বিষয়ের ভূমিকা
ভারতবর্ষ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের দেশ। আপনি কি কখনও লক্ষ্য করেছেন যে আমাদের চারপাশের গাছপালা এবং পশুপাখিগুলি একে অপরের থেকে কতটা আলাদা? হিমালয়ের উচ্চতায় যে গাছ দেখা যায়, রাজস্থানের মরুভূমিতে কি সেই একই গাছ জন্মায়? অবশ্যই না। আমাদের দেশ ভারত বিশ্বের ১২টি অতি-জীববৈচিত্র্যময় (Mega-biodiversity) দেশের মধ্যে একটি। এখানে প্রায় ৪৭,০০০ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়, যার ফলে উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের দিক থেকে ভারত বিশ্বে দশম এবং এশিয়ায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারতে প্রায় ১৫,০০০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ রয়েছে, যা বিশ্বের মোট সপুষ্পক উদ্ভিদের ৬ শতাংশ। উদ্ভিদের পাশাপাশি ভারতে বন্যপ্রাণীর সংখ্যাও অবিশ্বাস্য; এখানে প্রায় ৯০,০০০ প্রজাতির প্রাণী এবং মাছের বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে। নবম শ্রেণির ভূগোলের এই অধ্যায়টি আমাদের ভারতের এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ, বনের প্রকারভেদ এবং বন্যপ্রাণী সম্পর্কে বিশদ ধারণা প্রদান করে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্যের কারণসমূহ
ভারতের এই বিশাল বৈচিত্র্য আকস্মিক নয়। বিভিন্ন ভৌগোলিক কারণ এর পেছনে কাজ করে। এই কারণগুলিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: ভূ-প্রকৃতি (Relief) এবং জলবায়ু (Climate)।
- ভূমি (Land): ভূমির প্রকৃতি সরাসরি উদ্ভিদের ওপর প্রভাব ফেলে। পাহাড়, মালভূমি এবং সমভূমির উদ্ভিদ কখনও এক হয় না। উর্বর সমভূমি সাধারণত কৃষিকাজের জন্য ব্যবহৃত হয়, অন্যদিকে অসমতল ভূমিতে বনভূমি এবং তৃণভূমি গড়ে ওঠে, যা বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়স্থল।
- মৃত্তিকা (Soil): মাটির ধরণ অনুযায়ী উদ্ভিদের পরিবর্তন ঘটে। মরুভূমির বালুকাময় মাটিতে ক্যাকটাস বা কাঁটাঝোপ জন্মায়, আবার বদ্বীপ অঞ্চলের পলিমাটিতে ম্যানগ্রোভ অরণ্য দেখা যায়।
- উষ্ণতা (Temperature): হিমালয়ের উঁচু জায়গায় উষ্ণতা কম থাকায় সেখানে সরলবর্গীয় বৃক্ষ দেখা যায়। উষ্ণতা কমে গেলে উদ্ভিদের ধরণ ক্রান্তীয় থেকে উপ-ক্রান্তীয় বা আল্পাইন উদ্ভিদে পরিবর্তিত হয়।
- সূর্যের আলো (Photoperiod): অক্ষাংশ, উচ্চতা এবং ঋতুভেদে সূর্যের আলোর সময়কাল পরিবর্তিত হয়। বেশি সময় ধরে সূর্যের আলো পেলে গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
- বৃষ্টিপাত (Precipitation): ভারতে মূলত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত হয়। যেসব এলাকায় বৃষ্টিপাত বেশি (যেমন পশ্চিমঘাট পর্বতমালা বা উত্তর-পূর্ব ভারত), সেখানে ঘন বন দেখা যায়।
২. প্রাকৃতিক উদ্ভিদের প্রকারভেদ
বৃষ্টিপাত এবং জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে ভারতের বনভূমিকে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
ক) ক্রান্তীয় চিরহরিৎ অরণ্য (Tropical Evergreen Forests)
এই অরণ্যগুলি মূলত সেইসব অঞ্চলে দেখা যায় যেখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২০০ সেন্টিমিটারের বেশি।
- অঞ্চল: পশ্চিমঘাট পর্বতমালার পশ্চিম ঢাল, লাক্ষাদ্বীপ, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি।
- বৈশিষ্ট্য: এই বনের গাছগুলি ৬০ মিটারের বেশি লম্বা হয়। সারা বছর গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া থাকায় গাছগুলি একসাথে পাতা ঝরায় না, তাই একে 'চিরহরিৎ' বলা হয়।
- প্রধান উদ্ভিদ: মেহগনি, রোজউড, রবার এবং এবনি।
খ) ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্য (Tropical Deciduous Forests)
এগুলি ভারতের সবচেয়ে বিস্তৃত অরণ্য, যা 'মৌসুমি অরণ্য' নামেও পরিচিত। বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে একে দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
- আর্দ্র পর্ণমোচী (১০০-২০০ সেমি বৃষ্টিপাত): ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড় এবং হিমালয়ের পাদদেশে দেখা যায়। প্রধান বৃক্ষ হলো শাল, সেগুন (Teak), বাঁশ এবং চন্দন।
- শুষ্ক পর্ণমোচী (৭০-১০০ সেমি বৃষ্টিপাত): উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারের সমতল ভূমিতে দেখা যায়। গ্রীষ্মের শুরুতে জল সংরক্ষণের জন্য এই গাছগুলি ৬-৮ সপ্তাহ পাতা ঝরিয়ে দেয়।
গ) ক্রান্তীয় কাঁটাঝোপ ও গুল্ম (Tropical Thorn Forests and Scrubs)
যেসব অঞ্চলে ৭০ সেন্টিমিটারের কম বৃষ্টিপাত হয়, সেখানে এই ধরণের উদ্ভিদ জন্মায়।
- অঞ্চল: গুজরাট, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং হরিয়ানার শুষ্ক অংশ।
- বৈশিষ্ট্য: গাছগুলোর শিকড় অনেক গভীরে যায় যাতে মাটির নিচ থেকে জল সংগ্রহ করতে পারে। পাতাগুলো ছোট হয় যাতে প্রস্বেদন কম হয়।
- প্রধান উদ্ভিদ: বাবলা (Acacia), ফণিমনসা (Cactus) এবং খেজুর।
ঘ) পার্বত্য অরণ্য (Montane Forests)
উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে উষ্ণতা কমতে থাকে, ফলে উদ্ভিদের ধরণেও পরিবর্তন আসে।
- ১০০০-২০০০ মিটার উচ্চতায় আর্দ্র নাতিশীতোষ্ণ বন (ওক, চেস্টনাট) দেখা যায়।
- ১৫০০-৩০০০ মিটার উচ্চতায় সরলবর্গীয় বৃক্ষ (পাইন, দেওদার, সিলভার ফার) দেখা যায়।
- ৩৬০০ মিটারের ওপরে আল্পাইন উদ্ভিদ (জুনিপার, বার্চ) জন্মায়।
ঙ) ম্যানগ্রোভ অরণ্য (Mangrove Forests)
এগুলি জোয়ার-ভাটা প্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে দেখা যায়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মহানদী, গোদাবরী ও কৃষ্ণার বদ্বীপ অঞ্চলে এই বন বিস্তৃত। পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে 'সুন্দরী' গাছ বিখ্যাত, যা থেকে শক্ত কাঠ পাওয়া যায়।
৩. ভারতের বন্যপ্রাণী (Wildlife of India)
ভারতের বন্যপ্রাণী সম্পদ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এখানে যেমন হাতি রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাঘ ও সিংহের মতো রাজকীয় প্রাণী।
- হাতি: মূলত অসম, কর্ণাটক ও কেরলের উষ্ণ ও আর্দ্র বনে পাওয়া যায়।
- একশৃঙ্গ গণ্ডার: অসম ও পশ্চিমবঙ্গের জলাভূমিতে এদের বাস।
- সিংহ: গুজরাটের গির অরণ্য হলো এশীয় সিংহের একমাত্র প্রাকৃতিক আবাসস্থল।
- বাঘ: মধ্যপ্রদেশের বন, পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন এবং হিমালয় অঞ্চলে বাঘ পাওয়া যায়।
- পাখি ও সামুদ্রিক জীবন: ময়ূর (জাতীয় পাখি) ছাড়াও ভারতে প্রচুর রঙিন পাখি এবং কচ্ছপ, হাঙর ও কুমির দেখা যায়।
৪. পরিবেশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা
মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, নগরায়ন এবং শিকারের ফলে ভারতের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। বন্যপ্রাণী এবং উদ্ভিদ রক্ষায় ভারত সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন:
- ভারতে ১৮টি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ (Biosphere Reserves) তৈরি করা হয়েছে।
- ১৯৯২ সাল থেকে উদ্ভিদ উদ্যানগুলিকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
- প্রজেক্ট টাইগার (Project Tiger) এবং প্রজেক্ট এলিফ্যান্ট (Project Elephant)-এর মতো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
- বর্তমানে দেশে ১০৩টি জাতীয় উদ্যান এবং ৫৩৫টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রয়েছে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: 'ফ্লোরা' (Flora) এবং 'ফনা' (Fauna) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কোনো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের বা সময়ের প্রাকৃতিক উদ্ভিদসমূহকে 'ফ্লোরা' বলা হয়। অন্যদিকে, সেই অঞ্চলের প্রাণিকুলকে 'ফনা' বলা হয়।
প্রশ্ন ২: চিরহরিৎ অরণ্য কেন সর্বদা সবুজ দেখায়?
উত্তর: এই অরণ্যে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ থাকে। প্রতিটি প্রজাতির পাতা ঝরানোর নির্দিষ্ট সময় আলাদা আলাদা। ফলে সারা বছরই কোনো না কোনো গাছ পাতায় ঢাকা থাকে, যা বনটিকে সর্বদা সবুজ দেখায়।
প্রশ্ন ৩: ভারতের সুন্দরবন কেন বিখ্যাত?
উত্তর: সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং এটি 'রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার'-এর প্রধান আবাসস্থল। এখানে সুন্দরী নামক প্রচুর ম্যানগ্রোভ গাছ পাওয়া যায়।
সারসংক্ষেপ
- ভারত বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র্যময় দেশ যেখানে ৪৭,০০০ উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে।
- ভূ-প্রকৃতি এবং জলবায়ু উদ্ভিদের বৈচিত্র্য নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
- বৃষ্টিপাতের তারতম্যে ভারতে পাঁচ প্রকার বনভূমি দেখা যায়: চিরহরিৎ, পর্ণমোচী, কাঁটাঝোপ, পার্বত্য এবং ম্যানগ্রোভ।
- বাঘ ও সিংহ উভয়ই পাওয়া যায় এমন একমাত্র দেশ হলো ভারত।
- পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনভূমি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
- সরকার জাতীয় উদ্যান এবং বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের মাধ্যমে এই সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করছে।