ ইতালি গঠিত হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: 'ফ্রেডরিক সরিও' কে ছিলেন এবং তাঁর চিত্রকর্মের মূল বিষয় কী ছিল?
উত্তর: ফ্রেডরিক সরিও ছিলেন একজন ফরাসি চিত্রশিল্পী। ১৮৪৮ সালে তিনি চারটি প্রিন্টের একটি সিরিজ তৈরি করেন যার নাম ছিল 'ডেমোক্রেটিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিপাবলিক'। তাঁর ছবির মূল বিষয় ছিল বিশ্বের সমস্ত দেশের মানুষ, পুরুষ ও নারী, সব বয়স ও সামাজিক শ্রেণীর মানুষ, একটি গণতান্ত্রিক ও সামাজিক প্রজাতন্ত্রের পতাকার নিচে সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে চলেছে।
প্রশ্ন ২: ১৮০৪ সালের নাপোলিয়নিক কোড বা সিভিল কোড কী?
উত্তর: ১৮০৪ সালের নাপোলিয়নিক কোড হলো ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট কর্তৃক প্রবর্তিত একটি আইনি সংস্কার। এর মাধ্যমে জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বিশেষাধিকার বিলুপ্ত করা হয়, আইনের চোখে সমতা প্রতিষ্ঠা করা হয়, সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত করা হয় এবং সামন্ততান্ত্রিক প্রথা দূর করা হয়।
প্রশ্ন ৩: ইতালির একত্রীকরণে জুসেপ্পে গ্যারিবল্ডির ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: জুসেপ্পে গ্যারিবল্ডি ছিলেন একজন মহান ইতালীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি 'রেড শার্টস' (Red Shirts) নামে একটি সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন। ১৮৬০ সালে তিনি দক্ষিণ ইতালি ও সিসিলি জয় করেন এবং সফলভাবে সার্ডিনিয়া-পিজমন্টের রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল দ্বিতীয়কে ইতালি অর্পণ করেন, যা ইতালির একত্রীকরণকে ত্বরান্বিত করে।
সারসংক্ষেপ
- জাতীয়তাবাদ হলো এমন এক রাজনৈতিক মতাদর্শ যেখানে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মানুষের মধ্যে ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে একতাবদ্ধ হওয়ার চেতনা জাগে।
- ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব আধুনিক জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়।
- ১৮১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেস রক্ষণশীল রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে চাইলেও, উদারপন্থী ও বিপ্লবীদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি।
- ভাষা, লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি (রোমান্টিসিজম) জাতীয়তাবাদী চেতনা ছড়িয়ে দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
- অটো ভন বিসমার্কের নেতৃত্বে জার্মানি এবং গ্যারিবল্ডি-ক্যাভুরের নেতৃত্বে ইতালি একটি শক্তিশালি জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হয়।